বাজেট প্রতিক্রিয়া: বয়ান ও বাস্তবায়নের দূরত্ব কমানো হোক

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বাজেট। ছবি: যুগান্তর

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনায় অভিযোগ উঠছে, বাজেট সচ্ছল-উচ্চ আয়ের মানুষকে অনেক বেশি সুবিধা দিচ্ছে। গরিব মানুষের জন্য প্রান্তিকভাবে এ ধরনের ব্যবস্থা থাকছে। বলার চেষ্টা চলছে, ‘দেশের মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে বিকাশমান মধ্যবিত্ত, নিু মধ্যবিত্তরা এ বাজেট থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে না। কারণ যারা উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পায় না, বিদেশে গিয়ে এসব সেবা নিতে পারে না, তাদের জন্য আমরা কী মানসম্পন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছি।

তাদের সন্তান উচ্চমানের শিক্ষা পাচ্ছে কি না, চিকিৎসা করাতে পারছে কি না, এসবই বড় বিষয়। দেশের মধ্যবিত্তদের জন্য যা করা হবে, সেটার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়া। অভিমত হল, ‘করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রেখে বাড়ানো হয়েছে সম্পদের ক্ষেত্রে সারচার্জের সীমা।

যারা আয় করে তাদের জন্য সুবিধা দেয়া হয়নি, অথচ সম্পদশালীদের সুবিধা দেয়া হয়েছে। বাজেটে গরিব মানুষের জন্য একটি প্রান্তিক সুবিধা দেয়া হয়েছে। তবে অর্থনৈতিকভাবে যারা সুবিধাভোগী এবারের বাজেট আবারও তাদেরই পক্ষে গেছে।’

দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ব্যাংক খাত সম্পর্কে অনেকেই মতামত রেখেছেন; বলেছেন, ব্যাংক খাত থেকে যারা সুবিধা নিয়েছেন; তারা ব্যাংকিং কমিশন হোক, তা চান না। কমিশন হলে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। তথ্য-উপাত্তের সমস্যা আছে; সেগুলো প্রকাশিত হবে, জবাবদিহিতা বাড়বে। যারা এ খাত থেকে অন্যায্য সুবিধাগুলো নিয়েছেন, নিচ্ছেন; তারা এ পরিবর্তনগুলো আনতে দিতে চান না।

যারা অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী, এ বাজেট তাদের পক্ষেই গেছে। কারণ পরিবর্তনের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অর্থনৈতিক কৌশলে সেটা দেখা যায় না। কিন্তু এসব বিষয় প্রতিশ্রুতি, কর্মপরিকল্পনায়, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ছিল। উন্নয়নের জন্য বাজেটে যে টাকা বরাদ্দ করা হয়, তা যথাযথভাবে ব্যবহৃত-ব্যয়িত হচ্ছে কি না, অর্জিত করের টাকা যথাযথভাবে অর্থনীতিতে ট্রান্সফার হচ্ছে কি না, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি সমভাবে সবাইকে উপকারভোগীর আওতায় আনতে পারছে কি না, সেটাই বাজেট পরীক্ষা-পর্যালোচনায় মুখ্য বিষয়।

কেননা, দেখা গেছে, বহুল উচ্চারিত উন্নয়ন সব মানুষের কাছে যথাযথভাবে যায়নি, আর ব্যয়িত অর্থ আমজনতার পক্ষে যায়নি। অর্থনীতিতে বৈষম্য বৃদ্ধির, দুর্নীতির বিস্তারের সূচকের মধ্যে তা বেরিয়ে আসছে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যতের বেশ কিছু কঠিন উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার ফাইনাল পরীক্ষায় টিকে থাকা, এসডিজি অর্জনে) পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বাজেট, এই রকম বাজেটের মাধ্যমে বাংলাদেশ ওইসব উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার পথে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারবে কি না, তা বিবেচ্য থেকে যাচ্ছে। বাজেট প্রণয়ন, মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিতে আনতে হবে; পারস্পরিক প্রতিপক্ষ প্রতীয়মানের কূট তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে বিচ্যুতির বিবরে যেতে দেয়া সমীচীন হবে না।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ বাজেট বটে। বাজেটের আকার বেশ বাড়লেও তা বাস্তবায়নের স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অবর্তমানে এটি উচ্চাকাক্সক্ষী। সাম্প্রতিক বছরে বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতা যেন একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোর বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো যায়, কেন বা কীভাবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো প্রয়োজন, তা নিয়ে গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলোচনা-পর্যালোচনা দেখা যায় না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এবং দেশের সামনে যে বিশাল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো রয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্যই বড় আকারের বাজেটের প্রয়োজন। মূল সমস্যার জায়গাটি হচ্ছে দুর্বল বাজেট বাস্তবায়ন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাঞ্ছিত স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার ঘাটতি।

বাজেট কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন না করতে পারার পেছনে একটি রাজনৈতিক-অর্থনীতিও আছে। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ৮০ শতাংশের কম বাজেট বাস্তবায়ন করেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ অথবা ৮-এর ওপরে নিয়ে যাওয়া যায়। এ জন্য বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষগুলো সত্যিকার তাগিদ বা চাপ অনুভব করে না। ফলে আয়-ব্যয়ের বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক সূচকগুলোর দুর্বল সম্পর্ক দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

বাজেটের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ও গুণগতভাবে বাস্তবায়ন না হলেও দেখা যাচ্ছে, যেন অর্থনীতি শক্তিশালীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে খরচ ও সময় উভয়টিই বেড়ে যাচ্ছে, যা এ প্রকল্পগুলো শেষ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে এ ধরনের ধীরগতি সত্ত্বেও ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে নিঃসন্দেহে বাধাগ্রস্ত করছে।

এ কারণে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন, যেখানে বিদ্যমান সমস্যাগুলো উল্লিখিত থাকবে এবং পাশাপাশি নতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের সুযোগ থাকবে। বিগত বছরগুলোর মতো বর্তমান প্রস্তাবিত বাজেটেও এ ধরনের কোনো রোডম্যাপ দেখা যায়নি।

একক হারের প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে সরে এসে নতুন ভ্যাট আইনে মূল্য সংযোজন করের চারটি হার প্রস্তাব করা হয়েছে। একক হার ও একাধিক হার উভয় ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নে সুবিধা-অসুবিধা তথা চ্যালেঞ্জ আছে। উভয় প্রকার কর ব্যবস্থাপনায় সাধারণ জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে অটোমেশন ক্ষেত্র প্রস্তুতি ছাড়া একাধিক হার ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ফাঁকি দিতে উৎসাহিত করতে এবং ভ্যাট আইনের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনকে ব্যাহত করতে পারে। সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ভ্যাট আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়নের ওপর পরোক্ষ কর আদায় করার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

দুর্দশায় থাকা ব্যাংকিং খাত নিয়ে বাজেটে আরও বেশি মনোযোগ প্রয়োজন ছিল। ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান সংকট ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে বড় ধরনের আস্থাহীনতার সৃষ্টি করেছে, যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও স্থবিরতার সৃষ্টি করেছে। এখনও এ বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনা এবং যথোপযুক্ত পদক্ষেপ না নেয়া হলে ভবিষ্যতে সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে। এ কথা বলা বাহুল্য, ব্যাংকিং খাতের সংকট অনেক দিন ধরে চলমান কাঠামোগত সমস্যার ফল।

এ খাতে অত্যধিক মাত্রায় অনাদায়ী ও আড়াল করা ঋণ রয়েছে। একটি দুষ্টচক্র ব্যাংক ও বীমা খাত এবং ক্ষেত্রকে দখল করার পথে ধাবমান। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যবেক্ষণ ব্যাংকিং খাতের একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দ্বারা সমর্থিত অনিয়মের কোনো দৃশ্যমান শাস্তির পরিবর্তে পৃষ্ঠপোষকতার আবহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীন ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে না পারায় এ সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করছে বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত।

ব্যাংকিং খাতে সাম্প্র্রতিক সময়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা যাতে সংকটকে আরও গভীর করতে না পারে; সে জন্য একটি নিরপেক্ষ এবং পেশাদারি ব্যাংকিং কমিশন, যা বাজেটে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তার অগৌণে বাস্তবায়ন জরুরি।

কয়েক বছর ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ খুব একটা সচল অবস্থানে নেই, অন্যদিকে মহার্ঘ সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক জাতীয় বিনিয়োগ বেড়েছে; তবে তা প্রবৃদ্ধিতে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হয়নি। কর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখতে হবে এবং এর হারকে ত্বরান্বিত করতে বেসরকারি বিনিয়োগে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উন্নতির ধারার সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবৃদ্ধির ধারা সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। সরকারি হিসাবেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথেষ্ট শ্লথগতিসম্পন্ন।

এ রকম একটি ‘কর্মসংস্থান’বিমুখ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নানা রকম অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসাম্য বৃদ্ধি এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির সহায়ক। অতএব, শ্রমবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর খাতগুলোতে কীভাবে আরও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়, কীভাবে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা যায় এবং এ ধরনের বিনিয়োগের বাধাগুলো কীভাবে অপসারণ করা যায়; সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

এবারের বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ আছে, যেমন যুবকদের মধ্যে সব ধরনের ব্যবসা উদ্যোগ (স্টার্টআপ) সৃষ্টির জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা। কিন্তু সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি, ব্যাংকিং খাতের সংকটের সমাধান এবং অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর দৃশ্যমান ও সময়মতো বাস্তবায়ন ছাড়া ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের বড় ধরনের উন্নতি সম্ভব নয়।

এবারের বাজেটে এ তিনটি বিষয়েই শক্তিশালী কোনো অবস্থান চোখে না পড়ায় বাজেটে বয়ান ও বাস্তবায়নের মধ্যকার দূরত্ব বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনা, ভবন নির্মাণে বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও বাজেটে কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব নীতি ও নৈতিকতার দৃষ্টিতেও আপত্তিকর। শাস্তি বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না রেখে রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ধরনের সুযোগ দেয়া হলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের উদ্যোগের খুব বেশি সাফল্যের চিত্র নেই। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে একটি উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। সামনের দিনগুলোতে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রফতানি পণ্য বহুমুখী করা। এ ক্ষেত্রে অদ্যাবধি বাংলাদেশের সাফল্য নেই।

এবারের বাজেটে বরাবরের মতোই তৈরি পোশাক খাতে অন্য যে কোনো রফতানি খাতের চেয়ে বেশি সুবিধা দেয়া অব্যাহত রয়েছে। অথচ রফতানি পণ্য বহুমুখী করতে হলে তৈরি পোশাক খাতের চেয়ে অন্যান্য খাতেও বেশি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন, প্রস্তাবিত বাজেটে যা অনুল্লেখেই রয়ে গেছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সবার জন্য পেনশন, সরকারি কর্মচারীদের বীমা, ওয়েলথ ট্যাক্স, যানবাহনের নিবন্ধন কর বৃদ্ধি, রেমিটেন্সে প্রণোদনার উদ্যোগ ইত্যাদি ইতিবাচক।

তবে অতীতে উচ্চারিত এমন অনেক ভালো পদক্ষেপ কেন বাস্তবায়ন করা যায়নি, তা মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকাটা জরুরি; তা না হলে অনেক ভালো উদ্যোগ শুধু বয়ানেই থেকে যাবে, বাস্তবায়ন থেকে যথারীতি দূরত্বে।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব; এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান