স্বদেশ ভাবনা

দারিদ্র্য হার হ্রাসে প্রস্তাবিত বাজেট কতটা সহায়ক হবে?

  আবদুল লতিফ মন্ডল ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দারিদ্র্য হার হ্রাসে প্রস্তাবিত বাজেট কতটা সহায়ক হবে?

১৩ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হল ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এ যাবৎকালের বৃহত্তম এ বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের প্রথম বাজেট (১৯৭২-৭৩) ৭৮৬ কোটি টাকার তুলনায় ৬৬৬ গুণ বড়। বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে।

শাসক দল আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘গণমুখী ও সময়োপযোগী’ হিসেবে দাবি করলেও বিরোধী দলগুলো যেমন- জাতীয় পার্টি, বিএনপি, গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) যথাক্রমে এ বাজেটকে ‘আয় ও ব্যয়ের লক্ষ্য অর্জনে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টিকারী বাজেট’, ‘উচ্চাভিলাষী ও গণবিরোধী বাজেট’, ‘হতাশাজনক ও চটকদার বাজেট’, ‘গতানুগতিক বাজেট’ আখ্যা দিয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যথা- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), উন্নয়ন অন্বেষণ, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এ বাজেটকে যথাক্রমে ‘অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষের বাজেট’, ‘সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতাকে প্রকট করার বাজেট’ এবং ‘উচ্চাভিলাষী বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই প্রস্তাবিত বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব ও গণমুখী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

বিসিআই বলেছে, বাজেটে অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। বিজিএমইএ বাজেটকে কল্যাণমুখী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। দুর্বল অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে ঘোষিত এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মতপ্রকাশ করেছেন কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ। ভালো-মন্দের এ বাজেট দারিদ্র্য হার হ্রাসে কতটা সহায়ক হবে তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

গত প্রায় এক দশক ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগতভাবে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১১ সালের আদমশুমারির চূড়ান্ত রিপোর্টে দেশের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজারে। সংস্থাটির ২০১০ সালের হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। এতে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৯০ লাখ।

২০১৬ সালের হায়েসের প্রাথমিক রিপোর্টে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ ধরে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ কোটিতে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮১ লাখে উন্নীত হয়েছে।

হায়েস ২০১৬-এর চূড়ান্ত রিপোর্টে দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ ধরে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ ৪৫ হাজারের ওপরে।

তবে ২০১৬ সালের পর বিবিএস কর্তৃক আর কোনো হায়েস পরিচালিত না হওয়ায় হায়েস ২০১৬-এর চূড়ান্ত রিপোর্টে বিবিএস কীভাবে দারিদ্র্য হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করল তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এখানে আর যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হল, ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে দারিদ্র্য যে হারে হ্রাস পেয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সময়কালে দারিদ্র্য সে হারে হ্রাস পায়নি। প্রাথমিক রিপোর্টের মতো চূড়ান্ত রিপোর্টেও স্বীকার করা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দারিদ্র্য ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে কমলেও ২০১০ থেকে ২০১৬ সময়কালে তা কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে। অর্থাৎ দারিদ্র্য হ্রাসের গতি নিুমুখী।

দারিদ্র্য হ্রাসে যেসব বিষয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হারে স্থিতিশীলতা অর্জন, যুবকদের জন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ব্যবস্থাসহ সরকারি-বেসরকারি খাতে অধিক পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ, আধা-দক্ষ কর্মীদের বিদেশে প্রেরণ, আন্তঃবিভাগীয় বা আঞ্চলিক দারিদ্র্যবৈষম্য নিরসন, ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং উপকারভোগী বাছাইয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং সমাজের নিুস্তরের জনগণকে উন্নত জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে ছোট পরিবার গঠনে সচেতন করা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কিছুটা কমে গেলেও কৃষি খাত এখনও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান কর্মকাণ্ড এবং চালিকাশক্তি।

দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে কৃষি খাত। জনশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষিতে নিয়োজিত। কৃষিতে উৎপাদনের হার অধিকতর বৃদ্ধির লক্ষ্যে নব্বইয়ের দশকে সরকার থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়ার ফলে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশে (সূত্র : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৫)।

স্বাধীনতার পর কোনো বছরে এটিই ছিল কৃষিতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর থেকে অনেকটা ধারাবাহিকভাবে কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পাচ্ছে।

২০১০-১১, ২০১১-১২, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৯, ২ দশমিক ৪১, ১ দশমিক ৪৭, ৩ দশমিক ৮১, ২ দশমিক ৪৫, ১ দশমিক ৭৯ এবং ১ দশমিক ৯৬ শতাংশে (সূত্র : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮)। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার এখনও সরকারিভাবে জানা যায়নি। তবে তা ৩ শতাংশের বেশি হবে না বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

এদিকে গত এক দশকে কৃষি খাতে গড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা ১৩ জুন তার ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় দাবি করেছেন। তার এ দাবি মেনে নেয়া হলেও তা ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হারের প্রায় অর্ধেক। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির নিুগতি দারিদ্র্যবিমোচনে কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় কৃষি খাতে ভর্তুকি ও কৃষি উপকরণে প্রণোদনা অব্যাহত রাখার কথা বললেও তা বাড়ানোর আশ্বাস দেননি। সারের দাম অপরিবর্তিত রাখার কথাও তিনি বলেছেন। মন্ত্রী বলেছেন, শস্য কাটা ও মাড়ানো যান্ত্রিকীকরণে কৃষকদের উৎসাহিত করা হবে এবং এ জন্য মেশিনারিজ কিনতে তাদের ভর্তুকি দেয়া হবে।

এখানে যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হল, দেশের কৃষি পরিবারগুলোর ৮৪ শতাংশ ভূমিহীন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। সরকার ভর্তুকি দিলেও তাদের পক্ষে এসব মেশিনারিজ কেনা সম্ভব হবে না। তাই প্রথমদিকে সরকারকে এসব মেশিনারিজ বিনামূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে অতিরিক্ত জনসংখ্যার এ দেশে শস্য কাটা-মাড়াই যান্ত্রিকীকরণ কৃষি শ্রমিকদের বেকারত্ব ভীষণভাবে বাড়াবে, যা একটি নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে শস্য-ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রক্ষায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘শস্যবীমা’ চালুর কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। ভালো প্রস্তাব।

তবে বীমার কিস্তির টাকা কে পরিশোধ করবে কৃষিমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় তার উল্লেখ নেই। আগেই বলেছি, দেশের ৮৪ শতাংশ কৃষক ভূমিহীন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। এদের পক্ষে বীমার কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে বীমার কিস্তি সরকারকেই বহন করতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মসংস্থান নিয়ে গত ১৬ নভেম্বর ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এতে বাংলাদেশ সম্পর্কিত তথ্যে দেখা যায়, দেশে বেকারত্বের হার ২০১০ সালের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিবিএসের ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপের হারের (৪ দশমিক ২ শতাংশ) চেয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেশি। আর তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের ৬ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের উচ্চহারের জন্য দায়ী মূল কারণটি হল, যে হারে যুবশক্তি শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, সে হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ২০১০, ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তরুণ বেকারত্বের হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪, ৯ দশমিক ৯, ১১ দশমিক ৪ ও ১২ দশমিক ৮ শতাংশে।

অর্থমন্ত্রী শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সব ধরনের ব্যবসার উদ্যোগ সৃষ্টির জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন বাজেটে। নিঃসন্দেহে ভালো প্রস্তাব। এতে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, স্বল্পশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত গরিব যুবকরা (এখানে যুবক বলতে যুবতীদেরও বোঝাবে) কি এ সুবিধা পাবে? উত্তর হল, তারা এ সুবিধা পাবেন না। কারণ ব্যবসা শুরু করতে কিছু নিজস্ব অর্থেরও প্রয়োজন। সে অর্থ তাদের নেই। প্রস্তাবিত সুবিধা শুধু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের যুবকরাই ভোগ করবেন। তাই প্রস্তাবিত সুবিধা সার্বিক বেকারত্ব, বিশেষ করে যুব বেকারত্ব হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবে না। উল্লেখ্য, চাহিদা অনুযায়ী যুব জনশক্তির কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় জনসংখ্যা কাঠামোর সুযোগ দেশ কাজে লাগাতে পারছে না। বেকার যুবকরা হতাশায় ভুগছে। বেকারত্ব যে দারিদ্র্যের হার হ্রাসে এক বিরাট বাধা, সে কথাও বলার অপেক্ষা রাখে না।

হায়েস ২০১৬ মোতাবেক দেশের ৮টি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে। এখানে দারিদ্র্যের হার ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হারের প্রায় দ্বিগুণ। দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ ১০ জেলার পাঁচটিই রংপুর বিভাগে। সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত বিভাগ বা অঞ্চলগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগ। ময়মনসিংহ বিভাগে দারিদ্র্য হার ৩২.৮ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে দারিদ্র্য হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

খুলনা ও বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্য হার যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৫ এবং ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে দারিদ্র্য হার জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য হারের নিচে।

ঢাকা বিভাগে দারিদ্র্য হার সবচেয়ে কম। এখানে দারিদ্র্য হার ১৬ দশমিক শূন্য শতাংশ। সিলেট বিভাগে দারিদ্র্য হার ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে দারিদ্র্য হার ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। দরিদ্রতম রংপুর বিভাগ এবং জাতীয় দারিদ্র্য হারের ওপরে অবস্থানকারী বিভাগ বা অঞ্চলগুলোর জন্য বাজেটে কোনো বিশেষ বরাদ্দ নেই।

বাজেটে রংপুরের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও উন্নয়নবৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে সংসদে বাজেট পেশের আগেই মানববন্ধন করেছে রংপুর উন্নয়ন ফোরাম। বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে বরিশালের মানুষ। দেশের সব অঞ্চলের উন্নয়নে মোটামুটি সমতা আনা না হলে দারিদ্র্য হ্রাসে সাফল্য আসবে না।

অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ও মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেলেও ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য বেড়েছে বৈ কমেনি। ওয়েলথ-এক্স নামের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক তথ্য মোতাবেক, বাংলাদেশ ২০১২ সাল থেকে অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে সবার ওপরে।

২০১২ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে দেশটিতে ধনকুবের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে। এ হার যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়ে বেশি। বিবিএস-এর খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারে আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে।

তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। বিপরীতে একই সময় সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়, যা ২০১০ সালে ছিল ১ হাজার ৭৯১ টকা। ফলে দারিদ্র্য হার হ্রসের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। বাজেটে এ বৈষম্য হ্রাসে বিশেষ কোনো ব্যবস্থার উল্লেখ নেই। তাই এ বাজেটকে ‘ধনীদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের বাজেট’, ‘সুবিধাভোগীদের বাজেট’ ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে একটি স্বীকৃত পন্থা। এটা ঠিক, এ কর্মসূচির আওতায় ক্রমান্বয়ে কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটছে এবং অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমস্যা হল, যে হারে ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, সে হারে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

তবে একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে সুবিধাভোগীর সংখ্যা। এতে সুবিধা পাবেন প্রায় ৮৯ লাখ মানুষ, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় অনেক বেশি। এ জন্য বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৬৪ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, যা ওই বছরের জিডিপির ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

সবশেষে বলতে চাই, ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দারিদ্র্য যে হারে কমেছিল, সে হারে পৌঁছতে এবং অতিক্রমে বাজেট বরাদ্দে অসঙ্গতি দূর করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেট দারিদ্র্য হার হ্রাসে সহায়ক হোক- এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×