সুখ-শান্তি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে পৃথিবী

  জয়া ফারহানা ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুখ-শান্তি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে পৃথিবী
প্রতীকী ছবি

একুশ শতকের বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ নতুন করে আর ফিরে আসবে না, কখনই আসবে না ভেবে অনেক সময় আত্মতৃপ্তিতে আপ্লুত হই আমরা। কিন্তু কখনও কি ভেবেছি, আমরা প্রত্যেকেই মানসিকতায় একেকজন সাম্রাজ্যবাদী? দীর্ঘদিন উপনিবেশের অধীনে থেকে অবচেতনে আমরা হয়ে উঠেছি সাম্রাজ্যবাদী।

মনের একান্ত গভীরে যে সাম্রাজ্যবাদী মনের বসবাস, অনেক সময় হয়তো তা আমরা ঠিকমতো ধরতেও পারি না। বিত্তবানরা যাদের দান করেন, তাদের ঠিক রক্ত মাংসের মানুষ বলে মনে করেন না।

দাতা এবং গ্রহীতার সহজ সম্পর্কটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। দাতা জানেন না কাকে তিনি দান করছেন, সে কোথায় থাকে। তারও একটি পরিবার আছে, কিছু মানবিক সম্পর্ক আছে, মানবিক মর্যাদা তো আছেই। দাতা এবং গ্রহীতা এটিই একমাত্র সম্পর্ক নয়।

যিনি দিচ্ছেন এবং যিনি নিচ্ছেন সেই দেয়া-নেয়ার সম্পর্কটি ঠিক সম্মিলন এবং সমন্বয়ের হচ্ছে না। এও একরকম সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ। কাবুলিওয়ালা গল্পে আমরা দেখি মিনির বিয়ের দিনে ইলেক্ট্রিক আলো জ্বলল না।

কারণ মিনির বাবা আলোর জন্য বরাদ্দ অর্থ দান করে দিয়েছিলেন আরেক মেয়ের বাবা রহমতকে, যেন সেই বাবা তার মেয়েকে সুদূর ভারতবর্ষ থেকে আফগানিস্তানে গিয়ে দেখে আসতে পারে। ‘যেমন মনে করিয়াছিলাম তেমন করিয়া ইলেক্ট্রিক আলো জ্বালাইতে পারিলাম না, গড়ের বাদ্যও আসিল না, অন্তঃপুরে মেয়েরা অত্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। কিন্তু মঙ্গল আলোকে আমার শুভ উৎসব উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।’ এই দানের মধ্যে লেখকের সঙ্গে রহমতের মানবিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

সময়ের ব্যবধানে এই ভূগোল থেকে সাম্রাজ্যবাদ দূর হয়েছে; কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী মন থেকে মুক্তি মেলেনি আমাদের। যাদের বাড়িতে একাধিক গৃহকর্মী, পাচক, গাড়িচালক, মালি, নিরাপত্তাকর্মীসহ আরও নানা কাজে সহায়তাকারী থাকে তাদের সঙ্গে গৃহমালিক-মালকিনের সম্পর্কটি কেমন?

একুশ শতকে আবদুর রহমানের মতো কর্মঠ বিশ্বস্ত আন্তরিক গৃহকর্মী পাওয়া প্রায় অসম্ভব, যিনি লেখককে ছুটি কাটাতে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। কিন্তু একটা সময় পর্যন্ত গৃহকর্মীর বাড়িতে নিমন্ত্রণে যাওয়া না হোক, তার বাড়ির খোঁজখবর শহুরে মধ্যবিত্তের জানা ছিল। সত্তর এমনকি আশির দশকেও পত্রিকা গ্রাহকরা হকারকে চিনতেন না, তার বাড়ি কোথায় জানতেন না এমন দূরত্ব ছিল অসম্ভব। আজকাল কেউ আর হকারের মুখ চেনে না, তার সম্পর্কে অন্যান্য খবর জানা তো আরও দূরের ব্যাপার।

সম্পর্কের রসায়নগুলো একেবারে এলোমেলো হয়ে গেছে। সম্পর্কের রসায়ন বদলে গেছে আদ্যোপান্ত। গৃহকর্মীর বদলে গেজেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবটের কাল। তখন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও কত কৃত্রিম, আরও কত আনুষ্ঠানিক এবং কতটা যে দূরত্বের হবে ভাবলে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়।

২.

প্রায় সবকিছু বদলে যাচ্ছে এবং খুব দ্রুত। চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলছে, বিশ্বজুড়ে মানুষের বিশৃঙ্খল খাদ্যাভ্যাসের কারণে অচিরেই মানবসভ্যতা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে। গবেষকরা দাবি করেছেন, সঠিকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুললে এক কোটি দশ লাখ অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব।

বিশৃঙ্খল এ খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে রয়েছে অতিমাত্রায় জাঙ্ক ফুড, রেডমিট, কোমল পানীয়, মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহোল পান, সেই সঙ্গে শিম, মটর এবং শাকসবজিজাতীয় খাওয়ার পরিমাণ খাদ্যতালিকা থেকে কমে যাওয়া। ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে এক হাজার কোটি।

এখনই সবার খাদ্যাভ্যাস না বদলালে এত বিপুলসংখ্যক লোককে টেকসই স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের জোগান দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে খাদ্যের উৎপাদন, কমাতে হবে খাদ্যের অপচয়। কিন্তু আমরা লক্ষ করি, খাবারের অপচয় কমছে তো না-ই, বাড়ছে বরং। পাঁচতারা হোটেলগুলোয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাবারের অপচয় হয়। বাসাবাড়িতেও উৎসব উপলক্ষে কম অপচয় হয় না।

অথচ বিশ্বজুড়ে প্রায় একশ’ কোটি লোক প্রয়োজনীয় খাবার পায় না। প্যারাডক্স এই, দু’শ কোটি লোক আবার প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খায়। ল্যানসেট বলছে, যারা অতিরিক্ত খায়, তারা সবাই অস্বাস্থ্যকর খাবার খায়। আমাদের দেশে এত স্বাস্থ্যকর খাবার আছে এবং তা এত সুলভে পাওয়া যায় অথচ আমরা সে সবকে পাত্তাই দেই না।

ল্যানসেট সবজি জাতীয় খাবারের পরিমাণ বাড়াতে বলেছে। বাংলাদেশের যে কোনো ডোবা কিংবা জলার ধারে, অবহেলা অনাদর অযত্নে অনায়াসে অগণিত শাকসবজি জন্মায়। এসব শাকসবজি ডাঁটা পাতা কুড়ি অপরিমেয় ঔষধি গুণসম্পন্ন। যুগান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখেছিলাম, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় অ্যান্টাসিড, ওমিপ্রাজল গ্রুপের ওষুধ। অতি অনায়াসে পাওয়া পাটশাক, পুদিনাপাতা খেয়ে আমরা অ্যাসিডিটি রোধ করতে পারি। তা করি না।

ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া মুঠো মুঠো অ্যানালজিন, অ্যাসপিরিন, অক্সিফেন বুটাজোন, প্যারাসিটামল, রোফেক্সিব জাতীয় ওষুধ খাই। বিভিন্ন চিকিৎসা সাময়িকী বলছে, ব্যথা কমানোর এসব ওষুধ থেকে পাকস্থলীর রক্তপাত, গ্যাস্ট্রিক হ্যামারেজ, বোনম্যারো থেকে শ্বেত রক্তকণার সংখ্যা কমে যাওয়া, কিডনিতে প্রদাহ, রক্তপাত, হৃদযন্ত্রের সমস্যা হতে পারে।

ব্যথার ওষুধে ডোপিংয়ের ব্যবহার এখন ডালভাত। এই ডোপিংয়ের প্রভাবে প্রথমদিকে অকারণে জেদ জাগে, অতিরিক্ত আনন্দ আসে কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে গভীর অবসাদ নেমে আসে, ঘুম পায়।

হৃৎপিণ্ডের কোনো না কোনো সমস্যায় ষাটোর্ধ্ব প্রায় প্রত্যেকে ভুক্তভোগী। সরবিট্রেট মুড়ি মুড়কির মতো কিনে খাচ্ছি। অথচ ধুন্ধলের তরকারি হৃদযন্ত্রের অসুখ সারানোর মোক্ষম সবজি, তার দিকে ফিরেও তাকাই না।

সামান্য সর্দি কাশিতে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেয়ে রক্তচাপ বাড়াচ্ছি, কারণে অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে এনেছি শূন্যের কোঠায়। ইউরিক অ্যাসিড সারাতে গিয়ে ল্যাসিক্স জাতীয় ওষুধ খেয়ে অ্যারিদমিয়ার শিকার হচ্ছি।

স্নায়ুতন্ত্রকে অধিকতর কর্মক্ষম রাখার জন্য দিনেরাতে কত কাপ চা কফি যে খাই! মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন তৈরি করছে ইনসমনিয়া, অহেতুক অস্থিরতা, স্নায়ুরোগ, এমনকি হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত। রেস্তোরাঁগুলোর রসুইঘরের অপরিচ্ছন্ন শ্রীহীন দশাও রেস্তোরাঁর ক্যালোরিবহুল খাবার থেকে আমাদের চোখ সরাতে পারছে না। শুধু যে চোখের খিদেতেই খাচ্ছি, তা নয়। প্রয়োজনেও খেতে হচ্ছে। ঢাকার ষাট লাখ নাগরিককে মধ্যাহ্নভোজের জন্য বাধ্যতামূলক নির্ভর করতে হয় হোটেল রেস্তোরাঁর ওপর। বাসাবাড়ির খাবার খাওয়ার সুযোগ নেই। কেন নেই, সে আলাপও অনেক বড়, জটিলও।

পরিবর্তিত রুটিন কী পরিমাণ ক্ষতিকর হয়ে উঠছে আমাদের জন্য একবার সুস্থির মাথায় তা চিন্তা করি না। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ক্লিফোর্ড সাপারের নেতৃত্বাধীন একদল গবেষকের প্রতিবেদন বলছে রেনাল ফেইলিওর, হার্ট ফেইলিওর, স্ক্রিৎজোফ্রেনিয়া, অ্যাংজাইটি নিউরোসিসের অন্যতম প্রধান কারণ বেশি রাত জাগা, দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা।

৩.

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, গত এক দশকের মধ্যে বিশ্বে সুখের মাত্রা সর্বনিু পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০০৬ সালের পর এখনকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। গৃহযুদ্ধের ফলে অস্থিরতায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া অ-সুখের প্রধান কারণ।

রবীন্দ্রনাথের গান্ধারীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ধর্ম তোমাকে কী দেবে? গান্ধারীর উত্তর ছিল, যুদ্ধ নব নব। দেখা যাচ্ছে গান্ধারী মিথ্যে বলেনি। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, বিশ্বজুড়েই অস্থিরতা, অসুখ। সুখের সঙ্গে বৈশ্বিক শান্তি সূচকেও অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ইন্সটিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) প্রকাশিত বৈশ্বিক শান্তি সূচক-২০১৯-এ ১৬৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০১তম। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯৩তম।

গত দুই দশক ধরে পৃথিবীর তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রতিবেশী দিল্লিতে তাপমাত্রা উঠেছে পঞ্চাশ ডিগ্রি। সাগরের বরফ গলে যাচ্ছে। ফলে শ্বেত ভল্লুকের আবাসন মেরু অঞ্চলে খাবারের অভাবে টিকতে না পেরে দলে দলে শ্বেত ভল্লুক আক্রমণ করছে রাশিয়ার বেলুশিয়ায়।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে পোলার বিয়ারসহ আরও পঞ্চাশ শতাংশ প্রাণীর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশের বন্যপ্রাণীর দিকেই তাকাই না কেন। মনে করতে পারেন, শেষ কবে দেখেছেন একটি খাটাশ, উদবিড়াল, লেমুর, গন্ধগোকুল, সজারু কিংবা বন্য খরগোশ?

ইকো সিস্টেমকে বিবেচনায় না আনা হলে প্রাণীবৈচিত্র্য হ্রাস পাবে এ আর বিচিত্র কী! দক্ষিণ কোরিয়ার বাতাস এখন এতই দূষিত যে কুকুরকে পর্যন্ত মাস্ক পরিয়ে হাঁটানো হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশেও ইকো সিস্টেমকে দেখা হচ্ছে খণ্ডিতভাবে। মাছ, গাছ, জলাভূমি ও অরণ্যকে আমরা ইকো সিস্টেমের অংশ হিসেবে দেখছি না।

আমাদের উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে ইকো সিস্টেমের ধারণা সাংঘর্ষিক। শুধু আমাদের কেন, গোটা বিশ্বেই চলছে পরিবেশ নিয়ে তুঘলকি কর্মকাণ্ড। ভূমধ্যসাগরে লাখ লাখ টন প্লাস্টিক ফেলে তাকে কীরকম বর্জ্যাগারে পরিণত করা হয়েছে সে তো বোধহয় কমবেশি সবাই দেখেছেন টেলিভিশনের পর্দায়। ঢাকার বাতাসে প্রতি ইউনিটে এক হাজার ন্যানোগ্রাম সিসা।

এভাবে চলতে থাকলে অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে আপসমূলক অবস্থানের পরিবর্তে শোষণমূলক অবস্থান নিলে বৈশ্বিক শান্তিসূচক কমতেই থাকবে। সূর্যের রাগী চেহারা আরও রাগী হয়ে উঠবে। সুখ-শান্তি দূর থেকে সরে যাবে আরও দূরে।

জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×