সার্বিক উন্নয়নে উপশহর প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি

  মোহাম্মদ আলী ২০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সার্বিক উন্নয়নে উপশহর প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সবচেয়ে চমকপ্রদ ও দীর্ঘস্থায়ী কাজ হবে দেশের প্রত্যেক ইউনিয়ন হেডকোয়ার্টারকে একটি পরিপূর্ণ উপশহরে রূপান্তরকরণ। পদ্মা সেতু যেমন ১৬ কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, যা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে, তেমনি প্রত্যেক ইউনিয়ন হেডকোয়ার্টারে একটি উপশহর গড়ে উঠলে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নসহ লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান এবং জীবনমান উন্নত হবে।

এ কাজটি বাস্তবায়ন করা গেলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা পরিপূর্ণতা পাবে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ৮৭৩১৬ গ্রামের উন্নয়নই বাংলাদেশের উন্নয়ন।

সুষ্ঠু উন্নয়ন পরিকল্পনা বদলে দিতে পারে প্রতিটি গ্রামকে, একই সঙ্গে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে তা সহায়ক হবে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধনে যেসব কর্মপরিকল্পনা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে তার এটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।

কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আগে নেতিবাচক বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেয়া প্রয়োজন। পেশাগত বিষয়টি লক্ষ করলে দেখা যায়, প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও টারসিয়ারি এ তিন ধাপের মধ্যে গ্রামের ৮০ ভাগই প্রাইমারি বা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, ১০ ভাগ সেকেন্ডারি ও অন্যান্য ধাপে।

রাতারাতি পেশা পরিবর্তন করা যাবে না। যারা চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত, তারা চাষাবাদ করবে তবে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে কাজ করছে এবং বিষয়টিকে আরও নিবিড়ভাবে করতে হবে।

বিপণিবিতান, কলকারখানা স্থাপন করে শহরের রূপ দেখা যায়; কিন্তু এক্ষেত্রে গ্রামীণ জনপদের স্বাভাবিক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটবে। কেন মানুষ শহরমুখী হতে চায় এবং শহরে আসতে বাধ্য হয়, বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে সহজে অনুমান করা যায় যে, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং চাহিদামতো উপকরণপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা শহরে রয়েছে।

উপশহর গড়ে তোলার কর্মপরিকল্পনায় এসব বিষয় বিবেচনায় এনে দেখা যায়- ই-সেবা কেন্দ্র (যাকে আমরা ওয়ান স্টপ সার্ভিস বলতে পারি) চালুর মাধ্যমে সরকারি সেবাপ্রাপ্তির সুবিধা ছাড়াও সহযোগী সেবা পাওয়া যাবে।

একটি মডেল উপশহরে নিুলিখিত স্থাপনা, সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। যথা- ১. একটি ভূমি অফিস যেখানে একজন সহকারী কমিশনার/সাবরেজিস্ট্রার থাকবেন। এতে প্রত্যেক এলাকার জনসাধারণের জমিজমা সংক্রান্ত সব কাজ নগালের ভেতর থাকবে।

২. সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি) মনিটরিং করার সাব-অফিস থাকবে।

৩. ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সঙ্গে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও কমিউনিটি সেন্টার থাকবে।

৪. ধর্মীয় উপাসনালয়।

৫. খেলার মাঠ (মিনি স্টেডিয়াম)

৬. পশুচিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করা।

৭. বর্তমান বাজারকে সংস্কার, বাজারের ভেতরের রাস্তা, কাঁচাবাজার ও মাছের বাজার ইত্যাদি কংক্রিট দ্বারা পাকা করতে হবে।

৮. ডিপটিউবওয়েল স্থাপন করে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা। ৯. কমপক্ষে ৩-৪টি পাবলিক টয়লেট স্থাপন করে পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

১০. বিদ্যুতের লাইনগুলো সংস্কার করে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছানো।

১১. বিদ্যুতের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি মেরামতের কারখানা, মোটরসাইকেল, সাইকেল, রিকশা ও অটোরিকশা মেরামতের কারখানা স্থাপন, এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

১২. খাবার, টিভি, ফ্রিজ, হার্ডওয়্যার, সেনিটারি, দর্জি, ওষুধসহ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং নির্মাণসামগ্রীর দোকানপাট স্থাপন করতে হবে।

১৩. উৎপাদিত পণ্যের সহজ বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা। বৃহৎ বিপণি কেন্দ্র তৈরি করে জমির অপচয় নয়, তবে উৎপাদিত পণ্য পরিবহন সহজতর করার মাধ্যমেই আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সুফল পাওয়া সম্ভব।

উল্লেখ্য, উপরে বর্ণিত স্থাপনা/কাজ ও সুযোগ-সুবিধা কিছু ক্ষেত্রে আংশিক বিদ্যমান আছে, কিছু ক্ষেত্রে নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন প্রতি গ্রামকে শহরে রূপান্তরিত করা মোটেই কঠিন কাজ নয়।

নিুলিখিত সুযোগ-সুবিধাগুলো সংযোজন করলে প্রতিটি ইউনিয়ন একটি পরিপূর্ণ উপশহরে রূপান্তরিত হতে পারে, যেখান থেকে পুরো ইউনিয়নের জনসাধারণ শহরের সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবেন।

যথা- ১. বাজারগুলো বিশেষ করে কাঁচাবাজার, মাছ-মাংসের বাজার কংক্রিট দ্বারা পাকা করতে হবে।

২. গভীর নলকূপ স্থাপন করে সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. ন্যূনতম ৩টি গণশৌচাগার নির্মাণ করে পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. বাজারের সঙ্গে গ্রামের সংযোগ কাঁচা সড়কগুলো পাকা করতে হবে।

৫. কমিউনিটি সেন্টার ও শিশুপার্ক নির্মাণ করতে হবে।

৬. খেলার মাঠকে মিনি স্টেডিয়ামে রূপান্তরিত করতে হবে।

৭. ভ্যান, রিকশা ও অটোরিকশা স্ট্যান্ডের জন্য নির্ধারিত জায়গা থাকতে হবে।

৮. সম্ভব হলে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করতে হবে।

উল্লিখিত প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিটি প্রকল্পের আনুমানিক ১০-১২ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। বাংলাদেশে ৪৫৫৪টি ইউনিয়ন। তার মধ্যে ৬৮৩টি ইউনিয়ন শহরে অবস্থিত, বাকি ৩৮৭১টি ইউনিয়ন উপশহরে রূপান্তরিত করতে হলে আনুমানিক ব্যয় ৩৮,৭১০ কোটি টাকার প্রয়োজন।

যেহেতু এই প্রচুর পরিমাণ অর্থের জোগান একবারে সম্ভব নয় এবং এত বৃহৎ কর্মযজ্ঞ বাস্তাবয়নে কমপক্ষে ৪ বছর সময় লাগবে, সেহেতু পর্যায়ক্রমে কাজটি সম্পন্ন করতে হবে।

উল্লেখ্য, এ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এলজিইডি, আরইবি, আরএইচডি ও পিএইচই’র সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রয়োজন। যেসব বিষয় গ্রামীণ উন্নয়নের অন্তরায়, স্বাস্থ্য খাত তার মধ্যে অন্যতম।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ডাক্তারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাস্তবে ডাক্তাররা গ্রামীণ পরিবেশে থাকতে চান না, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে যে কোনো শর্তে চাকরিতে প্রবেশ করতে আগ্রহী হলেও গ্রামীণ পরিবেশে কাজ করতে আগ্রহী থাকেন না।

ফলে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয় না। এক্ষেত্রে প্যারামেডিকেল অর্থাৎ মধ্যবর্তী কোর্সসম্পন্ন ডাক্তারদের নিয়োগ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

পশুচিকিৎসা ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অধ্যয়নকালীন শহর জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে কর্মজীবনে দূরগ্রামে কাজ করতে আগ্রহী নন পশুচিকিৎসকরাও। শুধু কাগজে-কলমে নিয়োগ দিয়ে গ্রামীণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয় মাত্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও মনিটরিং হওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষকদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর সুযোগ-সুবিধা দেখাশোনা করার দায়িত্ব পালন উপজেলা শিক্ষা অফিসারের হলেও তার অফিস শহরে। তিনি শহরের বাইরে যেতে আগ্রহী নন।

গ্রামের শিক্ষকরাই অফিসে এসে রিপোর্ট দিয়ে যান। উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ে সহকারী শিক্ষা অফিসার নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শহরকেন্দ্রিক গড়ে উঠছে।

ইউনিয়ন পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলেই বাস্তবে কর্মমুখী মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব। এভাবে সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপশহর প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উপনীত করা সম্ভব।

ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী : প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সেলফ এমপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×