সাক্ষাৎকার

আমাদের বাজেট ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত : ড. আকবর আলি খান

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হবিগঞ্জ মহকুমার প্রশাসক ছিলেন এবং যুদ্ধকালীন সক্রিয়ভাবে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কিছুদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন। পরে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার আশংকায় তিনজন উপদেষ্টার সঙ্গে পদত্যাগ করেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটসহ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন ইত্যাদি নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -

  মোকাম্মেল হোসেন ২৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বহুল আলোচিত প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৮৭ শিক্ষার্থীসহ ১২৫ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
ফাইল ছবি

যুগান্তর : কেমন হয়েছে এবারের বাজেট?

আকবর আলি খান : অন্যান্য বছর যেমন বাজেট হয়, তেমনই হয়েছে।

যুগান্তর : বাজেটকে কেউ বলছেন উচ্চাভিলাষী, কেউ বলছেন স্বপ্নময়- এ বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে?

আ. আ. খান : আপনি অনেক প্রশ্ন একসঙ্গে করেছেন। উচ্চাভিলাষী অবশ্যই। বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা; সেটা আমাদের যে পরিমাণ আয়, তার চেয়ে অনেক বেশি। সেজন্য অনেকে এটিকে স্বপ্নময় বাজেটও বলছেন। বাস্তবায়নের বিষয়টি দু’দিক থেকে দেখতে পারেন। একটি হল- অধিকাংশ বাজেট বাস্তবায়িত হবে। সুতরাং সামর্থ্য নেই, এটা ঠিক না। দেখা যাবে, বাজেটে ব্যয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা; সেটা অর্জিত হবে না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে সক্ষমতার ঘাটতি অবশ্যই আছে।

যুগান্তর : তার মানে এটা গতানুগতিক একটি বাজেট হয়েছে?

আ. আ. খান : আমি তো তা-ই বললাম একটু আগে। আবার একই শব্দের কি পুনরাবৃত্তি করতে হবে?

যুগান্তর : বলা হচ্ছে, এই বাজেট মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আ. আ. খান : বাজেট বাংলাদেশের শুধু মধ্যবিত্ত নয়, নিম্নবিত্তের ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে। মধ্যবিত্ত কাকে বলে এবং মধ্যবিত্তের কত শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে- আমার জানা মতে, এ ধরনের কোনো সমীক্ষা এখন পর্যন্ত করা হয়নি। কাজেই এগুলো ঢালাও বক্তব্য- এভাবে আমি বাজেটকে দেখতে রাজি না। আপনারা সাংবাদিক এভাবে মন্তব্য করে থাকেন। আপনি বললেন, মধ্যবিত্তের ওপর বোঝা হবে; বোঝা তো অবশ্যই হবে। একটা বড় বাজেট যখন হয়, তখন লক্ষ্য থাকে কর বেশি আদায় করতে হবে; না হলে ঘাটতি হবে। এখন এই ঘাটতির প্রভাব কার ওপর পড়বে এবং অতিরিক্ত করের বোঝা কার পড়বে, তা নিয়ে আমার জানামতে কোনো সমীক্ষা হয়নি। কাজেই এগুলো ঢালাও বক্তব্য- আপনারা বলছেন, রাজনীতিবিদরা বলছে; এগুলোর ওপর আমার কোনো মন্তব্য নেই।

যুগান্তর : দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থা বাজেট বাস্তবায়নে কতটা প্রভাব ফেলবে?

আ. আ. খান : বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থা বাজেট বাস্তবায়নে অতীতেও খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। সুতরাং এটার প্রভাব কেন পড়বে, আমি বুঝি না। একমাত্র প্রভাব যেটা হতে পারে; যদি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা খাতে সরকারের বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এছাড়া আমি আর অন্য কোনো কারণ দেখি না, যা বাজেটকে প্রভাবান্বিত করতে পারে।

যুগান্তর : বাজেটের লক্ষ্য থাকে দেশের মানুষের উন্নয়ন। চলতি বাজেট এ লক্ষ্য পূরণে কতটা সক্ষম হয়েছে?

আ. আ. খান : আমরা যদি অভিজ্ঞতার আলোকে দেখতে চাই, তাহলে দেখা যাবে- আমাদের এখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ক্রমশ ত্বরান্বিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্তরের দশকে যা ছিল, আশির দশকে তার চেয়ে বেশি হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে তার চেয়ে আরও বেড়েছে। তারপর ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আরও বেড়েছে। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বেড়ে চলেছে। আমাদের বাজেটও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এই বছরের যে বাজেট- বলা হয়ে থাকে, এটা একটা ঐতিহাসিক বাজেট। কারণ এত বরাদ্দ এর আগে কোনো বাজেটে হয়নি। কিন্তু আবার এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটও ঐতিহাসিক হবে। পরের অর্থবছরের বাজেটও ঐতিহাসিক হবে। বাজেট বরাদ্দ ক্রমশ বেড়ে চলেছে এবং আমাদের দেশে প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলেছে। দেশে যে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, এটা বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির একটা কারণ। তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়। আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়ার পেছনে সরকারের যতটুকু ভূমিকা আছে, সরকারের বাইরে যারা কাজ করে, তাদের ভূমিকা আরও বেশি। বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির মূল চালক হলেন প্রবাসীরা; যারা বাইরে থেকে উপার্জন করে দেশে অর্থ প্রেরণ করছেন। তারা একটা বড় নিয়ামক। আর একটি নিয়ামক হলেন, পোশাক শিল্পে এবং অন্যান্য শিল্পে যেসব মহিলা কাজকর্ম করছেন- তারা প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছেন। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে যেসব মহিলা উৎপাদন বাড়াচ্ছেন, তারা অবদান রাখছেন। এর সঙ্গে দেশের যে কৃষক সম্প্রদায়, তারা অবদান রাখছেন। এসব উপাদান মিলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।

যুগান্তর : চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেট বাস্তবায়ন সম্পর্কে একটি দিকনির্দেশনা দিন।

আ. আ. খান : দিকনির্দেশনা অনেক বড় ব্যাপার। আপনি বোধহয় আমার কাছে জানতে চাইছেন, বাজেটে ব্যয় আরও কীভাবে বাড়ানো যায়। সরকারের যেসব কাগজপত্র দেখা যায়, তাতে দেখা যাচ্ছে- অধিকাংশ প্রকল্প গ্রহণ করার আগে ফিজিবিলিটি বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয় না। সাধারণত বাস্তবায়ন সেটারই ভালো হবে, যদি আগে থেকে তার পরিকল্পনা করা হয় এবং ফিজিবিলিটি দেখা হয়। বাংলাদেশে পরিকল্পনা কমিশনের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্তির সময়ই এ বিষয়গুলো দেখা দরকার। তাছাড়া এখনও দেখা যাচ্ছে, প্রকল্প পরিচালক ঠিকভাবে নিয়োগ করা হয় না। একই প্রকল্প পরিচালক অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন এবং যেখানে কাজ হয়, সেখানে তারা থাকেন না। এ ধরনের অনেক সমস্যা রয়েছে, যেগুলো সরকারের ভেতরের সমস্যা। এ সমস্যাগুলো সমাধান করলে আমাদের ব্যয়ের হার অবশ্যই বাড়বে।

যুগান্তর : সরকারের ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে ঋণের অঙ্ক ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে সুদ পরিশোধের পরিমাণ। এ ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ঋণ ও সুদ বাজেটকে কোথায় নিয়ে যাবে?

আ. আ. খান : এটা বাংলাদেশের জন্য একটা অশনিসংকেত। বাংলাদেশে সবসময়ই অর্থ মন্ত্রণালয় অত্যন্ত রক্ষণশীলভাবে ঘাটতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছে। অতি সম্প্রতি এ ঘাটতি বেড়ে গেছে। এ বছরের বাজেটে সম্ভবত ৭২ বা ৭৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে শুধু ঋণের সুদ এবং বৈদেশিক ঋণের মূলধন পরিশোধ করার জন্য। এই অঙ্ক আমাদের ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৭ ভাগের এক ভাগ। এটা যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে দেশের জন্য খুব ক্ষতিকর হবে। পাকিস্তানে এই হার খুব বেড়ে গেছে এবং এজন্য তাদের পক্ষে বাজেট প্রণয়ন অনেক কঠিন হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের এই ঋণ শোধ করতে হবে। আমরা ঘাটতি বাড়িয়ে বর্তমান প্রজন্মের ঋণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে চাপানোর চেষ্টা করছি। এটা এখন পর্যন্ত হয়তো গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আছে; কিন্তু এভাবে যদি দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পক্ষে এটা একটা বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়াবে এবং দেশের অর্থনীতির জন্য তা মোটেও কল্যাণকর হবে না।

যুগান্তর : কর আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ করা যাচ্ছে না। করদাতারা কর কর্মকর্তাদের কাছে যেতে ভয় পান। এ অবস্থা নিরসনে সরকারের কী করা উচিত?

আ. আ. খান : এ সমস্যা আজকের না। বাংলাদেশ হওয়ার পর থেকে সবসময় এ সমস্যা আছে এবং অন্যান্য দেশেও এ সমস্যা রয়েছে। এর জন্য যা করতে হবে, আস্তে আস্তে দুর্নীতি হ্রাস করার পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনকানুন পরিবর্তন করতে হবে। আইনের যে ফাঁকফোকর আছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। কর কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। যারা সৎ, তাদের পদোন্নতি দিতে হবে। যারা অসৎ, তাদের শাস্তি দিতে হবে। এ ধরনের অজস্র ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব এবং সরকার তা করবে বলে আমরা আশাবাদী।

যুগান্তর : সরকারি ব্যাংক তো বটেই, অনেক বেসরকারি ব্যাংকও দুর্নীতিতে ডুবতে বসেছে। ফলে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মূলধন ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট ঘাটতি জনগণের টাকায় পূরণ করা কতটুকু যৌক্তিক?

আ. আ. খান : এটা মোটেই যৌক্তিক নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাব- যখন সরকার খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থার উন্নতি ঘটেছে এবং যখনই সরকারের এই সংকল্পের অভাব দেখা দিয়েছে, তখনই খেলাপি ঋণের সমস্যা প্রকট হয়েছে। বর্তমানে সরকারি ব্যাংকগুলোতে এ ধরনের ঋণ বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। ঋণ বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হল, সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। রাজনীতিবিদরা রাজনীতি ভালো জানেন; কিন্তু তারা ব্যাংক পরিচালনা করতে জানেন না। সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, রাজনৈতিকভাবে যারা বোর্ড সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান, তারাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। সরকার যদি সঠিক ব্যক্তিদের বোর্ডে নিয়োগ দেয় এবং সঠিকভাবে ব্যাংক পরিচালিত হয়, তাহলে এ ধরনের খেলাপি ঋণ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার একটি কারণ হল, আমরা খুব বেশি ব্যাংককে লাইসেন্স দিয়েছি। এত ব্যাংক দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোথাও নেই। থাইল্যান্ডেও নেই। সিঙ্গাপুরেও নেই। এত বেশি ব্যাংক আছে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে শুধু ফেডারেল গভর্নমেন্ট ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে না; স্টেট গভর্নমেন্টও ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে চার ধরনের ব্যাংক নিয়ন্ত্রক আছে। আমাদের দেশে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। সবচেয়ে বড় কথা হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি ব্যাংক যদি ধসে পড়ে, সরকার তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে যায় না। প্রতিবছরই যুক্তরাষ্ট্রে অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। আমাদের এখানে কোনো ব্যাংককে দেউলিয়া হতে দেয়া হয় না। এটা হল ভিন্ন ধরনের সংস্কৃতি। আমরা মার্কিন সংস্কৃতির অনুসরণ করছি না; আবার ব্রিটিশশাসিত যেসব দেশ আমাদের অঞ্চলে আছে, তাদেরও অনুকরণ করছি না! আমরা ঢালাওভাবে ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়ে যাচ্ছি এবং এর ফলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এজন্য বেসরকারি খাতে ব্যাংক এখনও সুস্থির হতে পারেনি; সরকারি খাতে তো ব্যাংক অস্থির অবস্থায় আছেই!

যুগান্তর : বাজেটে সুন্দর সুন্দর প্রকল্পের কথা বলা হলেও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও এর গুণগত মান ধরে রাখতে না পারার কারণে তার কোনো সুফল দেশবাসী পায় না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়াসগুলো কী হতে পারে?

আ. আ. খান : আপনি যেগুলোকে সুন্দর প্রকল্প বলছেন, অন্যরা এগুলোকে সুন্দর বলে কি না, আমি জানি না; তবে যেটা আমি স্বীকার করব, তা হল- এখন বড় বড় অনেক প্রকল্প নেয়া হচ্ছে এবং এগুলোর ব্যয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ করা হয়। দ্বিতীয়ত, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগায় প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। ফলে এসব প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা অনেক কমে যায়। সুতরাং বড় প্রকল্প গ্রহণ করতে হলে সঠিক মূল্যায়ন করে গ্রহণ করতে হবে এবং অতি দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি না করা হয়, তাহলে আমাদের প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাবে; ঘাটতি বেড়ে যাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর চাপ পড়বে।

যুগান্তর : স্বাধীনতার এত বছর পরও বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদাননির্ভরতা বজায় থাকার বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আ. আ. খান : বৈদেশিক ঋণ এবং অনুদান আমরা অনেক বেশি নিতাম- যখন বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। এখন বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের পরিমাণ মোট যে বাজেট, তার অংশ হিসেবে অনেক কমে এসেছে। বৈদেশিক ঋণ নেয়া একেবারেই বন্ধ করে দেয়া ঠিক হবে না। আমরা এখন পর্যন্ত যথেষ্ট রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারছি না। আমাদের যে বাজেট ঘাটতি, তা বৈদেশিক ঋণ দিয়ে পূরণ করলে সহায়ক হবে। সুতরাং এটা চালু থাকাতে আমি কোনো অসুবিধা দেখি না।

যুগান্তর : বাজেটে কালো টাকা সাদা করার বিষয়টি সমর্থনযোগ্য?

আ. আ. খান : কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া কোনো অবস্থাতেই সমর্থনযোগ্য নয়। আপাতদৃষ্টিতে যুক্তি দেয়া হয়, এতে আমাদের লাভ হবে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কালো টাকা-সাদা টাকায় যে তফাৎ, সেটা যদি আমরা অক্ষুণ্ণ না রাখতে পারি; তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সবাই কালো টাকাই অর্জন করতে চাইবে এবং সাদা টাকার গুরুত্ব কমে যাবে। যে যুক্তি দেয়া হয়- এটা করলে পরে আমরা লাভবান হব, তার পক্ষে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া যায় না। বলা হয়, এর ফলে অনেক কালো টাকা সাদা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটাও ঘটে না। বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী কোনো কোনো সময় তাদের প্রয়োজনে কালো টাকা সাদা করে। এতে অর্থনীতি স্বল্পমেয়াদেও লাভবান হয় না; দীর্ঘমেয়াদেও লাভবান হয় না।

যুগান্তর : : দেশে বাজেট ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। এটা কাটিয়ে ওঠার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি?

আ. আ. খান : ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকার বিষয়টিকে কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একটা হল, আমাদের বাজেট ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। এটার বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। প্রশ্ন হল, বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে তা কোথায়? শুধু কি মন্ত্রণালয়গুলোতে বিকেন্দ্রীকরণ করবেন; নাকি স্থানীয় সরকারে বিকেন্দ্রীকরণ করবেন? আমাদের দেশে এখন কোনো স্থানীয় সরকার নেই। এখন স্থানীয় সরকার হল কেন্দ্রীয় সরকারের লেজুড় মাত্র; সুতরাং সেখানে বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব নয়। বাজেট ব্যবস্থাপনাকে যদি আমরা আরও ভালো করতে চাই, তাহলে সামগ্রিক যে সাংবিধানিক কাঠামো, সেটা পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে। সেটা পর্যালোচনা করলে কী দেখা যাবে- এ বিষয়ে বক্তব্য অনেক দীর্ঘ হবে। আমি এ মুহূর্তে তা বলতে চাই না।

যুগান্তর : কর প্রস্তাবসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে যেসব প্রস্তাব আসবে, সেগুলোর যৌক্তিকতা বিচার করে বাজেটে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া কতটা জরুরি?

আ. আ. খান : এটার কোনো সুযোগই নেই। যদি কর হ্রাস করা হয়, তাহলে নতুন কর বসাতে হবে; অথবা ব্যয় হ্রাস করতে হবে। আমাদের দেশে মাঝে মাঝে এটা করা হয়; কিন্তু এটা সম্পূর্ণভাবে বাজেটের শৃঙ্খলা পরিপন্থী।

যুগান্তর : বাজেটে দারিদ্র্য সমূলে উৎপাটনের কথা বলা হলেও কোনো গাইডলাইন দেয়া হয়নি। দারিদ্র্য নির্মূলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন?

আ. আ. খান : এ বিষয়ের ওপর আমি একটা বই লিখছি- দারিদ্র্যের অর্থনীতি। ৫০০ পৃষ্ঠার বই; আমি আমার ৫০০ পৃষ্ঠার বইয়ে যা বলব- সেটা এই সাক্ষাৎকারে দুই মিনিটে বা পাঁচ মিনিটে বলতে পারব না। আপনি যদি প্রশ্নের উত্তর পেতে চান, তাহলে আগামী গ্রন্থমেলায় বইটি প্রকাশিত হবে; বইটা পড়লে তখন জানতে পারবেন, কী করা উচিত।

যুগান্তর : এখন যদি দুই-চার লাইনে কিছু বলতেন...

আ. আ. খান : এটাই তো আপনাদের সমস্যা! দুই-চার লাইনে এর তো কোনো জবাব নেই। দুই-চার লাইনে জবাব থাকলে কোনো না কোনো সরকার এ সমস্যার সমাধান করত। এর অনেক সমস্যা আছে। আমি যদি দুই-চার লাইনে লিখতে পারতাম, তাহলে তো ৫০০ পৃষ্ঠার বই লেখার প্রয়োজন পড়ত না।

যুগান্তর : সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর যে কর বাড়ানো হয়েছে, এর প্রভাব কীরকম হবে?

আ. আ. খান : এর ফলে লোকজন সঞ্চয়পত্র কিনতে নিরুৎসাহিত হবে। শুধু করের হার নয়; সঞ্চয়পত্রের যে ব্যবস্থা, এটাও পরিবর্তনের দরকার রয়েছে। সরকার যদি বর্তমান ব্যবস্থায় জনগণের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে না চায়, অন্যান্য দেশে যেমনটি দেখা যায়, সেখানে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয় না; সরকার জনগণের কাছে ঋণ চায় এবং একেকজন একেকরকম অফার দেয়। সেই অফারের ভিত্তিতে ঠিক করা হয়, কী পরিমাণ ঋণ নেয়া হবে। সেরকম কোনো ব্যবস্থা আমাদের এখানে এখনও চালু হয়নি।

যুগান্তর : প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি কি একটি বড় বাধা নয়?

আ. আ. খান : শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি একটি বড় বাধা। আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি এত ব্যাপক মাত্রায় প্রসার লাভ করেছে, এ সমস্যার আশু সমাধানের উদ্যোগ নেয়া না হলে দেশের অগ্রগতি অবশ্যই ব্যাহত হবে। আশু সমাধানের একমাত্র উপায়- দুর্নীতিবাজদের ধরতে হবে। বিচার করতে হবে।

যুগান্তর : কে ধরবে? কে বিচার করবে? দেখা যাচ্ছে, অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্তির সার্টিফিকেট দিয়েছে!

আ. আ. খান : দেখুন, বর্তমান সরকার আগের মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকারি দলের অনেকের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করেছিল। ফলে সরকারের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত শুরুর পর দেখা গেল, সবাইকে দায়মুক্তির প্রত্যয়নপত্র দেয়া হচ্ছে। যদি দায়মুক্তিই তদন্তের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে দুদকের ভাবমূর্তি ম্লান হবে এবং সাংঘাতিকভাবে অনেক নিচে নেমে যাবে।

যুগান্তর : তাহলে দুদকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? দুদক কীভাবে কাজ করবে?

আ. আ. খান : দুদকের ভূমিকা হবে দুর্নীতিবাজদের ধরা। তাদের বিচারের সম্মুখীন করা। এটাই দুদকের কাজ।

যুগান্তর : পক্ষপাতবিহীনভাবে?

আ. আ. খান : দুদকের পক্ষপাত করার প্রশ্নই ওঠে না। যদি পক্ষপাতের ঘটনা ঘটে, তাহলে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে।

যুগান্তর : দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করার ত্বরিত কোনো ব্যবস্থা আছে কি?

আ. আ. খান : আমার কাছে ত্বরিত কোনো ব্যবস্থা নেই। আমি এর ওপর কয়েকটা বই লিখেছি; সেখানে কয়েকশ’ পৃষ্ঠাজুড়ে লেখা আছে- এগুলো পড়ে আপনারা দেখতে পারেন, কীভাবে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব। এই যে ত্বরিত, তাৎক্ষণিক- এসব নিয়ে ইন্টারভিউ দেয়ার মতো সামর্থ্য আমার নেই। আমার এ বিদ্যা নেই। যাদের আছে, তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।

যুগান্তর : দিনবদলের সনদ বাস্তবায়নে এবারের বাজেট কতটা ভূমিকা রাখবে?

আ. আ. খান : দিনবদলের মানেই তো আমি জানি না!

যুগান্তর : বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলা, মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত হওয়া...

আ. আ. খান : এটা কি এক বছরে হয়ে যাবে?

যুগান্তর : না, তা হবে না।

আ. আ. খান : আমি তো এক বছরের বাজেট সম্পর্কে আলোচনা করছি। কাজেই এক বছরের বাজেটে যেটা হবে না- তার ওপর আমি কীভাবে মন্তব্য দেব, বলুন!

যুগান্তর : এ বছর এর সূচনা তো হতে পারে!

আ. আ. খান : সূচনা তো অনেক আগেই হয়েছে। কোথাও আমরা এগোচ্ছি; কোথাও পিছাচ্ছি। এ ধরনের প্রশ্ন মেহেরবানি করে আমাকে করবেন না। এগুলো বাজারের স্লোগান। এগুলো নিয়ে তাহলে গবেষণা করা, বই লেখা- এসব আমি করতাম না। আপনি যেরকম তাৎক্ষণিক জবাব চান- কোনো পীর-ফকিরের কাছে গিয়ে দেখতে পারেন, তারা জবাব দিতে পারে কি না! এসব আমার জানা নেই, আমি কোনো তাৎক্ষণিক জবাব দিতে পারব না।

যুগান্তর : বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছি আমরা। এক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসছে না কেন?

আ. আ. খান : দেশে দুই ধরনের বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একটা হল বৈদেশিক বিনিয়োগ। আরেকটা দেশীয় বিনিয়োগ। বৈদেশিক বিনিয়োগ না বাড়ার কারণ হল, বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা পৃথিবীর যে কোনো উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগ করতে পারে। এখন ধরুন, যদি ১৩৩টি উন্নয়নশীল দেশে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়; বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেসব দেশে সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আছে, সেগুলোই নির্বাচন করবে অর্থাৎ ৫ কিংবা ১০টি দেশে তারা বিনিয়োগ করে। আপনি যদি দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারেন; তাহলে তাদের মধ্যে নতুন বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখা যাবে না। আর দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অনেক সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে প্রথম সমস্যা হল ব্যাংক খাতের সমস্যা; ব্যাংক খাতের মাধ্যমে বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহ করা হয়। পুঁজিবাজার আমাদের এখানে এখনও গড়ে উঠেনি। সুতরাং ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের যে ভৌত অবকাঠামো, সেগুলো অত্যন্ত দুর্বল। সেগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। সামাজিক অবকাঠামোও শক্তিশালী করতে হবে।

যুগান্তর : সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য নিরসনে কতটা কার্যকর?

আ. আ. খান : আমাদের দেশে যদি দ্রুত দারিদ্র্য নিরসন করতে হয়, তাহলে সামাজিক প্রতিরক্ষা কর্মসূচি বাড়াতে হবে। অনেক মানুষকে এর আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং অর্থের পরিমাণও বাড়াতে হবে। সেটা বাড়ানোর জন্য এখন যেসব প্রকল্প আছে, সেগুলোতে দেখা যায়- একই লোক দুই প্রকল্পের সুফল পাচ্ছে। সেগুলোকে কাটছাঁট করে দেশের অধিকাংশ গরিব মানুষের জন্য প্রতিরক্ষার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

যুগান্তর : শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের করণীয় কিছু আছে?

আ. আ. খান : শেয়ারবাজারের জন্য তিনটি বিষয় দরকার। একটি হল, শেয়ারবাজারের যারা উদ্যোক্তা; তাদের সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। গত দুই দশকে বাংলাদেশে দুটি শেয়ারবাজার বিপর্যয় ঘটেছে। এর ফলে শেয়ার ব্যবসা পরিচালনাকারীদের ওপর লোকজনের আস্থা সীমিত। তারা যদি পরিবর্তন না হয়, তাহলে কোনো কিছু করা যাবে না। দুই নম্বর হল, শেয়ারবাজারকে যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। এটা হল, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাজ। এখন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন যদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে না পারে, তাহলে শেয়ারবাজারের কিছু করা যাবে না। তিন নম্বর হল, সরকার নতুন আইনকানুন করে উদ্দীপনা দিতে পারে। কিন্তু যদি বেসরকারি খাত ঠিক না করা হয় এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তত্ত্বাবধান পর্যাপ্ত না হয়; তাহলে সরকারের পক্ষেও কিছু করা সম্ভব হবে না। চাইলেই যে শেয়ারবাজার রাতারাতি উজ্জীবিত করা যাবে- এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ কাজটা যেহেতু দুরূহ; তাই এটা নিয়ে সরকারকেও কাজ করে যেতে হবে।

যুগান্তর : কৃষি খাতে ভর্তুকি নিয়ে কী করা উচিত?

আ. আ. খান : আমি মনে করি, কৃষি খাতে ভর্তুকি এখন মূল সমস্যা নয়, মূল সমস্যা হল- কৃষক তাদের পণ্যের ন্যায্য দাম পায় না। পণ্যের ন্যায্য দাম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকার এখনও পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমার মনে হয়, এ সম্পর্কে সরকারের চিন্তাভাবনা শুরু করা উচিত। তবে এটা এক বছর বা দুই বছরের মধ্যে সমাধান করা যাবে না এবং সব পণ্যের জন্য হয়তো সমাধান করা না-ও হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের নতুন করে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

যুগান্তর : এ বছর দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকার কতটা সক্ষম হবে এবং এ লক্ষ্যে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত?

আ. আ. খান : এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আপনাকে আরেকটা বই ধরিয়ে দিতে হবে। এ মুহূর্তে আমাদের তো দ্রব্যমূল্যের চাপ বেশি নেই। এখন আপনিই বলুন- আপনার পরামর্শ কী; আর কী করতে পারে সরকার? এ ধরনের প্রশ্ন তখনই প্রাসঙ্গিক হয়, যখন দ্রব্যমূল্য দ্রুত বাড়তে থাকে। এখন তো দ্রব্যমূল্য....

যুগান্তর : আজকের পত্রিকায়ও সবজিসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির সংবাদ রয়েছে।

আ. আ. খান : এখন তো ৭ শতাংশের নিচে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার রয়েছে। এটা যখন ১২-১৩ শতাংশ হবে তখন দেখতে হবে, কোথায় কী করা দরকার।

যুগান্তর : যদি ১২-১৩ শতাংশ হয়ে যায়, এমনটি ঘটলে সরকারকে কী করতে হবে?

আ. আ. খান : সেটা তখন দেখা যাবে। এখন তো আমি এই প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারব না।

যুগান্তর : খাদ্যে ভেজাল রোধে সরকারের দায়িত্ব কী?

আ. আ. খান : খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে সবসময় কার্যকর থাকতে হবে। এটা করার জন্য যা দরকার, আমাদের অনেক পরীক্ষাগার স্থাপন করতে হবে। দেশে পরীক্ষাগারের সুবিধা এখনও অপ্রতুল। ভেজাল হলে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে- কী ভেজাল দেয়া হয়েছে। এসব করার ক্ষমতা আমাদের এখনও অত্যন্ত সীমিত। এক্ষেত্রে আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে; প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সংখ্যাও বাড়াতে হবে।

যুগান্তর : আড়ংয়ের ঘটনাটি আপনি কীভাবে দেখছেন?

আ. আ. খান : আড়ংয়ে তো ভেজাল না।

যুগান্তর : প্রতারণা।

আ. আ. খান : কী প্রতারণা করেছে? পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় বিভিন্ন পণ্যের দাম অনেক সময় বাড়ে, অনেক সময় কমে। ‘সেল’-এর ব্যবস্থা একেবারে তুলে দিতে হবে, আড়ং যা করেছে; সেটা যদি আইন হয়ে থাকে।

যুগান্তর : লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে কী ঘটবে?

আ. আ. খান : ঘাটতি বাজেট।

যুগান্তর : ঘাটতির ফলে কী কী সংকট দেখা দেবে?

আ. আ. খান : সংকট সম্পর্কে এখন আপনিই বলুন। ঘাটতি বাড়ার ফলে কী কী হবে, আমি আগে বলেছি।

যুগান্তর : সরকার অস্থিতিশীল হবে কি?

আ. আ. খান : সরকার অস্থিতিশীল কেন হবে? ঘাটতি থাকার পরও সরকার স্থিতিশীল থাকতে পারে।

যুগান্তর : কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ বাজেট কতটা সহায়ক হবে?

আ. আ. খান : আমাদের বাজেটের ব্যয় যত বাড়ছে, কর্মসংস্থান তত বাড়ছে না। সুতরাং কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

যুগান্তর : উদ্যোগগুলো কী কী হবে?

আ. আ. খান : বহু ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায়। যেখানে ঋণের দরকার, ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে; যেখানে প্রশিক্ষণ দরকার, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; যেখানে ভর্তুকি দরকার, সেখানে ভর্তুকি দিতে হবে। প্রত্যেকটা শিল্পে বিশ্লেষণ করে দেখাতে হবে, কীভাবে-কোন পদ্ধতিতে কর্মসংস্থান করা যেতে পারে।

যুগান্তর : অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। এসব শর্ত পূরণ করতে হলে করণীয় কী?

আ. আ. খান : আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাও সুশাসনের অঙ্গ। সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুশাসন না থাকলেও অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। যখন কোনো দেশ খুব নিম্ন পর্যায়ে থাকে, তখন সুশাসনের অনুপস্থিতিতেও সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব। যেমনটা বাংলাদেশের বেলায় ঘটছে। এর কারণ আমাদের এত সম্ভাবনা রয়েছে যে, তার কিছুটা বাস্তবায়িত হলেও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়। যখন আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা পর্যায়ে চলে যাব, তখন সুশাসন আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়বে। তখন দেখা যাবে, আমাদের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটা ঠিক কতদিন পরে ঘটবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। আমার মনে হয়, আগামী ১০-১৫ বছর সুশাসনের অনুপস্থিতিতেও আমরা অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের কাজটি চালিয়ে যেতে পারব। এরপর দেখা যাবে, সুশাসনের অভাবে আর এগোনো যাচ্ছে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সামনে ১০-১৫ বছরের সুযোগের একটা জানালা খোলা আছে। যদি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এ সময়ের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে আমাদের অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে। অন্যথায় এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া আমাদের অর্থনীতির ওপর পড়বে।

যুগান্তর : আমাদের এডিপি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দাতাগোষ্ঠীর অসন্তোষ রয়েছে। বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রী নিজেও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তারপরও বিভিন্ন প্রকল্প, বিশেষ করে বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গতি আনতে হলে কী কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার?

আ. আ. খান : গতি আনতে হলে সরকারের ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। ধরুন, আমরা যখন টেন্ডার আহ্বান করি, টেন্ডারে লেখা থাকে- ৬ সপ্তাহের মধ্যে কার্যাদেশ দেয়া হবে। বিশ্বব্যাংক একটা সমীক্ষা করেছিল- সেখানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ টেন্ডারের কার্যাদেশ দেয়া সম্ভব হয়। বাকি ৮৮ শতাংশ টেন্ডার ফাইনাল করা যায় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব তৃতীয় শ্রেণীর ঠিকাদার ভিড় করে। তারা অধিক লাভের জন্য বিভিন্ন ধরনের অজুহাত তোলে। অহেতুক বিলম্ব করতে থাকে। কাজেই সরকারকে প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। যারা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই টেন্ডারের কার্যাদেশ চূড়ান্ত করতে হবে। ৬ মাস বা ৬ বছর লাগালে হবে না।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

আ. আ. খান : ধন্যবাদ।

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×