রাশ টানার লাগামটি কোথায়?

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লাগাম
লাগাম। ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাস বলে, মানবসভ্যতা উত্থান, বিকাশ, পতন ও নবোত্থানের বলয়ে আবর্তিত হয়। একটি আবর্তিত ঘটনা ফিরে আসতে বহু বছর বা বহু যুগ লেগে যায়।

আমাদের দেশে মধ্যযুগের সুলতানি ও মোগল পর্বের সুশাসন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, অসাম্প্রদায়িক সমাজ চার-পাঁচশ’ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ফিরে আসেনি। দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে লক্ষণীয় মাত্রায়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে- হচ্ছে চোখে পড়ার মতো। বিশাল অঙ্কের জাতীয় বাজেট ঘোষিত হচ্ছে। যাপিত জীবন শ্রেণীবিশেষে অনেক উজ্জ্বল হয়েছে।

কিন্তু এ দেশের মানুষের সামাজিক জীবনে কি স্বস্তি বিরাজ করছে? ঘুষ-দুর্নীতি, খুন-সন্ত্রাস, দুর্ঘটনায় মৃতের মিছিল প্রতিদিন বড় হচ্ছে, হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে খেলাপির তকমা গলায় ঝুলিয়ে যারা বহু কোটি টাকার সম্পদশালী হচ্ছে রাষ্ট্র তাদেরই পাশে ছায়াবৃক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমন সব নেতিবাচক বাস্তবতা বহাল রেখে দেশের প্রকৃত অগ্রগতির সূচক কি ঊর্ধ্বমুখী হবে?

একদিকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির পরিসংখ্যান যেমন বড় হচ্ছে, তেমনি কালকের দুঃসংবাদ বা দুঃসহ জীবন আজকে ভয়ংকর দাঁত বের করে আবার ফিরে আসছে। এ কথার মর্মার্থ ভুক্তভোগী সবাই উপলব্ধি করেন। কথাটি বললাম বহু বছর আগে- ২০০০ সালের স্মৃতিচারণ করে। ২০০০ সালের ২৩ নভেম্বর জাতীয় দৈনিকে আমার একটি কলাম ছাপা হয়েছিল।

শিরোনাম ছিল ‘খুনে শহরের জিম্মাদার!’ আমার মনে হয় অতি সামান্য সংস্কার করে এ লেখাটি কোনো কাগজে পাঠালে সম্পাদক টাটকা বিষয় বলে সানন্দে ছাপবেন। লেখার শুরুটা একটু উদ্ধৃত করছি, ‘রাজধানীতে ক্রমাগত ঘটে যাওয়া খুন-সন্ত্রাস নিয়ে পত্রিকার সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় ও নানা নিবন্ধ-রিপোর্ট কম লেখা হচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর হুশিয়ারি আর পুলিশ কর্মকর্তাদের সাজ সাজ রব ও নানা পরিকল্পনার আয়োজন বরাবরের মতোই ফুটো বেলুন হয়ে চুপসে যাচ্ছে। তাবৎ রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রকদের চোখের সামনে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে খুনি আর সন্ত্রাসীরা।

বাস্তব অবস্থা এখন এমন যে, খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে পুলিশের পেটি অফিসারও যদি সন্ত্রাস দমনের পরিকল্পনা ও কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন তো মানুষের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া পড়ে। করুণার হাসি ফুটে ওঠে এদের উদ্দেশে।’ এখন যদিও খুন-সন্ত্রাসের পরিসংখ্যান কিছুটা নিম্নমুখী। এর জায়গা দখল করেছে সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা অপমৃত্যু।

২০০০ সালের লেখাটি ছিল রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে। এক যুগ পর তা পল্লবিত হয়েছে দেশজুড়ে। বিষয়টি এমন নয় যে, কেবল আওয়ামী লীগের শাসনামলেই এমন অবনতি চোখে পড়ে। স্বাধীনতা-উত্তর এ দেশে কোনো আমলেই যে মানুষ স্বস্তিতে ছিল না তা ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে। আসলে ক্ষমতা, দলতন্ত্র আর সুবিধাবাদের রাজনৈতিক কাঠামো অভিন্ন থাকায় পরিস্থিতির কোনো রূপান্তর নেই।

দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তত বাড়ছে। সাধারণ ডাকাতি, ছিনতাই, শত্রুতা সাধন, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির মধ্য দিয়ে খুনোখুনি তো ছিলই, এর সঙ্গে যুক্ত হতো রাষ্ট্রীয় প্রযোজনায় খুন-খারাবি। অপারেশন ক্লিনহার্ট, র‌্যাব, পুলিশের আয়োজনে প্রথমে ক্রসফায়ার, পরে এনকাউন্টার নামে হত্যার ঘটনা একটি নিষ্ঠুর নিয়তি হিসেবেই যেন আমাদের মানতে হয়েছিল।

এখন এ পরিস্থিতিতে নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে ‘অপহরণ’ নামে। এর মধ্যে দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। অপহরণকারীদের হাতে খুনও হয়েছে কেউ কেউ।

সবকিছু ছাপিয়ে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের মিছিল ক্রমে বড় হচ্ছে। একে কোনোভাবেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দেশে দায়িত্ববানদের কোনো কোনো আচরণ আমাদের কাছে অমানবিক ও দুর্বোধ্য মনে হয়। এবার ঈদের পর দেখলাম পত্রিকায় সরকারি কর্তৃপক্ষ স্বস্তি প্রকাশ করে পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছে, গতবারের চেয়ে এবার সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে।

অর্থাৎ যেন বলতে চাচ্ছেন গতবার পাঁচশ’ জন মারা গিয়েছিল, এবার তা কমে চারশ’ আটানব্বই জন হয়েছে। এ যেন এক বিরাট সাফল্য! ছন্নছাড়া রাজনীতি আমাদের এভাবে ক্রমে যেন অমানবিক করে তুলেছে।

মনে রাখতে হবে, যুক্তি যতই থাক, ভালোমন্দের দায়ভার সরকারকেই নিতে হয়। এ সত্যটি অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রের চর্চা যত না করেন, ‘গণতন্ত্র’ শব্দটির উচ্চারণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি করেন। বিরোধী দল মানে সরকারবিরোধিতায় অষ্টপ্রহর ব্যস্ত থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার নানা পথ আবিষ্কারে ঘর্মাক্ত হওয়া।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিশীল হতে দেখলে তাদের চোখ যেন আনন্দে চকচক করে। সরকারের ব্যর্থতার কথা সরবে প্রচার করার মওকাটি জিইয়ে রাখতে পারলে তাদের স্বস্তি বাড়ে। সরকারপক্ষ মাঝে মাঝে অভিযোগ করে, তাদের নাজেহাল করার জন্য বিরোধী দল সন্ত্রাস আর খুন-খারাবিকে উসকে দিচ্ছে। সময়ের বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ এসব অভিযোগ একেবারে উড়িয়েও দিতে পারে না।

অন্তত মানুষের কল্যাণচিন্তায় বিরোধী শিবির যে সন্ত্রাস প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছে তেমন নজির নেই। বরঞ্চ কোনো না কোনো নামাবরণে রাজনীতির ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীদের অভয় বিচরণ ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্য কম নয়। যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে তারা জঙ্গি উত্থানকে অনেকটা দুর্বল করে দিতে পেরেছেন। সংবাদমাধ্যম সক্রিয় হওয়ায় এবং জনমত তৈরি হওয়ার পর নুসরাত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন ও দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে পুলিশ দ্রুত সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

আবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব সক্রিয় থাকায় অনেক স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের তেমন সুরাহা করা যায়নি। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে তারা অনেক বেশি দক্ষতা দেখাতে পারত।

যানবাহনের বিশৃঙ্খলা প্রতিদিন দেশজুড়ে অব্যাহতভাবে প্রাণসংহার করছে, এর কোনো প্রতিবিধান তো করা যাচ্ছে না। কোনো সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বিশেষ তাৎপর্যের কারণে রাজধানী বা দেশজুড়ে যখন প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে তখন সাময়িক সময়ের জন্য নড়েচড়ে বসেন সংশ্লিষ্টরা। নানা রকম আদেশ-নির্দেশ জারি হতে থাকে। সব থিতিয়ে গেলে আবার উন্মত্ত নেশায় দাপিয়ে বেড়ায় পরিবহন সেক্টরের নিয়ন্ত্রক-পরিচালকরা।

ফিটনেসবিহীন গাড়িতে নগর আবার সয়লাব হয়। লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। ট্রাফিক আইন না মেনে রেষারেষির গাড়ি চালনা আর পথ আটকে যাত্রী তোলার দৃশ্যও অপসারিত হচ্ছে না। প্রতি রাতে টিভির স্ক্রলে তাকালে দেখা যাবে দেশজুড়ে বিচিত্র সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ অকাতর জীবন দিচ্ছে; কিন্তু এর প্রতিবিধান দেখছি না।

এ ছোট্ট দেশের চারপাশটা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিসীমার বাইরে নয়। তারা বিশ্বাস করেন, বেশিরভাগ পাবলিক পরিবহনের মালিকানার সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ফলে হাজার অপরাধ থাকলেও পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয় যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। একইভাবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাবানদের প্রভাবে ও দাপটে নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমিয়ে আনাও কঠিন।

আর এমন বাস্তবতায় দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কীভাবে সম্ভব হবে! সুশাসনের অভাবে সামাজিক জীবনে অস্থিরতাও বাড়ছে প্রতিদিন। সড়ক দুর্ঘটনার মতো মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণকারী শুধু ধর্ষণই করছে না, অনেক ক্ষেত্রে হত্যা করছে ধর্ষিতাকে। মাঝে মাঝে এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ায় ধর্ষক।

কিন্তু এসবেও রাশ টানা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকের মাথায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়া থাকে। নুসরাত হত্যার পর তা অনেকটা উন্মোচিতই হয়েছে। শুধু সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও মিডিয়ার ভূমিকার কারণে এটা হজম করা সম্ভব হয়নি।

দলীয় রাজনীতিকে এতটা নীতিহীন করে ফেলা হয়েছে যে, রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা দলকে ভালোবাসছেন বিবেককে বলি দিয়ে। এর পেছনে বোধহয় কিছুটা লাভ-লোভ, কিছুটা দলের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা আর কিছুটা বিরোধীপক্ষকে শত্রুজ্ঞান করার সংস্কৃতি কাজ করে। তাই নিজ দলের অন্যায়ের সমালোচনা দলসংশ্লিষ্ট মানুষ করতে শেখেননি।

ফলে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে দলের পরিশুদ্ধ হওয়ার যে সুযোগ ছিল তা তিরোহিত হয়েছে বারবার। সঙ্গতই আশা করার কারণ থাকে, দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীরা অন্তত বিবেকের শাসনে চলবেন। তারা লাইনচ্যুত দলকে লাইনে তুলে দেবেন।

সঠিক পথ দেখিয়ে দলের কল্যাণ সাধন করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নেতা-নেত্রীর সুনজর পাওয়ার জন্য তারাও ব্যতিব্যস্ত থাকেন। এসব কারণে রাজনীতির প্রতি জনআস্থা তৈরি হচ্ছে না।

আইনের শাসনের সংকট এবং সুশাসনের অভাব রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানেই মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, ধর্ষণ এসব রোধ করার বা রাশ টানার লাগাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যতটাই হোক, সামাজিক সুস্থিরতা না ফিরলে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন কি সম্ভব হবে? নানা অস্বস্তি থেকে জনবিক্ষোভ তৈরি হয়। প্রবল জলপ্রপাত সৃষ্টি হলে একে থামানো অসম্ভব। তখন অসহায়ভাবে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কাই থাকে বেশি। আমাদের রাজনীতি কি আত্মচৈতন্যে ফিরবে না?

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×