ব্যাংক থেকে অতিমাত্রায় ঋণ গ্রহণ শুভ লক্ষণ নয়

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এম এ খালেক

আগামী অর্থবছরের (২০১৯-২০) জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সম্ভাব্য ব্যয় ও আয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা ও ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা।

অর্থাৎ বাজেটের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সার্বিকভাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতি পূরণের জন্য তিনটি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করা হবে। দেশের বাইরে থেকে ঋণ গ্রহণ করা হবে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। স্থানীয়ভাবে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করা হবে ৩০ হাজার কোটি টাকা।

দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসারত বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করা হবে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। ইতঃপূর্বে অন্য কোনো বছর বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকিং সেক্টর থেকে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করা হয়নি।

আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণের প্রস্তাবনা নিয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ ব্যাংকিং সেক্টর থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের অর্থই হচ্ছে ব্যক্তি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণদান ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। বর্তমানে এমনিতেই ব্যাংকিং সেক্টর তারল্য সংকটে ভুগছে।

তার ওপর সরকার যদি অতিমাত্রায় ঋণ গ্রহণ করে তাহলে এই সেক্টরের অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পতিত হবে। সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ ব্যাংকই উদ্যোক্তাদের চাহিদামতো ঋণদান করতে পারছে না। কারণ তাদের অধিকাংশেরই তারল্য সংকট বিদ্যমান। তাই চাইলেও তারা ঋণদান কার্যক্রম সম্প্রসারিত করতে পারছে না। অবস্থা অনেকটা ২০১২/২০১৩ সালের অবস্থায় উপনীত হয়েছে।

সেই সময় ব্যাংকিং সেক্টরে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দিয়েছিল। অধিকাংশ ব্যাংকই বিনিয়োগযোগ্য পুঁজি সংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। একপর্যায়ে ব্যাংকগুলো ১৬/১৭ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহের চেষ্টা চালায়। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সময় সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকার যদি বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকিং সেক্টর থেকে অতিমাত্রায় ঋণ গ্রহণ করে তাহলে পরিস্থিতি ২০১২/২০১৩ সালের চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর এক অনুষ্ঠানে প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, আজ থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক টাকাও বাড়বে না। অনেকেই আশা করেছিলেন, অর্থমন্ত্রীর এই অঙ্গীকার পূরণের জন্য হলেও ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ে অধিকতর তৎপর হবে। কিন্তু দেখা গেল, ব্যাংকগুলো অর্থমন্ত্রীর এই অঙ্গীকার পূরণের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়ের পরিবর্তে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তাদের এই পলায়নপর মনোবৃত্তির কারণে ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ মুহূর্তে খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল; কিন্তু ব্যাংকগুলো ঋণের কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর চেয়ে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টায় রত হয়।

ইতিমধ্যে ঋণ হিসাব অবলোপনের সময়সীমা ৫ বছরের পরিবর্তে ৩ বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগে কোনো ঋণ হিসাব মন্দ ঋণ হিসেবে শ্রেণীকৃত হওয়ার পর ৫ বছর অতিক্রান্ত হলে উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের এবং শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করে কিছু শর্তসাপেক্ষে ঋণ হিসাবটি অবলোপন করা যেত। এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা দায়েরের শর্ত শিথিল করা হয়েছে।

শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণের বিধানও শিথিল করা হয়েছে। ব্যাংক চাইলে মন্দ ঋণ হিসাবে শ্রেণীকৃত হওয়ার পর সেই ঋণ হিসাব অবলোপন করতে পারবে। ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলীকরণের বিধানটিও সহজীকরণ করা হয়েছে। যদিও মহামান্য আদালত ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলীকরণের সংশোধিত আইনটি কয়েক মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। এ ছাড়া ঋণ হিসাব শ্রেণীকরণের নিয়মও শিথিল করার কথা শোনা যাচ্ছে।

এসব সংশোধিত আইন বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং সেক্টরের বিদ্যমান পর্বতপ্রমাণ খেলাপি ঋণ কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানো যাবে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। কারণ খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়বে। নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন। ফলে সার্বিকভাবে ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা খারাপের দিকেই ধাবিত হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, আজ থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক টাকাও বাড়বে না। কিন্তু দেখা গেল, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা ও অপরিণামদর্শিতার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাস না পেয়ে বরং আরও বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকায়।

এর সঙ্গে অবলোপনকৃত ৩৭ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এটা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ খেলাপি ঋণ। ২০১৮ সালের শেষ কোয়ার্টারে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। ২০১১ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।

২০১২ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সামান্য হ্রাস পেয়ে ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছিল। ২০১৪ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকায়।

২০১৫ ও ২০১৬ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা ও ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলো নতুনভাবে ঋণ প্রদান করলেও আগে দেয়া ঋণের কিস্তি আদায় করতে পারছে না। একশ্রেণীর ঋণগ্রহীতার মনে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে তা পরিশোধ না করলেও চলে। তাদের এই মনোভাবের কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশে কেউ ঋণ গ্রহণ করে খেলাপি হলেও তাকে কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না।

বরং নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করলে তাদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। ঋণখেলাপিদের যেভাবে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে তাতে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধকারীরাও খেলাপি হতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। ঋণখেলাপিদের সবাই আবার একই রকম নন। কেউ কেউ আছেন যারা নানা বিরূপ পরিস্থিতির কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।

এরাই হচ্ছে প্রকৃত ঋণখেলাপি। যারা প্রকৃত ঋণখেলাপি তাদের নানাভাবে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে ঋণ পরিশোধে সক্ষম করে তোলা যেতে পারে। একজন ঋণখেলাপির সাম্প্রতিক নিকট অতীতের ঋণের কিস্তি ফেরতদান কার্যক্রম পর্যালোচনা করলেই অনুধাবন করা যেতে পারে তিনি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নাকি প্রকৃত ঋণখেলাপি।

আর একশ্রেণীর ঋণখেলাপি আছেন যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছা করেই ঋণের কিস্তি আটকে রাখেন। এরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। এদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। কিন্তু কেন জানি কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রতি বড়ই উদার।

আমাদের দেশে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যেখানে ‘শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালন’ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে তার অধিকাংশই উপভোগ করছেন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা। যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন তারা তেমন কোনো আর্থিক প্রণোদনা পাচ্ছেন না। ফলে একজন ঋণগ্রহীতা চেষ্টা করেন কীভাবে নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করে খেলাপি হওয়া যায়।

আমাদের দেশে ঋণ গ্রহণ করতেও যেমন আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজন হয়, তেমনি খেলাপি হতেও আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজন হয়। ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা দরিদ্র মানুষ ঋণের কিস্তি নিয়মিত ফেরতদান করেন। কারণ ঋণের কিস্তি আটকে রাখার মতো ক্ষমতা তাদের নেই। অবশ্য দরিদ্র মানুষের নৈতিকতা অনেক সময়ই বিত্তবানদের চেয়ে উন্নত হয়, যে কারণে তারা ঋণের কিস্তি আটকে রাখার চেষ্টা করেন না।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কখনোই তারল্য সংকট দেখা দিত না, যদি আমরা খেলাপি ঋণের কিস্তি নিয়মিত আদায় করতে পারতাম। ব্যাংক অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মতো নয়। ব্যাংকের মালিকরা তাদের নিজেদের অর্থে ব্যবসায় পরিচালনা করেন না। তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে সুদ প্রদানের শর্তে আমানত সংগ্রহ করেন এবং সেই আমানতের টাকা উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ হিসাবে প্রদান করেন।

বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগযোগ্য তহবিল কিছু ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে আছে। অর্থাৎ চাইলেও ব্যাংকগুলো এই বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে পারছে না। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রভিশন বাবদ যে অর্থ ব্যাংককে সংরক্ষিত রাখতে হচ্ছে তাও বিনিয়োগের স্রোতধারা থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে।

অর্থাৎ ব্যাংকিং সেক্টরের প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা (দেড় লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ+আরও প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা প্রভিশন=তিন লাখ কোটি টাকা) ঋণদানের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার যদি বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরের তারল্য পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষ ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে মোটেও আন্তরিক নয়। তাই তারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে চলেছেন। আগামীতে ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও অনেকটাই বেড়ে যাবে, যদিও তা দৃশ্যমান হবে না।

কারণ নানা আইনি মারপ্যাঁচে খেলাপি ঋণকে মূল লেজার থেকে আলাদা করে রাখা হবে। ব্যাংকিং সেক্টরের তীব্র আমানত সংকট, ঋণের সুদের উচ্চ হার ইত্যাদি বহু জটিল সমস্যার জন্মদাতা হচ্ছে খেলাপি ঋণ।

খেলাপি ঋণ আদায় করা না হলে ভবিষ্যতে যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসবে না। তারল্য সংকটও কাটবে না। সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকিং সেক্টর থেকে বর্ধিত হারে ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা করে তারল্য সংকটকে আরও জটিল করে তোলার পথই সুগম করেছে বলা যায়।

এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক