মিঠে কড়া সংলাপ

বিপন্ন মানবজাতি!

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ২৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তাপদাহ

জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলে বিপন্নের মুখে মানবজাতি! পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে উত্তর মেরুতে যেভাবে বরফ গলা শুরু হয়েছে, তাতে সাগর-মহাসাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে অচিরেই অনেক দেশের উপকূলীয় অঞ্চল সাগরে বিলীন হয়ে যাবে। আর এ মুহূর্তে অব্যাহতভাবে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি তারই একটি জাজ্বল্যমান প্রমাণ।

অর্থাৎ এতদিন আমরা যা আশঙ্কা করে আসছিলাম তারই বাস্তব প্রতিফলন শুরু হয়ে গেছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত হিমালয়ের হিমবাহও বর্তমানে দ্বিগুণ গতিতে গলা শুরু হয়েছে। আর এশিয়া মহাদেশের অধিকাংশ দেশেই যেভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে সে বিষয়টিও অত্যন্ত ভয়াবহ।

সারা ভারতবর্ষ বর্তমানে দাবদাহে আক্রান্ত। ভারতের দিল্লিসহ আশপাশের রাজ্যে প্রচণ্ড দাবদাহ বয়ে চলেছে। কুয়েত, কাতার ইত্যাদি দেশের কোনো কোনোটিতে বর্তমানে তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছে পৌঁছে গিয়েছে।

আমাদের বাংলাদেশও দাবদাহের কবল থেকে মুক্ত নয়। গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের মানুষের জীবনও গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জীবনে ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় কাজকর্মের জন্য যাদের বাইরে যেতে হচ্ছে বা যারা কায়িক পরিশ্রম করে খাচ্ছেন তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়।

আমাদের দেশের জলবায়ুতে হিউমিডিটি (আর্দ্রতা) বেশি থাকায় অন্যান্য অঞ্চল অপেক্ষা এ দেশের মানুষ গরমে বেশি কাহিল হয়ে পড়েন। আর দিনের পর দিন সারা বিশ্বে এভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের মানুষের জন্য তা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে।

যদিও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন তথা সারা বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে পৃথিবীজুড়ে হইচই শুরু হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম অব্যাহত রয়েছে; কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে বলে মনে হয় না। কারণ জলবায়ু দূষণে পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা সমধিক হলেও এসবের কুফলে তারাই সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত।

অন্যদিকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত। বর্তমান সময়ে যার ফলাফল আমরা হাতেনাতে পেতে চলেছি। আমাদের দেশ, প্রতিবেশী ভারত ইত্যাদি দেশ যে টগবগে ফুটন্ত অবস্থার দিকে অগ্রসরমান, গত কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহের দাবদাহ সেই কথাটিই জানান দিচ্ছে।

আর সেই সঙ্গে উত্তর মেরুতে হিমালয় পর্বতে যেভাবে বরফ গলা শুরু হয়েছে তাতে করে যে বঙ্গোপসাগরসহ ভারত মহাসাগর কূলবর্তী এলাকার এক বিশাল অংশ অচিরেই জলমগ্ন হয়ে পড়বে সে কথাটিও সত্য হতে চলেছে।

এখন প্রশ্ন হল, এসব ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? বৈশ্বিক উষ্ণতার এ প্রক্রিয়া থামাতে কার কী ভূমিকা আছে সেসব বিষয় ভেবে দেখে, নিজেদের দায়-দায়িত্ব স্বীকার করে প্রতিকার খুঁজে বের করতে না পারলে যে গোটা মানবজাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে সে কথাটি বোধহয় আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।

২.

এ প্রসঙ্গে পৃথিবীতে মানবজাতির আগমন এবং পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য নিয়েও কিছু আলোচনা করা যেতে পারে বলে মনে করি। পৃথিবীতে মানবজাতির আগমন নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা আছে এবং সেসব নিয়ে অনেক গবেষণাও হয়েছে আর এখনও তা অব্যাহত আছে।

সদ্য প্রয়াত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের মতে, বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে (সুপ্রাচীন একটি বিন্দুর অতি শক্তিশালী বিস্ফোরণে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে)। বিজ্ঞানীরা একে মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছেন।

শুরুতে অতি ঘন ও উত্তপ্ত অবস্থায় মহাবিস্ফোরণের ফলে তা টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মহাকাশে বিভিন্ন গ্রহ-উপগ্রহের সৃষ্টি হয়।

গোলাকার অগ্নিকুণ্ড (Cluster) বিস্ফোরিত হয়ে লাভা নির্গত হওয়ায় সেই লাভার বাষ্পে চারদিকে নাইট্রোজেন, কার্বন ড্রাইঅক্সাইড ইত্যাদি গ্যাস বের হয়ে বায়ুমণ্ডলের সৃষ্টি হয় এবং এভাবে মেঘমালা তৈরি হয়ে বহু কোটি বছর ধরে বৃষ্টির ফলে পৃথিবী নামক গ্রহটি সৃষ্টি হয়েছে।

আর কোটি কোটি বছরের বৃষ্টির জলমগ্নতার কারণে সাগর-মহাসাগরের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ সবই বিজ্ঞানীদের কথা বা তাদের যুক্তি। কিন্তু ধর্মীয় মতে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে মহান সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক। যেমন বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষ ও পৃথিবী খোদাতায়ালার দান।

৩.

আবার মানুষ ও জীব সৃষ্টির বিষয়ে ধর্মীয় মত ও যুক্তি আলাদা। পবিত্র কোরআনে মানুষকে মহান আল্লাহতায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (আশরাফুল মাখলুকাত) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে মহাসাগরে প্রাণের সৃষ্টি হয় এবং তারও আগে ৩৫০০ কোটি বছর আগে সেখানে জলজ উদ্ভিদের জন্ম হয়।

আর এভাবে প্রথমে ৬০ কোটি বছর আগে মহাসাগরে অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং ৪০ কোটি বছর আগে সাপজাতীয় প্রাণী সৃষ্টি হয়ে ৩৫ কোটি বছর আগে সাগর থেকে উভচর প্রাণী স্থলে আসে। অতঃপর আড়াই কোটি বছর আগে মানব প্রজাতির সৃষ্টি হয় এবং ৪০ লাখ বছর আগে আদি মানুষের উদয় ঘটে।

এসব দলিল-দস্তাবেজে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় এসব আদি বা আদিম মানুষকে দেখতে পাওয়া যায়। আবার এ বিষয়ে ডারউইন তার বিখ্যাত ল’ অব ইভলুশন (Law of Evolution) তত্ত্বে বলে গেছেন, ‘ক্রমবিবর্তনের ফলে বানরজাতি মানবজাতিতে রূপান্তরিত হয়েছে।’

সুধী পাঠক, বর্তমান পৃথিবীর যে পর্যায়ে আমরা মানবজাতি হিসেবে বসবাস করছি সেই মানব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ধ্বংস বা বিলুপ্তির বিপদাশঙ্কার কথা বলতে গিয়ে পৃথিবী ও মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত একটু আলোচনা করা হল। আর উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবীর মানবসমাজের সম্ভাব্য বিপদাশঙ্কা থেকে মুক্তিচিন্তা সংক্রান্ত উপসংহার টেনেই আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই।

বৈজ্ঞানিক আলোচনা ও গবেষণার ভিত্তিতে দেখা যায়, মহাবিস্ফোরণের সময় প্রাথমিক অবস্থায় পৃথিবী একটি লাভা ও তরল অগ্নিকুণ্ড হিসেবে বিদ্যমান ছিল। বহু কোটি বছরের বৃষ্টির ফলে ধীরে ধীরে তা ঠাণ্ডা হয়ে বর্তমান পৃথিবী নামক গ্রহটির সৃষ্টি হয়েছে এবং পৃথিবীতে সাগর-মহাসাগর ও স্থলভূমির উৎপত্তি হয়েছে।

বৈজ্ঞানিক এ তত্ত্ব সঠিক হোক আর না হোক, পৃথিবীকে মহান আল্লাহর দান হিসেবে গ্রহণ করে আমাদের এ গ্রহটি রক্ষা করাই হবে এখন সময়ের কাজ। আর সে দায়িত্ব বর্তমান পৃথিবীর সমগ্র মানবসমাজের ওপরই বর্তায়। কারণ আমরা মানবজাতিই পৃথিবীকে ধ্বংস করে চলেছি। পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী এ জন্য দায়ী নয়।

পৃথিবী নামক গ্রহটিকে আমরা ভোগদখল করতে গিয়ে নিত্যকার কাজকর্ম দ্বারা তা ধ্বংস করে চলেছি। আমরাই পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে গ্রহটিকে অগ্নিকুণ্ড বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছি। আমি নিজে যখন আকাশপথে বিমান ভ্রমণকালে দেখি, সেই বিমানের প্রকট শব্দ এবং পোড়ানো তেল দ্বারা আকাশপথ তথা মহাশূন্য দূষিত হয়ে পড়ছে তখন আমারও মনে হয়, পৃথিবীকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমিও কিছুটা দায়ী!

এ অবস্থায় আমার মনে হয় না এ বিষয়ে আর বলার কিছু আছে। বলার যা আছে তা হল, আমাদের যার যার অবস্থান থেকে পৃথিবী নামক গ্রহটিকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। আর ব্যক্তি, সমাজ, দেশ, জাতিভেদে সারা বিশ্বের সবাইকেই সে ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

অতঃপর প্রতিমুহূর্ত আমাদের এ কথা ভেবে অগ্রসর হতে হবে যে, বর্তমানে আমরা পৃথিবী নামক গ্রহটিকে যেভাবে ব্যবহার করে চলেছি, তাতে করে গোটা মানবজাতিই বিপন্ন হতে চলেছে!

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×