মানব পাচার একটি অভিশাপ

  মুঈদ রহমান ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অভিশাপ

‘মানব পাচার রোধে অগ্রগতি নেই’ শিরোনামে ২২ জুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে একটি দৈনিকে। এতে সরকারের প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও মানব পাচার নির্মূলে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বলে উল্লেখ করা হয়। সংবাদটি হতাশাব্যঞ্জক।

২০ জুন আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতর ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন্স রিপোর্ট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটিতে মানব পাচারের ক্ষেত্রে কোন দেশ কতখানি নজরদারি করতে সক্ষম, তার তিনটি স্তর নির্ধারণ করা হয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় ধাপের তালিকায় রাখা হয়।

এ নিয়ে পরপর ৩ বার বাংলাদেশ একই ধাপে অবস্থান করছে। এ ধাপগুলো নির্ধারণ করা হয় আমেরিকার ‘মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা আইনের’ (Trafficking Victim Protection Act ,TVPA) ওপর ভিত্তি করে। সে অনুযায়ী যেসব দেশ ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করতে পেরেছে তাদের প্রথম ধাপে, আর যারা ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করতে পারেনি কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অথচ কোনো কিছুই দৃশ্যমান নয়, এমন দেশগুলোকে দ্বিতীয় ধাপে রাখা হয়েছে; বাংলাদেশ তাদেরই একটি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল, মানব পাচারের অভিযোগগুলোর সুরাহা না করা। রোহিঙ্গাদের পাচার সম্পর্কিত কমপক্ষে ১০০টি অভিযোগের কোনো সুরাহা হয়নি। প্রতিবেদনের সবচেয়ে ভয়ংকর খবরটি হল, মানব পাচারের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িয়ে পড়া।

২২ জুন একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশে মানব পাচারের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা এখনও গুরুতর একটি সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু সরকার এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানায়নি। শুধু তা-ই নয়, বিদেশে কর্মী নেয়ার অবৈধ এজেন্টদের চিহ্নিত করতেও সেভাবে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বাংলাদেশে।’

বেদনাদায়ক হল, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ মানুষ অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমায় এবং তাদের বেশিরভাগই পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়।

মানব পাচার একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং একটি অবৈধ-অমানবিক মানব বাণিজ্য। এ ব্যবসাটি পরিচালিত হয় বলপূর্বক শ্রম, যৌনদাসত্ব এবং বাণিজ্যিক যৌনশোষণ দ্বারা।। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা অইএলও’র তথ্যানুসারে, ২০১৪ সালে মানব পাচারের মাধ্যমে ১৫০ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করা হয়। ২০১২ সালের হিসাব অনুযায়ী, সারা দুনিয়ায় ২১ মিলিয়ন মানুষ মানব পাচারের শিকার হয়ে আধুনিক দাসে পরিণত হন।

এদের মধ্যে ১৪.২ মিলিয়ন (প্রায় ৬৮ শতাংশ) শ্রমশোষণের শিকার, ৪.৫ মিলিয়ন (২২ শতাংশ) যৌনশোষণের এবং বাদবাকি ২.৩ (প্রায় ১০ শতাংশ) রাষ্ট্রের তরফ থেকে জোরপূর্বক শ্রমের শিকার হয়। মানব পাচারের পেছনে যে কারণগুলোকে ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- দারিদ্র্য, কর্মসুযোগের অভাব, স্বল্পশিক্ষা, ভঙ্গুর পরিবার, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অভিবাসন নীতিমালা ইত্যাদি।

এ বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কেউ কেউ বলতে চাইছেন- মানব পাচারের মূল কারণ হল মানব পাচারকারীর উপস্থিতি। একটি দেশে যত অনাকাক্সিক্ষত পরিবেশই থাকুক না কেন, তার পক্ষে বিদেশে অবৈধভাবে পাড়ি জমানো সম্ভব হতো না। কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে, কীসের জন্যই বা যাবে- এসব কাজ ও ভাবনার সঙ্গে জড়িত আছে পাচারকারীরা। একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বিদেশে পাড়ি জমানোর অবৈধ পথ চেনার কথা নয়।

২০১৮ সালের অক্টোবরে মেক্সিকোর দুর্গম পথে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি আটক হন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় যাওয়া; কিন্তু কোন পথে? তাদের দুবাই থেকে ব্রাজিল নেয়া হয়। সেখান থেকে বলিভিয়া, তারপর পেরু, ইকুয়েডর, পানামা সিটি হয়ে গুয়েতেমালা, তারপর মেক্সিকো। ভাবতে পারেন! এতগুলো দেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমাদের মতো সাধারণ বাংলাদেশিদের নেই।

পাচারকারীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকাই এ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে আটক হন ১৯৪ বাংলাদেশি। তাদের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। গত মে মাসে ঘটেছে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। মে মাসে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার উপকূলে ৩৯ বাংলাদেশি নৌকাডুবিতে মারা যান। সে সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, নোয়াখালী জেলার তিন ভাইকে পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা হল রোম্মন, রিপন ও রুবেল। লিবিয়া ও তুরস্কে এদের মানব পাচারের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। আমরা পরের কোনো পদক্ষেপের কথা জানি না। আরেকটি চালানে তিউনিসিয়ার সাগরে ৩ সপ্তাহ ধরে নৌকায় ভেসে বেড়ানো ৭৫ জনের মধ্যে ৬৪ জনই ছিল বাংলাদেশি। তিউনিসিয়া কর্তৃপক্ষ সে দেশের শরণার্থী কেন্দ্রে জায়গা না থাকায় তাদের গ্রহণ করতে পারেনি। ৬৪ জনের মধ্যে ১৭ জন কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ২১ জুন দেশে ফেরেন। ধারণা করা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে মানব পাচার হয়ে থাকে।

১৮ মে আরও একটি দৈনিকে দেশে মানব পাচার চক্রের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে মানব পাচারের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৫টি চক্র সক্রিয়। এদের গডফাদাররা সম্পূর্ণভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাচারকারীরা বাংলাদেশিদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদেরও পাচারের কাজে নিযুক্ত আছে।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলের কমপক্ষে ৬০টি পথে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার পথে পাচারের কাজ চলছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, যারা বাংলাদেশের কোস্টগার্ডকে ফাঁকি দিয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছান, তারা শেষতক মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের হাতে গ্রেফতার হন। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ৫৬ জন মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের মুখ থেকে শোনা যায়, একটি সুন্দর অর্থনৈতিক জীবনের প্রত্যাশায় জীবনবাজি রাখেন তারা। অর্থনৈতিক সচ্ছলতার আশাতেই অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রধান কারণ। সরকারি হিসাবমতে, গত ১৪ বছরে দারিদ্র্যের হার ৪০ থেকে কমে ২১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রবৃদ্ধিও ঘটেছে ৮ শতাংশের মতো। এ সময়ে মাথাপিছু আয় ১০৬৫ থেকে ১৯০৯ ডলারে পৌঁছেছে। গবেষকদের মতে, প্রতি দুটি খানার (house hold) মধ্যে একজন করে বেকার তরুণ-তরুণী আছে।

আমাদের ৩ কোটি ৫০ লাখ খানা থাকলে বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৫ লাখ। তবে সরকারি ভাষ্যমতে, আমাদের দেশে বেকারত্বের পরিমাণ হচ্ছে ২৬ লাখ। তারপরও মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘মরিয়া হয়ে যারা বিদেশ যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। তাদের অনেকেই হয়তো স্কুল কিংবা কলেজের পাট চুকিয়েছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, অর্থনীতি এখন কোন ধরনের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে? অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি হয়তো চায়ের দোকানে কিংবা অ্যাপভিত্তিক পরিবহন যাত্রীসেবায় লোকজনের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে। কিন্তু বিদেশগামী তরুণরা আসলে কী ধরনের কাজ চান, সেটা আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে। তারা নিজেদের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ চান। মর্যাদাসম্পন্ন কাজ চান। আমরা কি সেটা নিশ্চিত করতে পেরেছি? তাই ঝুঁকি নিয়ে যুবক সম্প্রদায় বিদেশে অনেক বাধ্য হয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার দিয়ে এটা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব না।’

আমরা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি, পাচারকারীদের অস্তিত্বই মানব পাচার সমস্যার মূল কারণ। এ চক্রের সন্ধান ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কোন অনিশ্চয়তার কারণে মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিচ্ছে, তারও অনুসন্ধান করতে হবে এবং সে অনিশ্চয়তাকে নিশ্চয়তায় পরিণত করতে হবে; তবেই আমরা মানব পাচারের মতো অভিশাপ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারব। এ বিষয়ে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ কামনা করছি।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×