ইস্তান্বুল নির্বাচনের পর তুরস্কে নতুন ভোর!

  সেলিম কোরু ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন ভোর

গত ২৩ জুন তুরস্কের ইস্তান্বুল নগরীর মেয়র নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট রিসেফ তায়েপ এরদোগানের পছন্দের তথা শাসক দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) প্রার্থীকে ৮ লাখ ৬ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন বিরোধী প্রার্থী একরেম ইমামোগলু। তিনি পেয়েছেন ৫৪ শতাংশ ভোট। প্রায় দুই দশকের মধ্যে এটি শাসক দলের জন্য সবচেয়ে বড় পরাজয় ছিল।

ইমামোগলু ইস্তান্বুল জয় করেছেন তুরস্ককে পুনরায় একটি রাজনীতির দিকে চালিত করার সূচনার মাধ্যমে, যা গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের পরিস্থিতিকে সক্ষম করে তুলতে পারে। তিনি নিজের বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন এ স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে যে, ক্ষমতাচ্যুতিও রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি করতে পারে, যা কিছু লোকরঞ্জনবাদীরা বুঝে থাকে।

যে বিষয়টি তাকে ব্যতিক্রমী বানিয়েছে তা হল, আরও গভীর না করে মেরুকরণ ভেঙে দেয়ার মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। মার্চে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে পৌর নির্বাচন আয়োজন করে তুরস্ক। এতে আঙ্কারা ও ইস্তান্বুলসহ প্রায় সব বড় শহরে এরদোগানের একেপি বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) কাছে পরাজয়বরণ করে।

দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা, মর্যাদাপূর্ণ ও তুরস্কের রাজনীতির চাঁই হিসেবে বিবেচিত হওয়া ইস্তান্বুল নগরীতে পরাজয় মেনে নিতে পারেননি এরদোগান ও তার দল। ফলে নিজেদের দাবির পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই নির্বাচনে প্রতারণা, ভোট প্রদানে ছোটখাটো অনিয়ম এবং ভোট পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইস্তান্বুলের ভোট বাতিল করে নতুন করে আবারও ভোটের দাবি তোলে একেপি।

তুরস্কের নির্বাচনী সংস্থা আনুগত্যের পরিচয় দেয় এবং নতুন করে ২৩ জুন ভোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মানুষ অনুভব করেছে (সম্ভবত সঠিকভাবে) যে, ফের নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিতে নির্বাচনী সংস্থার ওপর চাপ প্রয়োগ করেছেন এরদোগান। এটি কেবল তাকে ভোট না দেয়া অর্ধেকের বেশি মানুষকেই বিরক্ত করেনি; একই সঙ্গে তার অনেক সমর্থককেও ক্ষুব্ধ করেছে। পরাজিত হওয়ার পর সরকার আরেকবার নির্বাচন আয়োজন করতে পারে- এ বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেননি তুর্কিরা।

এরদোগানের দল অবশ্য পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে নিজেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত নেতিবাচক প্রচারণা ত্যাগ করা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পার্লামেন্টের স্পিকার বিনালি ইলদিরিমকে প্রার্থী করার মাধ্যমে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করে। ইলদিরিমের সবচেয়ে লক্ষণীয় গুণ হল এরদোগানের নিঃশর্ত আনুগত্য এবং তার বেশিরভাগ প্রচারণা দেখে মনে হয়েছে তাকে সম্ভবত নির্বাচন করার জন্য বাধ্য করা হয়েছে। তিনি ছিলেন নিষ্প্রাণ এবং প্রায় দেখা গেছে যে তিনি প্রাণশক্তি পাচ্ছেন না ও মাইক্রোফোনের সামনে মিনমিন করছেন।

ইমামোগলু বিরোধী পক্ষের বিভিন্ন মতের লোককে- তার নিজের দল সিএইচপি ও এর প্রতিষ্ঠাতা দ্য রিপাবলিক, দ্য গুড পার্টি ও এর জাতীয়তাবাদী অংশীদার এবং কুর্দিপন্থী পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টিকে একসঙ্গে করতে পেরেছিলেন। তার র‌্যালিগুলো রাজনৈতিক প্রতীকগুলোর মিলনস্থলে পরিণত হয়েছিল- রেইনবো পতাকা, প্যান-তুর্কি ব্যানার, পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির পতাকা। মানুষের মাথার স্কার্ফে এবং ট্যাঙ্কের মাথায় এসব পতাকা শোভা পেয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনগুলোয় যখন জরিপে ইমামোগলুর এগিয়ে থাকার বিষয়টি দেখা যায়, তখন এরদোগান হামলে পড়েন। তিনি সুকৌশলে ধীরে ধীরে বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইমামোগলু যুক্ত ছিলেন রহস্যময় ইসলামপন্থী নেতা ফেতুল্লা গুলেনের সঙ্গে- যিনি একসময় এরদোগানের মিত্র ছিলেন এবং তুরস্ক যাকে ২০১৬ সালের অভ্যুত্থানচেষ্টার দায়ে অভিযুক্ত করেছে।

ওই অভুত্থানচেষ্টায় ২৫১ জন নিহত ও ২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। ‘সিএইচপি প্রার্থীর পুরো বাগ্মিতাই মিথ্যার ওপর নির্ভর করে’- বলেছেন এরদোগান। তিনি ও তার অনুগত মিডিয়া হাউসগুলোও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি পিকেকের সঙ্গে ইমামোগলুর সংযোগ আছে বলে অভিযোগ তুলেছে, যে পিকেকের সঙ্গে তিন দশকের বেশি সময় ধরে লড়াই করে যাচ্ছে তুরস্ক।

একই সময় পিকেকের কারাবন্দি নেতা আবদুল্লাহ ওসালান লিখিত একটি চিঠি সম্ভবত এরদোগান পেয়েছেন, যা প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। ওসালানের চিঠিতে কুর্দিস পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির ভোটারদের ‘নিরপেক্ষ থাকার’ আহ্বান জানানো হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে তাদের বলা হয়েছে ইমামোগলুকে তারা যেন ভোট না দেয়। এরদোগান ওসালানের পক্ষ থেকে বলার কর্তৃত্ব পাওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাস্যরসের খোরাকে পরিণত হয়েছেন। তুর্কি মিডিয়া সাধারণত ওসালানকে জনসাধারণের প্রধানতম শত্রু হিসেবে বর্ণনা করে থাকে।

এরদোগান সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন, যখন তিনি ইমামোগলুকে তার মার্চের বিজয় থেকে বঞ্চিত করেন এবং একটি নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য করেন। ধার্মিক মুসলমানদের দল হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষ এলিটদের সরিয়ে ২০০০ শতকের শুরুর দিকে ক্ষমতায় আসা একেপিকে আর আন্ডারডগের তকমা নিতে হয়নি। আড়াই দশক ক্ষমতায় থাকা একেপি তুর্কি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অতঃপর দলটি বিরোধীদের একটি নির্বাচনী বিজয় থেকে বঞ্চিত করেছে।

তুর্কিদের বিরক্তি এরদোগানের বিপক্ষে গেছে এবং তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যত তাদের কথোপকথনে প্রায়ই প্রকাশ পেত, যখন তারা একেপির রাজনীতিকদের বর্জনের বিষয়ে নিজেদের কল্পনার কথা, সুবিধাভোগী মোসাহেবদের কথা বলতেন।

প্রতিশোধের ভয় : যে কোনো বিরোধী প্রচারণা ন্যায়বিচারের আহ্বানের মধ্য দিয়ে যায়; কিন্তু তুরস্কে এ ধরনের কোনো প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রতিশোধের সীমা অতিক্রম করে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পুরনো সেক্যুলার এলিট লেখক ও প্রাবন্ধিক মাইন কিরিক্কানাত গত বছর এক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে এ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ইসলামপন্থী ক্ষমতাচ্যুতির ভাষায় ফান করতে গিয়ে।

যেমন- তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্কার্ফ নিষিদ্ধের পুরনো তুর্কি ইস্যু নিয়ে কথা বলছিলেন। ‘এখন কারা ক্ষমতাচ্যুত’? বলছিলেন তিনি। ‘আমরা!’ ওই বিরক্তিকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের শপথ নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমরাও তোমাদের ক্ষমতাচ্যুত করব। নিশ্চিতভাবেই, সেদিন আসবে।’

মাইন কিরিক্কানাতের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল বিরোধী সেক্যুলারদের বিরক্ত একটি গ্রুপের মধ্যেও; কিন্তু এটি এরদোগান ও তার সমর্থকদের কাছে একটি আশীর্বাদ হয়ে আসে, যারা একে প্রতিশোধপরায়ণতার ভয় হিসেবে দেখানোর জন্য ব্যবহার করেছিল। সরকারপন্থী জনপ্রিয় একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে নির্বাচনের দিন ভিডিওটি অনেক শেয়ার করা হয়েছিল। তাতে লেখা হয়েছিল ‘এটি তাদেরকে দেখাও যারা এখনও দ্বিধান্বিত, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ বা বিপর্যস্ত- ইনশাল্লাহ বিনালি।’ কিন্তু ইস্তান্বুলের রক্ষণশীল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ফাতিহ, ইয়ুপ ও উসকুদার জেলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট দেয়া হয়েছে ইমামোগলুকে, যিনি পুনরুত্থানবাদী আবেগকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছিলেন।

প্রচারণার শুরুতে ইমামোগলু এরদোগানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন এই উদ্দেশ্যে যে, নিজের কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি ও সম্মান দেয়ার বিষয়টি তিনি জনগণকে দেখাতে চান। তিনি রক্ষণশীল জেলাগুলোয় সবচেয়ে কঠোর প্রচারণা চালিয়েছেন, রমজান মাসে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে ইফতার করেছেন এবং একেপির ভোটারদের চিন্তাচেতনা শোনার জন্য দীর্ঘসময় ব্যয় করেছেন। যা সত্যিকারার্থে এরদোগানের পক্ষে কখনও করা সম্ভব ছিল না, সেটি তিনি করেছেন। যেমন- তিনি বলেছেন, আমরা একে অপরকে ক্ষমা করে দিতে পারি এবং আইনের আওতায় সমানভাবে বাঁচতে পারি। ‘এটি কোনো বিজয় নয়, এটি একটি নতুন শুরু’- নিজের বিজয়ী বক্তব্যে বলেছেন ইমামোগলু। তুরস্ক যে পদ্ধতিতে শাসিত হচ্ছে, একটি মেয়র নির্বাচন তাতে কিছুটা পরিবর্তন আনবে; কিন্তু সেখানে এমন একটি অনুভূতি দেখা যাচ্ছে যে, ইস্তান্বুলে একটি নতুন ভোর এসেছে এবং দেশের দুটি অংশ সম্ভবত চূড়ান্তভাবে বৃহৎ ভারসাম্যের একটি স্থানের দিকে দ্রুত আবর্তিত হচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

সেলিম কোরু : আঙ্কারার ইকোনমিক পলিসি রিচার্স ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক এবং ফরেন পলিসি রিচার্স ইন্সটিটিউটের রাইটিং ফেলো

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×