স্বদেশ ভাবনা

উসকানি নয়, প্রয়োজন আত্মসমালোচনার

  আবদুল লতিফ মন্ডল ০৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উসকানি নয়, প্রয়োজন আত্মসমালোচনার

‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আন্দোলন-সংগ্রামকে আরও বেগবান করা হবে’- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যের জবাবে গত ২২ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপি আন্দোলনের কথা তো বারবারই বলে বেড়াচ্ছে।

এখনও পুরনো কথার পুনরাবৃত্তি শুনতে পাচ্ছি। তাদের যদি সেই সক্ষমতা থাকে, সাহস থাকে আন্দোলন করে দেখাক। দশ বছরে তো দশ মিনিটের একটা আন্দোলনও দেখলাম না।’

আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন উসকানি প্রদান নতুন নয়। সাধারণ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং নতুন জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে ২০১৫ সালে বিএনপির ব্যর্থ আন্দোলন, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্বের অভাবের সুযোগ নিয়ে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ অনেকদিন ধরে বিএনপির প্রতি এরূপ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে আসছে।

উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর দাবিতে ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সময়কালে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের মার্চে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের জুনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করে।

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সমমনা ৮টি দল দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। অংশগ্রহণহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে। এতে দেশে গণতন্ত্র কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এটা সত্য, বিএনপির বর্তমান অবস্থার জন্য দলটিও অনেকটা দায়ী। বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়া আওয়ামী লীগের অনেকদিনের মনোবাঞ্চনা। আর এ মনোবাঞ্চনা পূরণে বিএনপি বারবার আওয়ামী লীগের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে।

আশির দশকের শেষদিকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ মিলিতভাবে এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুললেও জাতীয় পার্টি সরকারের পতনের পর, বিশেষ করে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পর আওয়ামী লীগ বিএনপি সরকারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৯৪ সালে মাগুরার একটি উপনির্বাচনে অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এ দাবিতে আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন ও সংসদ থেকে পদত্যাগ ছাড়াও ১৭৩ দিন হরতাল পালন করে।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় বিএনপি সরকার সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের পর কেবল বিএনপি সদস্যদের দ্বারা গঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে ওই বছর মার্চে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন রাজনীতিতে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেও এর ফলে বিএনপি ৫ বছর দেশ শাসনের আইনসঙ্গত অধিকার থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে। বিএনপির এ বদান্যতা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে এবং ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম সাধারণ নির্বাচনে দলটি হেরে যায়। আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। তৎকালীন সংবিধানের [৫৮ গ (৩)] অনুচ্ছেদ মোতাবেক ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে এ সরকারের মেয়াদ শেষে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা ছিল।

বিচারপতি কেএম হাসান এক সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন- এ অজুহাতে তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের অস্বীকৃতি ও আন্দোলনের কারণে বিচারপতি কেএম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অপারগতা জানান।

বিএনপি সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী বিকল্প কোনো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পদক্ষেপ না নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সর্বশেষ পন্থা হিসেবে তাদের মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমদকে নিজ দায়িত্বসহ প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন।

রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমদ নিজ দায়িত্বসহ প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করলে আওয়ামী লীগ প্রথমে তাকে মেনে নিলেও পরে এটিকে নবম সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার নীলনকশা হিসেবে অভিহিত করে। আওয়ামী লীগ থেকে ঘোষণা করা হয়, তারা নিজে এবং এর সঙ্গে যুক্ত ছোট দলগুলো ২২ জানুয়ারি ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নবম সাধারণ নির্বাচন বর্জন করবে।

প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করলে রাজনৈতিক সংকট গুরুতর আকার ধারণ করে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অব্যাহত রাজনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার এবং উপদেষ্টারা নিজ নিজ পদে ইস্তফা দেন। দু’বছরের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় সেনাসমর্থিত নির্দলীয় সরকার।

রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদকে নিজ দায়িত্বসহ প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ বিএনপির একটি বড় ভুল ছিল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থলে সেনাসমর্থিত নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার জন্য জনগণ বিএনপিকে অনেকটা দায়ী করে।

তাছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশ পরপর চারবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ায় জনগণ বিএনপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ভীষণভাবে পরাজিত হয়।

নবম সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর দু’বছর পার হতেই আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে।

জনগণ আওয়ামী লীগের এ পদক্ষেপকে ভালোভাবে নেয়নি। সাধারণ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের প্রতি জনগণের সমর্থন বাড়তে থাকে। এ দাবিতে আন্দোলন বেগবান হতে থাকলে সরকারের অস্বস্তি বেড়ে যায়। সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সংলাপের জন্য দশম সংসদ নির্বাচনের আড়াই মাস আগে অর্থাৎ ২০১৩ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের জন্য টেলিফোনে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত সংলাপের দিনের পরদিন পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আহূত হরতালের মেয়াদ বহাল থাকায় খালেদা জিয়া পরবর্তী কোনোদিনে যে কোনো জায়গায় তার সঙ্গে সংলাপে বসার সম্মতি দেন। এ সংলাপ আর হয়নি।

অনেকে মনে করেন, গণভবনে আলোচনায় বসার জন্য খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোনে আমন্ত্রণ ও তাৎক্ষণিক সম্মতি প্রদানের তাগিদ ছিল লোক দেখানো এবং সময় পার করার কৌশল। কারণ আওয়ামী লীগ কখনও বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসতে আগ্রহী ছিল না এবং আওয়ামী লীগ কখনও চায়নি বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। সরকারের কৌশল বুঝতে ব্যর্থ হয় বিএনপি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত সংলাপে যোগ না দিয়ে দলটি সরকারের পাতানো ফাঁদে পা দেয়।

দশম সাধারণ নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষে একটি গণজোয়ার সৃষ্টি হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য দেশি-বিদেশি সুহৃদদের পরামর্শ উপেক্ষা করে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। এটি ছিল বিএনপির একটি মারাত্মক ভুল।

এ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের জয়লাভের সমূহ সম্ভাবনা ছিল। অধিকাংশ আসনে জয়লাভ না করলেও বিএনপি ১০০ থেকে ১২০টি আসনে জয়লাভ করত এবং একটি শক্তিশালী বিরোধী দলে পরিণত হতো। সেক্ষেত্রে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিএনপিকে কঠিন সময় পার করতে হতো না।

একাদশ সাধারণ নির্বাচনে যোগদান বিএনপির সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে দলীয় চেয়ারপারসন জেলে থাকায় এবং সিনিয়র সহসভাপতি একটি মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বিদেশে অবস্থান করায় বিএনপির উচিত ছিল অন্য একটি দল থেকে আওয়ামী লীগের এক সময়ের একজন বড় নেতাকে ভাড়া না করে দেশে রাজনীতিতে সক্রিয় নিজেদের একজন নেতার নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করা। এ নির্বাচনে বিএনপি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভাড়া করা নেতার দলটি লাভবান হয়েছে।

একাদশ সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ছয়টি আসনে জয়লাভ করে। বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীরা শপথ গ্রহণ ও জাতীয় সংসদে যোগদান করবেন না এরূপ সিদ্ধান্ত হলেও নির্বাচিত প্রার্থীদের সংসদে যোগদানের প্রবল আগ্রহের কারণে ‘দলের ভাঙন এড়াতে’ তাদের সংসদে যোগদানে দলীয় সিদ্ধান্ত হয়। নির্বাচনে একটি আসন থেকে জয়ী দলটির মহাসচিব ছাড়া অন্যরা সংসদে যোগদান করেন।

আসলে সরকারের কৌশলের কাছে এখানেও বিএনপির পরাজয় হয়েছে। বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীদের সংসদে যোগদান একাধিক কারণে দলটির জন্য শুভ হবে না।

কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. একাদশ সাধারণ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম হয়েছে বিএনপির এমন দাবি গুরুত্ব হারাবে। দুই. বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীরা জাতীয় সংসদে যোগ দেবেন না এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিএনপি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বিএনপি থেকে নির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদে যোগদান করায় দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে নবগঠিত ৩৬টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে এবং ১২টি নারী কাউন্সিলর পদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এবং মার্চ-জুন সময়ে পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হলেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা এমপি হতে চান না।

তাদের লক্ষ্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ও জয়ী হওয়া। এখন একাদশ সাধারণ নির্বাচনে জয়ী বিএনপির প্রার্থীরা সংসদে যোগদান করায় দলটির তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ বাড়াবে। এতে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর অন্য বড় দলে, বিশেষ করে সরকারি দলে যোগদানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এটা সত্য, বিএনপি বর্তমানে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। তবে বিএনপির এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বা তাদের আন্দোলন করার অসামর্থ্যরে প্রতি ইঙ্গিত করে তাদের আন্দোলনে নামতে উসকানি দেয়া সরকারি দলের উচিত নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ কী অবস্থায় পড়েছিল তা তাদের স্মরণে রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের ১০ বছরের একটানা শাসনামলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও পরিবেশ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তা মোটেই অবহেলার নয়। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটবর্জিত দশম সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় এবং এতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিফলন না ঘটায় দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

লন্ডনের বিখ্যাত দি ইকোনমিস্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পচে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ গণতান্ত্রিক বিশ্ব একতরফা নির্বাচনে জয়ী ও সরকার গঠনকারী দল আওয়ামী লীগকে বিএনপি ও অন্যসব দলের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরামর্শ দেয়।

একাদশ সাধারণ নির্বাচন বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক হলেও সুষ্ঠু হয়নি। এ নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম যেমন- নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্সে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে সিল মেরে রাখা, বুথ দখল করে প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে ব্যালটে সিল মারা, সরকারবিরোধী জোটের পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া, সরকারবিরোধী দল বা জোটের প্রার্থীর সমর্থক ও নেতাকর্মীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হামলা, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করা ও পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ দেশ-বিদেশে এ নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস ‘ডেমোক্রাসি ইন রিট্রিট : ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

দশম সাধারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় এবং নজিরবিহীন অনিয়মের মধ্যে একাদশ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সূচকে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে।

শাসক দল আওয়ামী লীগ এ বিষয়টি অবহেলা করতে পারে না। তৃতীয়ত, সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক স্বাধীনতা বিপর্যয়ের মুখে। জনগণের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গত এক দশকে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। এখানে বড় অভিযোগটি হল, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পালিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরকার এ জঘন্য অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০১৮-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার হ্রাসের বিপরীতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। চতুর্থত, বিশ্বের মানচিত্রে পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থানের ধারাবাহিকভাবে অবনতি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি (ইপিআই) প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখা যায়, ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০ ধাপ পিছিয়ে ১৭৯তম অবস্থানে পৌঁছেছে। অথচ টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের বিকল্প নেই।

সবশেষে বলতে চাই, শাসক দল আওয়ামী লীগের উচিত হবে না বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্বের অভাবের সুযোগ নিয়ে দলটির প্রতি কোনোরকম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া। সহাবস্থানে বিশ্বাসী হতে হবে আওয়ামী লীগকে। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের উচিত হবে আত্মসমালোচনা করা। এতে নিজেরা নিজেদের দুর্বলতা ও ভুল বুঝতে পারবে, যা দেশের গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×