স্বপ্নযাত্রা, না সলিলসমাধি?

  মোহসিনা হোসাইন ও আরাফাত শাহরিয়ার ০৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সলিলসমাধি

বাংলাদেশি শ্রমিকদের সমুদ্রপথে বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের আইন অনুযায়ী তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়া তাদের আর কোনো বহির্গমন পথ নেই। প্রতারকচক্র সবকিছু জেনেও সাধারণ মানুষকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সমুদ্রপথে পাঠানোর নামে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর মুখে।

অবৈধভাবে সমুদ্রপথে যাত্রা করে স্বপ্নের দেশে নোঙ্গর করে না অনেক সমুদ্রযান। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেক মানুষের জীবন হয় বিপন্ন। টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে মাঝপথেই প্রতারকরা পালিয়ে গেছে, এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে।

অনেক ক্ষেত্রে আটকে রেখে পরিবারের সদস্যদের কাছে দাবি করা হয় মুক্তিপণ। মেটাতে না পারলে চলে অমানুষিক অত্যাচার। অনেককে বিক্রি করে দেয়া হয় দাসশ্রমিক হিসেবে।

সম্প্রতি তিন সপ্তাহের বেশি সময় ভূমধ্যসাগরে নৌযানে ভাসতে থাকা ৭৫ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে ৬৪ জনই বাংলাদেশি। গত ২১ জুন বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয় ১৭ যুবককে। তাদের জবানিতে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য।

দালালরা বড় জাহাজের ছবি দেখিয়ে টাকা নিলেও সাগরপাড়ে নিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের তুলে দেয় ছোট বোটে। ছিল না পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কেউ কেউ নিজের প্রস্রাব পান করেছে। কেউ রক্তবমি করেছে সাগরের লোনাজল পান করে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে গেছে সমুদ্রপথে মানবপাচার। গত মে মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে সলিলসমাধি হয় ৩৯ বাংলাদেশির। সে সময় প্রাণ নিয়ে দেশে ফেরা বাংলাদেশিদের বয়ান থেকে বেরিয়ে আসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার জীবন-মরণ ‘গেম’-এর বিষয়টি।

ভূমধ্যসাগর হয়ে অবৈধভাবে ইউরোপ প্রবেশের পথে অপেক্ষা করতে হয় লিবিয়ার ত্রিপোলির উপকূলীয় এলাকার একটি ঘরে। তিন দিন ধরে চলে নৌযান, দিকনির্ণয় যন্ত্র পরিচালনাসহ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার প্রশিক্ষণ।

শেখানো হয় সাগর পাড়ি দেয়ার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় কোথায় কী সংকেত দিতে হবে এবং কার সঙ্গে কী কথা বলতে হবে। নৌকায় থাকে না পাচারকারীদের কোনো প্রতিনিধি। ইউরোপ পৌঁছাতে পারা, না-পারায় নির্ধারণ হয় এই ‘গেম’-এর জয়-পরাজয়।

সাধারণত যাত্রাটা শুরু হয় মাছ ধরার ট্রলারে। তিউনিসিয়ার উপকূল ছাড়ার পর সেই নৌযানে আর ইউরোপের সমুদ্রসীমায় ঢোকা যায় না। এজন্য ব্যবহার করা হয় রাবারের তৈরি উদ্ধারকারী নৌকা। ২০-২৫ জনের ধারণক্ষমতার এই নৌকায় ওঠানো হয় ৪০-৪৫ জন করে।

দালালদের জনপ্রতি দিতে হয় ৮-১০ লাখ টাকা। ধারদেনা করে, জায়গাজমি বিক্রি করে এই টাকা জোগাড় করে বেশিরভাগ অভিবাসনপ্রত্যাশী। দালালরা এমনভাবে বর্ণনা করে যেন নৌপথে স্বপ্নের ইউরোপে নোঙ্গর করা কোনো ব্যাপারই না। বাস্তবে অনেকেরই হয় সলিলসমাধি। আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসাজশে চলে অবৈধভাবে ইউরোপে মানবপাচারের এই জীবন-মরণ খেলা।

বেঁচে থাকলেও অনেককে পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। বনে-জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াতে হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হলে ঠাঁই হয় কারাগারে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের পাঠানো হয় জাল ভিসায়। কারও সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয় স্টুডেন্ট বা ট্যুরিস্ট ভিসা।

অবৈধ পাসপোর্ট, জাল ভিসা বা ভুয়া কাগজপত্রসহ বিদেশে ধরা পড়ে জেল-হাজত খাটছেন অনেকে। জায়গা-জমি বিক্রির কিংবা উচ্চ সুদে ঋণের টাকা জলাঞ্জলি দিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন, এমন লোকের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

২০১৭ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশের নাগরিকরা। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত যেসব দেশের নাগরিকরা সমুদ্রপথে ইতালি ঢোকার চেষ্টা করেছে তার মধ্যে ৪ নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাবে অবৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করতে গিয়ে গত আড়াই বছরে ভূমধ্যসাগরে ৫ হাজার ৮৮১ জন ব্যক্তির সলিলসমাধি হয়েছে।

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের দেয়া তথ্যমতে, গত সাত বছরে সাগরপথে ইউরোপ পাড়ি জমাতে গিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ৬ হাজার ৯০৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ১২ হাজারের বেশি মানুষ।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ‘সমুদ্রপথে অবৈধভাবে অভিবাসনের কারণ, ধরন ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়া শ্রমিকদের ৩৮.৯৬ শতাংশ নিয়মিত বেতন পায় না, ১৪.০৬ শতাংশ জেল খাটছে, ২৮.৫১ শতাংশকে অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে, ১৫.২৬ শতাংশ বাইরে যেতে পারে না, ২৩.৭০ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, ১০.৮৪ শতাংশের কাজের নিশ্চয়তা নেই এবং খাওয়া-দাওয়া ও স্বাস্থ্যগত সমস্যায় রয়েছে ২১.২৮ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শ্রমিকদের ১০.৩৬ শতাংশ যাওয়ার সময় সীমান্তে আটক হয়েছে, ৪৭.৫০ শতাংশ চরম মানসিক যন্ত্রণায় সময় পার করেছে, ১০ শতাংশ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।

একটি অংশকে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়েছে, পরে তাদের অনেককে উদ্ধার করা হয়েছে। যাওয়ার আগে শ্রমিকদের ৬৩.৯২ শতাংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল, ২৩.৯২ শতাংশকে অগ্রিম টাকা দিতে হয়েছে, ১৭.৫০ শতাংশের কাছে একাধিকবার টাকা চাওয়া হয়েছে, ১০.৩৬ শতাংশের টাকা নিয়ে পালিয়েছে দালালচক্র।

আন্তর্জাতিক মানব পাচারচক্রের জাল অনেক বিস্তৃত। স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যেই থাকতে পারে পাচারচক্রের এজেন্ট। মনে রাখা জরুরি, নৌপথে বিদেশযাত্রা মানেই অবৈধপথে যাত্রা। এতে স্বাভাবিকভাবেই বিপদের আশঙ্কা থাকে।

কেউ নদীপথে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তাব দিলে ধরে নিতে হবে সে মানব পাচারকারী, প্রতারক। পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া কেউ বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও ধরে নিতে হবে সে আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের সদস্য।

পাসপোর্ট ছাড়া বা জাল পাসপোর্টে বিদেশ গেলে প্রবাসে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আটক করতে পারে। এসব প্রতারকের বিশ্বাস করা যাবে না, এদের তথ্য জানাতে হবে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে।

বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার অনেক সুযোগ আছে। বৈধ উপায়ে চাকরি নিয়ে বিদেশে যেতে হলে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেল বা সরকার নিবন্ধিত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যেতে হবে।

কোন্ ভিসায় পাঠানো হচ্ছে, আবেদন পদ্ধতি, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, কাজের পরিবেশ, বিদেশে যাওয়া এবং ফিরতি বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা- এসব বিষয়ে ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়েই পা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য মেলে। গ্রামাঞ্চলে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্রে এবং জেলাপর্যায়ে জনশক্তি অফিসেও এসব তথ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় একটি মাধ্যম জনশক্তি রফতানি। তাই অভিবাসন নিয়ে সরকারের বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নেয়া দরকার। দেশের প্রতিটি উপজেলায় বিএমইটি ও বোয়েসেলের কার্যালয় এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।

কমাতে হবে অভিবাসন খরচ। নিয়োগদাতা দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ কমিশন গঠন করলে দালালদের দৌরাত্ম্য কমবে। সরকারিভাবে বিদেশে লোক পাঠানোর হার একেবারেই কম, এই প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। সরকারিভাবে বা সরকারের সরাসরি তদারকিতে বেশিরভাগ লোক পাঠাতে পারলে জটিলতা কমবে।

জনসচেতনতাও বর্তমান চিত্র পাল্টে দিতে পারে। মানবপাচারকারীদের বেশিরভাগ শিকার সাধারণ মানুষ। অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্য সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে।

কিভাবে বৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়া যায়, বিদেশে কাজের জন্য প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। সমুদ্রপথে টহল জোরদার করতে হবে। আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতারক ও পাচারকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে শতকরা ২ টাকা হারে প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে চাহিদা আছে এমন সব কাজে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও বিদেশে সরকারিভাবে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে মহাপরিকল্পনা হাতে নিতে পারে সরকার।

চাইলে এ উদ্যোগের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি মহাবিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও যুক্ত করা সম্ভব। এ উদ্যোগ যেমন বর্তমান চিত্র পাল্টে দিতে পারে, তেমনি দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় যোগ করতে পারে নতুন মাত্রা।

মোহসিনা হোসাইন : চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

আরাফাত শাহরিয়ার : সহকারী পরিচালক, ইন্সটিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×