স্যানিটারি ন্যাপকিনে ভ্যাট আরোপ উপসর্গ, রোগ নয়

  জাহেদ উর রহমান ০৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ন্যাপকিন

ফেসবুকে অনেক ফেসবুকারের মধ্যে বেশ আনন্দের ভাব দেখা গেল; কেউ কেউ কার্যকর সংসদের অনুপস্থিতিতে ফেসবুককে ‘ডি ফ্যাক্টো’ সংসদের সম্মান দিয়ে দিচ্ছেন। যে খবর এ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে সেটা হল- সরকার স্যানিটারি ন্যাপকিন থেকে ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করেছে।

ফেসবুকে আনন্দ দেখা যাওয়ার কারণ সরকারের এ পদক্ষেপকে নেটিজেনরা তাদের প্রতিবাদের ফল হিসেবে দেখে আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন। গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন করছে নেটিজেনরা।

আনন্দে উদ্বেল নেটিজেনরা হয়তো খেয়াল করেননি সরকার এই বছরের বাজেটে নতুন করে আরোপিত ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করেছে মাত্র। গত বছরের ১৫ শতাংশ ভ্যাট এখনও আরোপিত রয়ে গেছে।

সঙ্গে আছে প্যাড তৈরির কাঁচামালের ওপর কাস্টমস ডিউটি, অগ্রিম আয়কর, রেগুলেটরি ডিউটি। যারা এটা জানেন, তারা কি এই পরিমাণ শুল্ক মেনে নিয়েছেন?

আমাদের দেশে প্রায় সব সমস্যায় জনগণের প্রতিবাদের ক্ষেত্রে খেয়াল করি- মানুষ যাকে রোগ মনে করে, সেটা আদতে উপসর্গ, রোগ নয়। স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ভ্যাট বসানোটা একটা রোগের উপসর্গ। সেই রোগের কথায় পরে আসছি।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ভ্যাট বসানোর বিরুদ্ধে সবাই যে মূল যুক্তি দিচ্ছে সেটা হল, এটা কোনো বিলাস পণ্য নয়, এটা নারীর অতি প্রয়োজনীয় জিনিস। তাদের অনেকেই সম্ভবত জানেন না, ভ্যাট এবং অন্যান্য পরোক্ষ কর অতি প্রয়োজনীয় বস্তুর ওপর বসানোটাই তত্ত্বগতভাবে বেশি যৌক্তিক।

পরবর্তী আলোচনায় যাওয়ার আগে অর্থনীতিতে ‘প্রাইস ইলাস্টিসিটি অফ ডিমান্ড’ কনসেপ্টটি সম্পর্কে একটু কথা বলে নেয়া যাক। ধরা যাক চালের দাম অনেক বেড়ে গেল, কিন্তু সেই ক্ষেত্রেও মানুষ চাল কেনা কমাতে পারবে খুব কম।

খুব বেশি চাপ হলে মানুষ কিছু অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে দেবে, কিন্তু চালের ব্যবহার খুব বেশি কমাতে পারবে না। অর্থনীতির ভাষায় বলে চালের প্রাইস ইলাস্টিসিটি খুব কম। অপরপক্ষে বেশি ইলাস্টিক পণ্যের দাম বাড়লে (যেমন গরুর মাংস) সেটার ব্যবহার কমে যাবে।

খুব সাধারণ যুক্তি বলে সরকার যদি চায় ভ্যাট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্কের মতো পরোক্ষ কর থেকে অনেক বেশি আয় করবে, তাহলে যেসব পণ্যের প্রাইস ইলাস্টিসিটি কম সেসব পণ্যেই এসব কর বেশি আরোপ করবে।

যেসব পণ্যের প্রাইস ইলাস্টিসিটি বেশি, শুল্ক আরোপের কারণে সেসব পণ্যের দাম বেড়ে গেলে মানুষ সেগুলোর ব্যবহার কমিয়ে দেবে, তাই সরকারের কাক্সিক্ষত পরিমাণ শুল্ক আসবে না।

নারীর শারীরবৃত্তীয় কারণে যেহেতু স্যানিটারি ন্যাপকিন একটা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, তাই দাম যতই বাড়ুক এর ব্যবহার নারী কমাতে পারবে না। তাই এ পণ্য থেকে সরকারের আয় অনেক বেশি হবে।

স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করলেও অবিশ্বাস্যভাবে নেটিজেনরা কিন্তু ভোজ্যতেল, চিনির মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যে পরোক্ষ কর বাড়ানোর বিরুদ্ধে কথা বলেননি।

চিনির উদাহরণ দিয়েই বোঝা যাক এসব পণ্যে কী হচ্ছে। এ মুহূর্তে এক কেজি চিনির আমদানি মূল্য ২৮ টাকা। কিন্তু এর ওপর আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক মিলিয়ে মোট শুল্কের পরিমাণ ২১ টাকা। অর্থাৎ মোট মূল্যের ৭৫ শতাংশ শুল্ক আছে চিনিতে।

চিনি কিনতে গিয়ে এই একই পরিমাণ শুল্ক পরিশোধ করেন একজন ভিক্ষুক কিংবা ব্যাংক লুটেরা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক।

পরোক্ষ কর অমানবিক করব্যবস্থা বলে স্বীকৃত, কারণ এ ক্ষেত্রে একই পণ্যের ক্ষেত্রে সব সামর্থ্যরে মানুষকে একই পরিমাণ কর দিতে হয়। তুলনায় প্রত্যক্ষ কর (যেমন আয়কর, কর্পোরেট কর, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) অনেক মানবিক, কারণ এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার নাগরিকের সামর্থ্যরে পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে কর ধার্য করে।

তাত্ত্বিকভাবে সেই করব্যবস্থা সবচেয়ে মানবিক যেখানে কোনো পরোক্ষ কর নেই, পুরোটাই প্রত্যক্ষ কর। কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এটা হয় না, তবে মানবিক করব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হয়। আমাদের মতো দেশে এটা এক দশক আগে থেকেই অন্তত ৫০ শতাংশ হওয়া উচিত; ভারতে প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ করের অনুপাত ৫০:৫০।

আমাদের মোট রাজস্ব আয়ে প্রত্যক্ষ করের হিস্যা গত বছর ছিল ৩৫ শতাংশের মতো। এটা বাড়া দূরেই থাকুক, এই বছর এটা কমেছে। অর্থাৎ সরকার তার রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে পরোক্ষ কর থেকে সরে তো আসছেই না, বরং আরও বেশি নির্ভরশীল হচ্ছে। মানে এই রাষ্ট্র ধনীদের স্বার্থরক্ষার দিকেই বেশি মনোযোগী।

এই বাজেটে সামান্য কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুবিধা রেখে, ব্যাংক লুটপাট বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ দূরেই থাকুক বরং লুটপাটকারীদের নতুন নতুন সুবিধা দিয়ে, টাকা পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে, সম্পদের ওপর ওয়েলথ ট্যাক্স আরোপ না করে, ধনীদের আয়করের ওপর সারচার্জ প্রযোজ্য হওয়ার সীমা বাড়িয়ে, শেয়ারবাজারে লুটপাটের পথ চালু রেখে রাষ্ট্রের ধনী এবং দুর্নীতিবাজদের আরও ধনী বানানোর পথ তৈরি করা হয়েছে।

অপরপক্ষে চিনি, তেল, গুঁড়াদুধ, মোবাইলে কথা বলার মতো বিষয়ে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে; সঞ্চয়পত্রের উৎসে আয়কর বাড়ানো হয়েছে; করমুক্ত আয়ের নিম্নসীমা গত পাঁচ বছরেও বাড়ানো হয়নি, যদিও এই সময়ে মূল্যস্ফীতি হয়েছে অন্তত ত্রিশ শতাংশ।

সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হল, কল্যাণ খাতে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা) জিডিপির অনুপাতে ব্যয় কমানো হয়েছে, যেটা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এখন আবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। পত্রিকায় দেখলাম অচিরেই বিদ্যুতের মূল্যও বাড়তে যাচ্ছে। এসব কিছুই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের আরও পিছিয়ে দেবে।

এবার আসা যাক রোগের কথায়। সরকারের রাজস্ব আয়ের নীতি, খাত অনুযায়ী ব্যয় বরাদ্দ পর্যালোচনা করলে দেখব সরকার রাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের স্বার্থ রক্ষা না করে ধনী, ক্ষমতাশালী মানুষদের স্বার্থরক্ষার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

এই রাষ্ট্র নানা পন্থায় সমাজের বেশিরভাগ মানুষের কাছ থেকে সম্পদ আহরণ করে তুলে দেয় হাতেগোনা কিছু মানুষের হাতে। এটাই সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেটাকে ‘হোয়াই ন্যাশন্স ফেইল’-এর লেখক ওসিমাগলু এবং রবিনসন বলেছেন ‘এক্সট্র্যাকটিভ ইকোনমি’। হ্যাঁ এই সেই রোগ, যার উপসর্গ হচ্ছে স্যানিটারি ন্যাপকিন, চিনি, তেলের ওপর ভ্যাট বাড়া।

এই রোগটিকে চিনে এর বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী নিজেদের অধিকারের পক্ষে যতদিন না দাঁড়াবে, যতদিন সংগ্রাম না করে সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ‘ইনক্লুসিভ ইকোনমি’ প্রতিষ্ঠিত করতে না পারবে, ততদিন তাদের শোরগোলে কখনও কখনও দুই-একটা কর কমতে পারে, কিন্তু রোগটি সারবে না। আর রোগ না সারলে সেটি নতুন উপসর্গ নিয়ে হাজির হবেই।

ডা. জাহেদ উর রহমান : সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×