বিপন্ন মানবতা

  মেহেদী হাসান ০৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিপন্ন মানবতা
রিও গ্রান্দে নদীর তীরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আলবার্তো মারটিনেজ ও তার শিশু কন্যা ভ্যালেরিয়া, ছবি: সংগৃহীত

ছবি কথা বলে! হয়তো অনেক বেশি বলে, অনেক সত্য বলে। কখনও কখনও ছবিতে দেখানো দৃশ্য শব্দের চেয়ে প্রবল ও প্রখর হয়ে ওঠে।

কয়েক দিন আগে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্থান করে নিয়েছে রিও গ্রান্দে নদীর তীরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আলবার্তো মারটিনেজ ও তার শিশু কন্যা ভ্যালেরিয়ার স্থির চিত্রটি।

ছবিতে দেখা যায়, এল সালভাদরের অস্কার আলবার্তো মারটিনেজ রামিরেজের কাঁধ ধরে আছে তার ২৩ মাস বয়সী মেয়ে ভ্যালেরিয়া। রিও গ্রান্দে পার হয়ে টেক্সাস যেতে চেয়েছিলেন মারটিনেজ, শেষ পর্যন্ত নদীবক্ষে প্রাণ গেল বাবা ও মেয়ের। মেক্সিকোর মাতামোরোস নদীর তীরে বাবা ও মেয়ের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। চরিত্র ভিন্ন হলেও চিত্রটি পৃথিবীবাসীর কাছে বেশ পরিচিত

। ঘটনার আকস্মিকতা থাকলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। স্মৃতির আড়ালে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের বদ্রুম উপকূলে সাগর সৈকতে পাঁচ বছর বয়সী আইলান কুর্দির নিথর দেহটি একইভাবে পড়েছিল। সিরিয়া থেকে আসা একদল শরণার্থী তুরস্ক হয়ে গ্রিসের কস্দ্বীপে যাওয়ার পথে সাগরে নৌকাডুবিতে আইলান নিজের মা রেহানা এবং বড় ভাই গালিবের সঙ্গেই তলিয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশিরা আরও কাছ থেকে দেখছে একই চিত্র- যেদিন নাফ নদীতে জীবন বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যকে আলিঙ্গন করেছিল ১০ মাস বয়সী শিশু তোতাইত। ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর নৌকা নিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টার সময়ে ডুবে যাওয়া নৌকায় অন্যদের সঙ্গে ছিল সে; পরে তোতাইত তৌহিদের মরদেহ নাফ নদীর তীরে কাদায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে।

সেদিন আইলান, তৌহিদ কিংবা ভ্যালেরিয়া মানুষ হিসেবে জন্মানোর জন্য লজ্জায় দুঃখে-ক্ষোভে মুখ লুকিয়ে ছিল। আইলানের লাল টি-শার্ট তার পবিত্র রক্তের চিহ্ন হিসেবে পৃথিবীকে অর্ঘ্য দিয়ে গিয়েছিল। তৌহিদের নরম দেহের ওপর অত্যাচার মনুষ্যত্বহীনতাকে নগ্ন করে দেখিয়েছে। ভ্যালেরিয়ার বাবাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার আকুতি অমানবিকতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে।

আইলান, তৌহিদ, ভ্যালেরিয়ার নিথর দেহ লাখ লাখ সিরিয়ান, ইরাকি, আফগান, মেক্সিকান ও রোহিঙ্গা শিশুর ওপর ঘটে চলা নিষ্ঠুরতার নীরব অথচ তীব্র বহির্প্রকাশ।

আর কত আধুনিক হলে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার সার্বজনীনভাবে নিশ্চিত হবে! আর কত অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা হলে বিশ্ব নেতৃত্বের লোভ থেমে যাবে! আর কত মুনাফা হলে ব্যবসায়ীরা সৎ হবে! আর কত অস্ত্র উৎপাদন হলে পৃথিবী মানবিক হবে! আর কত প্রাণ গেলে মানুষের মনুষ্যত্ব ফিরে আসবে!

আমরা পারিনি আইলনাদের একটু জায়গা দিতে; তাই প্রকৃতির কাছে সেই জায়গাটুকু নিশ্চিত করে নিয়েছিল আইলানরা। প্রতিদিন এরকম অসংখ্য আইলানদের সলিল সমাধি হচ্ছে; এর কিছু কিছু প্রচারের মুখ দেখলেও বেশির ভাগই থাকে অন্ধকারে।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন হচ্ছে, সভ্য আধুনিক সম্ভ্রান্ত পৃথিবীতে কেন এভাবে আইলানরা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে মৃত্যুবরণ করছে?

মানুষ জন্মগতভাবেই লোভী- এই লোভ ক্ষমতার, সম্পদের আর নেতৃত্বের। এই লোভী মনোবৃত্তি চরিতার্থ করতে মানুষ হয়ে পড়েছে বিবেক বিবর্জিত আর মানবতাকে করেছে বিপন্ন, বিক্ষিপ্ত। কর্তৃত্ববাদী পশ্চিমা শাসক শ্রেণী নব্য ঔপনিবেশিকতাকে সামনে নিয়ে গণতন্ত্রের মুখোশ পরে যুদ্ধ নামক হাতিয়ার দিয়ে বিপন্ন করেছে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার।

পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী তাদের হীন অসভ্য অভিপ্রায়কে সত্য করতে একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়েছে; এর ফলে পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ডায়ানা শরণার্থী সংকটের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বলেছেন, এ মানবিক সংকটের জন্য পাশ্চাত্যই অনেকাংশে দায়ী।

তিনি বলেছেন পশ্চিমের রাজনীতি, তাদের প্রচারণা আর পররাষ্ট্রনীতি মিলে এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মানুষ তার নিজ জন্মভূমিতে নিরাপত্তাহীনতা ও স্বাধীনতাহীনতায় ভুগতে শুরু করে এবং জীবনের তাগিদে জন্মভূমি ছেড়ে শুরু করে শ্বাপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দেয় আর হয়ে পড়ে উদ্বাস্তু; যার জন্ম দেয় শরণার্থী নামের এক ভয়ঙ্কর সমস্যার এবং যেটার কারণ জানা আছে, কিন্তু সমাধান অধরা।

শরণার্থী এমন এক ব্যক্তি, যে নিজের দেশেই সাংঘাতিক বিপদগ্রস্ত, নিরাপদ নয় অথবা প্রতিহিংসার ভয়ে নিজের দেশে থাকতে অনিচ্ছুক। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী শরণার্থী সেসব ব্যক্তি, যারা তাদের জাতি, ধর্ম, নাগরিকত্ব, বিশেষ সম্প্রদায় অথবা রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে নিপীড়নের আশঙ্কার সম্মুখীন এবং নিজের দেশে নিরপত্তা পাচ্ছে না অথবা উক্ত নিপীড়নের আশঙ্কার দরুন নিজের দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর আস্থাহীন এবং পূর্বে যে দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিল; সেই দেশে ফিরতে পারছে না অথবা উক্ত নিপীড়নের আশঙ্কার দরুন সেই দেশে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক। এই সংজ্ঞায় শরণার্থীকে একজন ভাসমান ব্যক্তিরূপে বিবেচনা করা হয়।

এই প্রবন্ধে শুধু শরণার্থীদের কথা বলা হচ্ছে। অভিবাসী আর শরণার্থীদের মধ্যে পার্থক্য সহজে দেখা যায়। অভিবাসন বিভিন্ন অর্থনৈতিক কারণে বা জীবনের গুণগতমান পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ঘটে।

অন্যদিকে শরণার্থীরা তাদের দেশে যেতে চায় না; কারণ তারা দ্বন্দ্ব, অত্যাচার বা যুদ্ধের কাছ থেকে বেঁচে থাকতে চায়। সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শুধু ইউরোপেই ৪০ মিলিয়নেরও অধিক মানুষ শরণার্থী ছিল। জর্জ বুশের আফগান ও ইরাক যুদ্ধ দেশ দুটিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিচূর্ণ করেছে আর মানুষগুলোকে বাধ্য করেছে দেশত্যাগ করতে।

ইউএনএইচসিআরের মতে, আফগানিস্তানের প্রায় ২৫ লাখ নিবন্ধিত শরণার্থী রয়েছে, যা এশিয়ার বৃহত্তম দীর্ঘস্থায়ী এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরণার্থী জনসংখ্যা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি হ্রাস পেলে জনগণ প্রতিনিয়ত তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যায়। সোভিয়েত আমল থেকেই আফগানিস্তান থেকে শরণার্থীরা দেশ ছেড়ে যেতে থাকে, যা গৃহযুদ্ধ ও তালেবান শাসনের সময়ও অব্যাহত রয়েছে।

ইরাকে চলমান দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপ এখন পর্যন্ত ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ নিজের জীবনের জন্য পালিয়েছে। আরব বসন্তের নাম করে লিবিয়া থেকে সিরিয়া আজ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে, এখন শরণার্থীদের অন্য নাম সিরিয়ান। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

এ বাস্তুচ্যুত মানুষের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৪০ লাখ এখন দেশের বাইরে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করছে। স্মরণকালের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় রোহিঙ্গা নিধন। সারা পৃথিবীকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে অং সাং সু চি’র সেনাবাহিনী যেভাবে নিরীহ রোহিঙ্গা নিধন করেছে, তা হলকাস্টকেও হার মানায়। ১০ লাখ রোহিঙ্গা আজ গৃহহীন ও পরিচয়হীন।

প্রতিদিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা অসংখ্য ভেনিজুয়েলার নাগরিক কলম্বিয়া পাড়ি দিচ্ছে। সরকারি তথ্য মতে, সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার ভেনিজুয়েলার মানুষ ইকুয়েডরে যাচ্ছে। মেক্সিকানরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, কখন আমেরিকায় যাবে।

সবক্ষেত্রেই দেখা যায়, জীবনের তাগিদে বেঁচে থাকার সামান্য প্রয়াসের অংশ হিসেবে প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এককালে যাযাবর ছাড়া সহজে কেউ জন্মভূমি ত্যাগ করত না, এখন পৃথিবীর অনেকেই গৃহত্যাগী।

এই মুহূর্তে পৃথিবীব্যাপী অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশু এক অনিশ্চিত মানবেতর জীবনযাপন করছে; যাদের প্রত্যেককে জোরপূর্বক তাদের নিজের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে অথবা অনেকে নিজেই শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করছে।

ইউএনএইচসিআর ৩১ মে ২০১৯-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ নিপীড়ন, সংঘর্ষ, সহিংসতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে ৭০.৮ মিলিয়ন ব্যক্তি জোরপূর্বক বিশ্বব্যাপী স্থানান্তরিত হয়েছে, ২০১৭ সালে তুলনায় যা ছিল ২.৩ মিলিয়ন বেশি এবং এটি ছিল বিশ্বের জোরপূর্বক উদ্বাস্তু জনসংখ্যার সর্বোচ্চ রেকর্ড।

পৃথিবীতে বর্তমানে ২৫.৯ মিলিয়ন শরণার্থী আছে, যাদের মধ্যে অর্ধেক ১৮ বছরের কম বয়সী। অভ্যন্তরীণভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষ ৪১.৩ মিলিয়ন এবং ৩.৫ মিলিয়ন আশ্রয় প্রার্থী।

বর্তমানে নতুন স্থানচ্যুতি খুবই বেশি। একজন ব্যক্তি প্রতি দুই সেকেন্ডে স্থানচ্যুত হয়ে পড়ছে, যা এই বাক্যটি পড়ার থেকে কম সময়। এ যেন চির প্রত্যাশিত ঘটনা; একের পর এক ঘটেই চলেছে।

আলোচ্য ছবিগুলোর দৃশ্য পৃথিবীর নিষ্ঠুর অমানবিক নোংরা দিকটি মানবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে; কোনো ভূমিকা বা অলংকার ছাড়া। ঘুমন্ত, সুপ্ত, নেতিয়ে পড়া মানবিক সত্তাকে নাড়া দিয়েছে বারবার। এই প্রকাশিত সত্যকে মেনে নিতেও বিশ্ব নেতৃত্ব আজ দ্বিধাবিভক্ত।

পৃথিবীর অভিভাবক সংগঠন জাতিসংঘ আজও তেমন কিছুই করতে পারেনি। বিশ্ব নেতৃত্ব সামান্য উষ্মা প্রকাশ করে থেমে যায় আর আত্মবিস্মৃত আমরা সময়ের ব্যবধানে সবকিছু ভুলে যাই।

মানবতার ঊর্ধ্বে যখন ব্যবসায়িক স্বার্থ এসে যায়; তখন এভাবেই মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে ক্যাম্পে বসবাস করে। এভাবে যাদের স্বপ্ন অঙ্কুরোদ্গমের আগেই বিনষ্ট হচ্ছে, তাদের ভারি বোঝা পৃথিবীকেই বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে যুগ যুগ ধরে।

মেহেদী হাসান : শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×