ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বাণিজ্য সমাচার

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুঈদ রহমান

গেল সপ্তাহের প্রায় পুরোটা সময় ধরে যুগান্তরের একটি উল্লেখযোগ্য সংবাদ ছিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনৈতিক নিয়োগ বাণিজ্য। গত ২৮ জুন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে যুগান্তর ছয়টি অডিও ক্লিপ ফাঁস করে। পরবর্তী সময়ে আরও দুটি। এই ফাঁসের ঘটনায় গোটা বিশ্ববিদ্যালয় নড়েচড়ে ওঠে।

চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে দু’জন শিক্ষকের ১৮ লাখ টাকা লেনদেনের ফোনালাপ প্রকাশিত হলে দু’জনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু ২৯ জুন ছাত্রলীগ এক প্রতিবাদ মিছিলে দাবি করে, বরখাস্তকৃত দু’জন শিক্ষকের বাইরেও একজন গডফাদার আছেন, তাকেও বরখাস্ত করতে হবে। যাকে তারা গডফাদার বলছেন তিনি আদতেই গডফাদার কিনা জানি না, তবে ভিসির খাসলোক বলে ক্যাম্পাসে পরিচিত।

অত্যন্ত দাপুটে এবং ভিসির সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ। শোনা যায় ওই অধ্যাপক কুষ্টিয়া থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ক্যাম্পাসে এসে ভিসি মহোদয়কে ঘুম থেকে তুলে নাশতা খাইয়ে রাতে ডিনার করিয়ে ঘুম পাড়িয়ে বাড়ি যান। এমন সার্ভিস দেয়ার মানুষ পাওয়া দায়। যে কারণে ভিসি মহোদয় তার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তাই ছাত্রলীগের দাবি সত্য বলে অনেকের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

বরখাস্তকৃত দু’জন শিক্ষকের একজন হলেন ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ের, অপরজন ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের। তাদের মধ্যে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ের ওই শিক্ষক দ্বিতীয়বারের মতো বরখাস্ত হলেন। বছর তিনেক আগে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের ফোনালাপ ফাঁসের পর সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়েছিলেন, তারপর আবার অদৃশ্য ক্ষমতাবলে বহাল তবিয়তে কাজ করছিলেন। তাই অনেকেরই ধারণা, যেভাবেই হোক এবারও তারা পার পেয়ে যাবেন।

এমনটি ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এমনতর অনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অষ্টম ভিসি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রফিকুল ইসলাম ০৩.০৪.২০০৪ তারিখে ভিসি হিসেবে যোগদান করার পর থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য শুরু হয়েছিল। পরবর্তী দুই বছরে তা এমন মাত্রায় পৌঁছায় যে সর্বশেষ নিয়োগ দেয়ার পর তাকে ২০০৬ সালের জুলাই মাসে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।

দশম ভিসি প্রফেসর ড. এম আলাউদ্দিন ও প্রথম প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন দায়িত্ব পান ০৯.০৩.২০০৯-এ। দু’জনেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধেও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। শেষতক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে তদন্ত কমিটি এসে রিপোর্ট দিলে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই অব্যাহতি পান। ৩১.১২.২০১২ তারিখে একাদশ ভিসি হিসেবে যোগদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের শিক্ষক প্রফেসর ড. আবদুল হাকিম। কিন্তু যে লাউ সেই কদু। তিনিও নিয়োগ বাণিজ্যের বাইরে যেতে পারলেন না। তার বিরুদ্ধেও ইউজিসি তদন্ত করে এবং সরকার সঙ্গত কারণেই মেয়াদ পূর্তির আগেই ৩০.০৬.২০১৬ তারিখে তাকে অব্যাহতি দেয়। বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারী হলেন দ্বাদশ। তিনি ২১.০৮.২০১৬ তারিখে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। বলতে দ্বিধা নেই, তার নিয়োগে গোটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার আশ্বস্ত হয়েছিল। ভেবেছিল, আর যাই হোক অন্তত নিয়োগ বাণিজ্যের দুর্নাম ঘুচবে।

আমি নিজেও তেমনটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু তার সময়েই তৃতীয়বারের মতো অর্থ লেনদেনের গোপন কথা ফাঁস হয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত হল। ব্যক্তিগতভাবে আমি ভীষণ আঘাত পেয়েছি। কারণ আমি দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে কাজ করেছি, সংগঠন করেছি। আর্থিক অসততার কোনো লক্ষণ দেখিনি। এখনও আমি বিশ্বাস করি না প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারী কোনোরকম অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত আছেন। কিন্তু আমার বিশ্বাসটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে একটি কথা ভেবে। একজন বড় দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষের ব্যক্তিগত সততা কতদূর পর্যন্ত কার্যকর? পারিপার্শ্বিক অন্ধকারে ব্যক্তিগত সততা হারিয়ে যেতে পারে নাকি? সেদিক বিবেচনা করে আমার মনে হয়েছে ভিসি মহোদয়কে একটি চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে হবে। অপরাধী যত কাছের মানুষই হোক না কেন, তাকে বিচারের আওতায় এনে কোনো ধরনের অনুকম্পা না দেখিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সেটা করতে যদি কোনো রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত বাধা আসে, হয় তা অতিক্রম করতে হবে নতুবা পদ থেকে সরে আসতে হবে। শিক্ষকতার যে সম্মান তা যদি রক্ষিত না হয় তাহলে কোনো পদই আপনাকে সম্মানিত করতে পারবে না। দীর্ঘদিনের সাথী হিসেবে আমি এ দাবি করতেই পারি।

নিয়োগ বাণিজ্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রধান সমস্যা, তবে তা একমাত্র সমস্যা নয়, আরও সমস্যা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত দেখলে আপনি বলবেন, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’। আশির দশকের শুরুতে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহের একেবারে মাঝখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। কিন্তু এখানে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালুর আগেই বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকার গাজীপুরে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। সেখানে ৪-৫ বছর একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলার পর ১৯৯০ সালে দ্বিতীয় ভিসি প্রফেসর ড. সিরাজুল ইসলামের (মেয়াদকাল ২৮.১২.১৯৮৮ থেকে ১৭.০৬.১৯৯১) হাত ধরে আবার কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহে আগের স্থানে ফিরে আসে।

সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অমুসলিম কোনো শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল না। সিরাজুল ইসলাম স্যার এটাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অমুসলিমদের স্থান করে দিয়েছিলেন। এর জন্য তাকে বড় ধরনের ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল। তৃতীয় ভিসি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আব্দুল হামিদ (মেয়াদকাল ২০.০৬.১৯৯১ থেকে ২১.০৩.১৯৯৫) এসে আরেকটি সমস্যায় পড়লেন। সমস্যাটা হল সমগ্র ক্যাম্পাসটি কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলায় সমানভাবে বিভাজিত। আবাসিক হলগুলো ঝিনাইদহ পুলিশের আওতায় আর প্রশাসনিক ভবনসহ আবাসিক এলাকা কুষ্টিয়া পুলিশের আওতায়। পরে ক্যাম্পাসের আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠন করা হয় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা’ (ইবি থানা), যা কিনা কুষ্টিয়া পুলিশের আওতায়। তারপর সমস্যা হল পোস্টাল কোড কী হবে- কুষ্টিয়া নাকি ঝিনাইদহ।

সেটার সমাধান করা হল কুষ্টিয়া ৭০০৩ করার মাধ্যমে। এভাবেই সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়েছে। কিন্তু একমাত্র সমাধানের বাইরে থেকে গেল ওই নিয়োগ বাণিজ্য। বর্তমান ভিসির আগে যে ১১ জন ভিসি কাজ করেছেন, তারা কেউই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। তাদের মধ্যে ছয়জন অপসারিত হয়েছেন শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে। স্বাভাবিকভাবেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের দিনগুলো সুখকর ছিল না। বলতে পারেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি একটি ‘অতীব ঝুঁকিপূর্ণ’ পদ। সততা, নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতাই পারে এ ‘ঝুঁকি’ কমিয়ে আনতে।

আমার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার বয়স ২৯ বছর। আমার কাছে মনে হয়েছে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৯ সালে একটি ভালো সুযোগ হাতছাড়া করেছে। সে সময়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভ‚ষিত, দুই বাংলার প্রখ্যাত লালন গবেষক ড. আবুল আহসান চৌধুরীর ভিসি হওয়ার কথা শুনেছিলাম। কিন্তু শেষতক সেটি হয়নি। আসলে আমাদের প্রত্যাশা আর সরকারের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই সমার্থক হয় না। আমার বিশ্বাস, ড. আবুল আহসান চৌধুরী সে সময়ে ভিসি হলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। স্যারের ব্যক্তিগত আচার-আচরণের মধ্যে সামন্ত সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে ঠিকই; কিন্তু তার পাণ্ডিত্য, আর্থিক সততা ও সাহস ছিল প্রশ্নাতীত। কুষ্টিয়ার সন্তান হিসেবে যে কোনো ছোটখাটো রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলা করার ক্ষমতা তার ছিল। তিনি বর্তমানে অবসরে গেলেও এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই তাকে সমীহ করে।

ভিসি উপাখ্যানের পর বলতে হবে, এখানকার সরকারদলীয় শিক্ষক রাজনীতি এযাবৎকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ দাবি করলেও কাজকর্ম সবই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা হল ব্যক্তিস্বার্থের জলাঞ্জলি দিয়ে সার্বিক স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু এখানে যেটা চলছে তা হল সার্বিক স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে মরিয়া হয়ে ওঠা। ভিসিকে ঘিরে আছেন গুটিকয় সুবিধাভোগী মানুষ আর ভিসির বিপরীতে আছেন গুটিকয় বঞ্চিত ব্যক্তি।

ব্যস! এর বাইরে কোনো রাজনীতি নেই, নেই কোনো আদর্শ। প্রবীণ শিক্ষকরাই এ দু’দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কাজে আসবে না। বরং অধিকতর বিভাজন তৈরিতে সহায়ক হবে। ভিসি-গ্রুপ, এন্টি-ভিসি গ্রুপের টানাটানিতে নবীন শিক্ষকরা মানসিকভাবে অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে। তারা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করার সাহস পাচ্ছে না বা তাদের কথা বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। বিএনপি-জামায়াত তো এখন মাঠের সম্পূর্ণ বাইরে। সরকারি দলের সমর্থকরা এখন নিজেরাই নিজেদের শত্রু । সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ এখন বিনষ্টের পথে। আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, আগামী ৫ বছরে অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ পাওয়ার কথা। শিক্ষকদের একটি দাপুটে অংশ ইতিমধ্যে ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে দেনদরবার শুরু করে দিয়েছেন। অবস্থাটা ভাবতে পারেন!

এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া দরকার। বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারীর সুযোগ ছিল সবার ভিসি হয়ে ওঠার। যে কারণেই হোক, হয় একটি অন্ধকার বলয় তাকে ঘিরে ফেলেছে, নয়তো তিনি নিজেই বলয়ের ভেতর ঢুকে পড়েছেন। এ থেকে বেরিয়ে এসে নিরপেক্ষতার সঙ্গে প্রশাসনিক কাজ চালিয়ে যেতে হবে। দুর্নীতি আর আর্থিক অনিয়মের বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলতে হবে। এত বেশি রাজনীতি করার কোনো প্রয়োজন নেই। যত মানুষের সমর্থন নিয়ে ভিসি দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন, তিন বছরের মাথায় এসে তা অনেকটা কমে গেছে। এ সত্য তোষামোদকারীরা কখনও বলবে না। কিন্তু আমরা মাঠে থাকা মানুষ খোঁজখবর রাখি। এই চরম সত্যটি তিনি বুঝতে পারবেন চেয়ার ছেড়ে দেয়ার পর। তখন আর কিছুই করার থাকবে না।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়