ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী কিসের ইঙ্গিত করে?

  এ কে এম শামসুদ্দিন ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতে গণপিটুনিতে নিহত মুসলিম যুবক তাবরেজ আনসারি। ছবি-সংগৃহীত
ভারতে গণপিটুনিতে নিহত মুসলিম যুবক তাবরেজ আনসারি। ছবি-সংগৃহীত

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের পূর্বে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তারই যেন প্রতিফলন ঘটে চলেছে সমগ্র ভারতজুড়ে। বিগত কয়েকদিনে দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর যে হারে গণপ্রহার, অত্যাচার এবং মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছে তা দেখে অনেকের ধারণা হয়েছে, উগ্রবাদী হিন্দুরা যেন বিজেপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ উপলক্ষে উৎসব উদযাপন করছে।

এ ধরনের সাম্প্রদায়িক ঘটনা শুধু ভারতেই আলোড়ন সৃষ্টি করেনি, বিশ্বব্যাপী সবার দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছে। বিগত কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোদির প্রথম মেয়াদে যেসব রাজ্যে মুসলমানের ওপর অত্যাচারের ঘটনা ঘটেনি এবার ওইসব রাজ্যতেও একই ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ও মুসলমানের সম্পর্ক অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বরাবর ভালো ছিল। পারস্পরিক সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানে ধর্মীয় গোঁড়ামি কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি; কিন্তু এবারের লোকসভা নির্বাচনের পর মুসলমানের প্রতি উগ্র হিন্দুদের মনোভাবের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।

এ পরিবর্তন যে ঘটবে তা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরই অনুমান করা গিয়েছিল। নির্বাচনের পরপর দৈনিক যুগান্তরে আমার লেখায় আমি হিন্দু উগ্রবাদীদের সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করেছিলাম। আমি আমার লেখায় পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল আসন জয়লাভ করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলাম, ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনের গভীরে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের যে বীজ এতদিন লুকানো ছিল, এবারের নির্বাচনপূর্ব ব্যাপক প্রচারকালে বিজেপি সযত্নে তা বাইরে বের করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কল্পনাতীত সাফল্যের মুখ দেখেছে।’ এবার ৪২ আসনের মধ্যে ১৮টি আসন দখল করে তৃণমূল কংগ্রেসের ঘাড়ের ওপর এখন তারা নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে। এটা শুধু পশ্চিমবঙ্গেই ঘটেনি, ভারতজুড়ে এ ঘটনা ঘটেছে।

সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হল আগে তো তবু গরু জবাই করা কিংবা মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র করে মুসলমানের বিরুদ্ধে নির্মম আচরণ করা হতো। এখন শুধু মুসলমান হওয়ার কারণেই অত্যাচার করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নৃশংস হত্যার শিকারও হতে হচ্ছে।

ইতিমধ্যে এসব অত্যাচারের ভয়াবহ চিত্র বিভিন্ন সংবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা দেখতে পেয়েছি। প্র্রতিদিনই যেন এসব ঘটনা বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নির্মম ঘটনাটি ঘটে গেছে ভারতের পূর্বাঞ্চল প্রদেশ ঝাড়খন্ডে।

১৮ জুন ২৪ বছর বয়সী তাবরেজ আনসারি নামের এক যুবককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে সারারাত কাঠের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করে। তাবরেজের ওপর এ নিষ্ঠুর নির্যাতনের ভিডিও দৃশ্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বিজেপির কিছু লোক কর্তৃক তাবরেজ আনসারিকে দিয়ে জোরজবরদস্তি করে ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘জয় হনুমান’ বলানো হচ্ছে এবং একইসঙ্গে কাঠের লাঠি দিয়ে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করছে।

আশপাশে অনেক মানুষকে দেখা গেলেও তার আর্তচিৎকারে কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। লাঠির আঘাতে আঘাতে তাবরেজ যখন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে, তখন তাকে ‘মোটরসাইকেল চোর’ বানিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন ২২ জুন তাবরেজের মৃত্যু হয়। তাবরেজের ওপর অত্যাচারের এই দৃশ্য ভারত তো বটেই, সমগ্র বিশ্বের বিবেকবান মানুষের মনে দাগ কেটেছে। তাবরেজ আনসারি বড় দুর্ভাগ্য নিয়েই এ পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিলেন।

জন্মের তিন বছরের মাথায় তিনি মা’কে হারান। নয় বছর বয়সে অন্য আরেকটি নির্মম ঘটনার শিকার হয়ে তার পিতার মৃত্যু হয়। তাবরেজের ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, এখন থেকে ১৫ বছর আগে ২০০৪ সালে জামসেদপুরের বাগবেড়া এলাকায় তাবরেজের পিতা মাসকুর আনসারিকেও দাঙ্গাবাজরা পিটিয়ে হত্যা করেছিল।

সে ঘটনায় বাগবেড়া পুলিশ স্টেশনে একটি হত্যা মামলা হলেও সে মামলার কোনো ফলাফল আজও কেউ জানতে পারেনি। উল্লেখ্য, বিজেপি শাসিত ঝাড়খন্ডে গত চার বছরে ১২ জন মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

এযাবৎ এ ধরনের ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িক ঘটনা মূলত ভারতের উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান কিংবা ঝাড়খন্ডে কেন্দ্রীভূত থাকলেও এবারের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আদি উগ্র হিন্দুত্ববাদের নোংরা চেহারা বেরিয়ে পড়েছে। নির্বাচনের পর ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। ঝাড়খন্ডে তাবরেজকে পেটানোর দু’দিনের মধ্যে ২০ জুন হুগলী জেলার এক মাদ্রাসা শিক্ষককেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোয় বাধ্য করতে মারধর করা হয়।

কলকাতার এক টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ বুলেটিনের মাধ্যমে জানা যায়, ছুটি শেষে কর্মস্থল হুগলীতে ফেরার পথে ট্রেনের কামরায় উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠন ‘হিন্দু সংঘতি’র কিছু কর্মী শাহরুখ হাওলাদার নামক মাদ্রাসার শিক্ষকের কাছে যায় এবং মুখে দাড়ি ও মাথায় টুপি দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে দাড়ি কেন রেখেছে ও টুপি কেন পরেছে তাকে জিজ্ঞেস করে। শুধু তাই নয়, মুখে দাড়ি রাখলে এবং মাথায় টুপি পরলে তাকে পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দেওয়া হবে না বলে হুমকিও দেয়।

তারপর তাকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বললে তিনি জয় শ্রীরাম বলতে অস্বীকার করেন। এতে ওরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বেদম মারধর করে। মারধরের এক পর্যায়ে ট্রেনটি যখন পার্ক সার্কাস রেলস্টেশন ক্রস করছিল তখন তারা মাদ্রাসার ওই শিক্ষককে লাথি মেরে স্টেশনের প্লাটফর্মে ফেলে দেয়। এরকম অসংখ্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ভিডিও যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সয়লাব হয়ে আছে।

এসব ঘটনা ভারতের সব মানুষই যে সহজভাবে গ্রহণ করছেন তা কিন্তু নয়। বুদ্ধিদীপ্ত, সুশীল ও প্রগতিশীল বিশিষ্টজনরা এ ব্যাপারে বেশ সরব। কিছু কিছু আইনপ্রণেতাও যে যার বলয়ে সোচ্চার। এদের অধিকাংশই ভারতের ভবিষ্যৎ সামাজিক জীবনব্যবস্থা ও রাজনীতি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত।

পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সমাজতত্ত্ববিধ অভিজিৎ মিত্র হুগলী জেলার মাদ্রাসার শিক্ষকের ওপর ‘হিন্দু সংঘতি’র কর্মীদের ওই ঘৃণ্য ঘটনার পর টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে তার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের ঘটনার তো সবেমাত্র শুরু! যদি এখনই লাগাম ধরা না হয়, তবে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘যেখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে থেকে এসব ঘটনায় মদদ দেয়া হয় সেখানে উগ্র হিন্দুত্বের বহিঃপ্রকাশ তো ঘটবেই। বাংলার সাংস্কৃতি ও রাজনীতির জন্য এসব ঘটনা অশনি সংকেতের ইঙ্গিত বহন করে। এসবের সুদূরপ্রসারী অ্যাফেক্ট আছে। এ ধরনের মানসিকতা সামাজিক সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক সুসম্পর্কের জন্য হুমকিস্বরূপ।’

তিনি আরও একটি আশঙ্কার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘এ ধরনের আঘাত যদি চলতে থাকে, তাহলে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে তখন ধর্মীয় দাঙ্গা লেগে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে।’

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভেতর আস্থা এবং অবিশ্বাস দিন দিন বেড়েই চলেছে। নির্বাচনের পর উত্তরপ্রদেশের মুসলমান অধ্যুষিত একটি এলাকায় বর্তমান সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে পর্যালোচনা করে জানা যায়, আগের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ছবি এখন গ্রামগুলোতে আর দেখা যাচ্ছে না। আগে হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষজন একসঙ্গে বাস করতেন, জন্ম হোক কিংবা মৃত্যু, বিয়ে হোক বা যে কোনো অনুষ্ঠান- একে অন্যকে পাশে পেতেন সবাই।

সর্বধর্ম সমন্বয়ের ঐতিহ্যকে আগলে ধরে বেঁচে থাকতেন মানুষ। কিন্তু বর্তমানে সে ছবি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন পথ চলতে দেখা হলেও কেউ কারও কুশল বিনিময় পর্যন্ত করেন না। এর জন্য বিজেপির ধর্মবিভেদের রাজনীতিই সম্পূর্ণ দায়ী বলে বিজ্ঞজনরা মত দিয়েছেন।

সম্প্রতি প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ও রাজ্যসভার সংসদ সদস্য গোলাম নবী আজাদ সংসদে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে গিয়ে সবার উদ্দেশে বলেন, ‘পুরনো ভারত ফিরিয়ে দিন। সেখানে কোনো হিংসা, বিদ্বেষ, গণপ্রহার ছিল না। এমন ভারত ছিল যেখানে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান পরস্পর একসঙ্গে সুন্দরভাবে বাস করত। যেখানে মুসলিম ও দলিতরা যন্ত্রণা পেলে হিন্দুরা তা অনুভব করত। একে অপরের কষ্টে শরিক হতো। বর্তমান ভারত চাই না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুরা কোনো অবস্থাতেই নিরাপদ নন। আপনারা সবাই মিলে পুরনো সেই ভারতকে ফিরিয়ে দিন।’

আশার কথা, ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন বিশিষ্ট নাগরিকরা সে দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও দেশ গড়ার কাজে মুসলমানের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে চলেছেন। উল্লেখ্য, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানের অবদানের কথা স্মরণ করা তো দূরে থাক, উল্টো বিজেপির অনেক নেতাকে কথায় কথায় ভারতের প্রতি মুসলমানের আনুগত্য নিয়ে কটাক্ষ ও অপপ্রচার চালাতে দেখা যায়।

অথচ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানের রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। একটু লক্ষ করলে বোঝা যায়, সে দেশের নাগরিকদের কাছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানের ভূমিকা ইচ্ছাকৃতভাবেই আড়াল করে রাখা হয়েছে। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর উল্টো চিত্রটিই সবার সামনে তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আমবাগানে এদেশের বিশ্বাসঘাতক বেইমানরা ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ভারতকে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিয়েছিল। ভারতের স্কুলের সরকারি বইয়ে বিশ্বাসঘাতকদের মধ্যে শুধু মীর জাফরের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, ‘জগৎ শেঠ, বাবু কৃষ্ণদেব, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, কান্তিমুদি, নন্দকুমার, গোবিন্দ সিং এদের নাম সম্পূর্ণ উহ্য রাখা হয়েছে।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে ১৭৫৭ সাল থেকে চলতে থাকা মুসলমানের বিক্ষিপ্ত আন্দোলন যখন ১৮৫৭ সালে সর্বভারতীয় মহাবিদ্রোহের রূপ নিল। তখন ভণ্ড ঐতিহাসিকরা সে বিদ্রোহের নাম দিল ‘সিপাহি বিদ্রোহ।’ ১৮৫৭ সালের বিপ্লব দমন করার পর পাইকারি হারে যেভাবে মুসলমানের ওপর ব্রিটিশদের অত্যাচার চলতে থাকে তা ভারতের ইতিহাসের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল এবং ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা পর্যন্ত যেসব মুসলিম বিপ্লবী নেতা-নেত্রীদের জেল, দীপান্তর ও ফাঁসি হয়েছে তাদের নাম ভারতের স্কুল-কলেজের পাঠ্য ইতিহাস বইয়ে পুরোপুরি গোপন রাখা হয়েছে।

বিপ্লবী ফকির মজনু শাহ, হাজী শরীয়তুল্লাহ্ ও তার পুত্র মোহাম্মদ মহসীন, তিতুমীর, মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহসহ আরও শত-সহস্র ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শহীদদের অবদানের কথা ভারতীয় ইতিহাস রচনায় ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাষক, যিনি নিজেও একজন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ সংগ্রামী ছিলেন, সেই শান্তিময় রায় তার ‘ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও মুসলিম অবদান’ বইয়ে লিখেছেন, ‘স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘ভারতীয় মুসলমানদের ভূমিকা’ বিষয়ে বিরাট অজ্ঞতা দেখি। আমাদের সমগ্র প্রজন্মই খ্যাতনামা ব্যক্তিদের লেখা ডাহা মিথ্যা ও ভুল ইতিহাস পাঠ করে বড় হয়েছে।’ শান্তিময় রায়ের এ বিখ্যাত বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে অন্য আরেকজন বিশিষ্ট পণ্ডিত পিসি যোশী লিখেছেন, “সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে কিছু ‘হিন্দু’ ইতিহাসবিদদের মুসলমানের অবদান উপেক্ষা বা তার ভুল ব্যাখ্যা শান্তিময় রায়কে বিচলিত করে। ফলশ্রুতিতে শান্তিময় রায় সত্য উদঘাটনে ‘ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও মুসলিম অবদান’ বইটি লিখতে অনুপ্রাণিত হন।”

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উদ্বেগের অনেক কারণ আছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে যে কোনো প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলায় বাংলাদেশের উচিত হবে নিজেদের প্রস্তুত রাখা। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারা ধীরে ধীরে এমন পরিবেশ তৈরি করছে, যাতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি কর্মসূচি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারে। যদিও নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিশিষ্ট নাগরিকরা প্রথম থেকেই বিরোধিতা করে আসছেন।

তারা বলছেন, নাগরিকপঞ্জি হল বাংলা থেকে বাঙালি উচ্ছেদের এক গভীর ষড়যন্ত্র। উল্লেখ্য, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মোট জনসংখ্যার সাতাশ শতাংশ মানুষ মুসলিম, যাদের অধিকাংশ বিজেপির ধর্মীয় উগ্রবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। তার প্রতিফলনও দেখা গেছে এবারের নির্বাচনে।

বিজেপির বিশ্বাস, নাগরিকপঞ্জি বাস্তবায়ন করা গেলে আদতে তারাই লাভবান হবে আগামী নির্বাচনে। এজন্য তারা এখন থেকেই ‘নাগরিকপঞ্জি মানেই বাঙালি খেদাও নয়’ এমন একটি ধারণা সহজ-সরলমনা মানুষের মনের ভেতর এমনভাবে ঢোকানোর চেষ্টা করছে যেন সহজেই তারা বিজেপির ওপর আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে; যেভাবে তারা এসব মানুষের মনের গভীরে লুকানো সাম্প্রদায়িকতার বীজকে সহজেই বের করে নিয়ে এসেছিল নির্বাচনী প্রচারকালে। এর ফলও তারা পেয়েছে।

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সাফল্যজনকভাবে নাগরিকপঞ্জি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ দ্বিমুখী চাপে পড়ে যেতে পারে। সবারই জানা আছে আসামে নাগরিকপঞ্জির মাধ্যমে এরই মধ্যে ৪০ লাখ বাঙালিকে নাগরিক অধিকারশূন্য করে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ২৬ জুন আবারও আসামে নাগরিকপঞ্জির অতিরিক্ত খসড়া তালিকায় ৪০ লাখ মানুষের সঙ্গে আরও লক্ষাধিক বাঙালির ভাগ্য সংযুক্ত হয়েছে।

অতএব পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনৈতিক ভিতকে যদি আরও শক্ত করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চাপ সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। রোহিঙ্গা সংকট এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×