অসুস্থ প্রতিযোগিতার নানা গল্প

  সাইফুর রহমান ০৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশু

আজকাল আমরা যেন অসুস্থ প্রতিযোগিতা খাবি খাচ্ছি সর্বত্র। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো এটা আমরা না বুঝেই করছি। জলের মাছকে ডাঙায় তুললে যেমন খাবি খেতে খেতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, অনেকটা সেরকম। মৎস্যকুল ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, মাছ খাবি খাওয়ার সময় হয়তো বুঝতে পারে তার মৃত্যু আসন্ন।

আমরা হয়তো সেটাও বুঝতে পারি না। বিষয়গুলো একটু স্থিরদৃষ্টি দিয়ে কিংবা ভালো করে খেয়াল না করলে টের পাওয়ার উপায় নেই। আমার একমাত্র কন্যার বয়স পাঁচ বছর। ওকে ভর্তি করে দিয়েছি একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে।

ওর মা তার ডাক্তারি পেশাটিকে আপাতত নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়ে আমাদের পুত্র-কন্যাদের গড়ে তোলায় ব্যস্ত। স্কুল থেকে প্রতিনিয়ত আনা-নেয়ার কাজটি দীর্ঘদিন ধরে ও-ই সুচারুরূপে সম্পন্ন করে আসছে।

আমার স্ত্রীর মুখেই কথাগুলো শুনলাম একদিন। স্কুলের পাশে অভিভাবকদের অপেক্ষা করার জন্য অভিভাবক ছাউনির মতো একটি অভ্যর্থনা কক্ষ থাকে। যেখানে বসে অভিভাবকরা তাদের ছেলে-মেয়েদের ছুটির জন্য সাধারণত অপেক্ষা করেন।

বাদবাকি সময় মেতে থাকেন নানারকম মুখরোচক গালগল্পে। জনৈক অভিভাবক মহিলা অন্য একজনকে উদ্দেশ করে বলছেন- আরে আপা শোনেন- আশ্চর্যের বিষয়! হয়েছে কী জানেন, আমার মেয়ে তো এখনও ভালো করে বাংলাই বলতে পারে না।

অথচ দেখেন ইংরেজিটা কেমন গটগট করে বলে যায়। মেয়ের ইংরেজি শুনে বোঝার উপায় নেই যে আসলে কোনো ইংরেজ কথা বলছে নাকি কোনো বাঙালি। দ্বিতীয় অভিভাবক- আরে আপা কী বলেন! আমার মেয়েরও তো সেই একই অবস্থা।

আপনার মেয়ে তো তাও দু-চারটা কথা বাংলায় বলে। আমার মেয়ে তো তাও নয়। গর্বে বুকটা ভরে যায় তাই না? ওদের বয়সে আমরা কি এক লাইনও ইংরেজি বলতে পারতাম, বলেন, তাই না? বউয়ের মুখে এসব শুনে আমি বললাম, তোমার কথায় আমি এতটুকু অবাক হচ্ছি না।

বিচিত্র সব চরিত্রের অধিকারী বাংলাদেশের মানুষ। পৃথিবীতে এমন আরেকটি দেশ ও জাতি খুঁজে পাবে না, যারা মাতৃভাষা না জানার জন্য গর্ববোধ করতে পারে। ইংল্যান্ড-আমেরিকায় তো চাষাভুষারাও ইংরেজিতে কথা বলে। তাতে আর এমন কী আসে যায়।

বরং এসব অভিভাবককে বলা উচিত ছিল- দেখেন আপা, আমার এতটুকু মেয়ে অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেকটাই ওর আয়ত্তে। অনেকের শিশুবয়স থেকেই জ্ঞানের স্ফুরণ ঘটে। এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রত্যেক পিতা-মাতার কর্তব্য হচ্ছে, সেই শিশুকে ঠিক পথে পরিচালিত করা।

কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তিন বছর বয়সে মামাবাড়ি বেড়াতে এসেছেন কলকাতায়। এসেই অসুখ। কলকাতায় তখন মশা-মাছির প্রবল উপদ্রব। সেটা দেখেই বালক ঈশ্বরচন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেলেছিলেন একটি ছড়া যা পরবর্তীকালে কিংবদন্তিতুল্য হয়েছিল- রাতে মশা, দিনে মাছি- এই নিয়ে কলকাতায় আছি। বিদেশি ভাষা রপ্ত করা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তবে তা নিয়ে আদিখ্যেতা করা দৃষ্টিকটু। বিখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিলও মাত্র তিন বছর বয়সে গ্রিক ভাষাটি আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। মিল যে শুধু একটি বিদেশি ভাষাই শিখেছিলেন তা নয়; সেই সঙ্গে তিনি পড়তে শুরু করেছিলেন ইংল্যান্ডের ইতিহাস, শিল্প ও সাহিত্য।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জেরেমি বেন্থাম ছোটবেলায় প্রতিভাসম্পন্ন বালক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিন বছর বয়সেই নাকি তার পিতার পড়ার টেবিলে স্তূপকৃত ইংল্যান্ডের ইতিহাসের বিশাল বিশাল ভল্যুম খুলে খুলে পড়তেন। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে শিখতে শুরু করেছিলেন পৃথিবীর জটিলতম ল্যাটিন ভাষা।

যা হোক, আমার স্ত্রী কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমার কাছে জানতে চাইলেন এরকম আদিখ্যেতার কারণ কী? আমি বললাম, এর কারণ সম্ভবত দুটি। হীনম্মন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতা। আমার স্ত্রী বললেন, হীনম্মন্যতা তো বুঝলাম কিন্তু ইনসিকিউরিটি অনুভব করবে কেন?

আমি বললাম, ভালো করে খেয়াল করে দেখলে দেখবে এসব লোকজনের বেশিরভাগই নব্য ধনিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যে কোনো পথে হাতে কিছু কাঁচা টাকা হয়তো এসেছে। একজন মানুষের টাকা অর্জন করাটাই শেষ কথা নয়। ওটা অর্জনের পর প্রয়োজন সম্মান, স্ট্যাটাস ইত্যাদি।

নিজেরা স্কুল-কলেজে হয়তো পড়ার সুযোগ তেমন একটা পায়নি কিংবা ইচ্ছা করেই লেখাপড়া করেনি; কিন্তু এখন টাকার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তাটাও প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে তোমাকে একটা মজার গল্প শোনাই। বাংলাদেশের সচিবালয়ে যদি কখনও যাও তবে দেখবে ওখানে একটি অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু আছে।

উচ্চপদস্থ একজন আমলা অপেক্ষাকৃত নিুপদস্থ আমলাকে তুমি বলে সম্বোধন করে। এর মূলেও কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা। বলা হয়ে থাকে এই উপমহাদেশে এই অপসংস্কৃতির গোড়াপত্তন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

তার বেশকিছু গুণ থাকলেও একটি বদাভ্যাস ছিল। তিনি কাউকে আপনি করে বলতে পারতেন না। সবাইকে সম্বোধন করতেন তুমি বলে। যেখানে শিষ্টাচারে বাধে সেখানে কথাবার্তা চালাতেন ভাববাচ্যে। এর কারণ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে জানা যায়, ডা. বিধান রায় রাজনীতি ভালো বুঝলেও সিভিল ব্যুরোক্রেসি সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল সীমিত।

আর এ জন্য বড় বড় আমলাকে কাবু ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের সবাইকে তিনি তুমি করে বলতেন। এ জন্য ডা. বিধান রায়ের সঙ্গে বড় বড় আইএস অফিসারের মনোমালিন্যেরও সৃষ্টি হয়েছিল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিধান রায় এমন কোনো রাজা মহারাজা, নবাব-জমিদার বংশে জন্মাননি।

জন্মেছিলেন সাধারণ এক পরিবারে। তারপরও এ বদাভ্যাসটি জীবনে তিনি কখনও বদলাতে পারেননি। ধীরে ধীরে তার এ তুমি বলাটাই অতীব এক দৃষ্টিনিন্দিত অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়।

দৈবাৎ যদি কখনও আমার খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় আমি বিছানায় শুয়ে না থেকে একটু হাঁটাহাঁটি করি। সূর্য ওঠার আগে প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ দেখতে আমার বেশ ভালো লাগে। নিকুঞ্জ ১-এর দিকটায় গাছপালাসমেত একটি প্রসন্ন ছায়াচ্ছন্ন পরিবেশ। তো হয়েছে কী, একদিন হেঁটে হেঁটে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে ফুটপাতে বসে জিরোচ্ছিলাম।

পাশে দু-তিনজন অশীতিপর বৃদ্ধ কথা বলছিলেন- জানেন ভাই, আমার শরীরে তো নানারকম ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র, হাড়ে হাড়ে ব্যথা ইত্যাদি। পাশে বসা দ্বিতীয় বৃদ্ধলোকটি বললেন, আরে ভাই, আপনার তো উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র, হাড়গোড়ে ব্যথা। আমার তো এগুলো আছেই। সঙ্গে কিডনির সমস্যা, পোস্ট্রেট জটিলতা ইত্যাদি।

তৃতীয় লোকটি উল্লিখিত সব রোগের নাম তো বললেনই, সঙ্গে যুক্ত করলেন আরও দু-চারটি নতুন রোগের নাম। আমি মনে মনে ভাবলাম হায় খোদা! শরীরের রোগবালাই নিয়েও প্রতিযোগিতা! শিল্প-সংস্কৃতিতেও অসম প্রতিযোগিতা চলছে নির্বিঘ্নে। ঈদ উৎসবটি এলেই টিভি চ্যানেলগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে কে কতগুলো নাটক দেখাবে।

গুণগতমানের দিকে তাদের কোনো খেয়াল নেই। দেখে খুবই বিস্মিত হতে হয় যে, আমাদের দেশে মানসম্পন্ন নাটক রচিত হয় হাতেগোনা দু-চারটি। দেখে মনে হয় যেন নাটক নির্মাতাদের কোনো দায় নেই দর্শকদের প্রতি। নেই কোনো ভালো চিত্রনাট্য কিংবা দিকনির্দেশনা। নাটকগুলো প্রায় সবই বিকৃত আঞ্চলিক ভাষা ও ভাঁড়ামিতে পূর্ণ।

একটি ভালো নাটকের জন্য প্রচুর গবেষণা ও শ্রম দিতে হয়। এর একটি উদাহরণ দিচ্ছি। প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ১৯৭৭ সালের দিকে যখন ‘শতরঞ্জ কা খিলাড়ি’ চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছিলেন, তার ছবিটিতে একটি দৃশ্য ছিল নলগড়গড়ায় আগুন ধরানো। শতরঞ্জ কা খিলাড়ির প্রেক্ষাপট ১৮৫০ সাল।

সত্যজিৎ রায় এ দৃশ্যটি ধারণ করতে গিয়ে খুব চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। কারণ ১৮৫০ সালের দিকে হুঁকায় আগুন ধরানোর জন্য কী ব্যবহার হতো- দেশলাই না কি জ্বলন্ত মালসার টিকে। শুধু এই একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য দৃশ্য ধারণ করার জন্য সত্যজিৎ রায় ছয় মাস গবেষণা করেছিলেন। কবে ভারতবর্ষে প্রথম দেশলাই চালু হয় ইত্যাদি।

এ ব্যাপারগুলো নিয়ে তিনি অনেক কাগজপত্রও ঘেঁটেছিলেন। এই উপমহাদেশে প্রথম দেশলাই চালু হয় ১৮৫৮ কিংবা ১৮৬০ সালের দিকে। তবুও সত্যজিৎ তার শতরঞ্জ কা খিলাড়িতে দেখিয়েছেন যে, যখন জেনারেল উটরামকে ওয়াজিদ আলি শাহ দেখা করার জন্য ডেকে পাঠান তখন তিনি সামনে গড়গড়া থেকে জ্বলন্ত টিকে চিমটে করে তুলে তার সিগার ধরালেন।

সত্যজিৎ বাবুর মালসায় টিকে দিয়ে সিগার ধরানোর ব্যাপারটি এসেছিল ১৮৫৬-৬০-এর মধ্যে ছাপা জিএফ অ্যাটকিনসের ‘কারি অ্যান্ড রাইস’-এর ডেকচিপুর শহরের ‘আওয়ার প্যাড্রি’ ছবিটি দেখে।

এ ছবিটিতে দেখা যায় যে, পাদরি সাহেবকে একজন চাকর পেছন থেকে কোট পরিয়ে দিচ্ছে আর তিনি সামনে আর একজন চাকরের হাতে ধরা টিকের মালসা থেকে সিগার ধরিয়ে নিচ্ছেন।

দর্শকদের প্রতি কতটা নিষ্ঠাবান হলে একজন পরিচালক ছয় মাস শ্রম দেন শুধু একটি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য আবিষ্কারের জন্য। এ জন্যই সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকরা ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছেন।

সাইফুর রহমান : গল্পকার, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×