স্বদেশ ভাবনা

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

  আবদুল লতিফ মন্ডল ১০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দের তুলনায় ৯ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা বেশি।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বাজেট বক্তৃতা (২০১৯-২০) অনুযায়ী বরাদ্দকৃত অর্থ চলতি অর্থবছরের সার্বিক বাজেটের ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। নানাবিধ কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এ যাবৎ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি। এসব কারণ পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

চলতি অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ভাতাভোগীদের সংখ্যা নির্ধারণে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় যে প্রস্তাব রেখেছেন তা হল- ক. বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে ৪৪ লাখে বৃদ্ধি করা; খ. বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতাভোগীর সংখ্যা ১৪ লাখ থেকে ১৭ লাখে বৃদ্ধি করা; গ. অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ ৪৫ হাজারে বৃদ্ধি করা; ঘ. প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তির সংখ্যা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখে বৃদ্ধি করা; ঙ. সব হিজড়াকে অন্তর্ভুক্ত করে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ৬০ হাজারে উন্নীত করা; ঙ. বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উপকারভোগীর সংখ্যা ৬৪ হাজার থেকে ৮৪ হাজারে বৃদ্ধি করা; চ. ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজারে উন্নীত করা; ছ. চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজারে বৃদ্ধি করা; জ. দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগীর সংখ্যা ৭ লাখ থেকে ৭ লাখ ৭০ হাজারে বৃদ্ধি করা; ঝ. কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তার আওতায় ভাতাভোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ৭৫ হাজারে বৃদ্ধি করা।

সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দারিদ্র্য হ্রাসে একটি কার্যকর উপায় হিসেবে স্বীকৃত। ২০১৫ সালে প্রণীত ‘ন্যাশনাল সোস্যাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি (এনএসএসএস) অব বাংলাদেশ’ বা বাংলাদেশ জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রে’ জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতার আলোকে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ক. চরম দরিদ্র-হতদরিদ্র এবং অধিক ঝুঁকিগ্রস্ত জনগণ, বিশেষত মা ও শিশু, কিশোর, যুব, কর্মজীবী, প্রবীণ এবং শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের পরিধি সম্প্র্রসারণ; খ. অতি ঝুঁকিগ্রস্ত নারীদের, বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন আয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান এবং শ্রমবাজারে তাদের প্রবেশ সহজ করা; গ. নগরকেন্দ্রিক জনগণ ও সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারণ করা; ঘ. দুর্যোগ মোকাবেলায় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেন কার্যকর সহায়তা প্রদান করে, তা নিশ্চিত করা; ঙ. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মকাণ্ড সম্পর্কে উপকারভোগীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাবনাময় অবদানকারীদের উদ্বুদ্ধ করা।

জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব। এনএসএসএসে বলা হয়েছে, ২০১৬-২০ সময়কালের জন্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে ২ লাখ ২৩ হাজার ২২০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।

সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এবং বিভিন্ন চাহিদার প্রতিযোগিতায় বাজেটে সে পরিমাণ অর্থের বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাবেন প্রায় ৮৯ লাখ মানুষ, যা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের এক-চতুর্থাংশেরও কম।

দুই. সুষ্ঠু বাস্তবায়নের অভাবে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ড থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সরকারের এক ডজনের বেশি মন্ত্রণালয় এবং তাদের অধীন সমসংখ্যক বা তার বেশি সংস্থা।

মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকলেও এত মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক।

তিন. ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অব্যবহিত আগের মেয়াদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন এবং কাউন্সিলর/সদস্য পদে অলিখিতভাবে মনোনয়ন প্রদানের ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে দলীয়করণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। উপকারভোগী নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

তারা ভোট ও ভোটারের চিন্তা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি মাথায় রেখে উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করে আসছেন। ফলে উপযুক্ত ব্যক্তিরা সহায়তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে চলেছেন।

সমাপ্ত ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-২০১৫) বলা হয়, ভিজিডি কর্মসূচির ২৭ শতাংশ উপকারভোগী দরিদ্র নন। প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে বৃত্তির সুবিধাপ্রাপ্তদের প্রায় ৪৭ শতাংশ দরিদ্র নয় এবং তাদেরকে ত্রুটিপূর্ণ স্বেচ্ছাচারী নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে ছাত্রীদের বৃত্তির প্রায় ২০-৪০ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায় না।

চার. দুর্নীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয় হয়েছে। কাবিখা, টিআর, ভিজিডি, ভিজিএফ ইত্যাদি কর্মসূচিতে দুর্নীতির খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অনেক মন্ত্রীকে এসব কর্মসূচিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে।

পাঁচ. গত এক দশক ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগতভাবে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সেই হারে কমেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ (২০১৬) মোতাবেক দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় পৌনে চার কোটি। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস।

দশ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষিতে ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারের তুলনায় বর্তমানে কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশের সামান্য উপরে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার ২০১৯-২০ সালের বাজেট বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন, গত এক দশকে কৃষি খাতে গড় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ প্রবৃদ্ধি হার ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি হারের প্রায় অর্ধেক। খ. বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দেশে বেকারত্ব হার, বিশেষ করে যুব বেকারত্বের হারে উল্লম্ফন ঘটেছে।

আইএলও’র হিসাব অনুযায়ী যুব বেকারত্বের হার ২০১০ সালের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গ. দেশে প্রশাসনিক বিভাগগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য হারের বিভিন্নতা।

বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে যখন দারিদ্র্যের হার ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ, তখন ঢাকা বিভাগে দারিদ্র্যের হার ১৬ দশমিক শূন্য শতাংশ। আর সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ১৬ দশমিক ২ এবং ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ঘ. জিডিপির আকার ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য বেড়েছে বৈ কমেনি।

বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারে আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। বিপরীতে একই সময় সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়, যা ২০১০ সালে ছিল ১ হাজার ৭৯১ টাকা। ফলে দারিদ্র্য হার হ্রাসের গতি মন্থর হয়ে পড়েছে।

সবশেষে যা বলা দরকার তা হল, দেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানে পরিচালিত হয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এ কর্মসূচি থেকে কাক্সিক্ষত ফল পেতে যা প্রয়োজন তা হল কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন।

এ জন্য যা প্রয়োজন তা হল- ক. কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা; খ. মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে সমন্বয় জোরদার করা; গ. দুর্নীতি দূর করা; ঘ. উপকারভোগী বাছাইয়ে দলীয়করণ বন্ধ করা; এবং ঙ. দারিদ্র্য হ্রাসের নিুগতিকে ঊর্ধ্বমুখী করা।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×