উদারবাদ সম্পর্কে পুতিন যা বলেন

  স্টিফেন হোমস ১০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি ফিনান্সিয়াল টাইমসকে (যুক্তরাজ্য) বলেছেন, ‘উদারবাদ (লিবারেল) মতবাদটি সেকেলে হয়ে পড়েছে’, যার মধ্য দিয়ে একটি যুক্তি খণ্ডনের চেষ্টা করা হয়েছে।

উসকানি মনোযোগ আকর্ষণ করে; কিন্তু ওই ধরনের মনোযোগ নয় যা সে নিজে গ্রহণ করেছে। স্বীকার করে নিতে হয়, পুতিনের মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিবৃতি থেকে কম হাস্যকর। লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ফ্রান্সিসকোতে ট্রাম্প ‘উদারবাদ’কে ‘যা কিছু ঘটছে’র সমতুল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন।

কিন্তু পুতিন আরও জোর দিয়ে বলেছেন, রাশিয়া ব্রিটেন থেকেও বেশি গণতান্ত্রিক। অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার তার দাবি এমন সরস যে একে সিরিয়াস হিসেবে নেয়ার দরকার নেই।

এর মধ্যে রয়েছে পুতিনের এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব যে, উদারবাদ একেবারে সেকেলে ও পুরনো মতবাদ। অবশ্যই, তার মনোবাসনা হল উদার পাশ্চাত্য বর্তমানে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবমাননাকর ভাগ্য ভাগাভাগি করছে, যাতে অভিলাষী চিন্তার প্রতিবিম্ব বা প্রতিশোধের একটি কল্পরাজ্য দেখা যাচ্ছে।

তারপরও যে বিষয়টি প্রশ্ন তোলার দাবি রাখে তা হল, কেন পুতিন ‘উদারবাদ মতবাদ’কে সেকেলে দর্শন হিসেবে ব্যঙ্গ করেছেন, যে মতবাদ ধর্ষণ-নিপীড়নের শিকার অভিবাসীদের সযত্নে লালন-পালনকে উৎসাহিত করে এবং শিশুদের ওপর নানামুখী লৈঙ্গিক ভূমিকা আরোপ করে। তিনি বলছেন, ‘বহু সংস্কৃতিবাদ’ দীর্ঘমেয়াদে আর ‘বাস্তবভিত্তিক’ নয়, কারণ এটি উদার-গণতান্ত্রিক সমাজগুলোতে ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বার্থগুলো’র সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে।

এই অদ্ভুত-অস্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি কী তথ্য দেয়? সবচেয়ে সহজ উত্তর হল, পুতিন উগ্র ডানপন্থী স্বদেশিদের আলোচিত পয়েন্টগুলোকে পুনর্ব্যবহার করছেন, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা রাজনীতি নিয়ে বিরক্ত হয়ে পড়েছে। প

শ্চিমাদের চোখে খোঁচা মারার জন্য এটি কেবল মজা পাওয়ার কোনো পদ্ধতি নয়। পুতিন ভালো করেই জানেন, হারানো একক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারে স্বদেশিদের প্রতিজ্ঞা হচ্ছে রাজনৈতিক দুর্বলতার একটি রেসিপি, এমনকি আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে নাগরিক সহিংসতার জন্যও এটি একটি চমকপ্রদ বিষয়। ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রশ্নে পুতিনের অন্য জবাবগুলো তেমন উল্লেখ করার মতো ছিল না।

তার পর্যবেক্ষণ- বিশ্বায়ন পশ্চিমা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পক্ষে নয়- খুব একটা বাস্তবভিত্তিক নয়। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভুয়া সংবাদ প্রচারের সুবিধা দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ না করলেও এটি কোনো গোপন বিষয় নয় যে, চীনের অর্থনৈতিক মিরাকলের মধ্য দিয়ে উদারবাদের খ্যাতি বিবর্ণ হয়ে গেছে। ট্রাম্পের মতো অভিবাসনবিরোধী স্বদেশবাদী রাজনীতিকরা উদারবাদের দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন অর্থনৈতিকভাবে হতাশ মানুষদের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ক্ষোভকে ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠিত এলিটদের প্রতি বিদ্বেষ উসকে দেয়ার মধ্য দিয়ে।

তবে ট্রাম্পের মতো না হলেও পুতিন জানেন যে, প্রথাগত উদারবাদকে ‘রাজনৈতিক শুদ্ধতা’ এবং ‘উন্মুক্ত সীমান্তে’ নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। তিনি উদারবাদের বৃহৎ গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে পরিপূর্ণ অবগত, যাতে অন্তর্ভুক্ত আছে নির্যাতনের বিলোপ সাধন, সামরিক বাহিনীর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সরকারি দুর্নীতি ও অযোগ্যতা উন্মোচনে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাস্তবতা ও বিতর্ক সাপেক্ষে করা, যাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা থাকতে পারে।

উদারবাদ সম্পর্কে পুতিনের আরও গভীর অনুধাবন স্পষ্ট হয় যখন তিনি স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে এর প্রভুত্ববাদী কর্তৃত্বের বিষয়ে অভিযোগ তোলেন। বেশিরভাগ সোভিয়েত-পরবর্তী নেতাদের মতো তিনি এ অবমাননাকর আইডিয়া সম্পর্কে বিরক্ত ছিলেন যে, সব অপশ্চিমা দেশের উচিত পশ্চিমা উদারবাদকে গ্রহণ করা এবং নিজেদের অভিযুক্ত অনুত্তম প্রথা বাতিল করে দেয়া।

ফিনান্সিয়াল টাইমসের সাক্ষাৎকারে পুতিন বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে, পশ্চিমারা ‘চাইতে পারেন লিবিয়ার মতো একটি অঞ্চলেও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো মানের গণতন্ত্র থাকবে।’ তার মতে, ‘উদারবাদী কর্তৃত্বে’র অর্থ হল ‘গণতন্ত্র প্রবর্তন’- যা ‘সরকার পরিবর্তনে’র প্রতিশব্দ বৈ কিছুই নয়। এখানে তার উপহাসে লৈঙ্গিক বহুত্ববাদ ও অভিবাসীদের অপরাধের সঙ্গে উদারবাদের সখ্য সম্পর্কে কিছু নেই। উদারবাদী ধারণার বিরুদ্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে যে কেউ এক নজরে নালিশ করতে পারেন।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মতো একনায়কদের রক্ষা করার পক্ষে পুতিন। তাদের সরানোর মতো বিষয়টিকে তিনি দেখেন পশ্চিমা অনধিকার প্রবেশ হিসেবে, কারণ তিনি নিজেও তার অনিশ্চিত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত রকমের উদ্বিগ্ন। তিনি দীর্ঘসময় ধরে বিশ্বাস করতেন, যুক্তরাষ্ট্র (ট্রাম্পের আগ পর্যন্ত) গণতন্ত্র এগিয়ে নেয়ার আড়ালে তাকে ক্রেমলিন থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র করেছে।

তবে উদারবাদ বিষয়ে পুতিনের মন্তব্যগুলো প্রকৃতপক্ষে ‘উদার মতবাদের’ বর্তমান ভঙ্গুরতা সম্পর্কে। যদিও ট্রাম্প পশ্চিমা মিত্রদের দুর্বল করে ফেলেছেন এবং গণতন্ত্র সম্প্রসারণের অভিযান বাতিল করেছেন, যেমনটি ক্রেমলিন আশা করত।

আরও এগিয়ে গিয়ে তিনি গণতন্ত্রকে পুরো মাত্রায় অপবিত্রকরণের জন্য একটি প্রকল্প নিয়েছেন দেশে-বিদেশে। আপাত বিরোধী হলেও গণতন্ত্র ও উদারবাদের বৈশ্বিক প্রসারে মার্কিন স্বার্থ শেষ হয়ে যাওয়া পুতিনের নিজস্ব অবস্থানের জন্যও একটি হুমকি তৈরি করছে। পুতিনের অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতার বেশির ভাগ আসে এ বাস্তবতা থেকে যে, তিনি সাহসিকতার সঙ্গে পশ্চিমা ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। কিন্তু একদা পশ্চিমারা শক্তভাবে দাঁড়াত এমন বিষয়গুলো যখন ট্রাম্প ত্যাগ করেছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কার্ড তার রাজনৈতিক যৌক্তিকতা হারিয়েছে।

বস্তুত, যুক্তরাষ্ট্রে খোলাখুলিভাবে রাশিয়াবিরোধী প্রশাসন না থাকা হতে পারে পুতিনের অভ্যন্তরীণ সমর্থন দ্রুত কমে যাওয়ার একটি কারণ। ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারের শেষের দিকে এ সংক্রান্ত তার ভয়ের বিষয়টিও প্রকাশ পেয়েছে, যখন তিনি উদারবাদের মৃত্যুদণ্ডের পথে হেঁটেছেন এবং স্বীকার করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে উদারবাদের জন্য কিছুটা সমর্থনেরও প্রয়োজন রয়েছে।

যদিও তার ডিগবাজি দেয়া চেহারা একেবারে তার দাবির বিপরীত আওয়াজ দিয়েছে যে, উদারবাদের ‘বহির্গমন পথ’ রয়েছে। এটি হল এমন একজন নেতাকে ধরে রাখা যিনি খোলামেলাভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পদ্ধতিকে ট্রাম্পের ‘অধৈর্য’ ও ‘বেপরোয়া’ নিয়ম থেকে রক্ষা করতে চান। কিন্তু উদারবাদী বিশ্বব্যবস্থার জন্য পুতিনের অপ্রত্যাশিত নস্টালজিয়ার মাঝে আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রতি তার দুঃখ প্রকাশ লক্ষণীয়।

যেখানে ‘সরকার পরিবর্তনে’ যুক্তরাষ্ট্রের বিরামহীন প্রতিশ্রুতি এখনও বিতর্কের বিষয় এবং অগণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য পারমাণবিক নিবৃত্তকরণ গ্রহণের প্রাথমিক আগ্রহ বিদ্যমান, সেখানে পুতিন এখন স্বীকার করছেন যে, সব ধরনের বহুপাক্ষিকতা থেকে ট্রাম্পের সরে যাওয়ার সমান ও বিপরীত বিপদ রয়েছে।

ইউরোপ বা এশিয়ায় নিজের প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে আরও বেশি দেশ অনুভব করবে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তাদের পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়া দরকার। উদারবাদ-পরবর্তী অনিশ্চিত ও ক্রমবর্ধমান অবাধ্য বিশ্বে অনুদারবাদী স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোও এ থেকে বের হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

স্টিফেন হোমস : নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র অধ্যাপক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×