জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন

  চয়ন সেন গুপ্ত ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জনসংখ্যা

আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। বাংলাদেশ এ দিনটিকে বিশেষ মর্যাদা সহকারে উদযাপন করে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত পরিবার গঠনে আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা উন্নয়ন সংস্থার পরামর্শ ও প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং নিজস্ব অভিজ্ঞানে বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে রোল মডেল। এ অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে অনেক কথা।

১৯৯৪ থেকে ২০১৯ সাল। টানা ২৫ বছর। ব্যাপক-বিস্তৃত প্যারাডাইম নিয়ে মিসরের কায়রো থেকে কেনিয়ার নাইরোবিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের ভিশন ও মিশন ঠিক হয়।

এরও আগে ষাটের দশকের শেষদিকে তেহরান ঘোষণায় পরিকল্পিত পরিবার গঠন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আসে মানবাধিকারের বিশাল স্বীকৃতি। প্রাকৃতিক ও বিশ্ব জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষায় সেই সচেতন সিদ্ধান্তে দেখা যায় জোর করে নয়, বরং নিজের সন্তান নেয়ার নিজের পছন্দসই পদক্ষেপ।

২৫ বছর আগে কায়রো আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা উন্নয়ন সম্মেলনের বার্তাটিতে ছিল জনসংখ্যা উন্নয়নের সঙ্গে ব্যক্তিক মঙ্গল চেতনার সম্পর্কের কথা। নারীর ক্ষমতায়ন, জেন্ডার সমতা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবারে সহিষ্ণু সুন্দর পরিবেশে নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সহযোগিতা করা এবং বাল্যবিয়ে রোধ।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে বিশেষভাবে যৌনবাহিত রোগের চিকিৎসা, বন্ধ্যত্ব সেবা, নিরাপদ গর্ভবতী সেবা, এএনসি ও পিএনসি সেবা, আইনসিদ্ধ নিরাপদ অ্যাবরশন সংক্রান্ত সেবা, সুস্থ প্রজনন স্বাস্থ্যে দায়িত্ববান পিতৃত্ব ইত্যাদি সেবাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কাজগুলোই হল আইসিপিডির পাওয়ার অব অ্যাকশন। এ অ্যাকশন হল সারা দুনিয়ায় সসম্মানে নারীর সেক্সুয়াল ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার মানবিক অধিকার।

২৫ বছর পর ২০১৯ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে আইসিপিডির বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিতে ধ্বনিত হল নারীর অধিকার ও উন্নয়নে মানবাধিকার ও নিজস্ব পছন্দের কথা। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির সূচক পূরণ এবং মানুষের কল্যাণেই আইসিপিডির এ আহ্বান।

জাতিসংঘের ইউএনএফপিএসহ তার সহযোগী সদস্য দেশগুলোকে জানানো হল মাত্র তিনটি জিরোর (০) কথা : ১. জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর কোনো অপূর্ণ চাহিদা থাকবে না। ২. নিরাময়যোগ্য কোনো মাতৃমৃত্যু হবে না। বাল্যবিয়ে বন্ধ। ৩. নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে কোনো সহিংস ও অমানবিক আচরণ থাকবে না। যেন সবাই সেই পৃথিবীকে ধারণ করে, যেখানে রবে যার যার পছন্দসই অধিকার ও শান্তি।

চলতি বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় আইসিপিডির নাইরোবি শীর্ষ সম্মেলনে পাঁচটি আলোচ্য বিষয় এবং পাঁচটি ত্বরান্বিত কৌশলকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ পাঁচ প্রসঙ্গ (টপিকস্) হল- ১. সেক্সুয়াল প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বাস্তবায়নে অর্থায়ন করা, ২. পরিবার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও মাতৃমৃত্যু রোধ, ৩. ক্ষতিকর ও সহিংসতার কুঅভ্যাস বর্জন, ৪. জনমিতিক বৈভব ও টেকসই উন্নয়ন অর্জন এবং ৫. সেক্সুয়াল ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় অধিকার প্রতিষ্ঠা। এর পাঁচটি অ্যাকসিলেটর হল- ১. রাজনৈতিক ও জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব বিকাশ, ২. তরুণদের অংশগ্রহণমূলক ক্ষমতায়ন, ৩. জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, ৪. তথ্যবহুল ডাটা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম, ৫. প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণ।

উপর্যুক্ত পাঁচটি টপিক্স ও পাঁচটি ত্বরান্বক মিলে একত্রে হবে ৫x৫=২৫ বা আইসিপিডির ২৫ বছর।

এ হল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নে বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির কাহিনী। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সফল দেশ। একে বৈভব নিয়ে বলা হয় জনমিতিক সূচকের স্বর্ণযুগ। বিবিএসের সাম্প্রতিক প্রজেকশন অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৭৪ লাখ ৬৯ হাজার। পুরুষ হল ৮ কোটি ৩৭ লাখ ৯২ হাজার। নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩৬ লাখ ৭৭ হাজার।

মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৬ দশমিক ৬৯ ভাগ অর্থাৎ ১১ কোটি ১৬ লাখ ৭৮ হাজার নারী-পুরুষ কর্মক্ষম। আর নির্ভরশীল জনসংখ্যা {(১-১৪ বছর)+৬৫ ঊর্ধ্ব} হল ৪ কোটি ৬৯ লাখ ৭৮ হাজার। অর্থাৎ শতকরা ৪৫ দশমিক ৯৬ ভাগ।

এখন এই বিশাল কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে অতি দ্রুত জনসম্পদে পরিণত করে বেকারত্বের অভিশাপ দূর করাই বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের মূল দায়িত্ব।

তাহলে জনমিতিক ডিভিডেন্ডের সুফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশ হবে চমকদার। নইলে বেকারত্ব বাংলাদেশের জনমানসে, সমাজে, সংসারে একটা অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। তখন এ দেশের সব উন্নয়ন ম্লান হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের এ স্বর্ণালি সময় এসেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে ১ নম্বর অগ্রাধিকার প্রদান করায়।

সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩১ শতাংশ। কন্ট্রাসেপটিভ ব্যবহারকারী ৬২ দশমিক ৪ ভাগ। নারীপ্রতি গড় সন্তান সংখ্যা বা টিএফআর ২ দশমিক ০৫। মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লাখ জীবিত জন্মে ১৭২ জন। ২০৩০ সালে এ হার হ্রাস পেয়ে হবে ৭০।

গত এক দশকে মাতৃমৃত্যু হ্রাস পেয়েছে ৪০ শতাংশ। নবজাতকের মৃত্যু হার হ্রাস পেয়ে এখন প্রতি হাজার জীবিত জন্মে হয়েছে ২৪। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অপূর্ণ চাহিদা এখন শতকরা ১২ ভাগ। সর্বোপরি মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছরের কিছু বেশি ।

আইসিপিডির ২৫ বছরের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নে প্রায় মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল।

চয়ন সেনগুপ্ত : পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের কর্মকর্তা

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×