হঠাৎ বাঁধ ভেঙে গেলে প্রতিরোধ সহজ নয়
jugantor
হঠাৎ বাঁধ ভেঙে গেলে প্রতিরোধ সহজ নয়

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

১৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট

ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়াতে গিয়ে আজকাল বড় দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। চেষ্টা করি ইতিহাস পাঠ যাতে তথ্য আর উদ্ধৃতির ভারে শিক্ষার্থীদের কাছে খটখটে কঙ্কাল হয়ে না পড়ে। কঙ্কালের গায়ে রক্ত-মাংস চড়াতে চাই। ঘটনার ইতিবৃত্তকে উপস্থাপন করতে চাই গল্পবলার আদল দিয়ে।

নানা সময়, কাল ও অঞ্চলের সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতিকে উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীর সামনে জীবন্ত করতে চাই। কিন্তু ইদানীং নিজের মধ্যে একটি খটকা তৈরি হচ্ছে। খটকাটা বড় হচ্ছে সভ্যতার ইতিহাস পড়াতে গিয়ে।

সভ্যতার উত্থান, বিকাশ, পতন ও নব উত্থানের বলয় বোঝাতে গিয়ে হোঁচট খাই। বারবার মনে হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসে এই নিয়ম যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগোচ্ছে না। অগ্রগতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী দেখেও একটি অজানা আশঙ্কা মন থেকে তাড়াতে পারছি না।

ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিচারে বাংলাদেশও নিয়মের আবর্তনেই চলছিল। মধ্যযুগ পর্যন্ত এ দেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যুচ্চে পৌঁছেছিল। তাই দূরপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপের বণিকরা ধারাবাহিকভাবে এ দেশে এসেছিল বাণিজ্য করে অর্থশালী হওয়ার জন্য।

বংলার সুলতানরা পনেরো শতকে আরব দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য জাহাজ বোঝাই অর্থ আর পণ্য পাঠাতেন। ঔপনিবেশিক যুগে এসে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী সূচক নিুগামী হতে থাকে। পাকিস্তানি অপশাসনের যুগে অধঃগতির চূড়ান্তে পৌঁছি আমরা। অতঃপর মুক্তিযুদ্ধ মুক্তির পথ দেখিয়েছিল।

নব উত্থানের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছিল। কিন্তু দুর্বল রাজনীতি আমাদের নব উত্থানের পথকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। রাজনীতি ভোগবাদিতা আর স্বার্থপরতার হাতে বন্দি হয়ে পড়ে। আদর্শ অদৃশ্য হতে থাকে রাজনীতি থেকে। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে তার কাছের মানুষও স্বস্তি দেয়নি।

তাই তাকে ‘চাটার দল’ নিয়ে আক্ষেপ করতে হয়েছে। নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পেছনের ক্রীড়নকরা কি বঙ্গবন্ধুর খুব দূরের মানুষ ছিলেন? মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের নব উত্থানের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল তা হোঁচট খেতে থাকে বারবার। তাই মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলতে পারলেন।

সেনাবাহিনী, প্রশাসন সব জায়গায় পাকিস্তানপন্থীদের আশ্রয়দাতা হয়ে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শাহ আজিজুর রহমান জিয়াউর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও ক্ষমতাসীন জিয়াউর রহমান দুঃখিত হলেন না। যেন এর পেছনে ক্রীড়নক তিনিই ছিলেন।

তাই পুরস্কৃত করলেন খুনিদের। খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি বিল পাস করলেন। আত্মস্বীকৃত খুনিদের জেলখানার বদলে লোভনীয় পদে বহাল করলেন। অর্থাৎ নব উত্থানের বদলে ইতিহাসের বলয়কে উল্টো পথে ঘুরিয়ে দিলেন।

অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সোপান যখন দৃশ্যমান তখন আবার অশনিসংকেত যেন আমাদের মনে কালো ছায়া ফেলছে। শুধু অর্থনীতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হলেই দেশের সার্বিক অগ্রগতি সূচিত হয় না, দেশবাসীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক আর বাস্তব অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

আমি অর্থনৈতিক বিষয়াবলি ভালো বুঝি না। তাই বাজেট প্রতিক্রিয়া নিয়ে পত্রিকা সম্পাদকগণ লিখতে বললে আমি করজোড়ে ক্ষমা চাই। আমি তত্ত্বকথা বুঝি না। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ভালোমন্দ বিচার করি। ৩০ শতাংশ গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কথা শুনে অনেকের মতো আমিও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।

আমি হয়তো বর্ধিত মূল্য দিতে পারব কিন্তু আমার অফিসের পিয়ন, গাড়ির ড্রাইভার যখন আতঙ্কিত হয় তখন আমার মনেও আশঙ্কা দেখা দেয়।

কিন্তু মনকে হালকা করতে যখন ভাবি দেশের মানুষের বড় অংশ তো গ্যাস ব্যবহার করে না, তাহলে আর ক্ষতি কতটা হবে! কিন্তু যখন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা হিসাব মিলিয়ে বলেন এই মূল্য বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব পড়বে ভোগ্যপণ্যের ওপর, যানবাহনে, কৃষি উপকরণে তখন অসহায় বোধ করি।

এই আতঙ্কিত দশা থেকে মানসিকভাবে কিছুটা মুক্তি পেয়েছি কয়েকদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে। তিনি বলেছেন ভর্তুকি কমাতে যতটুকু মূল্য বৃদ্ধি করা উচিত ছিল জনগণের কথা ভেবে এর চেয়ে কম বৃদ্ধি করেছেন। তাই তো, এভাবে তো ভেবে দেখিনি! যদি ৫০ বা ৬০ ভাগ মূল্য বৃদ্ধি করা হতো তাহলে কেমন পরিস্থিতি দাঁড়াত?

জনগণের সরকার জনগণকে কঠিন সংকট থেকে বাঁচিয়ে দিল। আমি জাতীয় বেতন স্কেলে ১ম গ্রেডে বেতন পাই। সরকারের সর্বোচ্চ আমলা যতটা পান। তবে শিক্ষক বলে আমলাদের মতো আর কোনো ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় থাকি। তাই ৫০ ভাগ বাড়িভাড়া কাটার পর হাতে বড় কোনো অর্থ থাকে না।

তারপর গবেষণার বাতিক থাকায় বইপত্র, গবেষণা উপকরণ এসব জোগাতে কিছ– অর্থ বেরিয়ে যায়। দেশের সরকার যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করেন তেমনি পারিবারিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আমাদের মাঝে মধ্যে বড় দাগে অর্থ খরচ হয়।

এসব খরচ মেটানোর আর কোনো উপায় থাকে না বলে শিক্ষকদের বড় অংশ ভবিষ্যৎ না ভেবে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ঋণ করেন। ফলে শুরু হয়ে যায় বেতন থেকে কর্তন। এবার সত্যিই সংসার নির্বাহের অঙ্কটা একটু জটিল হয়ে পড়ে।

পর মুহূর্তে স্বস্তি খুঁজি এই ভেবে আমি মুষড়ে পড়ব কেন! আমার চেয়ে অনেক বেশি কম আয়ের মানুষের অভাব নেই। এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশে তারা যাবেন কোথায়!

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির পর আমি আমার ব্যক্তিগত গাড়ির গ্যাস ভরতে গিয়ে হোঁচট খেলাম। প্রতিবার আগের হিসাবের চেয়ে কমপক্ষে ১০০ টাকা বেশি বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি অঙ্কে কাঁচা, মেধা দিয়ে হিসাব কষতে চাইলাম। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম।

গাড়ির গ্যাস, বাড়ির গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি এসবের কারণে প্রতি মাসে আমার অতিরিক্ত ৫-৭ হাজার টাকা বেরিয়ে যাবে। এ বাজেট মেলাব কেমন করে। আবার নিজেকে প্রবোধ দিলাম এই বলে যে, আমি আতঙ্কিত হলে নিুআয়ের মানুষ যাবে কোথায়!

আমার অবস্থা দেখে সদ্য সাবেক হয়ে যাওয়া আমার এক আমলা বন্ধু হাসতে হাসতে বলল মাস্টার মানুষ তোমার আবার গাড়ি কেনার দরকার পড়ল কেন? তাই তো- এভাবে তো ভাবিনি। আমার বন্ধুর সামনে আমি বেশ সংকুচিত হয়ে পড়লাম। মনে হল গাড়ি কিনে আমি খুব অপরাধ করে ফেলেছি।

কিন্তু ওকে কী করে বোঝাই এটি আমার ঘোড়া রোগ নয়। শখে কিনিনি গাড়ি। প্রয়োজন বড় বালাই। বয়স হয়েছে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছাড়াও নানা একাডেমিক কাজে এখানে ওখানে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি সীমিত। প্রয়োজন পড়লে মাইক্রোবাস রিকুইজিশন দিলে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। শিক্ষক জীবন প্রায় শেষ হতে চলল।

পরিপূর্ণ প্রফেসর হয়েছি তাও প্রায় বিশ বছর হয়। একজন বন্ধু কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে চাইলেন। বললেন, আপনার তস্য ছাত্র যারা, মাঝারি আমলা প্রায় তরুণ বয়সেই তাদের সহজ শর্তে গাড়ি কেনার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সদাশয় সরকার।

ওদের ড্রাইভার ও জ্বালানি খরচের জন্য সরকার থেকে যে ভাতা দেয়া হয় তাতে কেটেকুটে আপনি যে বেতন হাতে পান তার চেয়ে ওদের অঙ্ক বড়। কিন্তু বন্ধুটি জানে না এই নুনের ছিটায় আমি কোনো জ্বালা অনুভব করিনি।

কারণ আমলাদের সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যদি তুলনা করব তবে সব ছেড়েছুড়ে শিক্ষক হব কেন! আর রাজনৈতিক নিদানে আমলারাই সরকার ও সরকারি দলের কাজে লাগে। শিক্ষক ও অন্যরা তো কচুপোড়া।

তাদের নিয়ে সরকারি বিধায়কদের এত ভাবতে হবে কেন! এরপরও শুকুর গুজার করি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণের কথা ভেবে গ্যাসের মূল্য কম বাড়িয়েছেন বলে। এ জন্য অন্তত জনগণের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

এসবের পরও একটি প্রশ্ন মন থেকে সরাতে পারি না। এই যে সর্বত্র এতসব প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতির কথা শুনি, বিশাল ভর্তুকির পেছনে নাকি এসব দুর্নীতির ভূমিকা বড়। তাহলে সরকার দুর্নীতি না কমিয়ে ভর্তুকি মেটানোর জন্য জনগণের পকেটের দিকে তাকায় কেন!

তাহলে একেই কি বলে সুশাসনের অভাব? এমন বাস্তবতা চলমান রেখে দেশের সার্বিক অগ্রগতি কেমন করে হবে আমি বুঝে পাই না।

এই বাজেটের পর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়েছে সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে ফেলা। অনেকে বলবেন, সঞ্চয়পত্র দেশের কত ভাগ মানুষের আছে? তাদের আমি বিনয়ের সঙ্গে বলব ৫ ভাগ মানুষের স্বার্থরক্ষা করাও জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের কর্তব্য।

আমি ঘর থেকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছি। আমার স্ত্রী পঁচিশ বছরের তিল তিল করে জমানো টাকা ব্যাংক থেকে তুলে অধিক মুনাফার আশায় পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছিলেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূদের এটুকুই তো আয়।

বাজেটের পর এক ঝটকায় আয় কৃশকায় হয়ে গেল। আমার স্ত্রী বাস্তববাদী মানুষ। তিনি তেমন কাতর হলেন না। বললেন, দেশের উপকারে লাগলে ক্ষতি কী! কিন্তু তার যত দুঃখ সোনালীর মায়ের জন্য। সোনালীর মা ঘরকন্নায় তার সহযোগী।

পনেরো বছর আমাদের বাসায় কাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত। আমার স্ত্রী শুরু থেকে সোনালীর মাকে একটু একটু সঞ্চয় করা শিখিয়েছিল। ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছিল। এক লাখ টাকা জমা হওয়ার পর সেই টাকা তুলে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কিনে দেয়।

মাসে মাসে যেটুকু লভ্যাংশ পেত তার সংসারে এতে খুব উপকার হতো। এখন সোনালীর মায়ের মাথায় হাত। আমাদের এক বন্ধু প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। গত বছর অবসরে গেছেন। পেনশন ও অন্যান্য পাওনা তুলে ১২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন।

এর মাসিক লভ্যাংশ তুলেই সংসার নির্বাহ করতেন। এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। একই রকম সংকটে পড়েছেন আরেক বন্ধু। দীর্ঘ প্রবাস কাটিয়ে বছর তিনেক হল পাকাপাকি দেশে ফিরে এসেছেন।

সংসার পরিজন ফেলে প্রবাসের পরিশ্রমলব্ধ আয়ের বড় অংশ টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন। তার সংসার নির্বাহের বড় নির্ভরতা ছিল সঞ্চয়পত্রের মুনাফা। এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন বন্ধুটি।

দেশের ঋণখেলাপি, ধনাঢ্য আর ক্ষমতার রাজনীতিকরা এসব নিয়ে হাহাকার করছেন না। কারণ সমাজের অধস্তন মানুষের মতো সঞ্চয়পত্র কেনার প্রয়োজন তাদের নেই। তাদের বান্ধব বাজেটে তারা মহাখুশি। সংকটাপন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণের কথা কে বা কবে ভাবে! তারপরও দুর্ভাবনা এক জায়গায়ই।

এমন বাস্তবতায় আমাদের দেশের আশাজাগানিয়া উন্নয়ন উপরি ভাগের চাকচিক্যেই আটকে যায় কি না! সভ্যতার ইতিহাসের আবর্তন রীতিতে এ দেশের নব উত্থান কতটা দৃঢ় গতি পাবে! কখনও কখনও মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু পুঞ্জীভূত জলধারা হঠাৎ প্রস্রবণে রূপ নিলে কোনো বাঁধ দিয়ে প্রতিরোধ করা যাবে কি?

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

হঠাৎ বাঁধ ভেঙে গেলে প্রতিরোধ সহজ নয়

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
১৬ জুলাই ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বাজেট
বাজেট। ছবি: যুগান্তর

ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়াতে গিয়ে আজকাল বড় দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। চেষ্টা করি ইতিহাস পাঠ যাতে তথ্য আর উদ্ধৃতির ভারে শিক্ষার্থীদের কাছে খটখটে কঙ্কাল হয়ে না পড়ে। কঙ্কালের গায়ে রক্ত-মাংস চড়াতে চাই। ঘটনার ইতিবৃত্তকে উপস্থাপন করতে চাই গল্পবলার আদল দিয়ে।

নানা সময়, কাল ও অঞ্চলের সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতিকে উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীর সামনে জীবন্ত করতে চাই। কিন্তু ইদানীং নিজের মধ্যে একটি খটকা তৈরি হচ্ছে। খটকাটা বড় হচ্ছে সভ্যতার ইতিহাস পড়াতে গিয়ে।

সভ্যতার উত্থান, বিকাশ, পতন ও নব উত্থানের বলয় বোঝাতে গিয়ে হোঁচট খাই। বারবার মনে হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসে এই নিয়ম যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগোচ্ছে না। অগ্রগতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী দেখেও একটি অজানা আশঙ্কা মন থেকে তাড়াতে পারছি না।

ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিচারে বাংলাদেশও নিয়মের আবর্তনেই চলছিল। মধ্যযুগ পর্যন্ত এ দেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যুচ্চে পৌঁছেছিল। তাই দূরপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপের বণিকরা ধারাবাহিকভাবে এ দেশে এসেছিল বাণিজ্য করে অর্থশালী হওয়ার জন্য।

বংলার সুলতানরা পনেরো শতকে আরব দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য জাহাজ বোঝাই অর্থ আর পণ্য পাঠাতেন। ঔপনিবেশিক যুগে এসে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী সূচক নিুগামী হতে থাকে। পাকিস্তানি অপশাসনের যুগে অধঃগতির চূড়ান্তে পৌঁছি আমরা। অতঃপর মুক্তিযুদ্ধ মুক্তির পথ দেখিয়েছিল।

নব উত্থানের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছিল। কিন্তু দুর্বল রাজনীতি আমাদের নব উত্থানের পথকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। রাজনীতি ভোগবাদিতা আর স্বার্থপরতার হাতে বন্দি হয়ে পড়ে। আদর্শ অদৃশ্য হতে থাকে রাজনীতি থেকে। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে তার কাছের মানুষও স্বস্তি দেয়নি।

তাই তাকে ‘চাটার দল’ নিয়ে আক্ষেপ করতে হয়েছে। নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পেছনের ক্রীড়নকরা কি বঙ্গবন্ধুর খুব দূরের মানুষ ছিলেন? মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের নব উত্থানের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল তা হোঁচট খেতে থাকে বারবার। তাই মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলতে পারলেন।

সেনাবাহিনী, প্রশাসন সব জায়গায় পাকিস্তানপন্থীদের আশ্রয়দাতা হয়ে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শাহ আজিজুর রহমান জিয়াউর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও ক্ষমতাসীন জিয়াউর রহমান দুঃখিত হলেন না। যেন এর পেছনে ক্রীড়নক তিনিই ছিলেন।

তাই পুরস্কৃত করলেন খুনিদের। খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি বিল পাস করলেন। আত্মস্বীকৃত খুনিদের জেলখানার বদলে লোভনীয় পদে বহাল করলেন। অর্থাৎ নব উত্থানের বদলে ইতিহাসের বলয়কে উল্টো পথে ঘুরিয়ে দিলেন।

অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সোপান যখন দৃশ্যমান তখন আবার অশনিসংকেত যেন আমাদের মনে কালো ছায়া ফেলছে। শুধু অর্থনীতির সূচক ঊর্ধ্বমুখী হলেই দেশের সার্বিক অগ্রগতি সূচিত হয় না, দেশবাসীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক আর বাস্তব অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

আমি অর্থনৈতিক বিষয়াবলি ভালো বুঝি না। তাই বাজেট প্রতিক্রিয়া নিয়ে পত্রিকা সম্পাদকগণ লিখতে বললে আমি করজোড়ে ক্ষমা চাই। আমি তত্ত্বকথা বুঝি না। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ভালোমন্দ বিচার করি। ৩০ শতাংশ গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কথা শুনে অনেকের মতো আমিও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।

আমি হয়তো বর্ধিত মূল্য দিতে পারব কিন্তু আমার অফিসের পিয়ন, গাড়ির ড্রাইভার যখন আতঙ্কিত হয় তখন আমার মনেও আশঙ্কা দেখা দেয়।

কিন্তু মনকে হালকা করতে যখন ভাবি দেশের মানুষের বড় অংশ তো গ্যাস ব্যবহার করে না, তাহলে আর ক্ষতি কতটা হবে! কিন্তু যখন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা হিসাব মিলিয়ে বলেন এই মূল্য বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব পড়বে ভোগ্যপণ্যের ওপর, যানবাহনে, কৃষি উপকরণে তখন অসহায় বোধ করি।

এই আতঙ্কিত দশা থেকে মানসিকভাবে কিছুটা মুক্তি পেয়েছি কয়েকদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে। তিনি বলেছেন ভর্তুকি কমাতে যতটুকু মূল্য বৃদ্ধি করা উচিত ছিল জনগণের কথা ভেবে এর চেয়ে কম বৃদ্ধি করেছেন। তাই তো, এভাবে তো ভেবে দেখিনি! যদি ৫০ বা ৬০ ভাগ মূল্য বৃদ্ধি করা হতো তাহলে কেমন পরিস্থিতি দাঁড়াত?

জনগণের সরকার জনগণকে কঠিন সংকট থেকে বাঁচিয়ে দিল। আমি জাতীয় বেতন স্কেলে ১ম গ্রেডে বেতন পাই। সরকারের সর্বোচ্চ আমলা যতটা পান। তবে শিক্ষক বলে আমলাদের মতো আর কোনো ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় থাকি। তাই ৫০ ভাগ বাড়িভাড়া কাটার পর হাতে বড় কোনো অর্থ থাকে না।

তারপর গবেষণার বাতিক থাকায় বইপত্র, গবেষণা উপকরণ এসব জোগাতে কিছ– অর্থ বেরিয়ে যায়। দেশের সরকার যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করেন তেমনি পারিবারিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আমাদের মাঝে মধ্যে বড় দাগে অর্থ খরচ হয়।

এসব খরচ মেটানোর আর কোনো উপায় থাকে না বলে শিক্ষকদের বড় অংশ ভবিষ্যৎ না ভেবে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ঋণ করেন। ফলে শুরু হয়ে যায় বেতন থেকে কর্তন। এবার সত্যিই সংসার নির্বাহের অঙ্কটা একটু জটিল হয়ে পড়ে।

পর মুহূর্তে স্বস্তি খুঁজি এই ভেবে আমি মুষড়ে পড়ব কেন! আমার চেয়ে অনেক বেশি কম আয়ের মানুষের অভাব নেই। এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশে তারা যাবেন কোথায়!

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির পর আমি আমার ব্যক্তিগত গাড়ির গ্যাস ভরতে গিয়ে হোঁচট খেলাম। প্রতিবার আগের হিসাবের চেয়ে কমপক্ষে ১০০ টাকা বেশি বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি অঙ্কে কাঁচা, মেধা দিয়ে হিসাব কষতে চাইলাম। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম।

গাড়ির গ্যাস, বাড়ির গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি এসবের কারণে প্রতি মাসে আমার অতিরিক্ত ৫-৭ হাজার টাকা বেরিয়ে যাবে। এ বাজেট মেলাব কেমন করে। আবার নিজেকে প্রবোধ দিলাম এই বলে যে, আমি আতঙ্কিত হলে নিুআয়ের মানুষ যাবে কোথায়!

আমার অবস্থা দেখে সদ্য সাবেক হয়ে যাওয়া আমার এক আমলা বন্ধু হাসতে হাসতে বলল মাস্টার মানুষ তোমার আবার গাড়ি কেনার দরকার পড়ল কেন? তাই তো- এভাবে তো ভাবিনি। আমার বন্ধুর সামনে আমি বেশ সংকুচিত হয়ে পড়লাম। মনে হল গাড়ি কিনে আমি খুব অপরাধ করে ফেলেছি।

কিন্তু ওকে কী করে বোঝাই এটি আমার ঘোড়া রোগ নয়। শখে কিনিনি গাড়ি। প্রয়োজন বড় বালাই। বয়স হয়েছে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছাড়াও নানা একাডেমিক কাজে এখানে ওখানে যেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি সীমিত। প্রয়োজন পড়লে মাইক্রোবাস রিকুইজিশন দিলে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। শিক্ষক জীবন প্রায় শেষ হতে চলল।

পরিপূর্ণ প্রফেসর হয়েছি তাও প্রায় বিশ বছর হয়। একজন বন্ধু কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে চাইলেন। বললেন, আপনার তস্য ছাত্র যারা, মাঝারি আমলা প্রায় তরুণ বয়সেই তাদের সহজ শর্তে গাড়ি কেনার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সদাশয় সরকার।

ওদের ড্রাইভার ও জ্বালানি খরচের জন্য সরকার থেকে যে ভাতা দেয়া হয় তাতে কেটেকুটে আপনি যে বেতন হাতে পান তার চেয়ে ওদের অঙ্ক বড়। কিন্তু বন্ধুটি জানে না এই নুনের ছিটায় আমি কোনো জ্বালা অনুভব করিনি।

কারণ আমলাদের সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যদি তুলনা করব তবে সব ছেড়েছুড়ে শিক্ষক হব কেন! আর রাজনৈতিক নিদানে আমলারাই সরকার ও সরকারি দলের কাজে লাগে। শিক্ষক ও অন্যরা তো কচুপোড়া।

তাদের নিয়ে সরকারি বিধায়কদের এত ভাবতে হবে কেন! এরপরও শুকুর গুজার করি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণের কথা ভেবে গ্যাসের মূল্য কম বাড়িয়েছেন বলে। এ জন্য অন্তত জনগণের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

এসবের পরও একটি প্রশ্ন মন থেকে সরাতে পারি না। এই যে সর্বত্র এতসব প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতির কথা শুনি, বিশাল ভর্তুকির পেছনে নাকি এসব দুর্নীতির ভূমিকা বড়। তাহলে সরকার দুর্নীতি না কমিয়ে ভর্তুকি মেটানোর জন্য জনগণের পকেটের দিকে তাকায় কেন!

তাহলে একেই কি বলে সুশাসনের অভাব? এমন বাস্তবতা চলমান রেখে দেশের সার্বিক অগ্রগতি কেমন করে হবে আমি বুঝে পাই না।

এই বাজেটের পর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়েছে সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে ফেলা। অনেকে বলবেন, সঞ্চয়পত্র দেশের কত ভাগ মানুষের আছে? তাদের আমি বিনয়ের সঙ্গে বলব ৫ ভাগ মানুষের স্বার্থরক্ষা করাও জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের কর্তব্য।

আমি ঘর থেকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছি। আমার স্ত্রী পঁচিশ বছরের তিল তিল করে জমানো টাকা ব্যাংক থেকে তুলে অধিক মুনাফার আশায় পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছিলেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূদের এটুকুই তো আয়।

বাজেটের পর এক ঝটকায় আয় কৃশকায় হয়ে গেল। আমার স্ত্রী বাস্তববাদী মানুষ। তিনি তেমন কাতর হলেন না। বললেন, দেশের উপকারে লাগলে ক্ষতি কী! কিন্তু তার যত দুঃখ সোনালীর মায়ের জন্য। সোনালীর মা ঘরকন্নায় তার সহযোগী।

পনেরো বছর আমাদের বাসায় কাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত। আমার স্ত্রী শুরু থেকে সোনালীর মাকে একটু একটু সঞ্চয় করা শিখিয়েছিল। ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছিল। এক লাখ টাকা জমা হওয়ার পর সেই টাকা তুলে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কিনে দেয়।

মাসে মাসে যেটুকু লভ্যাংশ পেত তার সংসারে এতে খুব উপকার হতো। এখন সোনালীর মায়ের মাথায় হাত। আমাদের এক বন্ধু প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। গত বছর অবসরে গেছেন। পেনশন ও অন্যান্য পাওনা তুলে ১২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন।

এর মাসিক লভ্যাংশ তুলেই সংসার নির্বাহ করতেন। এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। একই রকম সংকটে পড়েছেন আরেক বন্ধু। দীর্ঘ প্রবাস কাটিয়ে বছর তিনেক হল পাকাপাকি দেশে ফিরে এসেছেন।

সংসার পরিজন ফেলে প্রবাসের পরিশ্রমলব্ধ আয়ের বড় অংশ টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন। তার সংসার নির্বাহের বড় নির্ভরতা ছিল সঞ্চয়পত্রের মুনাফা। এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন বন্ধুটি।

দেশের ঋণখেলাপি, ধনাঢ্য আর ক্ষমতার রাজনীতিকরা এসব নিয়ে হাহাকার করছেন না। কারণ সমাজের অধস্তন মানুষের মতো সঞ্চয়পত্র কেনার প্রয়োজন তাদের নেই। তাদের বান্ধব বাজেটে তারা মহাখুশি। সংকটাপন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণের কথা কে বা কবে ভাবে! তারপরও দুর্ভাবনা এক জায়গায়ই।

এমন বাস্তবতায় আমাদের দেশের আশাজাগানিয়া উন্নয়ন উপরি ভাগের চাকচিক্যেই আটকে যায় কি না! সভ্যতার ইতিহাসের আবর্তন রীতিতে এ দেশের নব উত্থান কতটা দৃঢ় গতি পাবে! কখনও কখনও মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু পুঞ্জীভূত জলধারা হঠাৎ প্রস্রবণে রূপ নিলে কোনো বাঁধ দিয়ে প্রতিরোধ করা যাবে কি?

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]