শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা

ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস ও উপোসথ ব্রত

  ড. সুকোমল বড়ুয়া ১৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আষাঢ়ী পূর্ণিমা
আষাঢ়ী পূর্ণিমা। ছবি: সংগৃহীত

আজ শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা। বুদ্ধ পূর্ণিমার মতো এ পূর্ণিমার আবেদন বৌদ্ধ বিশ্বে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং অতি পবিত্রময়। থেরবাদী বৌদ্ধ দেশগুলোয় আজ থেকে ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস ব্রত শুরু।

বিহারের ভিক্ষু-শ্রামণ, উপাসক-উপাসিকা ও গৃহীরা আজ থেকে তিন মাসের জন্য ধ্যান-সমাধি ও প্রজ্ঞা সাধনা করবেন। অতি যত্নের সঙ্গে ধর্মবিনয় অনুশীলন করবেন, শিক্ষা দেবেন এবং শাস্ত্র আলোচনা করবেন।

এ ছাড়া কায়িক, বাচনিক, মানসিক ত্রিবিধ উপায়ে সংযমতা রক্ষা করবেন এবং কায়িক শুদ্ধিতা, বাচনিক শুদ্ধিতা ও মানসিক শুদ্ধিতা বজায় রেখে পরমার্থ সাধনায় নিবেদিত হবেন। প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য বৃক্ষরোপণও করা হবে।

এ পূর্ণিমার আরও বিশেষত্ব হল, আষাঢ়ী পূর্ণিমার এই শুভ তিথিতেই রাজকুমার সিদ্ধার্থ রানী মহামায়ার গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন। বৌদ্ধ পরিভাষায় একে বলা হয় মহাভিনিষ্ক্রমন।

বুদ্ধত্ব লাভের পর এ দিবসেই তিনি তার অধীত নবলব্ধধর্ম ‘ধর্মচক্র প্রবর্তনসূত্র’ রূপে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যের কাছে প্রথম প্রচার করেন সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে (বর্তমান উত্তর প্রদেশের বানারস সন্নিকটস্থ)।

সেদিন তার প্রচারিত ধর্মের মূল আবেদন ছিল- জগৎ দুঃখময়, জীবন অনিত্য, জগতের সকল সংস্কার অনিত্য। জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যুই শাশ্বত। এই দুঃখময় সংসার থেকে মুক্তির একমাত্র পথ বা উপায় তৃষ্ণাক্ষয়, শীল, সমাধি, প্রজ্ঞার সাধনা এবং আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ তথা আটটি বিশুদ্ধ পথে চলা।

এ পূর্ণিমার আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, এ শুভ তিথিতেই ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীর গণ্ডম্ব বৃক্ষমূলে প্রতিহার্য প্রদর্শন করেন এবং মাতৃদেবীকে দর্শন ও ধর্মদেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। আমরা জানি, রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্মের পরই রানী মহামায়ার মৃত্যু হয়েছিল।

এ কৃতজ্ঞতা বোধে তিনি তার প্রাপ্ত ধর্মজ্ঞান তার মাতৃদেবীকে বিতরণ তথা দর্শনের জন্যই স্বর্গে গিয়েছিলেন। রানী মহামায়ার মৃত্যুর পর তার কনিষ্ঠ বোন গৌতমীই পরবর্তীকালে রাজকুমার সিদ্ধার্থকে লালন পালন করেন। এ জন্য সিদ্ধার্থের অপর নাম হয়েছিল গৌতম।

আজ থেকে ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান শুরু। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে এ তিন মাসের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ ত্রৈমাসিক এ বর্ষাবাসের মধ্যে ভিক্ষুসংঘ ও গৃহীসংঘ ধর্ম-বিনয়ের বহুবিধ আচার-আচরণ ও বিধিবদ্ধ নিয়মনীতি পালন ও অনুশীলন বাধ্যতামূলক।

এ ছাড়া ভিক্ষুসংঘের বিনয়কর্ম সম্পাদন ও প্রাতিমোক্ষ পাঠ এবং উপোসথধারীদের অষ্টমী, অমাবস্যা, পূর্ণিমায় উপোসথ গ্রহণ প্রভৃতি বিনয়ভিত্তিক পালনীয় কর্ম। এসব বিধিগুলো বিনয় পিটকের মহাবর্গ গ্রন্থে বিধৃত আছে।

এ বিধিবদ্ধ নিয়ম ও কর্তব্যগুলো পরিবেশ, প্রকৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গে এত নিবিড় ও গভীর যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার জীবদ্দশায় শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা পালন করতেন। তিনি এ পূর্ণিমার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন বলেই তার সাধনার পীঠস্থান শান্তি নিকেতনে প্রতিবছর আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন’ উৎসব পালন করা হতো।

বৌদ্ধমতে ঋতু তিনটি। যথা- গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত। বুদ্ধজীবনের সঙ্গে প্রকৃতি পরিবেশ, ঋতু, পূর্ণিমা-অমাবস্যা, গ্রহ-নক্ষত্র; এমনকি দিবা-রাত্রির প্রহরের সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। এ জন্য বুদ্ধজীবনের প্রধান ও ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো প্রতিটি পূর্ণিমা তিথিতেই সংঘটিত হয়েছিল।

বৌদ্ধমতে বর্ষা ঋতুতে প্রকৃতির শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ ধ্যান-সমাধির জন্য উপযুক্ত সময়। এ সময় চলাফেরা তথা ভ্রমণও তেমন সুখকর নয়। নিমগ্নতা ও নিবিষ্টতায় তখন প্রকৃতি ও পরিবেশকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।

ঋতুগুলো কেউ নিয়ন্ত্রণ করে না। জাগতিক ও প্রাকৃতিক কার্যকারণে আবর্তিত হয়, নিয়ন্ত্রিত হয়। এতে প্রকৃতি তার নিজস্ব পরিচয় ফুটিয়ে তোলে। পরিবেশ ও প্রকৃতির এ নিয়ন্ত্রণে মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতিও নিয়ন্ত্রিত হয়। কারণ প্রাণিজগৎ প্রকৃতি ও পরিবেশনির্ভর।

আজ এর ভিন্নতা বা দূষণের ফলে প্রাণিকূল তথা জীবকূল বিপন্ন হচ্ছে এবং আমাদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হতে চলেছে। ভগবান বুদ্ধ এসব বিষয়ে অতি সচেতন ও যত্নবান ছিলেন।

পূর্বেই বলেছি, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস শুরু হয় আর তা শেষ হয় আশ্বিনী পূর্ণিমায়। আষাঢ়ী পূর্ণিমাকে বাংলাদেশের বৌদ্ধরা ‘ছাদাং’ বলে অভিহিত করেন। ‘ছাদাং’ শব্দটি বার্মিজ শব্দ; এর অর্থ উপোসথ। বর্ষাবাসের এই তিন মাসে অষ্টমী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপোসথ পালন করা হয়।

এ সময়ে বিহারে গিয়ে ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ নর-নারী ও উপাসক-উপাসিকারা উপোসথব্রত গ্রহণ করেন। উপোসথব্রতীরা অষ্টশীল গ্রহণ করেন এবং তা চব্বিশ ঘণ্টার জন্য রক্ষা করেন।

বাংলাদেশের বৌদ্ধরা যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যে এ উৎসব পালন করেন। দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে সকালে বুদ্ধ পূজা, ভিক্ষুসংঘের পিণ্ডদান, শীলগ্রহণ এবং বিকালে ধর্মসভার আয়োজন করা হয়।

আষাঢ়ী পূর্ণিমার তাৎপর্যসহ বৌদ্ধ ধর্মদর্শনের নানাবিধ দিক আলোচনা করা হয়; বিশেষ করে দুর্লভ মানবজীবনের সার্থকতার জন্য বৌদ্ধজীবন পদ্ধতিতে যেসব নিয়ম-নীতি, শিক্ষা, সদাচার পালনীয় তা এবং ইহ-পারলৌকিক শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি আনয়নের জন্য যেসব ব্রত বা কর্ম বৌদ্ধশাস্ত্রে বিধৃত, তা তুলে ধরা হয়।

এ ছাড়া সব ধরনের অকুশল যেমন- তৃষ্ণা, লোভ, দ্বেষ, মোহসহ মানব মনের সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা দূরীকরণ এবং সৎকর্মে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য পরম শিক্ষা লাভ করা যায়।

সন্ধ্যায় প্রদীপ পূজা এবং বিশ্ব শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা করা হয়। অনেক বিহারে এ পূর্ণিমার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। সরকারি টেলিভিশন ও বেতারে বিশেষ কথিকা পাঠেরও ব্যবস্থা করা হয় এবং অনেক বিহারে কিশোর-কিশোরী ও বালক-বালিকাদের জন্য পুরস্কার বিতরণীসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

পরিশেষে বলা যায়, মানবজীবনে এসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ব্রত, অধিষ্ঠান সবই মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য এবং মানবজীবনের পরিপূর্ণতা ও মনুষ্যত্ব বিকাশের জন্য।

উল্লেখ্য, বিশ্বের সব জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নানা বিদ্যা যেমন মানবকল্যাণ ও মানবতার জন্য, তেমনি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও ব্রত-অধিষ্ঠানও শান্তি এবং মানবতার জন্য। এর মাধ্যমেই একটি পরিপূর্ণ-পরিশুদ্ধ এবং উৎকৃষ্টতম মানবজীবন ও মানবসমাজ গঠন করা যায়; যেখানে বিশ্বমানবতা উপকৃত হবে এবং ধরিত্রী ও মানববিশ্ব শান্তি ও নিরাপদে থাকবে।

কিন্তু সমগ্র বিশ্বে আজ প্রতিনিয়ত এর ব্যতিক্রমই আমাদের চোখে পড়ছে, যা কাম্য নয়। আমরা এর সমাধান চাই। শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা আজ আমাদের সবার চেতনায় এই বোধ ও এই জ্ঞান তৈরি করুক- এটাই আজ আমাদের প্রার্থনা। ‘সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু’- জগতের সব জীব সুখী হোক।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×