স্বদেশ ভাবনা

অভিযোগগুলোর তদন্ত হবে কি?

  আবদুল লতিফ মন্ডল ১৭ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অভিযোগগুলোর তদন্ত হবে কি?
ফাইল ছবি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংঘটিত অনিয়মগুলো সম্প্রতি আবার জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ৯ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে এ নির্বাচনকে ‘অনিয়মের খনি’, ‘একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

এ নির্বাচনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিরোধী দল বিএনপি ১০ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন বাতিল ও নির্বাচনে অনিয়ম তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানিয়েছে। এরও আগে একাদশ নির্বাচনকে ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জনগণ ইতিমধ্যে দেশের নির্বাচনব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। এমতাবস্থায় এ নির্বাচনে অনিয়ম তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিশন গঠনের অনুরোধে রাষ্ট্রপতি সাড়া দেবেন কি?

৯ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুজন উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০৩টি আসনের ২১৩ ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, যা কোনোক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

৭৫টি আসনে ৫৮৬ কেন্দ্রে সব ভোট নৌকায় এবং একটি কেন্দ্রে ধানের শীষে পড়েছে। ১২৮৫ কেন্দ্রে ধানের শীষে এবং দুটি কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকে একটিও ভোট পড়েনি।

এতে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনে চারটি আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার ঘোষিত তাৎক্ষণিক ফলাফলের সঙ্গে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে অমিল রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ১ দশমিক ০৯ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ পর্যন্ত ভোটের পার্থক্য পাওয়া গেছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা একাদশ সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলর গঠন করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানান। তাছাড়া, বর্তমান ইসি’র অধীনে আর কোনো নির্বাচন আয়োজন না করারও সুপারিশ করেন তারা।

এর একদিন পর অর্থাৎ ১০ জুলাই বিএনপি রাজধানীতে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাতিল ও নির্বাচনে অনিয়ম তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগের রাতে গোটা দেশে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার দালিলিক প্রমাণ এবার স্বয়ং নির্বাচন কমিশন নিজেই প্রকাশ করেছে। নির্বাচনের ৬ মাস পরে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রভিত্তিক যে ফলাফল প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে, কোনো নির্বাচনই হয়নি বাংলাদেশে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের কমবেশি দু’সপ্তাহ পর ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা প্রতিবেদন’ প্রকাশ করে টিআইবি। টিআইবির পর্যালোচনাভুক্ত ৫০টি সংসদীয় আসনে সংস্থাটির গবেষক দল যা দেখেছে তা প্রতিফলিত হয় প্রতিবেদনে।

এগুলো হল- এক. পঞ্চাশটি সংসদীয় আসনেই নির্বাচনের জন্য যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ প্রয়োজন, তা ‘অনুপস্থিত ছিল’ এবং একমাত্র ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রচারণায় তৎপর ছিল।

কোনো কোনো আসনে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যরা প্রচারণায় অংশগ্রহণ করে। দুই. তফসিল ঘোষণার পর ওই আসনগুলোয় ১২ হাজার ৬৮৯ জন সরকারবিরোধী জোটের প্রার্থী ও নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। এসব মামলায় গ্রেফতার হন ৩ হাজার ৭৩৩ জন। তিন. নির্বাচনের দিন উল্লিখিত ৫০টি আসনের ৪৭টিতেই কোনো না কোনো অনিয়মের অভিযোগ পায় টিআইবির গবেষক দল।

এসব অনিয়মের ধরনের মধ্যে ছিল নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে সিল মেরে রাখা, ভোটের দিন আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া এবং বুথ দখল করে প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে ব্যালটে সিল মারা, ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া এবং সরকারবিরোধী জোটের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া।

চার. সরকারবিরোধী দলের প্রার্থীর সমর্থক ও নেতাকর্মীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হামলা, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করা ও পুড়িয়ে দেয়া। পাঁচ. পর্যালোচনাভুক্ত ৫০ আসনের ৪১টিতে জাল ভোট দেয়া এবং ৪২টি আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা পালন করা। এসব অনিয়মের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানায় টিআইবি।

একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে ইসি প্রথমে দাবি করলেও তাদের পরবর্তী বক্তব্যে নির্বাচনের দুর্বল দিকগুলোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

৮ মার্চ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ (টিওটি) কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা বলেন, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি বন্ধ করতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার শুরু করা হবে।

তিনি আরও বলেন, রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী, কাদের কী করা প্রয়োজন, সেই শিক্ষা দেয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা কমিশনের নেই। কী কারণে, কাদের কারণে এগুলো হচ্ছে, কারা দায়ী তা বলারও কোনো সুযোগ নেই।

পরিবেশ-পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে বলেও তিনি জানান। সিইসির এ বক্তব্য একাদশ সংসদ নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের স্বীকৃতি বৈ আর কিছু নয়।

গত ৩০ জুন ঢাকার লালবাগ সরকারি মডেল স্কুল ও কলেজে ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রশিক্ষণের উদ্বোধনকালে সিইসি বলেছেন, নির্বাচনে শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক নয়। তবে এ বিষয়ে ইসির করণীয় কিছু নেই। ভোট গ্রহণের পরই প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা কেন্দ্রভিত্তিক সব বিরোধ নিষ্পত্তি করেন। তারপর রিটার্নিং কর্মকর্তারা ইসির কাছে একীভূত ফল পাঠান।

তখন ইসি কোনো অভিযোগ পায়নি। তাই এখন ইসির কিছু করণীয় নেই। সিইসির এ বক্তব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলে গেজেট প্রকাশ সম্পর্কিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হলেও ইসি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। কারণ দেশের সংবিধান ইসিকে সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ‘ইসির দায়িত্ব কি শুধু রিটার্নিং কর্মকর্তার পাঠানো কাগজটিতে সিল মারা? সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভোটারদের প্রতি তাদের কোনো কর্তব্য নেই?’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় নেতাদের বক্তব্য থেকে মনে হয়েছে, নির্বাচনে যে কোনো উপায়ে জয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসার একটি পরিকল্পনা এঁটেছিল ক্ষমতাসীন দল।

বহুদলীয় গণতন্ত্রে কোনো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের যে কোনো উপায়ে জয়লাভ করার আকাক্সক্ষা সুষ্ঠু নির্বাচনের ইঙ্গিত বহন করে না। অভিযোগ উঠেছে, প্রধান বিরোধী দলকে সব দিক থেকে কোণঠাসা করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে একচেটিয়া জয়লাভের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে।

ক্ষমতাসীন দলের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তার প্রমাণ বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোসহ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত। ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে’র মধ্যে সাত ধাপে অনুষ্ঠিত ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনে ভোট গণনায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) কার্যকারিতা সম্পর্কে কিছু অভিযোগ ছাড়া অন্য কোনো বড় ধরনের অনিয়মের খবর পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ নির্বাচন ছিল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ।

নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ঐতিহাসিক বিজয় পেয়েছে।

এনডিএ তথা বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) ভীষণভাবে পরাজিত হলেও কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী লোকসভা নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়ে এনডিএ তথা বিজেপির জয়ের মূল নায়ক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

শুধু এ নির্বাচনেই নয়, ভারতে ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনগুলোতেও বড় ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার রেকর্ড নেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী আরেক দেশ পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ইতিহাস সুখকর না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শুভ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন জোট জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পাকিস্তানে গণতন্ত্র এগিয়ে যাক- এটাই গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রত্যাশা।

আমাদের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ একজন উদার গণতন্ত্রমনা মানুষ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ সিনিয়র নেতা হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে দলটির মনোনয়ন পান। দলটির ওপর তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম তদন্তে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিশন গঠনে তিনি সরকারকে রাজি করাতে সক্ষম হবেন বলে জনগণের বিশ্বাস। একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিশনের মাধ্যমে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনীত অভিযোগগুলো তদন্ত করা হলে এবং তদন্তে সেগুলো প্রমাণিত না হলে আওয়ামী লীগ সরকারের হাত অনেক শক্তিশালী হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশ-বিদেশে যে প্রশ্ন উঠেছে এতে তার অবসান ঘটবে। জনগণ নির্বাচনের ওপর তাদের হারানো বিশ্বাস ফিরে পাবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×