রেল হোক আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ

  মুঈদ রহমান ২১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রেল

যুগান্তর গত ১৫ জুলাই দেশের রেলপথের করুণ অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বর্ষা মৌসুমে আমাদের রেলব্যবস্থা একেবারে নড়বড়ে হয়ে পড়ে; যারা এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকেন তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (অবকাঠামো) মুখ থেকে শোনা- ‘বর্ষা মৌসুম শুরু হয়ে গেছে, এতে আমাদের আতঙ্কের পাশাপাশি উদ্বেগও বাড়ছে।’

আবার বর্ষা পেরিয়ে গেলেই সমস্যার কথা অবলীলায় ভুলে যান। শিয়ালের কাঁথা কেনার মতো। শীতকালে সারা রাত ধরে শিয়াল চেঁচায় আর বলে পরদিন কাঁথা কিনব। যখন সকাল হয়, রোদ ওঠে, তখন সে আর কাঁথার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না আর, কাঁথা কেনা হয় না। সারা দিন শেষে রাতে আবার চেঁচামেচি।

বর্ষা এলে রেললাইনের মাটি নরম হয়ে যায়, ব্রিজের দু’পাশ থেকে মাটি সরে যায়- শেষতক বগি লাইনচ্যুত, জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। এ রকম চিত্র প্রতিবছরই আমরা দেখতে পাই। এই তো গত ১০ জুলাই রাজশাহীর হালদাগাছিতে একটি তেলবাহী ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ফলে রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ ২৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকে।

গত ১০ বছরে রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৭৯৮টি; এতে প্রাণ গেছে ৩৯২ জনের। আরও উদ্বেগের কথা হল, ৩ হাজার ৬২৯টি ব্রিজের মধ্যে ৩ হাজার ২০০টিই ঝুঁকিপূর্ণ। তার মানে আমাদের মোট ব্রিজের ৮৮ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ! এ ব্রিজগুলোর ৮৫ শতাংশ ব্রিটিশ আমলে তৈরি। এমনও ব্রিজ রয়েছে যার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ট্রেনের গতিবেগ থাকে মাত্র ৪-৫ কিলোমিটার। ফলে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা ১৪০ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন কোচ আদতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

ভালো কোচ থাকলেও ইঞ্জিনের অবস্থা একেবারেই নাজুক। ৭৫ শতাংশ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ। আর রেললাইনের প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার অতীব ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় রয়েছে। কোথাও কোথাও ফিশপ্লেট নেই, পাথর সরে গেছে কিংবা ঘাস গজিয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিটা বেশি হলেও সারা বছরই কোনো-না-কোনো ঝুঁকির মধ্যে থাকে আমাদের রেলওয়ে।

নির্মম দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি হয়, প্রতিবেদন জমা হয়- এ পর্যন্তই। তারপর আর কোনো অগ্রগতি আমরা দেখতে পাই না। প্রতিবেদনে কারণগুলো বেরিয়ে আসে সুনির্দিষ্টভাবেই; কিন্তু এর কোনো প্রতিকার নেই। সম্প্রতি কুলাউড়ার ট্রেন দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনটির কথা আমরা খেয়াল করতে পারি। রিপোর্টে উঠে এসেছে, ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর অব বাংলাদেশ রেলওয়ের (জিআইবিআর) বার্ষিক একটি পরিদর্শক দল কুলাউড়া রেল সেকশন পরিদর্শন করে ভয়াবহ প্রতিবেদন দেয় রেলকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘এ সেকশনে রেললাইনে পাথরের স্বল্পতাসহ ট্র্যাকে প্রচুর ঘাস রয়েছে। ট্র্যাকের অবস্থা একেবারেই ভালো নয়। অধিকাংশ স্থানেই অ্যালাইনমেন্ট ঠিক নেই। ১০-১২ বছরে এ লাইনে কোনো টেম্পিং করা হয়নি। টেম্পিং এবং ট্র্যাকের অ্যালাইনমেন্টসহ জরাজীর্ণ লাইনের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ওই সেকশনে সব ট্রেন গতি কমিয়ে চালাতে হবে।’ প্রতিবেদনটির বয়স ১ বছর হতে চলল; কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

যদিও কেউ কেউ বলছেন, রেললাইন নয়, দুর্ঘটনার কারণ হল আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া ইঞ্জিন ও বগি। এ দ্বিমতটি বিবেচনায় নিয়েও বলতে পারি, রেলওয়ের অবস্থা নাজুক। আমরা সমস্যা চিহ্নিত করতে পারছি ঠিকই; তবে তার হয় কোনো সুরাহা করতে পারছি না, নয়তো সুরাহা করছি না।

কেন এমনটি হচ্ছে, কী করতে হবে? এমন প্রশ্নের জবাব দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। তার মতে, ‘রক্ষণাবেক্ষণে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নেই, প্রকল্পে সেটা আছে। তাই বড় প্রকল্পে মনোযোগ বেশি। মাঠপর্যায়ে লাইন, সেতু মেরামতে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে রেলে বর্তমানে যে সম্পদ আছে, তা দিয়েই যাত্রীসেবা পরিবহন ও সেবা কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। শুধু কেনাকাটায় টাকা খরচ না করে রক্ষণাবেক্ষণে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।’

রেলওয়েকে নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করার চেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে আমার চোখে পড়ে, আসলে আমরা রেলের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করিনি। এর জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট সরকারকে দায়ী করার সুযোগ নেই। দীর্ঘ ৪৮ বছরে আমরা রেল নিয়ে আলাদাভাবে কিছু ভাবিনি। ভাবিনি বলেই আজ পদে পদে খেসারত দিতে হচ্ছে। ১৫ নভেম্বর ১৮৬২ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার পথ তৈরি দিয়ে বাংলাদেশে রেলযাত্রা শুরু।

চওড়া ছিল ১৬৭৬ মিমি, যাকে আমরা ব্রডগেজ বলি। ৪ জানুয়ারি, ১৮৮৫-তে আরও ১৪.৯৮ কিলোমিটার লাইন বসানো হল, যা চওড়ায় ছিল ১০০০ মিমি, যাকে আমরা মিটার গেজ বলে জানি। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে ৬৬০ কিলোমিটার রেললাইন ব্রডগেজ আর মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে ১৮৩০ কিলোমিটার মিটার গেজ লাইন এবং ৩৬৫ কিলোমিটার হল ডুয়াল গেজ ট্র্যাক। বর্তমানে আমাদের মোট রেলপথ ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার। এ পথের মধ্যে ৪৮৯টি স্টেশনে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেবার কাজ সম্পন্ন হয়।

যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে আকাশ পথটি উল্লেখ করার মতো নয়। নৌপরিবহনের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণ সময়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কিলোমিটার এবং বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার পথ ব্যবহার করতে পারি। যদি কার্গো জাহাজ হয় সে ক্ষেত্রে এই পথ ৩ হাজার কিলোমিটারের বেশি নয়।

আবার যদি সড়কপথকে বিবেচনায় নিই তাহলে দেখব মোট ২১ হাজার ১১৮ কিলোমিটার পথের মধ্যে হাইওয়ে, যাকে ‘ঘ’ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, তার দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৭৯০ কিলোমিটার এবং সড়ক সংখ্যা ৬৭। আঞ্চলিক ১২১টি সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ২০৬ কিলোমিটার, এদের আমরা চিহ্নিত করি ‘জ’ দিয়ে। আরেকটি অংশ আছে জেলা সড়ক, চিহ্ন ‘ত’, এর দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ১২১ কিলোমিটার এবং এর সংখ্যা ৬৩৩।

আমাদের নৌপথ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। রাজপথের অবস্থাও বেহাল- যেভাবে গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে তাতে অতিরিক্ত চাপ নিতে পারছে না। দীর্ঘ সময় ধরে ৪ লেন করতে করতে ৬ লেনের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ হাইওয়েগুলো তৈরি করা হচ্ছে ১৫-২০ টন ভার সক্ষম করে, অথচ সেখানে একটি ট্রাক ৪৫-৫০ টন মালামাল পরিবহন করে।

ফলে দু-চার মাস যেতে না যেতেই সড়কগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা। সরকারি হিসাবমতে, গত এক দশকে ২৫ হাজার ৫২৬ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। পঙ্গুত্ব নিয়ে ধুঁকছেন ১৯ হাজার ৭৬৩ জন। সরকারি হিসাবমতে, প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা গড়ে ৭। তবে বেসরকারি হিসাবমতে এ সংখ্যা ১২-১৩।

গেল ঈদেই প্রাণ হারিয়েছেন ১২৬ জন। সারা বছর ধরেই চলছে নামকাওয়াস্তে রাস্তা মেরামতের কাজ। এর যেন বিরাম বলতে কিছু নেই। যে কারণে সড়কপথের অতিরিক্ত চাপ কমানোর উপায় খুঁজতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের রেলপথ সম্পর্কে নতুনভাবে, আন্তরিকভাবে ভাবার সময় এসেছে। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

বর্তমান ব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি ব্যাপক সম্প্রসারণের কথা মাথায় নিতে হবে। সিঙ্গেল লাইনগুলোকে ডাবল লাইনে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন। এর জন্য নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। এখনও রেললাইনের অধিগ্রহণকৃত জমি গড়ে ১০০ ফুট চওড়া। যদি রেলওয়েকে জনপ্রিয় ও আস্থায় রূপ দেয়া যায় তাহলে বাংলাদেশ রেলওয়েই হতে পারে এ দেশে লাভজনক প্রতিষ্ঠানের এক অনন্য উদাহরণ। এ কথা আমি দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি। আমি দেখেছি, আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে এখন টিকিট পাওয়াই দায়।

কোনো যাত্রী ভাড়ার প্রশ্ন তুলছেন না, টিকিট প্রাপ্তির অনিশ্চয়তার কথা বলছেন। ট্রেনের কার্যকর চাহিদা অনেক বেশি। দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারলে সরকার এ দেশে একটি চমৎকার রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। পাশের দেশ ভারত অবকাঠামোগত দিক থেকে আমাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভারতকে সাম্রাজ্যবাদী দেশ হিসেবেও বিবেচিত করেন। তা সত্ত্বেও ভারতের আমজনতার জীবনমানে বাংলাদেশের তুলনায় আহামরি কিছু পার্থক্য নেই।

ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে রেলব্যবস্থা একটা সংস্কৃতি। আমি বছর পাঁচেক আগে গেদে থেকে ট্রেনে কলকাতার উদ্দেশে যাচ্ছিলাম। কয়েক স্টেশন পরই আমার সামনের লোকটা নেমে পড়লেন। আমার পাশে বসা ভদ্রলোক (গালি দিয়ে) বলে উঠলেন, ব্যাটা টিকিট না কেটে উঠেছিল। আমি বললাম, গালমন্দ করলেন কেন, ওর কাজ ও করেছে। ভদ্রলোক বললেন, না দাদা, আজ ও টিকিট কাটেনি, কাল অন্যজন কাটবে না; রেল লোকসানে পড়ে যাবে, লোকসান পোষাতে ভাড়া বাড়াবে, আর সেই ভাড়া আমাকেই গুনতে হবে।

আমার বুঝতে কষ্ট হয়নি, সে দেশের সাধারণ মানুষ রেলকে জীবনের অংশ ধরে নিয়েছেন, একটা অবলম্বন মনে করছেন। সরকারও সেভাবেই সঙ্গত দিচ্ছে। আমরা কিন্তু রেলকে অবজ্ঞা করে চলেছি। ৪৮ বছরের বাংলাদেশও তেমন কিছু ভাবেনি।

অভিযোগ উঠেছে, এ দেশের রেলব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করার পেছনে বাস-ট্রাক মালিকদের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। আমার কাছে এর কোনো প্রমাণ নেই; কিন্তু প্রশ্ন আছে। বছর কয়েক আগেও ময়মনসিংহ থেকে সকালের ট্রেন ধরে মানুষ ঢাকায় অফিস করে বিকালের ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরে যেতেন। শোনা যায়, বাস মালিকদের চাপে ট্রেনের সিডিউল পরিবর্তন করা হয়েছে, তাকে বাসেই আসতে হবে।

বাস্তব সত্য হল এই যে, রেলওয়ের অবস্থা ভালো হলে বাস-ট্রাক মালিকদের পথে বসার কোনো আশঙ্কা নেই। রেল শুধু সড়কপথের বাড়তি চাপটুকুই সামাল দেবে। তাই সরকারকে গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সার্বিক জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় নিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×