দুর্নীতি থেকে উত্তরণের কি কোনো পথ নেই?

  মনজু আরা বেগম ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি আমাদের জীবন ও সমাজকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়িয়ে অসহনীয় পর্যায়ে গেছে এবং যাচ্ছে। দেশে এমন কোনো খাত নেই যেখানে দুর্নীতি হচ্ছে না। পৃথিবীর সব দেশেই দুর্নীতি হয়। দুর্নীতি যুগে যুগে হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু সেটার একটা মাত্রা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে এ মাত্রা সীমাহীন পর্যায়ে চলে গেছে। গত ২৭ জুন দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত ‘রংপুর মেডিকেলে নজিরবিহীন দুর্নীতি, কার্যাদেশের ৪ দিনের মাথায় বিল পরিশোধ’। আটটি জেলা নিয়ে গঠিত বিভাগীয় শহর রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের করুণ চিত্র গত ২৪ জুন ’১৯ তারিখে যুগান্তরে ‘স্বাস্থ্যখাতে এ কী দুরাবস্থা’ কলামে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা কিছুটা তুলে ধরেছিলাম। ২৭ জুনের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী বিষয়টি আরও স্পষ্ট হল। বোঝা গেল রংপুর মেডিকেল কলেজের এ করুণ চিত্রের রহস্য। রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ৫ কোটি টাকা প্রদান করা হলেও সোয়া তিন কোটি টাকাই লোপাট করা হয়েছে। যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কার্যাদেশ দেয়ার ৪ দিনের মাথায় জাপান, জার্মানি, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কার্যাদেশ দেয়ার মাত্র ৪ দিনের মধ্যে বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক যোগসাজশে যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্য থেকে ৪/৫ গুণ মূল্য বাড়িয়ে এ বিল নেয়া হয়েছে। হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধানদের চাহিদা অনুযায়ী যন্ত্রপাতি সরবরাহের কথা থাকলেও তা না করে ঠিকাদারদের মর্জিমাফিক হাসপাতালের জন্য প্রয়োজন আছে কিনা তা যাচাই না করেই যন্ত্রপাতির তালিকা প্রস্তুত করে সরবরাহ করা হয়েছে। যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে ৫ কোটি টাকার মধ্যে সোয়া ৩ কোটি টাকা হরিলুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আমরা এ কোন্ দেশে বাস করছি? সাধারণ গরিব-দুঃখী মানুষের টাকা মেরে হাসপাতালগুলোর দুরবস্থা সৃষ্টি করেছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এসব দুর্নীতির কারণে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। যা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। এক কথায় এটাকে হাসপাতাল বলা যায় না। একই দিনের পত্রিকায় লিড নিউজ, কেরানির স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ২৬৩ কোটি টাকা। এক কোটি দুই কোটি নয়, একেবারে শত শত কোটি টাকা! দুদকের হিসাবে এর পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা। দুদকের অনুসন্ধান টিম দেখতে পায় কেরানি আবজালের কয়েকটি ব্যাংক হিসাব থেকে বিভিন্ন সময় ক্লিয়ারিং ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিশাল অংকের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। যার পরিমাণ ২০ কোটি ৭৪ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকা। তথ্যমতে, আবজাল সর্বসাকুল্যে বেতন পেতেন ৩০ হাজার টাকা। যে টাকা দিয়ে রাজধানী শহরে বাড়িভাড়া ও ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচসহ দৈনন্দিন খরচ মেটানোর কথা নয়; কিন্তু সেখানে তিনি হ্যারিয়ার জিপে চড়ে বেড়াতেন। তার স্ত্রীর নামে উত্তরায় ৫টি বাড়িও আছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে ২৪টি প্লট ও সেই সঙ্গে ফ্ল্যাট। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে, তার বাড়ি রয়েছে। দেশে-বিদেশে রয়েছে বাড়ি, মার্কেটসহ অনেক সম্পদ। পত্রিকান্তরে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কেরানি আবজালের বর্তমান বয়স মাত্র ৪৫ বছর। বাড়ি ফরিদপুরে। লেখাপড়াও তেমন একটা নেই। মাত্র তৃতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দৈনিকভিত্তিক মজুরিতে কাজ করা একজন কর্মচারী কী করে এত বিশাল সম্পদের মালিক হতে পারেন এরকম একটি খবর অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটিই সত্যি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতির কথা আমার সবাই জানি। কিন্তু একজন কেরানির পুকুর চুরির খবর আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তোলে।

দুর্নীতি কোন্ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকলে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির স্থান মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা অর্থাৎ ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থও লোপাট হয়ে যাচ্ছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদক কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা যায়, ঢাকা জেলা পরিষদ ঢাকা জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার জন্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ঢাকা জেলা পরিষদের নিজস্ব তহবিল থেকে ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করে। কিন্তু এই প্রতিবেদক সরেজমিন তদন্ত করে দেখতে পায়, ঢাকা-১৪ আসনের জন্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বরাদ্দকৃত তালিকায় কল্যাণপুরে ১২টি মসজিদের মধ্যে ৪টি মসজিদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই আসনের ১৮৩টি মসজিদের মধ্যে অনেক মসজিদের কোনো ঠিকানা কিংবা হোল্ডিং নাম্বার নেই। অথচ কাজ সমাপ্ত দেখিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়ে ২২ কোটি টাকাই তুলে নিয়েছে জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরকম দুর্নীতির আরও খবর পত্রিকান্তরে জানা যায়। বরিশালের আগৈলঝাড়া সদর উপজেলায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ কর্তৃক সড়ক উন্নয়নের নামে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সে অনুযায়ী রাস্তার কাজও হয়। কিন্তু এর পরদিনই রাস্তার পুরো কার্পেটই উঠে যায়। এরকম পুকুর চুরি, পাহাড় সমান দুর্নীতির খবর প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে আমরা প্রতিদিনই পাচ্ছি। কিন্তু এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তা জানতে পাচ্ছি না। ফলে অনেকে জিরো থেকে হিরো বা বলা যায় একবারে শূন্য থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন। একদিকে একটা শে ণি দুর্নীতির মাধ্যমে রাতারাতি বিশাল অর্থ বৈভবের মালিক হচ্ছেন, কর ফাঁকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কস্টার্জিত অর্থ থেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিরাট করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে সমাজে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে।

আমরা জানতাম এ সরকার প্রবীণবান্ধব সরকার। প্রবীণদের কল্যাণের কথা তারা সবসময়ই বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সদ্যসমাপ্ত বাজেটে সরকার অবসরপ্রাপ্ত, প্রবীণ, যাদের আয় রোজগারের অন্য কোনো সংস্থান বা ব্যবস্থা নেই, শুধু সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে যাদের দুবেলা খাওয়ার সংস্থান করতে হয়, তাদের মুনাফা থেকে ১০% উৎসে কর কেটে রাখার নিয়ম করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করছেন, দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করছেন তাদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে তা জনগণ জানতে পাচ্ছে না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা আরও বেশি এগিয়ে যেতে পারতাম যদি দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা হতো। উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট না হতো। কিছুসংখ্যক দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় যাদের বেতন-ভাতা আসে তারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কথা কতটুকু ভাবেন বা তাদের সেবা প্রদান করেন? এদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না নেয়ার ফলে সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলেছে। বর্তমান সরকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিলেও দুর্নীতি অনেকের পিছু ছাড়ছে না। লোভের মাত্রা দিন দিন যেন বেড়েই যাচ্ছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাগাম এখনই টেনে না ধরলে আমরা হয়তো আবারও দুর্নীতিতে প্রথম স্থান অধিকার করব। সৎ, নিষ্ঠাবানরা হতাশাগ্রস্ত হবেন। একসময় এদের ভিড়ে হারিয়ে যাবেন। কাজেই আর দেরি না করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতির কল্যাণে এগিয়ে এসে আন্তরিকতার পরিচয় দেবেন, এটাই সাধারণ সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ আশা করে।

মনজু আরা বেগম : গবেষক, সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×