মিঠে কড়া সংলাপ

সুখী হওয়া এবং সুখে থাকা

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

সারা বিশ্বে কোন্ দেশের মানুষ কতটা সুখী সে বিষয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে এবং বছর দুয়েক আগে সেসব ফলাফলের একটিতে বাংলাদেশকেও সুখী মানুষদের অন্যতম একটি দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে!

উল্লেখ্য, এসব গবেষণা ও জরিপে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের যাপিত জীবনে দেশে আইনের শাসন, বাসস্থানের সুবিধা, খাদ্যের পর্যাপ্ততা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা, রাস্তাঘাটের অবস্থা বা চলাচলের সুবিধা, জানমালের নিরাপত্তা, চিত্তবিনোদন সুবিধা, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়। আর সেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও সুখী মানুষদের অন্যতম একটি দেশ হিসেবে দেখানোর ফলে সেদিন খানিকটা অবাকই হয়েছিলাম বটে!

মনে হয়েছিল, কোনো সুখী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত মতামতই হয়তো উপরোক্ত জরিপ বা মতামতে প্রতিফলিত হয়েছে। সার্বিক জনগোষ্ঠীর সুখ-দুঃখের প্রতিফলন হলে বাংলাদেশকে সুখী মানুষদের দেশ বলা যেত কিনা সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

কারণ পত্রপত্রিকাসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় নিত্যদিনের খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, হত্যা, গুম, সড়ক দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি অঘটনের দেশের মানুষদের সুখী মানুষ বলা যায় কেমন করে?

আমাদের দেশটি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা জনবহুল দেশের তালিকার প্রথম দিকে অবস্থান করায় এমনিতেই এটি একটি সমস্যাসংকুল দেশ। তার ওপর রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, সম্পদের অসম বণ্টন, দুর্নীতি ইত্যাদি কারণে দেশটির একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতায় জর্জরিত।

এ দেশে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সম্পদের পাহাড়, অন্যদিকে বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর নুন আনতে পানতা ফুরোয়। এ অবস্থায় উপরোক্ত বৃহৎ জনগোষ্ঠী যে সুখী জীবনের অধিকারী নয় সে কথা বলাই বাহুল্য। কারণ শিক্ষা, চিকিৎসা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা কঠিন সংগ্রাম এবং কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি।

চিকিৎসা বলতে তারা যা পান, তা ওই সরকারি হাসপাতালের একটি প্যারাসিটামল বা এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ট্যাবলেট মাত্র! সেখানে গণহারে লাইন দিয়ে আউটডোরে একজন ডাক্তারের সাক্ষাৎ পেলেও সেই ডাক্তারের পক্ষে রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করা সম্ভব হয় না। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তো দূরের কথা, সাধারণ জরুরি ধরনের ওষুধপত্রও সরকারি হাসপাতালে মেলে না!

ওই প্যারাসিটামল জাতীয় দু’একটি ওষুধ ধরিয়ে দিয়ে দরিদ্র রোগীদের বাইরের দোকান থেকে অন্যান্য ওষুধ কিনে খেতে বলা হয়। ফলে দরিদ্র জনসাধারণের অনেককেই ওইসব প্রেসক্রিপশন হাতে রাস্তার মোড়ে বা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওষুধ কেনার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করতে দেখা যায়। তাদের অনেকে আবার বাড়ির আশপাশের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদেরও দ্বারস্থ হন।

আর এই হল এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিকিৎসা সুবিধার অবস্থা! কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকার তাদের জন্য ভালো কিছু ওষুধের বরাদ্দ দিলেও সেক্ষেত্রে ‘বেড়ায় খেত খায়’। ফলে নিরীহ দরিদ্র মানুষের ভাগ্যে ওষুধ বলতে কিছু জোটে না। এখনও তাদের প্রায় বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়।

২.

অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষার ক্ষেত্রেও দরিদ্র মানুষদের একই অবস্থা। ৪-৫ জন বা ৬-৭ জন মানুষের একটি পরিবারে একজন হাড়ভাঙা খাটুনি করে কিছু আয়-রোজগার করলেও তা দিয়ে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা এসব কিছু মেটানো সম্ভব হয় না। এসব পরিবারে একজন বা দু’জন শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের জামা-কাপড় দিয়ে, পেটের ক্ষুধা মিটিয়ে স্কুল-কলেজে পাঠানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে এসব ক্ষেত্রেও তারা সুখের মুখ দেখেন না।

তারা নিজেরা বা তাদের সন্তানেরা কখনও একটুকরো ভালো কাপড় কিনে তা পরিধান করে সাধ-আহ্লাদ মেটাতে পারেন না। আর খাদ্য-খাবার বলতে তারা যা খেয়ে থাকেন তা ওই ক্ষুণ্ণিবৃত্তি নিবারণমাত্র। এসব খাদ্য খেয়ে তারা কোনোমতে তাদের পেটের ক্ষুধা নিবারণ করলেও পরিবারের সবাইকে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে হয়। ফলে অসুখ-বিসুখ-জ্বরা-ব্যাধি ওইসব পরিবারের নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকে। আবার একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী দিন কাটায় অনাহারে-অর্ধাহারে।

এত গেল দরিদ্র শ্রেণির মানুষের জীবনযাপনের একটি খণ্ডচিত্র। এবারে এ দেশের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের যাপিত জীবন নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। দেখা যাক উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলোয় দেশের সামর্থ্যবান লোকদের অবস্থা কোথায় এবং কেমন।

মধ্যবিত্ত ও ধনী সম্প্রদায় সাধারণত সরকারি হাসপাতালগুলোয় সেবা গ্রহণে আগ্রহী নন বা তারা সরকারি হাসপাতালে যান না। মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্তরা তাদের নিজ নিজ এলাকা বা শহরের প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারদের কাছে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে থাকেন। আর জটিল কোনো রোগব্যাধি ধরা পড়লে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনে তারা রাজধানীর কোনো বড় হাসপাতালে চলে আসেন।

আর এ জন্য যে অর্থকড়ির প্রয়োজন, তাৎক্ষণিক তাদের সঞ্চয়ে তা না থাকলেও ধারদেনা বা কিছু বিক্রি করে হলেও তারা এক আধ লাখ টাকা হাতে করে ঢাকায় চলে আসেন। আবার ধনী সম্প্রদায় তো সামান্য রোগব্যাধির চিকিৎসায়ও রাজধানীর বড় বড় ক্লিনিক-হাসপাতালের মধ্যে যেগুলো বেশি নামকরা, সেসব ছাড়া অন্যান্য হাসপাতালের দিকে ফিরেও তাকান না!

এ দেশে চিকিৎসা করাতে হলে তারা দেশের সেরা স্টারমার্কড দু’একটি হাসপাতালকেই বেছে নেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা তাদের সঞ্চিত অর্থ নিয়ে অথবা ধারদেনা বা সহায়সম্পদ বিক্রি করে রাজধানীর প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকে ছোটেন, তারা কি সেখানে সুচিকিৎসা পান? আবার যেসব ধনী ব্যক্তি দেশের সেরা হাসপাতালগুলোয় ভিড় জমান, তারাও কি সেখানে সেরা চিকিৎসা পেয়ে থাকেন?

কারণ এসব নিয়েও ওইসব রোগীর মনেই বিস্তর প্রশ্ন, এন্তার অভিযোগ আছে। ভুল চিকিৎসা, অপচিকিৎসা, অবহেলা ইত্যাদি কারণে মৃত্যু ঘটায় ওইসব রোগীর আত্মীয়স্বজন, শুভানুধ্যায়ীরাও ক্ষিপ্ত হলে, মিডিয়া সরব হলে আমরা যা দেখতে, শুনতে বা বুঝতে পারি তাতে করেও মনে হয় প্রচুর অর্থবিত্ত খরচ করেও এ দেশে সুচিকিৎসা পাওয়া সম্ভব নয়।

আর তাই তো এসব রোগীর বৃহৎ অংশই দেশে চিকিৎসা না করিয়ে বিদেশে চলে যান। চিকিৎসার জন্য ভারতের ভিসা গ্রহণের ভিড়ভাট্টা, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের দুর্মূল্য টিকিটের দুষ্প্রাপ্যতা তো এসবেরই প্রমাণ বহন করে, নাকি? সুতরাং চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এ দেশের মধ্যবিত্ত, এমনকি ধনী সম্প্রদায়ও যে সুখী- সে কথাটিই বা বলি কেমন করে?

৩.

মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্তদের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল, নুন, তেল ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করা সম্ভব হলেও এ দেশে তারা তা সঠিক বা ন্যায্যমূল্যে ক্রয় করতে পারেন না, বা সঠিক দ্রব্যও পান না। কারণ একশ্রেণির ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ানোসহ ওজনে কারচুপি, ভেজাল দ্রব্য বিক্রি ইত্যাদি অপকর্ম করে থাকেন। তাই সঠিক মূল্যে সঠিক দ্রব্য ক্রয় করা তাদের কাছে অধরাই থেকে যায়।

এসব ঠগবাজ ব্যবসায়ীর কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কষ্টার্জিত অর্থ ক্রয়মূল্য হারিয়ে ফেলে। আবার সম্পদশালী শ্রেণির জন্য বাড়তি মূল্য বা ওজনে কারচুপি তেমন কোনো সমস্যা না হলেও নির্ভেজাল খাদ্য সংগ্রহ করা এ দেশে তাদের জন্যও একটি বিরাট সমস্যা। কারণ খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল দেয়া এ দেশে এখন একটি নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

চাল, ডাল, নুন, তেল, দুধ, ফল, শাকসবজি- সবকিছুতেই ভেজাল মেশানো হচ্ছে। শাকসবজি, ফলমূল সজীব রাখতে, মাছ-মাংসকে টাটকা দেখাতে ফরমালিন বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণ চাল মেশিনে কেটে সরু বা মিহি চাল বানানো হচ্ছে, আবার কেমিক্যাল দিয়ে তা পালিশ করে চকচকে করা হচ্ছে। ডিম, দুধ, ঘি, তেলসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যদ্রব্যেই ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে।

এ অবস্থায় যাদের হাতে টাকা আছে অর্থাৎ খাদ্যদ্রব্যসহ ভোগ্যপণ্য ক্রয়ে যাদের অর্থবিত্তের কোনো সমস্যা নেই, তারাই বা এসব কিছু খেয়ে-পরে এ দেশে কতটা সুখে আছেন সে বিষয়টিও ভেবে দেখার মতো। আবার তাদের সন্তানদের যেসব স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়, সেসব স্থানেও এখন ভীষণ ভেজাল। সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশও দূষিত হয়ে পড়েছে।

এ স্বল্প পরিসরে এ সবকিছু নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ না থাকায় যে উপসংহার টেনে লেখাটি শেষ করতে চাই তা হল- একজন পরিচিত ব্যক্তি আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘ভাই আমার বয়স বেশি না হয়ে গেলে চেষ্টা করে আমি এ দেশ ছেড়ে চলে যেতাম।’

তাকে বলেছিলাম, ‘কেন এ দেশে আবার কী হল?’ প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই আমি আজ প্রায় ৫০ বছর ধরে দিনরাত পরিশ্রম করে বছরে ১২-১৪ লাখ টাকা আয়কর প্রদান করি এবং পাই পাই হিসাব করে সরকারকে সঠিক অঙ্কের আয়কর প্রদান করলেও মনে শান্তি পাই না।

কারণ আমার নিজের এবং দেশের অন্যান্য মানুষের আয়করের অর্থ যেভাবে, যে পথে খরচ করা হয় তা দেখে আমি ভীষণ কষ্ট পাই। বিশেষ করে রাস্তাঘাট নির্মাণে যেসব অর্থ ব্যয় করা হয় এবং বছর না ঘুরতেই সেসব রাস্তা দিয়ে যেতে কোমর ব্যথা হয়ে আমার যখন বারোটা বেজে যায়, তখন আমি খুবই দুঃখ পাই, ক্ষুব্ধ হই।

আবার দেশের অফিস-আদালত, থানা-পুলিশসহ সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে যখন আইনের শাসনের অভাব দেখি বা সুশাসন বলতে কিছু দেখতে পাই না, তখনও আমার ভীষণ খারাপ লাগে। তাদের আচার-আচরণ দেখে মনে ভীষণ কষ্ট পাই। তাছাড়া নিত্যদিনের হত্যা, ধর্ষণ, গুম, অপহরণ ইত্যাদি ঘটনাসহ একদলের প্রতি অপর দলের অমানবিক আচরণও আমাকে মর্মাহত করে।’

সুধী পাঠক, এ দেশের মানুষের সুখী হওয়া এবং সুখে থাকা শীর্ষক লেখাটির মর্মকথা আমি বোঝাতে পেরেছি কিনা জানি না, না পারলে সে অক্ষমতার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×