বঙ্গবন্ধুর ক্রমবর্ধমান প্রাসঙ্গিকতা

  অমিত রায় চৌধুরী ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

মত-পথ নির্বিশেষে আজ যে সত্যটি বাঙালি মননে প্রবল গরিষ্ঠতায় প্রতিষ্ঠিত, ইতিহাসের যে ছত্রটি কূটতর্কের চর্চিত সীমানার বাইরে- তা হল, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একটি অভ্রান্ত, অখণ্ড ও অবিভাজ্য সত্তা।

বঙ্গবন্ধুকে বিস্মৃতির গহিনে ঠেলে দেয়ার সংগঠিত অপচেষ্টা স্পষ্টতই আজ নিষ্ফল, ইতিহাসের মহানায়ককে বিভ্রান্তির ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন রাখার স্পর্ধা ন্যায়ের তীব্র প্রত্যাঘাতে বিদীর্ণ, জাতির জনক যথার্থই আজ এ জনপদের নাগরিক মানসে অনন্য গরিমায় উৎকীর্র্ণ।

ধ্রুপদী রাজনীতির বিশুদ্ধতার প্রতীক বঙ্গবন্ধু মুজিব শুধু এ গাঙেয় ব-দ্বীপে নয়, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভৌগোলিক পরিসীমা ছাপিয়ে এ ক্ষণজন্মা পুরুষের জাগতিক পরিক্রমা আজ বিশ্বের বিস্ময়, জীবনের চেয়ে যা বৃহত্তর, মহত্তর।

আদৌ অত্যুক্তি হবে না যে, পিতার অধিষ্ঠান আজ বাংলার মানচিত্রে, বাঙালির হৃদয় ও মননের সব সত্তাজুড়ে। বাংলার মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর, নগর-বন্দর, ব্যক্তি-দল-গোষ্ঠী হয়ে প্রতিষ্ঠান- সর্বত্রই বঙ্গবন্ধুর বিজয় কেতন।

বঙ্গবন্ধুর স্বরূপ নির্মাণে নান্দনিক শব্দের ছন্দময় মিছিল, বাঙালির রুচি ও আবেগও নিরূপম, ব্যঞ্জনাময়। মুজিবীয় চেতনায় এমন প্লাবিত ক্যানভাস সহসাই আজ কিছু কক্ষচ্যুত প্রসঙ্গ উত্থাপনের তাড়না জোগাচ্ছে।

পিতার অত্যুচ্ছ রাজনৈতিক দর্শন, সাধারণ জীবনযাপন, জনমতকে প্রভাবিত করার সম্মোহনী কারুকাজ, ন্যায়ের সঙ্গে নিবিড় সখ্য কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিস্পর্ধী প্রতিরোধ- এমন সব উচ্চকিত আদর্শিক মাপকাঠিতে রাজনীতির বৃহদাংশ কি আজ খানিকটা নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে- এমন ভাবনার ব্যবচ্ছেদ হয়তো এখনই প্রয়োজন।

সময়ের স্রোতে ভেসে নাগরিকের জীবনবোধ, ধারণার আদল, পার্থিব জগতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়তই হয়তো বদলে চলে। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় রাজনীতি ও অর্থনীতির নতুন সমীকরণ ভাবনার জগৎকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে- এ কথাও সত্যি।

একদিকে যেমন অতি জাতীয়তা, উগ্র রাষ্ট্রীকতা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ সমকালীন রাজনীতিতে জায়গা পেয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ব্যক্তি পরিসরে মানুষ সমাজ থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে; লোভ, স্বার্থপরতা, একাকিত্ব, আদর্শিক শূন্যতা নাগরিক জীবনকে নতুন নতুন সংকটের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কিছু কল্যাণ রাষ্ট্রের উদাহরণ বাদ রেখে বলা যায়- গোটা বিশ্বই হয়তো এ মুহূর্তে এক আদর্শ বিযুক্ত অনিশ্চয়তায় দিশাহীন, অনির্দেশ্য বিভক্তির ধারায় দ্বিধান্বিত।

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হয়তো নানা মানদণ্ডে মানবসভ্যতার ইতিহাসে ব্যতিক্রম হয়ে থাকবে। ধর্মীয় বিভাজনের অক্ষরেখায় জন্ম নেয়া পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে শৈশবকালেই ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা, নিয়মতান্ত্রিক স্বাধিকার আন্দোলনকে একটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে পরিণত করা, অতঃপর ত্রিশ লাখ নরনারীর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নকে সত্যি করে একটি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয় সম্ভব করে তুলেছিলেন যে মহামানব, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে সেই বাংলায়।

শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করা হয়েছে- এমন বৈপরীত্যের উপাদানে পূর্ণ বাঙালির যে মানসবৈশিষ্ট্য তা-ও অনন্য। একজন নেতার অনুপস্থিতিতে তার ছায়াকে আশ্রয় করে একটি সফল জনযুদ্ধ পরিচালিত হওয়া আর তার গর্ভে নতুন সম্ভাবনার মানচিত্র লালিত হওয়ার এমন দৃষ্টান্ত বিরল। আবার প্রবাদপ্রতিম এ মহানায়কের বর্বর হত্যাকাণ্ডের উত্তরপর্বে যে রহস্যজনক নীরবতা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল- তা-ও হয়তো ইতিহাসের পাঠকের জন্য গবেষণার উপজীব্য।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর বিপুলায়তন ঔদার্যে যে পরাজিত খলনায়করা আশ্রয় পেয়েছিল- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বা তৎপরবর্তী সময়ে সেসব মুখোশধারী ভ্রষ্ট আমলা- রাজনীতিকদের অতিসক্রিয়তা এবং একই সঙ্গে সেলিব্রেটেড বাম ও ডান বুদ্ধিজীবীদের একাংশের ব্যাখ্যাতীত উল্লাস- পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও একটি শিক্ষার উপকরণ হয়ে থেকে যাবে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড শুধু সভ্যতার নিষ্ঠুরতম পদস্খলন নয়; একটি রাজনীতি, একটি আদর্শকে সমূলে উৎপাটন করার সুসংগঠিত ষড়যন্ত্রের ফসল। ’৭১-র রণাঙ্গনে জনতার মহাকাব্যিক বিজয়ে কুঁকড়ে যাওয়া পরাজিত শক্তির কাপুরুষোচিত প্রতিশোধের নগ্ন নজির, প্রগতির আলোকরেখায় বাঙালির এগিয়ে চলার অভিমুখকে ঘুরিয়ে দেয়ার সীমাহীন ঔদ্ধত্য।

এ ঘটনা শুধু সদ্যোজাত জাতিরাষ্ট্রের মুক্তির স্বপ্নকে চূর্ণ করেনি, সমাজ কাঠামোর অন্তর্গত বিন্যাসকেও বদলে ফেলেছে; যার অভিঘাত সমাজ মননের গভীরে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকবে বলে মনে হয়। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন, ব্যক্তি-দল-সমাজ-রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক কাঠামো, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে নাগরিকতাবোধ, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনতার অংশীদারিত্ব ও সর্বোপরি তার সামাজিক অনুশীলনের ধারা আলোচনায় উঠে এলে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ও বর্তমান পটভূমিতে ভূমি বাস্তবতার এক তুলনামূলক চিত্র ফুটে উঠতে পারে।

বৈষম্যহীন সমাজ কায়েমের যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ও আর্থসামাজিক বাস্তবতায় কতটা সম্ভব- সে আলোচনায় না গিয়েও মোটাদাগে বলা যায়, বিগত এক দশকে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের সামর্থ্য বেড়েছে, বেড়েছে মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু, দারিদ্র্য কমেছে, নারীর ক্ষমতায়ন নজর কেড়েছে।

শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-শিল্প যোগাযোগ অবকাঠামোর মতো মৌলিক সেবা খাতে রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব বেড়েছে বিস্ময়কর গতিতে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী প্রসারিত হওয়ায় সুবিধা পেয়েছে অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী। আর প্রযুক্তির জগতে তো ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব। জলবায়ু, জ্বালানি, মহাকাশবিজ্ঞান- নতুন প্রজন্মের উপযোগী একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়ার প্রত্যাশায় এসব অপ্রচলিত সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো উন্মেচিত হয়েছে।

দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন, সমুদ্রসীমা বৃদ্ধি কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট প্রজ্ঞা ও পরিণত মনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশ আজ বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত।

অবশ্যই পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতি, আঞ্চলিক সহাবস্থান ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল অঙ্কে বাংলাদেশ যে অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে- তা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণের পথে স্পষ্ট অগ্রগতির সংকেত বহন করে।

তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগুনঝরা কালপর্বে বঙ্গবন্ধু যে সুবিধা পেয়েছিলেন বা সুযোগ সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন নিজ সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টির সাহচর্যে, তা ইতিহাসের একটি আলোকিত অধ্যায় নির্মাণে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে সন্দেহ নেই। আজকের বাংলাদেশে যে চোখ ধাঁধানো অগ্রগতি- তা বৈষয়িক, কূটনৈতিক বা নীতিনির্ধারণী যাই হোক না কেন, সব ক্ষেত্রেই অনুমান করা যায়- তার নিরঙ্কুশ কৃতিত্ব বা দায় জননেত্রী শেখ হাসিনার।

অনেকটা তার একক নেতৃত্বেই দেশ এগিয়ে চলেছে। এটি যেমন অহংকারের; অন্যদিকে অনাগত পরিপ্রেক্ষিত কল্পনায় তা আশঙ্কারও জায়গা তৈরি করে।

ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধু সঙ্গে পেয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এএইচএম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম, অধ্যাপক আবু সাইদ, সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ, আবদুর রাজ্জাক বা তোফায়েল আহমেদের মতো মেধাবী, দেশপ্রেমিক, নিবেদিত একঝাঁক সহযোদ্ধাকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক, বরেণ্য আইনজীবী, নামকরা চিকিৎসক ও প্রথিতযশা সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে তার সাথী করতে পেরেছিলেন।

ফলে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কখনোই ঔপনিবেশিক মানসজাত কর্তৃত্ব দেখানোর সাহস পায়নি। বঙ্গবন্ধু অকপটেই এই সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী, দুর্নীতিবাজ আমলাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে পেরেছিলেন। তিনি তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, তারা স্বাধীন একটি রাষ্ট্রে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, জনগণের প্রভু নন, জনগণই রাষ্ট্রের মালিক।

বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের চমৎকার একটি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছিলেন, চর্চাও করেছিলেন সততার সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, গরিষ্ঠের মতই মুখ্য নয়, একজনও যদি ন্যায্য কথা বলে, তা-ও গ্রাহ্য হতে পারে। একক বিরোধী সদস্য হিসেবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে বঙ্গবন্ধু সংসদে যথেচ্ছ বিরোধিতার পরিসর উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। বিরুদ্ধ মতের প্রতি তার এই সহিষ্ণুতা, বিরোধীদের প্রতি শিষ্টাচার বঙ্গবন্ধু চরিত্রে অনন্য মাত্রা সংযোজন করেছিল।

অথচ পরিবর্তিত বাস্তবতায় ব্যক্তি থেকে সমাজ- সব ক্ষেত্রেই অসহিষ্ণুতার চিহ্ন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে। ন্যায্য কথা বলার চেয়ে সুবিধাবাদী সমর্পণই হল আধুনিক প্রবণতার বৃহত্তর লক্ষণ।

সংগঠনের প্রশ্নেও বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও বর্তমান ধারার মধ্যে বিভাজনরেখা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। জনকের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিই ছিল ত্যাগ, ন্যায় ও সাম্য। দেশপ্রেম, সারল্য ও ঋজুতা ছিল তার চরিত্রের ভূষণ। যোগাযোগের অনন্য শৈলী, নমনীয়তা, ঔদার্য, বিনয়, শিষ্টাচার ও দুর্লভ চারিত্রিক দৃঢ়তা বঙ্গবন্ধুকে অসম্ভব জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

জীবনযাপনে বঙ্গবন্ধুকে অন্য দশজন সাধারণ বাঙালি থেকে আলাদা করা কঠিন ছিল। চলনে-বলনে, পোশাকে-পরিচ্ছদে, ভাবনায়-কল্পনায় তিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর বাঙালি। বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি তাকে কখনও আকর্ষণ করেনি। সুরম্য, সুরক্ষিত বঙ্গভবন ছেড়ে তিনি নেমে এসেছিলেন বত্রিশ নম্বর ধানমণ্ডির নিজস্ব বাড়িতে।

লক্ষণীয় যে, বিলাসবহুল জীবনযাপনে শুধু বঙ্গবন্ধুর অনাগ্রহ ছিল তাই নয়, তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরাও একই আদর্শে, অনুরূপ জীবনচর্চায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এ কথা ঠিক যে, সমকালীন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় নিরাপত্তার প্রশ্নটি অতীতের তুলনায় এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল হয়ে উঠেছে।

এ পটভূমিগত সত্যকে আমলে এনেও বলা যায়, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক কর্মীর বৃহত্তর অংশের মনোজগৎ সামন্ততান্ত্রিক দেউলিয়াত্বে আচ্ছন্ন। ভোগবাদী, কর্তৃত্বপরায়ণ, প্রদর্শনবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাটি ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করছে বলে মনে হয়। নিজ দলের আদর্শ, নীতি, কৌশল কিংবা নিজ দেশের ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব, সভ্যতার ক্রমবিকাশ, এমনকি সমকালীন ভূ-রাজনীতি যদি একজন রাজনৈতিক কর্মীর আগ্রহের বিষয়বস্তু না হয়- তবে তা কখনোই সমাজের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

আর সামগ্রিক বিচারে রাজনীতির এ অন্তঃসারশূন্যতা ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বা কারাগারের রোজনামচায় আমরা যে অনন্য সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীর দেখা পাই, তাকে অবক্ষয়িত মূল্যবোধে বিপন্ন বাস্তবতায় রূপকথার রাজপুত্রের মতোই মনে হয়। সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি- সবকিছুকে এক বৃহৎ দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচারের অনন্য দৃষ্টিকোণ প্রতিফলিত হয় তার অনুপম রচনায়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সততা, আদর্শিক ঋজুতা অথবা চিন্তার স্বচ্ছতা একজন নবীন রাজনীতিকের কৌতূহলের বিষয়বস্তু হতে পারে। ঐতিহাসিক সত্য এই যে, বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক বিভক্তিকে সমর্থন করেছিলেন। মনপ্রাণ দিয়ে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

প্রত্যাশা ছিল, পূর্ব বাংলার দরিদ্র জনসাধারণ লাভবান হবে। দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানি শাসকদের ঔপনিবেশিক, কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা বঙ্গবন্ধুকে হতাশ করে। তিনি বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের আধিপত্যবাদী শাসকগোষ্ঠী শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ধর্মীয় বিভাজনকে উসকে দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু চকিতে তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ ও লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলেন।

অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে হৃদয়ে ধারণ করে সামাজিক ন্যায়প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্পে ৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ৭১-র মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে সফল পরিণতির পথে এগিয়ে নিয়ে যান। কোনো প্রলোভন, মৃত্যুভয় তাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে অনেকের মনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল, নিভৃত বন্দিদশায় ধূর্ত পাকিস্তানি শাসকচক্র একটা কনফেডারেশনের জন্য বঙ্গবন্ধুর ওপর নানারকম কৌশল ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করবে।

১০ জানুয়ারি ৭২ বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে প্রমাণ করে দেন তিনি কালজয়ী মহামানব, পার্থিব কোনো লোভ বা চাপ তার আদর্শিক লক্ষ্য থেকে তাকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারেনি।

শান্তি, ন্যায় তার কাছে কোনো কৌশল ছিল না, এটি ছিল তার ব্রত। সহজ-সরল-শুদ্ধাচারী জীবনযাপন করেই বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিপক্ষে, সুশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক বলে ডিভি লটারির লাইনে দাঁড়ানো বা বাংলা ভাষার জন্য ভাষণে প্রাণপাত করে সন্তানকে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পাঠানো কিংবা মঞ্চে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রের জন্য গলা ফাটিয়ে নিজের মনে ও পরিপার্শ্বে লোভ ও ঘৃণা পুষে রাখার মতো আদর্শিক ভণ্ডামি বা সাংস্কৃতিক দ্বিচারিতা বঙ্গবন্ধুর অভিধানে ছিল না।

আজকাল দেখা যায়, নেতার ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা ও অনৈতিকতার সম্পর্ক বিপ্রতীপ নয়; বরং তারা একে অপরকে পুষ্ট করে। জনপ্রিয়তার ফুল বিছানো পথের দুই পাশের নীতি ও যুক্তিকে ধ্বংস করতে করতে নেতা ক্ষমতার আসনে বসেন; বঙ্গবন্ধু অন্তত তা করেননি।

বঙ্গবন্ধু জনতার উদ্দেশে এক ভাষণে বলেছিলেন, আপনারা সেদিন রক্ত দিয়ে আমাকে মুক্ত করে এনেছিলেন। মনে আছে আমি বলেছিলাম, এ রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়েই শোধ করব। হ্যাঁ, তিনি তাই করেছিলেন।

মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে ঘাতকরা ভেবেছিল তার অস্তিত্বকে তারা নিশ্চিহ্ন করতে পারবে। কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ বিধান এই যে, যার সারা জীবনের ত্যাগের ভস্ম থেকে উঠে এসেছে লাল-সবুজ পতাকা, যে দেশটি সব প্রতিকূলতা পায়ে ঠেলে তার স্বপ্নের আলোকরেখায় শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে দ্রুতগতিতে ধাবমান, সেই দেশটির মানচিত্র বঙ্গবন্ধুর সৌম্য-সুন্দর মুখাবয়ব ধারণ করে এগিয়ে চলবে যুগ থেকে যুগান্তরে, অনন্তের পথে।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×