দেশপ্রেমের চশমা

মনের পশুর কোরবানি জরুরি

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মনের পশুর কোরবানি জরুরি

কোরবানি মুসলমানদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। হজরত ইবরাহিমকে (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহতায়ালা তাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন।

নিজ পুত্র হজরত ইসমাইলকে (আ.) রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি সে পরীক্ষায় পাস করেন।

সৃষ্টি করেন আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ ত্যাগ করার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। কিন্তু আল্লাহতায়ালা হজরত ইসমাইলের পরিবর্তে হজরত ইবরাহিমকে দিয়ে পুত্রের পরিবর্তে প্রিয় বস্তুর প্রতীক হিসেবে পশু কোরবানি করান। তখন থেকে মুসলমানরা এ ঘটনাকে স্মরণ করে ঈদুল আজহার দিন পশু কোরবানি করে থাকেন।

কোরবানির উদ্দেশ্য হল ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু মনে করে প্রতীকী অর্থে পশু কোরবানি করা। এ ধর্মীয় উৎসব তাই ত্যাগের মহিমা বিজড়িত।

আল্লাহর জন্য, তার সৃষ্টির জন্য, মানবতার জন্য ত্যাগেও যে আনন্দ আছে, তা ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এ উৎসবে প্রতিফলিত হয়। সে জন্য কোরবানির পশুর সব মাংস কোরবানিকারীকে খাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।

এর এক-তৃতীয়াংশ গরিব মিসকিনকে, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়স্বজনকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কোরবানির উদ্দেশ্য পশু জবাই করে তার মাংস রান্না করে খাওয়া-দাওয়া করা নয়।

এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে, আল্লাহর পথে, তার সৃষ্টির কল্যাণের পথে সর্বোচ্চ ত্যাগের পরীক্ষায় প্রতীকী অর্থে পশু কোরবানি করার মধ্য দিয়ে ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করা। মহান আল্লাহ পাক তো আর কোরবানির মাংস চান না। তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চান যে, তার বান্দারা তার জন্য, মানুষের জন্য, মানবতার জন্য ত্যাগের পরীক্ষায় পাস করতে পারে কি না।

সঠিকভাবে কোরবানির জন্য বেশি দাম দিয়ে বড় গরু কিনে শোডাউন করার কোনো প্রয়োজন নেই। এ কাজ যারা করেন, তারা কোরবানির অন্তর্নিহিত প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে না পেরেই তা করে থাকেন। ‘আল্লাহকে ভালোবেসে তার রাস্তায় ত্যাগের দৃষ্টান্ত হিসেবে আমি কোরবানি করছি’- এমন উপলব্ধি হৃদয়ে স্থান না পেলে সে কোরবানি শুধু গরু জবাই করে মাংস খাওয়ার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

ভুলে গেলে চলবে না, ভালোবাসার ক্ষেত্রে উপহারের দাম বা আকৃতি কোনো ব্যাপার নয়; মূল বিষয় হল, দুই প্রেমিকের পরস্পরের প্রতি হৃদয়ের আকর্ষণ। আমাদের কোরবানি কি আমাদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি তেমন প্রেম, তার সৃষ্টির প্রতি তেমন ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পারছে? যদি না পারে, তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের কোরবানি শুধু পশু জবাই করে মাংস খাওয়ার মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়েছে। প্রকৃত অর্থে আমাদের কোরবানি হয়তো কবুল হচ্ছে না।

আল্লাহপাকের দরবারে আমাদের কোরবানি তখনই কবুল হবে, যখন আমরা যৌথভাবে বনের ও মনের পশুকে একত্রে জবাই করতে পারব। আত্মপ্রচার, গর্ব, অহংকার, নিজেকে বড় করে দেখানো, বড় গরু কিনে শোডাউন করে নিজের বড়লোকি জাহির করার বাসনা মনের মধ্যে নিয়ে একাধিক পশু জবাই করলেও কোরবানি কবুল হবে না।

মনের মধ্যে অন্যের ক্ষতি করে নিজে লাভবান হওয়ার পাশবিকতাকে উজ্জীবিত করে বনের পশু কোরবানি করলে কোরবানি হবে না। বনের পশুর সঙ্গে মনের মধ্যে অন্যকে খুন, ধর্ষণ করার পাশবিকতা থাকলে তাকেও কোরবানির পশুর সঙ্গে জবাই করে দিতে হবে।

বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে ধর্ম পালনের বাস্তবতা ভিন্ন। সাধারণত যে সমাজে মানুষ বেশি ধার্মিক হয়, সে সমাজে চুরি, লুণ্ঠন, ডাকাতি, ধর্ষণ, দুর্নীতি প্রভৃতি হ্রাস পায়। কিন্তু এ দেশে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতা।

একদিকে যেমন মসজিদের সংখ্যা বাড়ছে, মুসল্লির সংখ্যা বাড়ছে; তেমনি তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খুন, গুম, চুরি, ঘুষ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপকর্ম। এখানে মানুষ একদিকে ধর্মকর্ম এবং অন্যদিকে অপকর্ম একসঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে। এমন ধর্মকর্ম করে যে কী ফায়দা পাওয়া যাবে, তা শুধু তারাই জানেন।

এদের অনেকেই নিজেকে বুদ্ধিমান এবং মহান আল্লাহপাককে বোকা মনে করছেন। আল্লাহপাক যে ন্যায়বিচারক, তিনি যে অন্তর্যামী (সামিউম বাছির), তাকে যে ফাঁকি দেয়া যাবে না, সে কথাটি জেনেও এরা ধর্মীয় নৈতিকতাকে বিসর্জন দিচ্ছেন।

তা না হলে ঢাকার মসজিদগুলোতে যেখানে জুমার নামাজে একটু দেরি করে গেলে আর জায়গা পাওয়া যায় না, মানুষ রাস্তায় মাদুর বিছিয়ে নামাজে শরিক হয়; সেখানে এত দুর্নীতি, খুন, গুম, ধর্ষণ হয় কী করে!

কাজেই মানুষ এ দেশে ধর্ম পালন করছে ঠিকই; কিন্তু সে ধর্ম তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে পারছে না। তাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারছে না। এ জন্য মানুষ বুঝতে পারছে না, মানুষকে ভালো না বেসে, তাদের সম্পদ লুট ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে শত শত কোরবানি দিলেও সে কোরবানি কবুল হবে না।

অবশ্য এ ব্যাখ্যা ঢালাওভাবে যে সবার জন্য প্রযোজ্য, এমন দাবি করা যায় না। কারণ, এখনও সংখ্যায় কম হলেও সমাজে কিছু নীতি-নৈতিকতা পালনকারী মানবিক গুণাবলিসমৃদ্ধ ভালো মানুষ আছেন।

ধর্ম পালনকারীদের মধ্যে যদি নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত না হয়; যদি মানবিকতা, সহমর্মিতা সৃষ্টি না হয়, যদি অপরকে বিপদে-আপদে সহায়তা করার মাসসিকতা সৃষ্টি না হয়, তাহলে তেমন ধর্ম পালন তো পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।

আপনি একদিকে ধর্ম পালন করবেন, নামাজ-রোজা করবেন, কোরবানি করবেন; আবার অন্যদিকে নারী নির্যাতন, নারী ধর্ষণ করবেন, তা তো হতে পারে না। একজন ধার্মিক কখনও ধর্ষক হতে পারে না। কাজেই আজ যেসব মাদ্রাসার শিক্ষক নারী ধর্ষণ করছেন, তারা আর যাই হোক, নিজেদের ধর্ম পালনকারী বা ধার্মিক দাবি করতে পারেন না।

এরা হয়তো কোরবানি করছেন, কিন্তু কোরবানির শিক্ষা নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারেননি। এরা হয়তো অনেকের কোরবানির পশু জবাই করে অর্থ উপার্জন করছেন, কিন্তু নিজ মনের পশুকে জবাই করতে পারেননি। এদের জন্য মনের পশু কোরবানি করা বেশি জরুরি। কোরবানির পশুর সঙ্গে নিজের পাশবিকতাকে জবাই করে নতুন করে নৈতিক জীবন গঠন করতে পারলে এদের কোরবানি করা সার্থক হবে।

এ ব্যাখ্যা শুধু মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্য নয়, এ ব্যাখ্যা সবার জন্য প্রযোজ্য। মাদ্রাসা শিক্ষকদের কথা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলার কারণ হল, মাদ্রাসা হল ধর্ম ও নৈতিকতা শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান। এমন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ধর্ম ও নৈতিকতার শিক্ষা দেবেন; অথচ তা না করে এরা নিজেরাই যদি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে শিক্ষার্থীদের দিকে কুদৃষ্টিতে তাকান, তাদের ধর্ষণ করেন, তাহলে মানুষ কাকে দেখে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হবে।

বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ঈদুল আজহা এ দেশের মুসলমানদের কাছে নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। মানুষ বিপদে-আপদে পড়লে বেশি করে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে ডেঙ্গু ও বন্যার প্রকোপ এবং রাজনৈতিক অধিকার হারানোর বেদনার মধ্যে ধর্মের দিকে মানুষের বেশি বেশি ঝুঁকে পড়ার কথা। এ হিসেবে এবার মানুষ এসব বিপদ-আপদের চাপে বেশি করে কোরবানি করবেন বলে ভাবা যায়। সে জন্য পশু ব্যবসায়ীরা ভারত এবং মিয়ানমার থেকে অনেক গরু কোরবানি উপলক্ষে নিয়ে এসেছেন।

গরুর হাটে এবার গরুর অভাব হবে না। তবে পথে পথে চাঁদাবাজির শিকার হওয়ার কারণে গরুর দাম বেড়ে যায়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলের সতর্কতা কাম্য। এর জন্য গভীর গবেষণার দরকার হয় না।

লিশ বা র‌্যাবের লোক সিভিল ড্রেসে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে গরু বিক্রেতা সেজে সীমান্ত থেকে ঢাকাগামী গরুর ট্রাকে উঠে পড়লেই পথে চাঁদাবাজরা যেখানে ট্রাক থামিয়ে চাঁদা চাইবে, সেখানেই তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিয়ে এ প্রবণতা সহজে কমানো যায়। কিন্তু এ কাজ না করে যদি চাঁদাবাজির অর্থের ভাগ-বাটোয়ারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেই জড়িয়ে পড়ে; তাহলে গরুর দাম কমানো যাবে না।

এর মধ্যে আবার আছে গরু ব্যবসায়ীদের অসততা। মিয়ানমার থেকে আগত গরুগুলো ছোট আকৃতির। বাজারে দেশি গরুর চাহিদা ও দাম বেশি। সে জন্য গরু ব্যবসায়ীরা মিয়ানমারের গরুগুলো দেশি গরু বলে বাজারে বিক্রি করে ক্রেতাকে ধোঁকা দেয়। ভারতীয় গরু শনাক্ত করা গেলেও মিয়ানমারের গরু ছোট আকৃতির হওয়ায় এসব গরু বাংলাদেশি গরুর সঙ্গে মিশিয়ে দেশি গরু বলে ব্যবসায়ীরা অধিক দামে বিক্রি করেন।

কোরবানি উপলক্ষে বাংলাদেশের হাটে-হাটে যত সংখ্যক পশুর মজুদ থাকবে, তাতে করে যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল তাদের সবাই কোরবানি দেয়ার জন্য পশু কিনতে পারবেন। সে পশুকে ঈদের দিন জবাই করতেও পারবেন।

তবে কোরবানি উপলক্ষে যত সংখ্যক বনের পশু হাটে-বাজারে থাকবে, এ দেশে তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক পশু রয়েছে মানুষের মনে। বনের পশুকে কোরবানি করার সঙ্গে মনের সেসব হিংস্র পশু কতজন জবাই করতে পারেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধর্ষণ, হত্যা, খুন, গুম, নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী, নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার হরণকারী প্রভৃতি পাশবিকতাকে মনের মধ্যে জীবন্ত রেখে শুধু বনের পশুকে জবাই করলে কোরবানি কতটা কবুল হবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে।

কাজেই আগামী ১২ থেকে ১৪ আগস্ট যেসব বাংলাদেশি নাগরিক ধর্মীয় নির্দেশনা অনুযায়ী বনের পশু কিনে কোরবানি করবেন, তাদের উচিত হবে ওই পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনের মধ্যে যে হিংসা, ঘৃণা, পরশ্রীকাতরতা, অহমিকা, স্বার্থপরতা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যের স্বাধীনতা এবং অধিকার হরণের লক্ষ্যে যে পশু বসবাস করছে; তাকেও একই সঙ্গে জবাই করার মধ্য দিয়ে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করা। আর এ শিক্ষার মধ্য দিয়ে নৈতিকতা, মানবিকতা, প্রেম, ভালোবাসা ও সততার পথে ফিরে আসা।

কাজেই আসুন, আমরা সবাই ত্যাগের শিক্ষা প্রদানকারী ধর্মীয় উৎসব কোরবানিতে বনের পশুর সঙ্গে মনের পশুকেও জবাই করে সমাজে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করি। এ কাজ করতে পারলেই শুধু আত্মত্যাগ শিক্ষার ধর্মীয় উৎসব কোরবানি সার্থকতা পাবে।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×