বহুমাত্রিক ডেঙ্গু

  ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একজন চিকিৎসক যখন ডেঙ্গু নিয়ে লিখছেন তখন এর প্রতিকার, প্রতিরোধ আর চিকিৎসা আলোচনায় উঠে আসবে- পাঠকের প্রত্যাশা তেমন হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। আমি দুঃখিত এ লেখাটা সম্ভবত পাঠকের সেই প্রত্যাশা পূরণে কাজে আসবে না। আমার মনে হয়, ডেঙ্গুর এই দিকগুলো নিয়ে ঢের লেখালেখি হয়েছে। কারও মনে হয় আর জানতে বাকি নেই যে, স্ত্রী এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছড়ায়। এটি কামড়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। হাটে-মাঠে, বনে-বাজারে এই মশা হারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ডেঙ্গু মশার ছানাপোনা মানে লার্ভার দেখা পাবেন আপনার আশপাশে, ফুলদানিতে, ফ্রিজের তলায় আর এসি বা পুরনো টায়ারে জমে থাকা তিন থেকে চার দিনের পুরনো পানিতে। অতএব, এডিস মশা থেকে বাঁচতে হলে নজর রাখতে হবে এসব জায়গায়।

ডেঙ্গুজ্বর ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে আর ডেঙ্গুর ঝামেলাগুলো সাধারণত দেখা দেয় জ্বরটা ভালো হওয়ার দু-এক দিনের মধ্যে। তবে এবারের ডেঙ্গুর চেহারা একেবারে অন্যরকম। অনেকটা ২০১৩ সালের নির্বাচনকালীন মারদাঙ্গা বিরোধী দলের মতো। জ্বর ভালো হতে না হতে অনেকেরই দেখা দিচ্ছে পেটে বা ফুসফুসে পানি আসা, কিডনি ফেইলিউর, শক, এমনকি মাল্টি-অর্গান ফেইলিউরও। অতএব, আর আগের মতো তিন-চার দিনের জ্বরের পরে নয়, বরং দু-এক দিনের জ্বরের পরও ঘটছে অঘটন। কাজেই প্লেটলেট কাউন্ট করে ডেঙ্গু চিকিৎসা করার দিন শেষ হয়ে গেছে। তবে আমার ধারণা, এসব তথ্য এ শহরের বাসিন্দারা এখন ভালোই জানেন। বরং বলা যায় সচেতনতার মাত্রাটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটু বেশি বলেই মনে হয়। যে কারণে মানুষের সচেতনতা এখন আতঙ্কে গিয়ে পৌঁছেছে।

তবে যেমনটি বলছিলাম, এবারের ডেঙ্গুর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর বহুমাত্রিকতা। ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতে সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের উদ্যোগ ও সমন্বয়হীনতা যথেষ্ট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, মনে হচ্ছে প্রশাসন ক্রমেই ধাতস্থ হয়ে আসছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তারা এখন এক হয়ে এক ভাষায় কথা বলছেন। আমার কাছে মনে হয়, প্রথমদিককার সমন্বয়হীনতার পর এখন একসঙ্গে কাজ করায় যে পারদর্শিতা আমাদের প্রশাসন ইদানীং দেখাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতিটা ঝালিয়ে নেয়ার একটা ভালো মক ট্রায়াল। এটি তো ডেঙ্গু না হয়ে ভূমিকম্প হতে পারত। তাহলে শুরুর দিকটার এ সমন্বয়হীনতার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারত তা চিন্তারও বাইরে। ডেঙ্গুর ধাক্কা সামলানোর অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে এর চেয়ে বড় কোনো ধাক্কা সামলানোয় আমাদের ভালোই কাজে আসবে। আমার সহকর্মী ডা. ডিউ তার ফেসবুক ওয়ালে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। ডেঙ্গু রোগীর ভারে ভারাক্রান্ত সরকারি হাসপাতালগুলোর বারান্দা ও সিঁড়িগুলোয় শুয়ে থাকা রোগীদের বড় মাঠ বা স্টেডিয়ামে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করে সেখানে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব তার। প্রস্তাবটা আমার কাছে মন্দ লাগেনি। কারণ তেমনটি করা গেলে তাতে বরং ভবিষ্যতে আর কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতিটা আরও বেশি ঝালাই করা হয়ে যেত।

এবারের ডেঙ্গুর আরেকটি দিক হল আমাদের রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক কালচারের পজিটিভ পরিবর্তন। ডেঙ্গুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকরা শুরুর দিকে গুজব-আজব ইত্যাদি অনেক আজগুবি কথাবার্তা বললেও তারা এখন সেই সেলফ ডিনাইয়ের জায়গা থেকে সরে এসেছেন। ঢাকা উত্তরের মেয়র তো স্বীকারই করেছেন যে, তার সততা আর উদ্যোগ থাকলেও ছিল অভিজ্ঞতার অভাব। তিনি এখন শিখছেন এবং লক্ষণীয় এই যে, মানুষ কিন্তু তার এ পজিটিভ এটিটিউড পজিটিভভাবে নিচ্ছে। ডেঙ্গুর কারণে আমাদের স্বাস্থ্য প্রশাসন আর স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতাদের আমার মতো স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের ওপর আস্থা ফিরে আসছে, সেটাও এবারের ডেঙ্গু থেকে এ দেশের চিকিৎসকদের একটা বড় পাওয়া। এবার আর কোনো ভিনদেশি চিকিৎসকের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন পড়েনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে শুয়ে থাকা ডেঙ্গু রোগী প্রত্যেকেই ধন্যবাদ জানিয়েছেন দেশের চিকিৎসকদের সাধ্যের ঊর্ধ্বে উঠে সাধ্যমতো দেশের মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষকের ভূমিকাটা সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য।

পাশাপাশি এবারের ডেঙ্গু আমাদের কিছু লোককে নতুন করে চিনতে যেমন শিখিয়েছে, তেমনি আমরা আমাদের আস্থার জায়গাগুলোর ওপর আরও বেশি আস্থাশীল হওয়ার আস্থাটুকুও পেয়েছি। এবারের ডেঙ্গুর কারণে কিছু ব্যক্তিকে বিনোদনের কারণ হতে দেখেছি, যাদের আমরা অন্যভাবে চিনতাম, শ্রদ্ধাও করতাম। তারা এখন আমাদের সামনে অন্য ভূমিকায় আর অন্য পরিচয়ে পরিচিত হচ্ছেন। পাশাপাশি উল্টোটাও কিন্তু সত্যি। কেউ কেউ এই সংকটকালে তাদের ভূমিকার কারণেই আমাদের কাছে হয়ে উঠছেন আস্থার প্রতীক, যেমন আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এই তালিকায় আছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়াও। দিনে-রাতে বিরামহীন ছোটাছুটি তাদের ডেঙ্গু নিয়ে। কখনও পজিটিভ টকশো কিংবা প্রেসমিটে, তো পরমুহূর্তেই হাসপাতালের করিডোরে। প্রশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে তারা এখন আমাদের সবার কাছে ডেঙ্গুর কাউন্টার ফেস।

তবে এবারের ডেঙ্গু থেকে জাতি হিসেবে আমাদের যা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, আমার কাছে তা হল আমরা আরেকবার বুঝতে পারলাম আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ায় কোনো ভুল ছিল না। ডেঙ্গুর মহামারীর শুরুতে চারদিকে যখন সবার একটা হতচকিত দশা, উদ্যোগ আছে কিন্তু উদ্যম নেই, আবার উদ্যম থাকলেও নেই কোনো রকম সমন্বয়, মানুষ যখন ছোট এডিসের ধাক্কায় চোখের সামনে দেখছে লাল-নীল-হলুদ বাতি, তখন আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় দলের সাধারণ সম্পাদকের মোবাইলে বিদেশ থেকে আসা একটি ফোনকল আর কিছু দিকনির্দেশনা সবকিছুকে কীভাবে যেন একটা বিনি সুতার মালায় গাঁথল। পরদিন থেকে ডেঙ্গু জয়ে চারদিকে সাজসাজ রব আর সবার সমন্বিত উদ্যোগ। দেখে ভালো লাগছে এক মাসের মধ্যে ডেঙ্গু বিদায় হোক বা না হোক, বছরের শুরুতে সিদ্ধান্ত নেয়ায় বাঙালি কোনো ভুল করেনি।

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×