গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু রোগ

  ডা. রেজাউল করিম কাজল ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু রোগে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে। তবে গর্ভবতী মায়েরা রয়েছেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। কারণ গর্ভকালীন প্রাকৃতিকভাবেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল থাকে। কাজেই ডেঙ্গু ভাইরাস খুব দ্রুত মায়ের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু রোগে গর্ভবতীর মৃত্যুর হার অন্যান্য মানুষের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি। তাছাড়া গর্ভবতী মায়েদের ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর ও ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি।

গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ে বিভ্রান্তি : গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি হতে পারে। কারণ গর্ভাবস্থার কিছু উপসর্গ আছে, যা ডেঙ্গু রোগের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। যেমন গর্ভাবস্থায় খুব স্বাভাবিক একটা উপসর্গ হল বমি ও মাথা ব্যথা। তাছাড়া গর্ভকালীন হরমোনের প্রভাবে শরীর কিছুটা গরম থাকে। অন্যদিকে প্রস্রাবের ইনফেকশন গর্ভকালীন খুব বেশি দেখা যায়। এতেও জ্বর, বমি ও শরীরে ব্যথা থাকে, যা ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। গর্ভকালীন যোনিপথে সামান্য রক্তক্ষরণকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিলেও এটি ডেঙ্গু জ্বরের জটিলতার বহিঃপ্রকাশও হতে পারে। তাছাড়া গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে মায়ের রক্তে প্ল্যাটিলেট বা অনুচক্রিকা এমনিতেই কম থাকতে পারে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো প্রভাব না ফেললেও ডেঙ্গু জ্বরের সময় রক্তের রিপোর্ট বিশ্লেষণে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু জ্বর মারাত্মক কেন : দেহের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে বা সামান্য চিকিৎসায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু গর্ভকালীন দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল থাকার কারণে একদিকে যেমন ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি, অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগের জটিলতা বা ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর এবং ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে মায়ের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাও বেশি। গর্ভবতী মা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে মা ও গর্ভস্থ সন্তানের জীবনে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

গর্ভবতী মায়ের জটিলতা : গর্ভকালীন প্রথম তিন মাসে ঘন ঘন বমির কারণে এমনিতেই শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এ সময় গর্ভবতী মা ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হলে অত্যধিক জ্বরে শরীরে আরও বেশি পানিশূন্যতা দেখা দেয়, রক্তচাপ কমে যায়। এর ফলে গর্ভপাত হতে পারে। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় তিন মাসে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হলে এর ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। এ সময় মায়ের ডেঙ্গু হলে তার শরীর থেকে গর্ভস্থ বাচ্চার শরীরে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। এর ফলে বাচ্চার শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয়। ফলে গর্ভে বাচ্চার মৃত্যু হতে পারে। অন্যদিকে অসময়ে অপরিপক্ক সন্তান প্রসব হতে পারে। তাছাড়া মায়ের শরীর থেকে ডেঙ্গু ভাইরাস গর্ভস্থ সন্তানের শরীরে সংক্রমিত হয়ে নবজাতকের ডেঙ্গু রোগ দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে মায়ের শরীরে এমনিতেই পানি জমে। যে মায়েরা উচ্চ রক্তচাপ বা প্রি-এক্সামশিয়ায় ভুগছেন, তাদের শরীর থেকে প্রোটিন বা আমিষ বের হয়ে যায়। রক্তের প্ল্যাটিলেট কমে যায়। রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া দুর্বল থাকে। ডেঙ্গু রোগেও শরীরে এরকম জটিলতা তৈরি হয় বলে গর্ভবতী মা দ্রুত ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত অবস্থায় যদি কোনো মায়ের প্রসব বেদনা শুরু বা জরুরি অপারেশনের প্রয়োজন হয়, তখন এক জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। রক্তের প্ল্যাটিলেট কম থাকার কারণে প্রসবকালীন বা অপারেশন চলাকালীন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হতে পারে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত মায়ের নবজাতকের সমস্যা : গর্ভাবস্থায় মা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে নবজাতকও ডেঙ্গু সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগতে পারে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীর থেকে গর্ভস্থ সন্তানের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিক হয়ে অনাগত সন্তানের জন্মগত ত্রুটি, বিশেষত মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে গঠনগত ত্রুটি হতে পারে, যার ফলে পরবর্তীকালে সন্তানের স্নায়ুবিকাশজনিত জটিলতা তৈরি হতে পারে। বর্তমান ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় জন্ম নেয়া নবজাতকের শরীরে যদি জ্বর, লাল ছোপ ছোপ দাগ, কোথাও রক্তপাত দেখা দেয়া, তাহলে নবজাতককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষা করাতে হবে। শুধু তাই নয়, ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে যদি কোনো প্রসূতি সন্তান প্রসব করেন তাহলে জন্মের সময় নাড়ি থেকে রক্ত নিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় নবজাতকের দেহে ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়েছে কিনা। মায়ের গর্ভে বা

জন্মের সময় যদি এক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে সংক্রমণ হয় এবং পরবর্তী সময় যদি এই শিশু আরেক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, তবে তার জন্য ডেঙ্গু ভয়াবহ জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং রক্তচাপ বজায় রাখার ব্যবস্থা কম থাকে বলে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হলে খুব দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা : আমাদের দেশের গর্ভবতী মায়েদের অন্য সময়ের মতোই গর্ভকালীন পরিশ্রম করতে হয়। স্বামী-সন্তান, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের দিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে নিজের ছোটখাটো রোগ লক্ষণকে গুরুত্ব দেয়ার সময় হয় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু রোগের উপসর্গ দেখা দিলেই গর্ভবতী মাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। পরীক্ষা-নীরিক্ষায় যদি ডেঙ্গু রোগ নিশ্চিত হয় তবে গর্ভবতী মাকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। কোনোমতেই বাসায় থাকা যাবে না। গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় প্রসূতিবিদ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে টিম গঠন করা দরকার, যাতে রোগের জটিলতা অনুযায়ী সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা যেতে পারে। গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসার পাশাপাশি কালার ডপলার আলট্রামনোগ্রাফির মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর ভালোমন্দ পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

চিকিৎসার পাশাপাশি গর্ভবতী মায়েদের এসব বিষয়ে খেয়ালে রাখতে হবে : ১. গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু ধরা পড়লে বিষয়টি আপনার কাছের মানুষজনদের জানিয়ে রাখুন, যাতে যে কোনো সমস্যায় এগিয়ে আসার জন্য তারা প্রস্তুত থাকেন। ২. রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মিল আছে এমন দু’-চারজন রক্তদাতাকে প্রস্তুত রাখুন। ৩. যে হাসপাতালে মা ও নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র আছে, সম্ভব হলে সেখানে ভর্তি হবেন। ৪. যারা অ্যাসপিরিন বা হেপারিন জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করছেন, ডেঙ্গু জ্বর সন্দেহ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বন্ধ করুন। ৫. উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ এবং ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিনের ডোজ চিকিৎসকের পরামর্শ মতো পুননির্ধারণ করুন। ৬. গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে ডেঙ্গু জ্বর হলে বাচ্চার নড়াচড়া খেয়াল রাখুন। সারা দিনে কমপক্ষে ১০ বারের কম বাচ্চা নড়াচড়া করলে চিকিৎসককে জানান। ৭. জ্বর ১০১-এর বেশি হলেই সামান্য গরম পানি দিয়ে গা মুছে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন। তাছাড়া প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খেতে পারেন। ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০০০ মিলিগ্রাম বা ৫০০ মিলিগ্রামের ৮টি ট্যাবলেট খেতে পারবেন। ৮. চিকিৎসার পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস গ্রহণ করুন। ৯. চিকিৎসকের ওপর বিশ্বাস রাখুন। গর্ভাবস্থায় নিরাপদ ওষুধ দিয়েই তারা আপনার চিকিৎসা করবেন। ১০. মনে রাখবেন, জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরবর্তী ২-৩ দিন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় নিজেকে বিপদমুক্ত ভেবে পুনরায় কর্মযজ্ঞে লিপ্ত হবেন না বা ভ্রমণে বের হবেন না। এ সময় বাসায় বিশ্রাম নিন ও সতর্কতার সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বরের জটিলতার কোনো লক্ষণ শরীরে দেখা দেয় কিনা লক্ষ করুন।

ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে করণীয় : গর্ভকালীন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে মা ও গর্ভস্থ সন্তান উভয়ের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই ডেঙ্গুরোগের প্রতিরোধই একমাত্র উত্তম পন্থা। গর্ভবতী মায়েরা বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন- ১. ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করুন, বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। স্বচ্ছ পানি জমে থাকে এমন জিনিস যেমন- অব্যবহৃত পাত্র, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, ভাঙ্গা ফুলদানি ইত্যাদি সরিয়ে ফেলুন। ২. এডিস মশা যাতে ঘরে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখুন। সকালে ও সন্ধ্যার আগে ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রাখুন। প্রয়োজনে নেট লাগান। ৩. এডিস মশা সাধারণত ঘরের ভেতর, পর্দার আড়ালে, বিছানার নিচে অবস্থায় করে। কাজেই শোবার ঘর, বাথরুম, রান্নাঘর এসব জায়গায় মশাবিরোধী স্প্রে ব্যবহার করুন। তবে স্প্রে করার পর কমপক্ষে ২০ মিনিট ঘরের বাইরে থাকুন। ৪. শরীরের বেশিরভাগ অংশ ঢেকে রাখুন, প্রয়োজনে পায়ে মোজা পরুন। শরীরের খোলা অংশে মশাবিরোধী ক্রিম/তেল ব্যবহার করতে পারেন। তবে দেখে নেবেন গর্ভাবস্থায় সেটি নিরাপদ কিনা। ৫. গর্ভবতী মায়েদের আমরা দিনের বেলায় বিশ্রাম নিতে বলি। দিনের বেলায় বিছানায় বিশ্রাম করলে বা ঘুমালেও মশারি ব্যবহার করবেন।

দেশে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে গর্ভবতী মায়েরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। গর্ভকালীন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হলে গর্ভবতী মা ও অনাগত সন্তানের জীবনে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিয়ে দুটি জীবনই বিপন্ন হতে পারে। গর্ভবতী মায়েদের বাসস্থান শুধু নয়, তাদের কর্মক্ষেত্রেও ডেঙ্গুরোগ প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের সদস্যদের আন্তরিক যত্ন, সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ এবং সচেতনতার মাধ্যমেই গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গুরাগ মোকাবেলা করা সম্ভব।

ডা. রেজাউল করিম কাজল : সহযোগী অধ্যাপক, গাইনি বিভাগ, বিএসএমএমইউ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×