আসুন সবাই মিলে গুজব প্রতিরোধ করি

  জয়িতা শিল্পী ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গুজব
গুজব। প্রতীকী ছবি

গুজব এক ধরনের সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুৎ গতিতে শহর থেকে গ্রামে কিংবা গ্রাম থেকে শহরে। এই গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার বড় ভূমিকা আছে। তাৎক্ষণিকভাবে যে কোনো গুজব ছড়াতে বেগ পেতে হয় না।

যা মন চায় লিখে পোস্ট করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব গুজব চলছে, তার মধ্যে ছেলেধরা ও গলাকাটা এ দুটি বেশি ছড়াচ্ছে। এটি শুরু হয় ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে’ এই মিথ্যে গুজব দিয়ে।

এই গুজবের সূত্রপাত কারা করেছে তার তদন্ত নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক দূর এগিয়েছে। এদের শাস্তির আওতায় আনা খুব জরুরি। তাহলে সাধারণ মানুষের ভুল ভাঙবে। বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও মানুষের মন থেকে আতঙ্ক দূর হয়নি।

সম্প্রতি ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের উদ্যোগে একজন গুজব রটনাকারীকে আটক করা হয়। ফেসবুকের অনলাইন পেজ Maulana Sayer Billal Hosain Mujahedi-এর সূত্র ধরে এই চক্রের অন্যতম সদস্য মো. বিল্লাল হোসেনকে (২২) ২ আগস্ট কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থেকে আটক করা হয়।

ওই ব্যক্তি ময়মনসিংহের নান্দাইল থানার রসুলপুর গ্রামের আমিনুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে ইস্যুকৃত সিম ব্যবহার করে তার ফেজবুক আইডি থেকে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর তথ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করে আসছে।

১. ‘আপনার সন্তানকে সতর্ক অবস্থায় রাখুন। সবেমাত্র সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার আলীরগাঁও ইউনিয়নের রাউতগ্রামে পাবলিকের হাতে ধরা পড়ল কথিত তিনজন গলাকাটা। একসঙ্গে তারা ৫ জন ছিল। এখানে তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়ে বাকি দুই ধরা পড়ল পাশের গ্রাম চিতামইনে। তাদের গাড়িও আটক করা হয়েছে’ (১৯.০৭.২০১৯)।

২. ‘কল্লা কাটতে গিয়েছিল। পাড়ার মানুষ ধরে গণধোলাই দিয়ে বেহুঁশ...’ (২৩.০৭.২০১৯)।

৩. ‘কল্লা কেটে পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা খেল আর গণধোলাই দিল- ভিডিওটি দেখুন, লোকটি কল্লা কাটতে গিয়ে ধরা খেল। গণধোলাইও খেল, গণধোলাই খেয়ে বেহুঁশ হয়ে গেল’ (২৩.০৭.২০১৯)।

৪. ‘দেখুন ইন্ডিয়াতে কিভাবে মুসলমানদের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালাইয়া দিচ্ছে হিন্দুরা- সকলে শেয়ার করুন’ (২২.০৭.২০১৯)।

৫. ‘হে আল্লাহ মুসলিমদের হেফাজত করুন। চীনের মুসলিমদের দেখার কেউ নেই, দেখুন তাদের ওপর কী ভয়ংকর নির্যাতন হচ্ছে!’ (২০.০৭.২০১৯)।

৬. ‘ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে! কুকুর দিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে, কাশ্মীরের নিরীহ মুসলমানদের উপর!’ (১৭.০৭.২০১৯)।

উপরোক্ত মিথ্যা তথ্য দিয়ে সে একের পর এক পোস্ট দিয়ে আসছিল। এরা দেশের শত্রু। এরা দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। তাই এ ধরনের মিথ্যা বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার ও গুজব রটনা করে মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করে।

আমাদের মায়েরা-মেয়েরা এতটাই সরল, যৌক্তিক চিন্তা তারা কমই করতে পারেন। তাই সহজে গুজবে কান দেন এবং সেটি বিশ্বাস করে অন্যদের মধ্যে অকারণে ভীতি সৃষ্টি করেন। পরিবারের একজন ভীতির মধ্যে থাকলে তা অন্যদের প্রভাবিত করে। এই পরিবেশ কখনও মঙ্গলজনক নয়।

অকারণ ভীতির ফলে বাবা-মা তাদের সন্তানকে নিয়ে বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন, এমনকি স্কুল-কলেজে নিয়ে যেতে বা বেড়াতে নিয়ে যেতে ভয় পান। কিন্তু এভাবে কতদিন সন্তানকে ঘরে আটকে রাখবেন। এটি কোনো সমাধান নয়। তাই গুজবে কান দেবেন না। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না।

এ ধরনের কোনো সংবাদ পেলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় খবর দিন। সমাজে কিছু মানুষ থাকে মানসিক ভারসাম্যহীন। এরা কারও সুখে সুখী হয় না। এরা কারও আনন্দে আনন্দিত হয় না বরং অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়। এরা অসুস্থ প্রকৃতির। এদের কাছে ভালো কিছু আশা করা যায় না।

একটি অস্বাভাবিক ঘটনা পুরো সমাজের ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। অকারণ গুজবে একজন নিরপরাধ মহিলাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হল। কী নির্মম! যে মানুষগুলো এরকম গণপিটুনি দিয়ে একজন মায়ের মৃত্যু ঘটাতে পারল তারা জানে না সন্তানের মা হারানোর ব্যথা আর অসহায় মায়ের আর্তনাদ কী করুণ!

চিন্তার এই দৈন্য দূর করে যৌক্তিকতা দিয়ে কাজ করুন সবাই। বাস্তবতাকে অনুধাবন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হুজুগে বাঙালি বলে আমাদের যে দুর্নাম রয়েছে তার চরম ভয়াবহতায় পৌঁছে গেছি আমরা। এখান থেকে মূর্খ, বিবেকহীনদের ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রত্যেককে নিজের বিবেকবোধ খাটিয়ে কাজ করতে হবে। কতগুলো বিবেকহীন মানুষের মূর্খতার কারণে যে পরিবার একজন নির্ভরযোগ্য মানুষকে হারাল সে কীভাবে এর ক্ষতি পূরণ করবে? টাকা-পয়সা দিয়ে জীবন-যাপনের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো যায়; কিন্তু মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা আর দায়িত্ব কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব? কখনোই না।

তাই বিবেকহীনদের প্রতি অনুরোধ কখনও ঝোঁকের মাথায় না বুঝে কিছু করবেন না। আপনার সাময়িক উত্তেজনা বা বোকামির ফলে কারও বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সারা জীবন মাথা ঠুকলেও যে ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হবে না।

ছেলেধরা আর গলাকাটা সংক্রান্তে গুজবে কান দেয়ার কি কোনো কারণ আছে? দু-একটি ঘটনা ঘটেছে যা বিচ্ছিন্ন, এর সূত্র ধরে গুজব ছড়ানো হয়েছে অনেক বেশি। কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপট গলাকাটা সংক্রান্ত নয়। তাই এ ধরনের গুজব যারা ছড়াচ্ছে তাদের খুঁজে বের করে কঠিন শাস্তির আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। যারা এ ধরনের কাজ করে আনন্দ পান তাদের দয়া করে ধরিয়ে দিন।

মানুষকে বাঁচতে দিন। স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার সবার আছে। এ অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করবেন না। এখন বাবা-মা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছেন।

কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বের হচ্ছেন- আমার সন্তানকে নিয়ে বাইরে বেরোলাম। মানুষের মধ্যে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তারা সন্তানদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। সন্তানকে নিয়ে কোনো স্থানে যাওয়া-আসা করতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এ অবস্থায়, সরকারি সব প্রতিষ্ঠান গুজব প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে থানা পর্যায়ে, জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে বক্তব্য প্রদান করা হচ্ছে। বিভিন্ন মাদ্রাসা-মসজিদে বক্তৃতার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। মাইকিং করে জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে। হাট-বাজারে পথসভা করা হচ্ছে।

উঠান বৈঠক করে সব শ্রেণির মানুষকে গুজব প্রতিরোধে সচেতন করে তোলা হচ্ছে। মানুষকে বোঝানো হচ্ছে, গণপিটুনিতে কাউকে হত্যা করা ফৌজদারি অপরাধ। এ ধরনের দণ্ডনীয় অপরাধ সংঘটনের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

গত ২৯ জুলাই বেলা ১১টায় সারা দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হল মা সমাবেশ। ওই সমাবেশে সব মায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয় তারা যেন তাদের সন্তানদের নিরাপদে স্কুলে পাঠান। এ নিয়ে মায়েরা যেন কোনো ধরনের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না থাকেন।

সন্তানদের নিয়ে বাইরে বের হতে তারা যেন নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন সেই ব্যাপারে তাদের আশ্বস্ত করে বক্তব্য প্রদান করা হয়। যে কোনো গুজব শোনা গেলে গুজব রটনাকারীদের সম্পর্কে নিকটস্থ পুলিশকে তথ্য দিতে বলা হয়। এ ছাড়া ৯৯৯-এ ফোন করে তথ্য দিতে বলা হয়। অথবা যে কোনো ধরনের গুজবের তথ্য পেলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অবগত করতে বলা হয়।

ভীতি সৃষ্টিকারীরা আড়ালে বসে মজা দেখছেন। কারণ তাদের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে। তারা অকারণে মানুষকে ব্যস্ত রাখতে পারছেন। কাজে মনোযোগ না দিয়ে অকাজে সময় নষ্ট হচ্ছে। উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটাই তাদের উদ্দেশ্য।

যারা দেশের শত্রু, যারা সমাজের শত্রু, যারা দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায় তারা নানা কৌশলে তা করতে পারে। তাই কেউ ফাঁদে পা দেবেন না।

ফাঁদে পা দিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনবেন না। নিজের বিবেককে কাজে লাগান। মানুষের মঙ্গল চিন্তা করুন। তবেই সবকিছু সুন্দর হবে। সুন্দরের প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের লক্ষ্য।

সত্যের জয় হোক আমাদের লক্ষ্য। আসুন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করি। আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখি। সন্তানদের দেশকে ভালোবাসতে শেখাই।

জয়িতা শিল্পী : অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), ময়মনসিংহ

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×