২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা: এ বর্বরতা থেকে শেখার আছে অনেক কিছু

  এম এ মাননান ২১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা: এ বর্বরতা থেকে শেখার আছে অনেক কিছু

নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন এমন বর্বরতা। টিভি চ্যানেলে দেখেছে যারা তারাও সংবরণ করতে পারেনি অশ্রুজল।

পরদিন পত্রিকাগুলোতে বীভৎস ঘটনার ছবি দেখে তো দিশাহারা হওয়ার মতো। কী মর্মান্তিক দৃশ্য! চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। হাত-পা হারিয়ে কিংবা মাথায়-পিঠে মারাত্মক আহতাবস্থায় কাতরাচ্ছে অগণিত মানুষ।

বেঁচে থাকারা পাঁজাকোলে করে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আহতদের। মনে হচ্ছিল সভার স্থানটি যেন এক কারবালা। কেন হল এমন হামলা? কাকে মারার জন্য? কেন মারা? অনেক প্রশ্ন তখনই সামনে এসেছিল? জবাব নেই।

পরে বোঝা গেল, প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী। আসলে টার্গেট ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাই। হামলাকারীরা চেয়েছিল তারা সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেবে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে। আছেই তো মাত্র দু’জন। এ দু’জনকে শেষ করতে পারলেই তো তাদের পোয়াবারো।

১৯৭৫ সালের একই মাসে তো শেষ করে দিয়েছে তাদেরই দোসররা জাতির জনককে। আসলে আগস্ট মাসটিই যেন শয়তানদের আঁচলে বাঁধা একটি মাস। এ মাসকেই কেন তারা সব সময় বেছে নেয়।

এ জন্যই কি যে, এ মাসের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস, ব্রিটিশদের সৃষ্ট একটি আজগুবি রাষ্ট্রের বেহুদা দিবস। পরবর্তীকালেও তারা এ মাসটিকে বেছে নিয়েছিল সারা দেশের সব জেলায় বোমা হামলার জন্য। সিরিজ বোমা হামলা। ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল সারা দেশের মেরুদণ্ড।

জঘন্য মনোবৃত্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সারা দেশের মানুষের ওপর। কারও জানের মায়া নেই তাদের মধ্যে। আসলে তারা জনসাধারণের তোয়াক্কা করে না, কদর করে শুধু তাদের হীনস্বার্থকে।

দেশকে তাদের কব্জায় নিয়ে আসা, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকেই তারা গুরুত্ব দেয় সব সময়, জনমানুষের স্বার্থ নয়। তারা এখনও ভুলতে পারেনি তাদের একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি। এরা কিন্তু কখনোই চুপ করে থাকবে না।

সুযোগ পেলেই তারা ফণা তুলবে। এদের ব্যাপারে সাবধানতা সব সময়ের জন্য। নতুবা সর্বনাশ হয়ে যাবে দেশের। বিপন্ন হবে জনমানুষের ভবিষ্যৎ। সময় এসেছে এসব বর্বর ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার নিশ্চিহ্ন করে দেয়া, ১৭ আগস্ট চৌষট্টি জেলার মধ্যে একমাত্র মুন্সীগঞ্জ ছাড়া সব জেলায় সিরিজ বোমা হামলা চালানো, ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর বেঁচে যাওয়া দুই কন্যার এক কন্যাকে ধ্বংস করে দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে বিরোধী নেতৃত্বশূন্য করে দেয়া আর পাকিস্তানপন্থীদের রাজত্ব কায়েম করে পুরো রাষ্ট্রটিকে মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করা- এসবই গভীর চক্রান্তের কিঞ্চিৎ অংশমাত্র।

২১ আগস্ট জীবন দিতে হল সবার অতিপরিচিত, শান্ত নেত্রী হিসেবে বিবেচিত প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী এবং মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জনকে আর আহত হয়েছিলেন পাঁচ শতাধিক মানুষ, যারা সেদিনের আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। এর আগেও জীবন দিতে হয়েছে আরও অনেক সংস্কৃতিপ্রেমীকে, যারা উপস্থিত ছিলেন ছায়ানটের আরেকটি অনুষ্ঠানে রমনার বটমূলে।

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় পরিবারের সবার সঙ্গে বসে টিভিতে খবর দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলাম কখন ৭টা বাজবে। স্ক্রলবারে দেখছিলাম, আগামীকাল দুপুরের মধ্যে আঘাত হানতে পারে ১১০ কিলোমিটার বেগে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’।

খবর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুনতে পেলাম খবর পাঠিকার দরাজ গলায় হেডলাইনগুলো। প্রথমেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারের খবর। এককালের গণতন্ত্র ছিনিয়ে নেয়া সামরিক শাসকের চক্রান্তকারী জ্যেষ্ঠ সন্তানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন আর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড। আরও ১১ জনের হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা।

আমরা অনেকেই সবকিছু বিস্তারিত জানতাম না। পরে বিচারের রায়ের বিবরণ থেকে জানতে পারি, ভালো মানুষের উর্দি গায়ে দেয়া ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের জঘন্য আর নোংরা মনের পরিচয়।

পত্রিকা থেকেই জানতে পারলাম, ষড়যন্ত্রকারী আর হামলাকারীদের মধ্যে ছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, হুজির আমীর, এনএসআইয়ের মহাপরিচালক, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, মেজর জেনারেল, ক্ষমতাসীন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ক্ষমতাসীন দলীয় এমপি, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার, সিআইডির বিশেষ সুপার, পুলিশের উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা এবং দেশ-বিদেশ থেকে জঙ্গিপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক জঙ্গি।

ধারণা করি, এসব চক্রান্তকারী ও তাদের দোসররা সবাই পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যার পর থেকে তাদের ষড়যন্ত্র আরও প্রসারিত করার লক্ষ্যে চক্রান্তের জাল বুনতেই থাকে।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তারা অনেক বেশি তৎপর হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার পর যখন তিনি সামনের দিকে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই তারা দিশাহারা হয়ে শুরু করে গভীর ষড়যন্ত্র।

২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনের রাস্তায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে ঘটে যাওয়া দুর্ভাগ্যজনক এ ঘটনার পর দীর্ঘ ১৪ বছর দুই মাস ১৯ দিন লেগেছে বটে, তবু বিচার তো হয়েছে।

তৎকালীন সরকার তো বিচার করেইনি, বরং ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজিয়ে আর নামকাওয়াস্তে এক-সদস্যবিশিষ্ট কমিশন বসিয়ে ঘটনা ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করেছে, টার্গেট করে আওয়ামীপন্থীদের বাড়িঘর ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়েছে, নির্বিচারে মামলা করে বাড়িছাড়া করেছে, সর্বোপরি এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আসামি বানানোর চেষ্টা করেছে।

হামলার পর মামলা নেয়া তো দূরের কথা, আওয়ামী লীগের এমপিদের জাতীয় সংসদে এ ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে পর্যন্ত দেয়নি। তৎকালীন সরকারের এহেন অসহযোগিতা আর ন্যক্কারজনক ভূমিকার কথা দেশবাসী ভুলে যায়নি।

তাই রায়ের বিষয়টি শোনার পর স্বস্তি পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, যাকে মূল টার্গেট বানানো হয়েছিল সেই বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যার হাতেই হামলাকারী আর ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হয়েছে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায়। শাস্তি তো হয়েছে কিন্তু মনে রাখতে হবে, এদের দোসররা বসে নেই। ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য।

এরা কখনও থেমে থাকবে না, দেশে থাকুক আর বিদেশে থাকুক। এরাই দেশে জঙ্গিপনাকে উসকে দিচ্ছে, নিজেরাও জঙ্গিদের সঙ্গে মিলেমিশে অরাজকতার জন্য ঘোঁট পাকাচ্ছে। তারই নজির আমরা পেয়েছি রায় ঘোষণার পরপরই।

মাস্টারমাইন্ডের বাপের বাড়ির এলাকা বগুড়াতে ষড়যন্ত্রকারীদের দোসররা নীলফামারি থেকে ঢাকাগামী বাসে পেট্রোলবোমা হামলা করে তিনজনকে আহত করে এবং আরও নাশকতার চেষ্টা চালায়। বর্বর ওই হামলার পরের বছরই অর্থাৎ ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে দেশের ৪৫০টি স্পটে চালানো হয় বোমা হামলা।

এ হামলার ঘটনায় জড়িত ৫০ জন জঙ্গিকে এখনও ধরা হয়নি এবং বিচার কার্যক্রম ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। ৩৩টি মামলা এখনও বিচারাধীন। এসব দুর্বৃত্তরা বিগত কয়েক মাসের মধ্যে রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশসহ অন্যান্য পুলিশের ওপর বোমা হামলা করেছে।

একই ঘরানার ষড়যন্ত্রকারীরাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যাসহ নির্মমভাবে জেলের ভেতরে খাঁচায় বন্দি পাখির মতো জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছে, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। সবই হয়েছে তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায়। উদ্দেশ্য, বিরোধী দলের নেতাদের নিশ্চিহ্ন করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা। জাতির জন্য এ এক চরম দুর্ভাগ্য।

আমরা চাই না, এ দেশে আর কখনও এমনতরো নৃশংস বর্বরোচিত রাজনৈতিক হামলা হোক; আপন দল ছাড়া অন্য কোনো দলের নেতাকর্মীকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে দেশকে নেতৃত্বশূন্য করে কিংবা রাজনৈতিক দলের সভায় হামলা করে দেশে এমন অবস্থা তৈরি করা হোক যাতে তরুণরা রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠুক; এহেন কর্মকাণ্ডের কারণে আজকের এবং আগামীর প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করুক।

আমরা কোনোভাবেই কামনা করি না, রাজনীতি করা মানুষদের প্রতি অশ্রদ্ধার ভাব সৃষ্টি করা হোক কিংবা জনমনে চিরস্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করা হোক।

আমরা আরও চাই না, দুর্বৃত্ত শ্রেণির লোকেরা রাজনীতিতে আসুক, তারা রাজনীতি নদীটার স্বচ্ছ পানিকে ঘোলা করে আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় আর অর্থের জোগান দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করুক; সমরাস্ত্র চালিত গ্রেনেডের মতো বিধ্বংসী অস্ত্র সরবরাহ করে অসাধু রাজনৈতিক নেতারা জনগণকে হত্যার ধারা চালু রাখার সংস্কৃতি অব্যাহত রাখুক এবং ক্ষমতাসীন দলের কোনো ব্যক্তি অনাকাক্সিক্ষত ভাবমূর্তি তৈরি করুক।

আমরা সর্বান্তকরণে কামনা করি, জনগণ নিশ্চিন্ত মনে রাজনৈতিক সমাবেশে, সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করুক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করুক।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, সে দেশের মাটি থেকে চিরতরে লুপ্ত হোক সব ধরনের হানাহানি, অপরাজনীতি, জঙ্গিপনা আর সাধারণ মানুষ হত্যার ঘৃণ্য খেলা।

আলো ছড়িয়ে পড়ুক বাংলার আকাশে, মেধাবী তরুণরা এগিয়ে আসুক রাজনীতিতে এবং তৈরি করুক উজ্জ্বল আলোদীপ্ত রাজনীতির পুষ্পধাম। প্রত্যাশা করি, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করুক, চাকরিজীবীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করুক, কৃষকরা মাঠে থাকুক, শ্রমিকরা কলকারখানায় নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাক, মাঝি তার নৌকায় পাল তুলে দিয়ে মনের আনন্দে ভাটিয়ালি সুরের ঝলক তুলুক, আলেম-ওলামারা মানুষের অন্তরে মহান সৃষ্টিকর্তার নুরানী আলোর দীপ্তি ছড়িয়ে দিক, আর রাজনীতির ময়দানে থাকা ব্যক্তিরাই শুধু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, ঠিক যেমনটি হয় উন্নত দেশগুলোয়।

আমরা চাই, শুধু ভালোমনের রাজনীতিকরা রাজনীতি করুক যা হবে দেশের জন্য, জাতির জন্য, জনগণের জন্য কল্যাণমূলক এবং সুষম, বৈষম্যহীন উন্নয়নের অনুঘটক। সুশাসনের সুবাতাস বইতে থাকুক সারা দেশে বঙ্গকন্যার হাত ধরে।

ড. এম এ মাননান : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×