প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ

  মনজু আরা বেগম ২২ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের মানুষ বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় বছরের কোনো না কোনো সময় মোকাবেলা করছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনের মৃত্যুর খবর তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, এর সঙ্গে এ বছর বন্যার পাশাপাশি মহামারী আকারে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু। ১৮ আগস্ট ’১৯ পর্যন্ত অর্থাৎ এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫১ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৩ হাজার ৫৮০ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হিসাবে গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আক্রান্ত নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪৬০ জন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে ৮৩৯ জন এবং ঢাকায় ৬২১ জন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গত শনিবার, ১৭ আগস্ট ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এবার জুলাই মাসেই আগের সব রেকর্ড ভেঙে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছিল ১৫ হাজার ৬৫০ জন। গত ১২ আগস্ট ঈদুল আজহার দিন বৃষ্টি শুরু হওয়ায় সারা দেশে এডিস মশার প্রকোপ কমবে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন। কিন্তু থেমে থেমে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হওয়ায় মশার প্রকোপ না কমে আরও বেড়ে গেছে। হাসপাতালে জায়গা নেই, ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট নেই। ডাক্তার-নার্সরা বাড়তি রোগীর চিকিৎসা করতে করতে ক্লান্ত। নিজের সন্তান বা পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে হাসপাতালে জায়গা পাওয়া যাবে না এ আতঙ্ক প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে। হতাশা আর আতঙ্কের মাঝে আমাদের দিন কাটছে।

এমন আশঙ্কা করতে করতেই আমার পরিবারের একজন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তাকে নিয়ে কী পরিমাণ ভোগান্তিতে এবং সেই সঙ্গে আতঙ্কে আছি, হাসপাতালে ছোটাছুটি করছি তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। দিনের বেলা মশারি টাঙিয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে মশা মারার যত রকম উপকরণ আছে তা ব্যবহার করে গায়ে ওডোমস ক্রিম, নারিকেলের তেলসহ যে যা বলছে তা ব্যবহার করেও বুঝি শেষ রক্ষা হচ্ছে না। সিলেটের হবিগঞ্জের সিভিল সার্জনসহ এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। সেনাবাহিনীর সদস্যসহ সরকারের অতিরিক্ত আইজিপির স্ত্রীও মারা গেছেন। এতগুলো মৃত্যু মেনে নেয়া কঠিন। ডেঙ্গু আতঙ্কে সারা দেশের মানুষ কাঁপছে। রাজধানীর কোনো হাসপাতালেই জায়গা নেই। তা ছাড়া হাসপাতালগুলোর নোংরা পরিবেশ ডেঙ্গু মশার লার্ভা জন্মানোর উৎকৃষ্ট স্থান। ডেঙ্গু আক্রান্ত সন্তানদের নিয়ে মা-বাবা পাগলের মতো এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। অথচ দুই সিটি কর্পোরেশনে শিগগির মশা মারার নতুন ওষুধ আসছে না। ওষুধ কবে আসবে তাও সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারে না। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ সিটিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনবেন। প্রতিদিন যে হারে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না। মশা নিধনে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে মেয়রের এত দীর্ঘ সময় নেয়া কোনো যুক্তিসঙ্গত কথা হতে পারে না। ডেঙ্গুর প্রকোপ একটি মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়। এটি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের দায়িত্ব। বিগত কয়েক বছর থেকে দেখা গেছে বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হয়। এটা জানা সত্ত্বেও সিটি কর্পোরেশনগুলো আগাম কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে? তাদের অবহেলার শিকার হয়ে নগরবাসী মৃত্যুবরণ করবে কিংবা মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকবে কেন? এগুলো দেখভাল করার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনগুলোর। কিন্তু সারা বছর তারা এ দিকটাতে মনোযোগ না দেয়ায় নগরবাসী এ ভোগান্তিতে পড়েছে। শহর, নগর পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব তারা নিয়েছেন, কিন্তু কতটুকু দায়িত্ব তারা পালন করছেন? সিটি কর্পোরেশনের বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায় কী কাজে ব্যবহার হয় সেটা জানার অধিকার নগরবাসীর রয়েছে। মশার ভেজাল ওষুধ ছিটানো হয়। ফলে মশা মরে না। আমার এলাকায় সারা বছরেও মশা নিধন কার্যক্রম দেখতে পাইনি। নগরবাসীকে নিরাপদে রাখার দায়িত্ব যারা নিয়েছেন, তারা যদি সে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন তাহলে নগর বা শহরবাসী ট্যাক্স দেবে কেন? আমরা যে ট্যাক্স দেই তার বিনিময়ে কতটুকু সেবা পাই? বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ডুবে যায়। সারা বছরই খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে নগরবাসী চলাফেরা করে। বর্ষাকালে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়। বহু রাস্তায় ম্যানহোলের ঢাকনা উপচে পড়ে ময়লা আবর্জনা। দুর্গন্ধে চলাফেরা দায় হয়ে পড়ে। ভাঙাচোরা রাস্তা কোথাও ভাগ্যক্রমে ঢালাই হলেও দু-চারদিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এগুলো দেখভাল করার কেউ আছে বলে মনে হয় না। দুর্নীতি আমাদের অক্টোপাসের মতো বেঁধে রেখেছে। এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের মানুষ মরছে কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কখনও মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, অনেক সভা-সেমিনার, আন্দোলন, মানববন্ধন বহু কিছু হয়েছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বরং বলা যায় সড়ক দুর্ঘটনা যেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এমন একটি দিন নেই যে দিন সারা দেশে গড়ে ৫ থেকে ১০ জনের মৃত্য হচ্ছে না। দুর্ঘটনার কারণগুলো আমরা সবাই জানি; কিন্তু এ বিষয়ে জোরালো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় প্রতিদিন মৃতের সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। মনুষ্যসৃষ্ট এ বিপর্যয় থেকে আমরা আদৌ কখনও মুক্তি পাব কিনা, জানি না। এ ছাড়াও যানজটের কারণে নগরবাসীর জীবন ওষ্ঠাগত। অতিরিক্ত যানজটের কারণে মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার আগেই পথিমধ্যে কত যে প্রাণহানি ঘটছে, তার হিসাব কে রাখে? যানজটের কারণগুলোও আমাদের সবার জানা। একটু উদ্যোগ নিলেই বা সচেতন হলেই যানজট কিছুটা হলেও কমে আসত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটাকে তেমনভাবে আমলে নিচ্ছে না বা গুরুত্ব দিচ্ছে না । আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত আছেন, তাদের অনেকেই অনৈতিক কার্যক্রম এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। রক্ষক যখন ভক্ষক হয় তখন সাধারণ মানুষের যাওয়ার আর জায়গা থাকে না। তা ছাড়া আমরা অধিকাংশ মানুষই শিক্ষিত সত্য; কিন্তু স্বশিক্ষিত বা সচেতন নই। আমরা একটু সচেতন হলে বা একটু স্বার্থ ত্যাগ করলে সবাই ভালোভাবে থাকতে পারি। কিন্তু আমরা বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক হওয়াতে অন্যের সুবিধা অসুবিধার কথা চিন্তা করি না। নিজেদের নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকার ফলে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। শুধু তাই নয়, এ সমস্যাগুলো দিনকে দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে জনসংখ্যা অত্যধিক হারে বৃদ্ধির কারণে। আমাদের সম্পদ সীমিত, জায়গা সীমিত কিন্তু মানুষ বাড়ছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। এ অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। অতিরিক্ত জনসংখ্যা যদি দক্ষ জনসংখ্যা হিসেবে গড়ে না ওঠে কখনও তা সম্পদ না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। দক্ষতার অভাবে আমাদের অতিরিক্ত জনসংখ্যা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ম্যালথাসের মতে, জনসংখ্যা যখন অতিরিক্ত হারে বাড়ে তখন প্রকৃতি তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু এ নগরী হওয়াতে স্রোতের মতো মানুষ আসছে এ নগরীতে কেউবা কর্মসংস্থানের আশায়, কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ পড়ালেখার জন্য, কেউ দাফতরিক ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে। রাস্তাঘাট, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, অফিস, আদালত, ব্যাংক, বীমা, গণপরিবহন কোথাও জায়গা নেই। ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। জানা যায়, আমাদের দেশে রোগী-ডাক্তার অনুপাতে বিশাল তফাত। একদিকে যানবাহন জট অন্যদিকে মনুষ্যজটের ঠেলায় রাস্তাঘাটে হাঁটার উপায় নেই। ডাক্তার সীমিত, কিন্তু রোগীর সংখ্যা অত্যধিক বৃদ্ধির ফলে হাসপাতালগুলো স্বাভাবিক অবস্থাতেই জায়গা দিতে পারে না। দেশের বর্তমান অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণের জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মশা নিধনসহ শহর রক্ষার বা সুস্থভাবে বসবাসের উপযোগী শহর গড়ার কার্যকরী ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে। তা নাহলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়- উভয় বিপর্যয়ই মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে এবং আরও বেশি ফেলবে। যা কখনও কারও কাম্য নয়।

মনজু আরা বেগম : লেখক ও গবেষক; সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×