মিঠে কড়া সংলাপ

বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর কাশ্মীরিদের ভবিষ্যৎ কী?

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কাশ্মীরে সেনা বাহিনীর টহল

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় কাশ্মীরি জনগণের ভাগ্য নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলা শুরু হয়েছিল, আজও সে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় দিনের পর দিন তা জটিল আকার ধারণ করছে এবং সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি সস্ত্রীক কাশ্মীর ভ্রমণ করেছিলাম। তো, জীবনে প্রথম সেখানে গিয়ে যা দেখলাম তাতে মনে হল কাশ্মীরি জনগণ মোটেই ভালো নেই। ভারতীয় সেনাবাহিনী সেখানে দিনরাত টহলরত অবস্থায় আছে। অল্প দূরে দূরে, মোড়ে মোড়ে নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে যেখানে-সেখানে, যখন-তখন, যাকে-তাকে তল্লাশি করা হচ্ছে।

আমরা দু’জন যথেষ্ট বয়স্ক নারী-পুরুষ পর্যটক হিসেবে সেখানে ঘোরাফেরার সময় এক-দু’শ মিটার পরপরই আমাদের গাড়ি আটকিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে তিন দিন সেখানে কাটিয়ে আমরাও হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। ভ্রমণের আনন্দ অর্ধেকটা মাটি হয়ে গিয়েছিল ঘনঘন নিরাপত্তা তল্লাশির কবলে পড়ে।

মোটকথা, আমাদের স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসেও শীতের প্রচণ্ডতা যেমনটা আমাদের কাবু করেছিল, তেমনি আবার নিরাপত্তা বাহিনীর যুদ্ধাবস্থায় চলাফেরা এবং আমাদের প্রতি তাদের সন্দিগ্ধ দৃষ্টি দেখেও আমরা খানিকটা হলেও ভীত হয়েছিলাম।

যাক সে কথা, এমন বৈরী পরিবেশের মধ্যেও সেখানে তিন দিন অবস্থান করে কাশ্মীরিদের অবস্থা সম্পর্কে যা দেখতে, জানতে বা বুঝতে পেরেছিলাম সেই কথায় ফিরে আসি।

কাশ্মীরিদের বেশিরভাগ পরিবারের সন্তানরাই প্রবাসে থেকে আয়-রোজগার করে পরিবারকে অর্থ পাঠায় এবং ওইসব পরিবার মূলত প্রবাসী আয়ের ওপরই নির্ভরশীল। সেখানে শিল্প-কারখানা বলতে আছে কিছু পশমি বা গরম কাপড়ের ফ্যাক্টরি। আর প্রতিযোগিতার মুখে পড়ায় সেসবও তেমন সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। কারণ ভারতের পাঞ্জাবসহ অন্যান্য রাজ্যেও এখন বাহারি পশমি বা গরম কাপড় প্রস্তুত হয়।

বিশেষ করে পাঞ্জাবের মোহালি এখন এ বিষয়ে প্রায় শীর্ষস্থান দখল করে ফেলেছে। এ অবস্থায় গরম বা পশমি কাপড় উৎপাদনের ক্ষেত্রেও কাশ্মীরিরা এখন আর আগের মতো সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। তাছাড়া উপত্যকাটিতে সবসময় অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করায় সেখানে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে পর্যটন খাত থেকে সেখানকার মানুষের আয়-রোজগারও কমে গেছে। ডাল লেকে অবস্থিত বোট-হাউসগুলো দিনের পর দিন খালি অবস্থায় পর্যটকদের জন্য প্রহর গুনে চলেছে!

ফলে কাশ্মীরিরা কিছু শুকনো ফলমূল কৌটাজাত করে তা দোকানে দোকানে সাজিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও আশানুরূপ ক্রেতা পাচ্ছেন না। হোটেল-মোটেলগুলোও নাকি বছরের প্রায় সময়ই খালি পড়ে থাকে। একমাত্র স্প্রিং সিজনে সেগুলো কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। তা-ও আবার ভারতের অন্যান্য রাজ্যের পর্যটকরা ভিড় জমান বলে। মোটকথা, কাশ্মীরে বছরজুড়েই অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করায় সেখানকার পর্যটন শিল্পেও ধস নেমেছে।

শ্রীনগরে প্রায়ই কারফিউ জারি করা থাকে। আবার জুমার নামাজ শেষে মুসল্লিরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে কারফিউ ভঙ্গ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ঢিল ছোড়া শুরু করলে সেখানে আরেক ভয়ার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই হল কাশ্মীরের বর্তমান হালহকিকত। আর তার মধ্যেই ভারতের বর্তমান সরকার কাশ্মীরিদের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫/এ অনুচ্ছেদ বাতিল করে আইন পাস করল এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে সে আইন এখন চূড়ান্ত রূপ লাভ করায় সামনের অক্টোবর থেকেই তা কার্যকর হতে চলেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এই আইন বাস্তবায়নের পর কাশ্মীরি জনগণের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক জীবনে যে পরিবর্তন আসবে, তা তারা মেনে নেবেন কিনা? আর তারা ভারতীয় সংবিধানের এই পরিবর্তনকে মেনে নেবেনই বা কেন? কারণ কাশ্মীর সমস্যার সমাধান তো ১৯৪৮ সালের ২১ এপ্রিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।

আর তদানীন্তন ভারত সরকারও তো সে সময়ে নিরাপত্তা পরিষদের সেই সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে কাশ্মীরি জনগণের ভাগ্য তারা যাতে নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারেন সেজন্য গণভোটের প্রস্তাবকে মেনে নিয়েছিল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তো সে সময়ে কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য ওয়াদাও করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার সে কথা রাখেননি।

তাহলে কাশ্মীরিদেরই বা দোষ কী? ১৯৪৭ সালে কাশ্মীর নিয়ে পাক-ভারত যুদ্ধের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েও ভারত যদি তার বরখেলাপ করে, তাহলে অন্য কাউকে দোষ দেয়া কি সঠিক? আর কাশ্মীর তো কোনোদিনই ভারতের ছিল না বা ভারতভুক্ত অঙ্গরাজ্য ছিল না। ইতিহাস তার প্রমাণ। ১৮৪৬ সালে অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধের পর শিখ রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কাশ্মীরকে প্রিন্সলি স্টেট বানিয়েছিল।

অর্থাৎ রাজন্যবর্গশাসিত আলাদা রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়েছিল। আর সেজন্যই আজও কাশ্মীরকে জাতিসংঘের খাতাপত্রে, কাগজে-কলমে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখা যায়। আর প্রিন্সলি স্টেট মানেও তা ভারত বা পাকিস্তান অধিভুক্ত বোঝায় না। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় অন্যান্য প্রিন্সলি স্টেটকে যেমন ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেয়ার অপশন দেয়া হয়েছিল, কাশ্মীরকেও সেই অপশন দিলে সেখানকার ভোগরারাজ হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান কোনোটির সঙ্গেই যোগ না দিয়ে স্বাধীন থাকার অপশন দিয়েছিলেন।

তাই তখন থেকেই তো কাশ্মীর উপত্যাকাটি স্বাধীন থাকারই কথা, নাকি? মাঝখানে গায়ের জোরে ভারত-পাকিস্তান এলাকাটি দখল করে বানরের পিঠা ভাগের মতো ভাগ করে নিয়ে কাশ্মীরিদের ওপর জগদ্দলপাথর হয়ে চেপে বসে আছে। পাকিস্তান তার দখলকৃত কিছু অংশ আজাদ কাশ্মীর নামে স্বাধীন রাষ্ট্র বললেও তা নামকাওয়াস্তে। কলকাঠি সব পাকিস্তানের হাতে। আর ভারত তো তাদের দখলকৃত অংশ নিয়ন্ত্রণ করে অনড় অবস্থানে। তাকে নড়ায় কে?

১৯৪৭ সালের যুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তেরই বা কী হবে? এসব সিদ্ধান্তের যদি কোনো মূল্য না থাকে, তাহলে জাতিসংঘেরই বা মূল্য থাকে কোথায়? আর ভারত সেদিনের সে সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েও যুগ যুগ ধরে তার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় কেমন করে? সে সময় না হয় নেহরু পরিবারের প্রেস্টিজ ইস্যুর কারণে পরবর্তী সময়ে তিনি গণভোট দেননি।

কারণ নেহরু পরিবারের উত্থান হল কাশ্মীরের হিমালয়ের পাদদেশের একটি গ্রাম থেকে। যে গ্রামের একটি হিন্দু মন্দিরের পুরোহিত কাউল পণ্ডিত দিল্লি এসে একটি শহরের ধারে বাসা বেঁধে নেহরু উপাধি ধারণ করেছিলেন। সে ইতিহাস আমি কয়েক বছর আগের একটি লেখায় বিস্তারিত উল্লেখ করেছিলাম। তো সেই নেহরু পরিবারের কংগ্রেস সে সময়ে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত উগলে দিয়ে কাশ্মীরের আগুনকে যেভাবে ছাইচাপা দিয়েছিলেন সেই আগুনই তো এখনও জ্বলছে, নাকি?

বর্তমান কংগ্রেস নেতৃত্ব যদিও বিজেপি সরকারের সংবিধান সংশোধনকে সমর্থন না করে সমালোচনা করছে; কিন্তু সেটাও একটা লোক দেখানো কাহিনী মাত্র। বিজেপির কাছে ভোটযুদ্ধে গো-হারা হেরে গিয়ে এখন বিজেপির কর্মকাণ্ডের সমালোচনার কোনো সুযোগ তারা ছাড়ছেন না, এই আর কী! নইলে কাশ্মীরে অশান্তির বীজ কংগ্রেসই রোপণ করে রেখেছে। আর সেসব ইতিহাস সবারই জানা।

যাক সে কথা, এখন ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫/এ ধারা বিলুপ্তির ফলে কাশ্মীরি জনগণের লাভ-ক্ষতির বিষয়টি একটু ভেবে দেখা যাক। ৩৭০ ও ৩৫/এ অনুচ্ছেদে যা ছিল তা হল : ১. জম্মু ও কাশ্মীরিদের দুটি নাগরিকত্ব ছিল- একটি কাশ্মীরি এবং অন্যটি ভারতীয়, ২. জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের জন্য একটি আলাদা পতাকা ছিল, ৩. তাদের বিধানসভার কার্যকাল ছিল ৬ বছর, অন্যান্য রাজ্যে যা ৫ বছর,

৪. জম্মু ও কাশ্মীরের ভেতরে ভারতীয় পতাকার অবমাননা কোনো অপরাধ ছিল না, ৫. সেখানকার কোনো মহিলা ভারতের অন্য দু’-তিনটি রাজ্য ছাড়া বাকি রাজ্যের কোনো পুরুষকে বিয়ে করলে ওই মহিলার জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়; কিন্তু ভারতের অন্য কোনো রাজ্যের মহিলা সেখানকার কোনো পুরুষকে বিয়ে করলে সেই মহিলা জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিকত্ব পান, ৬. ৩৭০ ধারার ফলে ভারতের সংবিধানের কোনো ধারা জম্মু-কাশ্মীরে কার্যকর নয়,

৭. জম্মু-কাশ্মীরে ভারতীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার কোনো অস্তিত্ব বা আইন নেই, ৮. ভারতের সুপ্রিমকোর্টের কোনো নির্দেশ বা আদেশ জম্মু-কাশ্মীরে প্রযোজ্য নয়, ৯. জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দারা ভারতের অন্য কোনো রাজ্যে জমি ক্রয় করতে পারেন না, একইভাবে অন্য কোনো রাজ্যের লোকও জম্মু-কাশ্মীরে জমি ক্রয় করতে পারেন না, ১০. জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য আলাদা সংবিধান ছিল বা আছে।

উপরোক্ত সুবিধাগুলো বাতিলের ফলে এখন কাশ্মীরিদের সবচেয়ে বড় ভয় হল তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ক্ষেত্রে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাছাড়া এতদিন কাশ্মীরে অন্য রাজ্যের কেউ চাকরি পেতেন না। এখন সব রাজ্যের লোকই সেখানে চাকরি পাবেন। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীতে অন্য রাজ্যের মানুষের চাকরির ক্ষেত্রে তারা ভীষণভাবে স্পর্শকাতর।

আবার জমিজিরেত কিনে অন্য ধর্মের লোকেরা বাড়িঘর করে লোকসংখ্যা বাড়ানোর ফলে যে ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে কাশ্মীরি জনগণ ভীত। মোটকথা, এতকাল ধরে তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা না পেলেও যেসব সুবিধা ভোগ করছিলেন, তা রদ ও রহিত হওয়ায় শিক্ষা, সংস্কৃতি, চাকরিসহ পুলিশ বিভাগে তাদের যে একচ্ছত্র দখল ছিল, অচিরেই তা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ফলে যে প্রশ্নটি থেকেই যায় তা হল, বিশেষ মর্যাদার ইতি। কিন্তু কাশ্মীরিদের ভবিষ্যৎ কী?

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

ঘটনাপ্রবাহ : কাশ্মীর সংকট

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×