বীভৎসতার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে গেছি আমরা

  জাহেদ উর রহমান ২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লাইফ ইজ বিউটিফুল চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
লাইফ ইজ বিউটিফুল চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

আমাদের মনে থাকার কথা কয়েক মাস আগে ফেসবুক ‘এই থাকতে, মনে করেন খুশিতে ঠেলায় ঘোরতে’ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। যে কোনো কাজ কেউ কেন করছে সেটার জবাবে সবাই ওই কথাগুলো ব্যবহার করে মজা করেছে বেশ কিছুদিন। যেমন কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করত, আমি কেন লেখালেখি করি? তার জবাবে সেই সময়ের ট্রেন্ডে জবাব দিতেই পারতাম ‘লিখি খুশিতে, ঠেলায়, ঘোরতে’।

ফেসবুকে হঠাৎ শুরু হয়ে আমাদের একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলে আবার হারিয়ে যাওয়া ট্রেন্ডের মতো অতি আলোচিত ট্রেন্ডটাও পুরোপুরি হারিয়ে গেছে এর মধ্যেই। তখনও নিশ্চিতভাবেই জানতাম, এরপর আবার নতুন কোনো বিষয় আসবে, আর আমরা মেতে উঠব সেই নতুন ট্রেন্ড নিয়ে।

এবার কিছুদিন আগে এলো ‘তাদের বলে দিও....’ ট্রেন্ড। যে কেউ আগে এ শব্দগুচ্ছ জুড়ে দিয়ে নানা বক্তব্য প্রকাশ করতে শুরু করল। যেমন একজনের একটা স্ট্যাটাস মনে পড়ে, যে লিখেছিল, ‘তাদের বলে দিও, আমি আর সাবেক প্রেমিকার বিরহে কাতর নই, আমি আরও অনেক ভালো একজন প্রেমিকা পেয়েছি।’

এটার উৎস ছিল একটা কাগজ, যাতে বেশ কাঁচা হাতের লেখায় লেখা ছিল ‘তাদের বলে দিও, আমার মা ছেলেধরা ছিল না’। জানা যায় ওটা একটা শিশুর হাতে লেখা কাগজ।

তসলিমার স্মৃতি আমাদের মনে এখনও চাঙ্গা থাকার কথা। কিছুদিন আগে ঢাকার একটা স্কুলের সামনে ছেলেধরা অভিযোগ দিয়ে যে নারীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়, তিনিই তসলিমা। তসলিমার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের একজনের লেখা এ কাগজটা ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। এরপর আমরা সবাই এটা নিয়ে মজা করতে শুরু করি।

নানারকম বিষয় নিয়ে ফেসবুকে মজা হয়; কিন্তু এ দুটি বিষয়কে কি আর সবগুলোর মতো একই পাল্লায় মাপা ঠিক হবে?

হাতে অমোচনীয় কালির দাগ নিয়েও ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে লাইন যাতে এগোতে না পারে সেজন্য কিছু নারী লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ভোট দেয়ার পরও কেন তারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, তার জবাবে তারা বলেছিলেন এই থাকতে, মনে করেন খুশিতে ঠেলায় ঘোরতে। এই দেশে সংসদ নির্বাচন তো বটেই, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও এখন একেকটা যাচ্ছেতাই প্রহসনে পরিণত হয়েছে। তাই ওই ঘটনাটি নিয়ে আমরা হয়তো হাসি, মজা করি; কিন্তু গভীরভাবে যদি ভেবে দেখি একটা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে এত হাস্যকর অবস্থায় নিয়ে আসার এক প্রতীকী ঘটনাকে আর যাই হোক হাসিঠাট্টার বিষয় করে ফেলার তো কথা ছিল না।

এ রাষ্ট্রে একটা শিশুকে চুরির অপরাধে পিটিয়ে হত্যা করে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেয়া হয়, এখানে মলদ্বারে কম্প্রেসড বাতাস দিয়ে হত্যা করা হয় একের পর এক শিশু, অতি তুচ্ছ কারণে একজন আরেকজন মানুষকে পিটিয়ে বিকলাঙ্গ করে, হত্যা করে। এ সমাজটা এমনই বর্বর একটা সমাজে পরিণত হয়েছে। মানুষের মর্মান্তিক বর্বরতার শিকার হওয়া এমনই একজন নারীর শিশুসন্তান তার মায়ের ওপরে ঘটে যাওয়া বর্বরতার পর আমাদের উদ্দেশ্য করে তার কষ্টের কথা লিখেছে, তার হতাশার কথা লিখেছে। সেই লেখাটা নিয়েও কি আমাদের মজা করার কথা ছিল? কিন্তু আমরা সেটা করেছি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলোকষ্টে নিহত হওয়ার সংখ্যা সত্যি ৬০ লাখ ছিল কিনা সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে; কিন্তু এটা নিয়ে বিতর্ক নেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাখ লাখ ইহুদি প্রাণ হারিয়েছিল যুদ্ধাপরাধের শিকার হয়ে। অনুমান করি এটা নিয়ে কেউ বিতর্ক করবে না, পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত বড় একটা ট্র্যাজেডি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার হলোকষ্ট। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে হলোকষ্টের ভয়ংকর ট্র্যাজিক ঘটনার ওপরে ভিত্তি করে তৈরি হওয়া সিনেমার মধ্যে অনেকগুলোই কমেডি। এর মধ্যে একটা সিনেমা তো আমাদের অনেকেরই দেখা- রবার্টো বেনিনির ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’।

এত মর্মান্তিক একটা ঘটনা নিয়ে আমরা কেন কমেডি সিনেমা বানাই সেটার নানা রকম ব্যাখ্যা আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ স্লভো জিজেক যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেটা। তিনি বলেন, কোনো একটা ট্র্যাজেডি যখন এত বেশি ভয়ংকর হয়ে যায়, সেটাকে আর গভীর ট্র্যাজিক কোনো ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, তখনই মানুষ সেটা নিয়ে কমেডি করতে শুরু করে। বলাবাহুল্য এটা এক ধরনের ডার্ক কমেডি।

আমার লেখার শুরুতে যে দুটো ঘটনার উল্লেখ করলাম সেগুলোও ডার্ক কমেডির পর্যায়ে পড়ে। ডার্ক কমেডির অস্তিত্ব যতদিন থেকে আছে, ঠিক ততদিন থেকেই এর বিরুদ্ধে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনাও আছে। সমালোচকরা বলেন, যে বিষয়গুলো নিয়ে মজা করা ডার্ক কমেডি হিসেবে গণ্য হয়, সেগুলো নিয়ে মজা করা বিষয়গুলোর গুরুত্বকে নষ্ট করে।

এ পর্যায়ে একটু বলে রাখা ভালো আমি ব্যক্তিগতভাবে ডার্ক কমেডিবিরোধী মানুষ নই। তবে এটা বিশ্বাস করি ডার্ক কমেডি একটা সমাজকে বুঝতে আমাদের অবশ্যই সাহায্য করে। একটা সমাজের অসংখ্য মানুষ যখন কোনো বিষয়ে ডার্ক কমেডিতে ভেসে যায়, তখন সেটা নাগরিকদের সম্পর্কে আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।

জিজেকের ব্যাখ্যা অনুসরণ করে বলা যায়, যে ঘটনাগুলো নিয়ে আমরা কমেডি করছি সেই ঘটনাগুলোর ট্র্যাজিক দিক এমন পর্যায়ে চলে গেছে, এগুলো এখন আর স্বাভাবিক ট্র্যাজিক ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব না। মানে আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা এত খারাপ পর্যায়ে গেছে, কিংবা মানুষের প্রতি ন্যূনতম মমত্ববোধ দূরেই থাকুক, মানুষের প্রতি আমাদের অমানবিকতা এত নিচু পর্যায়ে গেছে, এখন আমরা সেগুলো প্রকাশ করার জন্য ট্র্যাজিক ভাষাকে আর যথেষ্ট মনে করছি না, তাই কমেডি করে সেগুলো প্রকাশ করি।

মানুষ কেন এ ধরনের কমেডি করে সেটার আরেকটা ডায়মেনশন আছে। মানুষ এই পর্যন্ত টিকে থাকার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কারণ তার অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা। মানুষ যখন বীভৎসতার মধ্যে বসবাস করতে থাকে তখন শুরুতে মানুষকে সেটা আহত করে। কিন্তু কিছুদিন পর টিকে থাকার স্বার্থেই তার ব্রেইন তাকে বিষয়গুলো নিয়ে নির্লিপ্ত হতে শেখায়। এ নির্লিপ্ততার ফল সে পায় হাতেনাতে- আরও বেশি বীভৎসতা আসে তার সামনে। টিকে থাকার জন্য তখন সে বিষয়গুলোকে আরও হালকা করে তোলে, সে তখন বিষয়গুলো নিয়ে মজা করতে শিখে যায়। এখনকার ফেসবুকের যুগে নতুন ট্রেন্ড আসার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন্ডি হতে এ কারণেই আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে তাতে শামিল হই।

এর মানে হল এসব বীভৎসতার সঙ্গে বসবাস করতে আমরা শিখে গেছি। এসব বীভৎসতার মধ্যে বসবাস করেও আমরা এখন নিজের মতো করে ভালো থাকতে পারছি। টের পাচ্ছি তো আমাদের সমাজের পচনটা কোন জায়গায় গেছে এবং এটাও বুঝতে পারছি তো সেই পচনে আমাদের আর তেমন কিছুই যায়-আসে না। আমরা এখন একেকজন সর্বংসহা মানুষে পরিণত হয়েছি।

আমরা ক্রমেই ঠিক তেমন একটা জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছি, যেমন একটা জনগোষ্ঠী একটা কর্তৃত্ববাদী সরকারের পরম আরাধ্য। এমন জনগোষ্ঠী তারা চায় কারণ তাদের নিয়ে করা যায় যা ইচ্ছে তাই।

ডা. জাহেদ উর রহমান : সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×