গোয়ালন্দ শিলাইদহ আজও আছে ভাই!

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

পাবনা-ঢাকা রেল চালুর দাবিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মানববন্ধন। ফাইল ছবি

প্রায় এক মাস হল পাবনা এসেছি। সেই যে কোরবানির ঈদে এখানে এসেছি, আর যাওয়ার নামটি নেই। তবে আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই ঢাকায় ফিরে যাব আশা রাখছি। এ অবস্থায় এই ক’দিনে পাবনার সর্বত্র ঘুরেফিরে যা দেখলাম তা নিয়েই আজকের লেখাটি লিখতে বসেছি।

আজ চার সপ্তাহ এখানে অবস্থানকালে সর্বশেষ পাবনার জেলা প্রশাসক সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি নতুন এসেছেন বিধায় তার সঙ্গে পরিচিত হওয়াও একটি বিষয় ছিল। তার আগের জনের সঙ্গে বিশেষ পরিচিতি ও সুসম্পর্ক ছিল। তিনি নারায়ণগঞ্জ বদলি হওয়ার পর নতুন যিনি এসেছেন, ঢাকায় ফেরার আগে তার সঙ্গে তাই কয়েক মিনিট কথা বলে এলাম।

আর কথার এক ফাঁকে তাকে অনুরোধ করে বলেছি, পাবনা মেডিকেল কলেজের পূর্বদিকের অংশে প্রতিদিন মাগরিবের নামাজের আজান দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে যায় এবং এভাবে নিয়ম করে ঠিক নামাজ পড়ার সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বিষয়টি জনগণ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছেন না।

অনেকেই এ বিষয়ে নানা মন্তব্য করছেন, ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিধায় নতুন ডিসি সাহেবকে বিষয়টিতে একটু নজর দেয়ার জন্যও অনুরোধ করে এসেছি। যাক সে কথা। আজ মূল যে বিষয়টি নিয়ে লিখব, তা হল যোগাযোগ ব্যবস্থা।

পাবনা ও এর সন্নিহিত এলাকা, যেমন বৃহত্তর কুষ্টিয়ার তিন জেলা এবং ঈশ্বরদী, রূপপুর ইত্যাদি এলাকার জনগণকে সড়কপথে ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে বর্তমানে সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, আশুলিয়া ঘুরে চলাচল করতে হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুসহ ওইসব এলাকার রাস্তাঘাটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

যমুনা সেতু নির্মাণের আগে এ এলাকার মানুষজনকে আরিচা-নগরবাড়ি ফেরি পার হয়ে চলাচল করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে ফেরির ঝামেলা এড়াতে এ এলাকার জনগণকে সড়কপথে অতিরিক্ত বহুপথ, বহুদূর ঘুরে বঙ্গবন্ধু সেতু ব্যবহার করতে হয়।

আবার ট্রাকসহ পণ্যবাহী অন্যান্য বড় বড় যানবাহনকেও গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ঘুরে তবেই পাবনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ইত্যাদি স্থানে চলাচল করতে হয়। এতে করে পরিবহন খরচসহ জনগণের যাতায়াত খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায় এবং অতিরিক্ত বহুপথ ঘুরে চলাচল করতে হওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অত্যধিক সময় ব্যয় করতে হয়।

এ অবস্থায় উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলাসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়ার ৩টি জেলা মিলে ১৯টি জেলার যানবাহন বঙ্গবন্ধু সেতু ব্যবহার করার ফলে সেতুটির আয়ু নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার রাস্তাঘাটের ওপর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি তো রয়েছেই। যার ফলে আজকাল প্রায়ই টাঙ্গাইলের পশ্চিম পাশ থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত যানজটের কারণে যাত্রীসাধারণকে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় বৃহত্তর কুষ্টিয়ার ৩ জেলা, ঈশ্বরদীর ইপিজেড, পাকশীর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইত্যাদির জন্য যেসব যানবাহন, ওয়াগনবাহী গাড়ি চলাচল করে, সেসব যানবাহনের সোজাপথে চলাচলের সুবিধার্থে আরিচা-নগরবাড় পয়েন্টে একটি সেতুর অপরিহার্যতা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই।

আবার ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল পার হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় অর্ধশত বছর পর পাবনা জেলা শহরে একটি রেলস্টেশন চালু হলেও আজও সেখান থেকে পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালু করা হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে সংসদে কথা উঠলেও রেলমন্ত্রী বলছেন, ‘যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে যে রেলপথটি বানানো হয়েছে, তা আর লোড নিতে পারছে না, বা পারবে না!’ অথচ এ কথা বলার পরও তিনি তার নিজ জেলাসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালু করেছেন।

তাই পাবনাবাসীর প্রশ্ন- ‘রেলমন্ত্রী পাবনার অধিবাসী হলেও কি তিনি ঢাকা-পাবনা সরাসরি ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে একই কথা বলতেন?’

মাননীয় রেলমন্ত্রী, আমি আজ প্রায় এক মাস পাবনা অবস্থান করে এখানকার মাঠঘাট চষে বেড়িয়ে যা দেখেছি, জেনেছি ও শুনেছি, সেসব কথা থেকেই আপনার কাছে উপরোক্ত কথাটি উপস্থাপন করলাম। জানি না, আপনার কাছে কথাটি পৌঁছাবে কি না। তবে পাবনার সর্বস্তরের মানুষ কিন্তু এ বিষয়ে রীতিমতো আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করে দিয়েছেন।

তারা দেয়াল লিখন, পোস্টারিং ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে পাবনা-ঢাকা সরাসরি রেল সার্ভিস চালুসহ আরিচা-নগরবাড়ী-গোয়ালন্দ পয়েন্টে একটি সেতু নির্মাণের জোর দাবি জানাচ্ছেন। আর তাদের এ দাবি দিনের পর দিন জোরালো হচ্ছে।

মাঠঘাটে-হাটবাজারে সর্বত্র পাবনাবাসী তাদের বঞ্চনার কথা বলছেন। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে ১৭ জেলার অন্যতম একটি জেলা হওয়া সত্ত্বেও তারা কেন সরাসরি ঢাকা-পাবনা ট্রেন সার্ভিস পাচ্ছেন না- এ প্রশ্নটি এখন পাবনার ঘরে ঘরে। পাবনার জনমনে এ বিষয়ে আরও প্রশ্ন, তাহলে কি পাবনার দিকে তাকানোর কেউ নেই? কারণ, অবশেষে জেলা শহরে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও কেন পাবনা থেকে ঢাকা সরাসরি ট্রেন চালানো হচ্ছে না?

মাননীয় রেলমন্ত্রী, আপনাকে আরও জানিয় রাখি, আমি স্বচক্ষে দেখে এলাম বিষয়টি নিয়ে পাবনাবাসী ভীষণভাবে দুঃখিত ও ক্ষুব্ধ। কারণ সেদিনের মহকুমা শহরগুলোর সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালু হবে, আর ব্রিটিশ আমলের জেলা শহর হওয়া সত্ত্বেও পাবনার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ট্রেন সার্ভিস এখনও চালু করা হবে না- এ বিষয়টি পাবনার জনগণ কোনোমতেই মেনে নিতে পারছেন না।

সেদিন দেখলাম, প্রেস ক্লাবের সামনে বিষয়টি নিয়ে তারা একটি মানববন্ধন করছেন। সুতরাং পাবনাবাসীর এ দাবিটুকু এখন মেনে নেয়াই শ্রেয় বলে মনে হয়। কারণ একে তো সড়কপথে ঢাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের পাবনার একদম উত্তরে প্রায় বগুড়ার কাছে গিয়ে তারপর পূর্বদিকে ঘুরে সিরাজগঞ্জের ওপর দিয়ে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, আশুলিয়া হয়ে ঢাকায় ঢুকতে হয়; তারপর তারা একটি রেলস্টেশন পেয়েও পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন সার্ভিস পাচ্ছে না, এটা কোনো ন্যায়নীতির কথা হতে পারে না।

তাই পাবনাবাসী এ ক্ষেত্রে বসে নেই। তারা যে এ নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেছেন, তা আগেই উল্লেখ করেছি। প্রায় দু’বছর আগে থেকেই দেওয়াল লিখন, পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি জানান দিয়ে বর্তমানে তারা মাঠে নেমেছেন। বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌঁছেছে কি না, জানি না, তবে পাবনা এবং সন্নিহিত এলাকার জনগণ সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

তারা পাবনা-ঢাকা সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালুর পাশাপাশি সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের জন্য আরিচা-নগরবাড়ী-গোয়ালন্দ সেতু নির্মাণের জোরালো আবেদন নিয়ে কাজ করে চলেছেন। আর ওয়াই (ণ) শেপবিশিষ্ট সেতুটি ‘শেখ হাসিনা সেতু’ নামকরণ করে তারা পাবনার অলিগলিতে, দেয়ালে-দেয়ালে পোস্টারও সেঁটে দিয়েছেন।

এখন সংবাদটি বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার কানে পৌঁছাবে এবং তিনি আরিচা-নগরবাড়ী-গোয়ালন্দ সেতু নির্মাণের জন্য অন্তত একটি ঘোষণা দেবেন- সেই অপেক্ষায় তারা প্রহর গুনছেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমলে এ দেশে প্রথম যে স্থানে বৃহৎ সেতুটি নির্মিত হওয়া উচিত ছিল, তা হল আরিচা-নগরবাড়ী-গোয়ালন্দ পয়েন্ট। আর তা হওয়া উচিত ছিল ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণেই।

আরিচা থেকে খুলনা ও পার্বতীপুর সমদূরবর্তী হওয়ায় প্রথম সেতুটি ভৌগোলিক কারণে সেখানে হওয়া উচিত ছিল। আর ঐতিহাসিক কারণ তো তুলনাহীন। এ দেশে পদ্মা-যমুনার সঙ্গমস্থলে আরিচা-নগরবাড়ী-গোয়ালন্দের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা কেই বা না জানেন! কারণ মোগল আমল, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ আমল পর্যন্ত সবসময় এ তিনটি নদীবন্দর ইতিহাসের সাক্ষী। আর ঐতিহাসিক সেই গুরুত্ব এখনও অম্লান।

মালামাল পরিবহনসহ শত শত বছর ধরে এই তিনটি স্থান দিয়ে পৃথিবীর অনেক স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিত্বের আগমন-প্রত্যাগমন ঘটেছে। আর বর্তমান অবস্থায় তো মালামাল পরিবহন এবং জনগণের চলাচলের ক্ষেত্রে আরিচা-নগরবাড়ী-গোয়ালন্দের গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে।

ফরিদপুর এবং বৃহত্তর কুষ্টিয়ার তিনটি জেলাসহ ঝিনাইদহ, ঈশ্বরদী, পাবনা ইত্যাদি এলাকা এবং তার সন্নিহিত অঞ্চলের জনগণের ঢাকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য উপরোক্ত তিনটি পয়েন্টের বিকল্প কোনো কিছুই হতে পারে না। তদুপরি ঈশ্বরদীর ইপিজেড এবং পাকশীর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় মালামাল পরিবহন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গমনাগমন সে গুরুত্ব আরও অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

আর এতদঞ্চলের মানুষের যাতায়াতসহ মালামাল পরিবহন ইত্যাদি ক্ষেত্রে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ঘুরে বগুড়ার পাশ দিয়ে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, পাবনা, ঈশ্বরদী চলাচল কোনোমতেই যুক্তিযুক্ত নয়, এ বিষয়টি বোধহয় সহজেই অনুমেয়।

উপসংহার : বাংলাদেশে এখন উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে। আর এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর চাপ কমিয়ে আরিচা-নগরবাড়ী-গোয়ালন্দ ওয়াই (ণ) শেপ সেতু নির্মাণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আর এ অপরিহার্যতা বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাই পূরণ করতে পারেন। শুনেছি এই সেতুটি নির্মাণের জন্য ফাইলপত্র বা পেপার ওয়ার্ক প্রস্তুত করা আছে।

তাই পাবনা, ফরিদপুরসহ এ অঞ্চলের ৫-৬টি জেলার জনগণের দাবি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করে বলতে চাই, এ অঞ্চলের মানুষ সোজাপথে ঢাকা যাতায়াত করতে চান। সিরাজগঞ্জ-টাঙ্গাইল-গাজীপুর ঘুরে নয়। সেই শিশুকাল থেকে আমরা শুধু মানিকগঞ্জ পার হয়ে ঢাকা পৌঁছাতাম।

সে ক্ষেত্রে যদিও আমাদের ফেরি পার হতে হতো। কিন্তু শিশুকাল থেকে আজ বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত এখনও ফেরি পার হতে হলে সেই দুঃখ, সেই কষ্ট যে থেকেই যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই তা বুঝবেন।

পরিশেষে কবির সেই কথাটি দিয়েই লেখাটি শেষ করছি : ‘গোয়ালন্দ শিলাইদহ আজও আছে ভাই/ আমার দেশে আমি যাব সোজা রাস্তা নাই!’

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট