এই ন্যক্কারজনক আচরণের অবসান চাই

  এ কে এম শামসুদ্দিন ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এই ন্যক্কারজনক আচরণের অবসান চাই
ফাইল ছবি

২ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের তৃতীয় পৃষ্ঠার একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘ঝুলিয়ে পিটিয়ে মিথ্যা খুনের স্বীকারোক্তি আদায় করে ডিবি’। সংবাদটি পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আবু সাঈদ নামক এক কিশোরের ‘কথিত অপহরণ ও হত্যা’ মামলায় সম্পূর্ণ নিরপরাধ ব্যক্তির সঙ্গে সরকারের একটি বিশেষ সংস্থার কিছু সদস্যের মধ্যযুগীয় নির্মম আচরণের রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা আছে খবরটিতে।

কথিত খুনের অন্যতম আসামি আফজাল দেশের সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের কাছে তার জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে দাবি করেন, ২০১৪ সালে তিনি এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। একই বছর ১৬ এপ্রিল রাত সাড়ে ১২টায় ডিবি পুলিশ তাকে, তার বাবা, বড় বোন সোনিয়া, ছোট বোন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তানিয়া ও তার ফুপাতো ভাই সাইফুলকে আটক করে প্রথমে বরিশালের হিজলা থানায় নিয়ে যায়। আটক করার সময় জানানো হয়, অপহরণের মামলা আছে তাদের বিরুদ্ধে।

পরবর্তী সময়ে হিজলা থানা থেকে ঢাকার ডিবি অফিসে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন করে মিথ্যা অপহরণ ও খুনের স্বীকারোক্তি দিতে তাদের বাধ্য করা হয়। তার ভাষায়, ‘নির্যাতনের একেকটি দিন ছিল বিভীষিকাময়। অফিসের সিলিংয়ের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে দুই হাত রশি দিয়ে বেঁধে পিটিয়েছে। রক্তে জামা লাল হয়ে গেছে। যে আসে সেই পেটায়। একজন পেটাতে পেটাতে হয়রান হয়ে গেলে আরেকজন এসে পেটাতে শুরু করে। একটা বেত ভেঙে গেলে আরেকটা বেত এনে পেটায়।’ যে পর্যন্ত না ১৬৪ ধারায় পুলিশের শেখানো জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছে, সে পর্যন্ত তাদের ওপর এ বর্বর নির্যাতন চলেছে।

আফজালের বর্ণনা যত না মর্মান্তিক, তারচেয়েও তার বোন সোনিয়ার ওপর শারীরিক এবং মানসিক টর্চার আরও করুণ ও হৃদয়স্পর্শী ছিল। সোনিয়া বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘ডিবি অফিসে নিয়ে আমাকে, আমার ভাই, বাবা ও ফুপাতো ভাইকে ভীষণ অত্যাচার করেছে। আমাকে নারী পুলিশ মারধর করেছে। মারধর করার সময় অপরাধ স্বীকার করে তাদের শেখানো ঘটনা উল্লেখ করে যেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেই সে জন্য পুলিশ বারংবার আমার ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে। আমি অস্বীকার করলে আমার এবং ছোট বোনের সামনেই পুলিশ ভাই ও বাবাকে বেদম মারধর করেছে। চেয়ারে মোটা রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে আমার বাবাকে খুব মেরেছিল। ‘পাঠক চোখ বন্ধ করে বর্ণিত ঘটনাটি একবার উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন, আপনার সামনে আপনার পিতা কিংবা ভাইকে যদি এমন করে পেটানো হয়, তাহলে আপনার মানসিক অবস্থার কী হবে? একজন অসহায়-নিরপরাধ ভুক্তভোগী নারীর জন্য এর চেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা আর কী হতে পারে? শুধু তাই নয়, তার বাবার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পুলিশ সোনিয়াকে হুমকি দেয়, ‘তোর বাবাকে এক শর্তে ছাড়তে পারি, যদি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিস। তা না হলে তোর বাবাকে মেরে ফেলব।’ এমন এক অসহায় মুহূর্তে সোনিয়া শেষ পর্যন্ত বাবার জীবন বাঁচাতে পুলিশের শেখানো জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়। অথচ এ মামলায় সোনিয়ার বাবা তালিকাভুক্ত কোনো আসামি ছিলেন না। তদন্ত কর্মকর্তা সোনিয়ার ফুপাতো ভাই সাইফুলের মাথায়ও পিস্তল ঠেকিয়ে একই কায়দায় স্বীকারোক্তি আদায় করে। পরে পুলিশ ২০১৫ সালের ১৫ জুন সোনিয়া ও আফজালসহ চারজনের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দেয়। চারজনের মধ্যে আফজাল ৩৩ মাস, সাইফুল ২৪ মাস এবং সোনিয়া ৬ মাস কারাভোগ করে জামিনে মুক্ত হন। অথচ যাকে অপহরণ এবং খুনের দায়ে গত চার-পাঁচ বছর এতগুলো মানুষ পুলিশের নিষ্ঠুর শিকারে পরিণত হয়েছে, সেই আবু সাঈদ সম্প্রতি জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরে এসেছে।

গাজীপুরের অন্য একটি ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে না পেয়ে তার বদলে স্ত্রীকে ধরে নেয়ার ঘটনাও অনভিপ্রেত। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ৭ আগস্ট গাজীপুরে এক মুমূর্ষু রোগীকে রমজান আলী নামক এক অটোরিকশা চালক তার অটোরিকশার ব্যাটারির চার্জ না থাকায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন। ফলে অন্য কোনো বাহন পেতে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হয়। অবশেষে হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতে রোগীর মৃত্যু হয়। এর জের ধরে শ্রীপুর থানার পুলিশ ওইদিন রাতে অটোরিকশা চালককে গ্রেফতার করতে বাড়ি গিয়ে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রী, দুই বছরের দুগ্ধশিশুর মা আমেনা বেগমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। অটোরিকশা চালক কিংবা তার স্ত্রী কারও নামেই থানায় কোনো মামলা বা অভিযোগ ছিল না। রমজান আলী পুলিশের কাছে ধরা না দিলে স্ত্রী আমেনা বেগমকে ছাড়া হবে না বলে হুমকিও দেয়া হয়। পুলিশ ভুক্তভোগী মহিলাটিকে সারা রাত থানায় আটকে রাখে। প্রশ্ন হল, দেশের কোন আইন কিছু পুলিশের এ অমানবিক আচরণকে জাস্টিফাই করে? সংবিধানের কোন ধারায় লেখা আছে অভিযুক্তকে না পেলে তার আত্মীয়স্বজন-আপনজনকে আটক করতে হবে? সংবাদপত্র খুললেই প্রতিদিন আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো না কোনো সদস্য দ্বারা সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণের ঘটনার খবর দেখতে পাই। এসব ঘটনা মানুষকে দিন দিন ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলছে।

বর্তমানে সাধারণ মানুষ যে কত অসহায়, উপরের পৃথক দুটো ঘটনা তারই প্রমাণ বহন করে। ঘটনা দুটো আমাদের ব্যথিত করে, মানসিক কষ্ট দেয়। আমরা প্রায়ই লক্ষ করি, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের পুলিশ ফোর্সের কিছু সদস্যের এরূপ কর্মকাণ্ড সংগঠনের সবার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। যেখানে ফোর্সের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভাবমূর্তি রক্ষায় নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে এ ধরনের ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক। তদন্ত কর্মকর্তা যদিও বরাবরের মতো আফজালের দাবিকে অস্বীকার করেছেন; তবুও প্রশ্ন থাকে, মিথ্যা হত্যা মামলায় আফজালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে জেলহাজতসহ বিগত চার বছরে যে মানসিক টর্চার করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা তার কী জবাব দেবেন? অবশ্য কথিত খুনের ঘটনায় পুলিশের এ ধরনের তদন্তের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে পুলিশ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার কথা সাংবাদিকদের কাছে ব্যক্ত করেছেন।

কিছু পুলিশের এ ধরনের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এ বছরের পুলিশ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক আচরণ ও নির্যাতন না করার জন্য পুলিশবাহিনীর সব সদস্যের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশের মাধ্যমেই পুলিশের কিছু কিছু সদস্য দেশের মানুষের সঙ্গে যে অন্যায় আচরণ করে, তা উঠে এসেছে। অথচ এসব বড় বড় অন্যায় কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে হাতেগোনা দু-একটি ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়, এমন শাস্তি প্রদানের উদাহরণ নেই। বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি ও দায়মুক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। ফলে এ ধরনের বর্বর আচরণের ঘটনাও দিন দিন বেড়েছে। এ জন্য পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভেতর এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি (কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার, ক্যাট) আয়োজিত বাংলাদেশের মানবাধিকার সংক্রান্ত যে সভা অনুষ্ঠিত হয়, এখানে তা উল্লেখ করতে চাই। এ বছর বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জোট মানবাধিকার ফোরাম বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর একটি রিপোর্ট ক্যাটের জেনেভা অফিসে জমা দেয়। রিপোর্টে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে পাওয়া বাংলাদেশে পুলিশি হেফাজতে বা রিমান্ডে নির্যাতনের যেসব কৌশল প্রয়োগ করে, সেগুলোর বিবরণ উল্লেখ করা হয়। রিপোর্টে উল্লেখ আছে, হাত-পা বেঁধে শুইয়ে পায়ের তলায় পেটানো হয় যাতে আঘাতের চিহ্ন না দেখা যায়, ছাদের হুকে ঝুলিয়ে নির্বিচারে পেটানো, মুখে কাপড় গুঁজে নাকে-মুখে অনবরত পানি ঢেলে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়ার মতো অবস্থা তৈরি করা এবং ধাতুর তৈরি আংটি আঙুলে পরিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া ইত্যাদি। উল্লেখ্য, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এক সভাও অনুষ্ঠিত হয় যেখানে আমাদের আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল যোগ দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে। সভায় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আইনমন্ত্রী। আমাদের আইনমন্ত্রীর বক্তব্য তারা কতটুকু গ্রহণ করেছেন, তা আমরা খবরের কাগজের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই জানতে পেরেছি।

গত কয়েক বছরে অত্যাচার, অনাচার, সন্ত্রাস, হত্যা, গুম, হামলা-মামলায় (ভূতুড়ে মামলা) মানুষের মনের ভেতর এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। মানুষ যখন দেখে, দেশে এমন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো না কোনো অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সরকারের তরফ থেকে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না, তখন স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষের মনে ধারণা জন্ম নেয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার বাইরেও কিছু ক্ষমতাশালী লোক আছেন যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে; কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশে এমন চলতে পারে না। এ অদ্ভুত চর্চা বেশি দিন চলতে দেয়াও উচিত নয়।

এসবের প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সদিচ্ছাই যথেষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সদিচ্ছার কথা যতই বলুক না কেন, দেশের মানুষ সেই সদিচ্ছা ও অনিচ্ছার পার্থক্য ভালোভাবেই বোঝেন। জনগণের এ ধারণাকে ভুল প্রমাণের জন্য দরকার বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা। এ ধরনের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। মনে রাখতে হবে, পক্ষপাতমূলক তদন্ত, মিথ্যা মামলায় হয়রানি, হেফাজতে রেখে নির্যাতনের অবসান না হলে মানুষের ভয়ের সংস্কৃতির অবসান হবে না।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×