স্বদেশ ভাবনা

মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো নির্জীব কেন?

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবদুল লতিফ মন্ডল

বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন অবস্থা নিয়ে ৪ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সুপারিশ আগের সংসদগুলোর মতোই উপেক্ষিত হচ্ছে। অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এক রকম নিষ্ফলে পরিণত হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলো।

এতে নষ্ট হচ্ছে মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা। অহেতুক অপচয় হচ্ছে অর্থেরও। সব মিলিয়ে ‘সিটিং-মিটিং-ব্রিফিংয়ে’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে সংসদীয় কমিটির মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কার্যক্রম।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে ১২৬টি সুপারিশ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এর মধ্যে মাত্র ২৩টি (১৮ দশমিক ২৬ শতাংশ) বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকি ১০৩টি অর্থাৎ প্রায় ৮২ শতাংশ (৮১ দশমিক ৭৪ শতাংশ) সুপারিশই মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় এসব কমিটির সভাপতিদের অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

ইতিপূর্বে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো তেমন কার্যকর হতে না পারা, তাদের অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়া এবং বর্তমানেও একই ধারা চালু থাকার কারণগুলো চিহ্নিতকরণ এবং এ অবস্থার উন্নতির জন্য কী করণীয় তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

সংসদের স্থায়ী কমিটি গঠনের ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে। এ অনুচ্ছেদের দফা (১)-এর নির্দেশনা মোতাবেক সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংসদ (ক) সরকারি হিসাব কমিটি, (খ) বিশেষ অধিকার কমিটি এবং (গ) সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট অন্যান্য স্থায়ী কমিটি গঠন করবে।

উপরে (গ)-এর নির্দেশনা মোতাবেক সংসদ চলতি অধিবেশনে ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এবং অন্যান্য বিষয়ে ১১টি কমিটি গঠন করেছে।

মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।

সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদের দফা (২)-এ সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা ও কার‌্যাবলির বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কমিটি সংবিধান ও অন্য কোনো আইনসাপেক্ষে (ক) খসড়া বিল ও অন্যান্য আইনগত প্রস্তাব পরীক্ষা করতে পারবে; (খ) আইনের বলবৎকরণ পর্যালোচনা এবং অনুরূপ বলবৎকরণের জন্য ব্যবস্থাদি গ্রহণের প্রস্তাব করতে পারবে; (গ) জনগুরুত্বসম্পন্ন বলে সংসদ কোনো বিষয় সম্পর্কে কমিটিকে অবহিত করলে সে বিষয়ে কোনো মন্ত্রণালয়ের কার্য বা প্রশাসন সম্বন্ধে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারবে এবং কোনো মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি সংগ্রহের এবং প্রশ্নাদির মৌখিক বা লিখিত উত্তর লাভের ব্যবস্থা করতে পারবে; (ঘ) সংসদ কর্তৃক অর্পিত অন্য যে কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারবে। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে কমিটির কাজের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে সংসদীয় কমিটিগুলো, বিশেষ করে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারা এবং তাদের অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

এক. ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের জন্য সংসদীয় সরকার পদ্ধতির বিধান করা হয়। মন্ত্রিসভা যৌথভাবে জাতীয় সংসদের নিকট দায়ী থাকার বিধান করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকবশত, সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর সংসদীয় সরকার পদ্ধতি তিন বছরও চালু ছিল না।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় সরকারব্যবস্থার স্থলে প্রবর্তিত হয় একদলীয় রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার। সংসদের কাছে মন্ত্রিসভা তথা সরকারের দায়বদ্ধতার অবসান ঘটে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরবর্তী ১৫ বছর রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা তথা সরকার সংসদের কাছে দায়ী না থাকায় সার্বিকভাবে সংসদ এবং বিশেষ করে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।

দুই. ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হলেও পরবর্তী ১৮ বছর পালাক্রমে ক্ষমতায় আসীন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আমলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকর ভূমিকা পালনে সহায়ক তেমন কোনো জোরদার পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নতুন সংসদ গঠনের পর যত শিগগির সম্ভব সংসদীয় কমিটি গঠনের নির্দেশনা থাকলেও ক্ষমতাসীন দল কোনো কোনো সময় সে নির্দেশনা পালন করেনি।

১৯৯৬ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ওই বছরের ১৪ জুলাই সপ্তম সংসদের অধিবেশন শুরু হলেও ১৬ মাস পর বিরোধী দল বিএনপির সদস্য ছাড়াই কয়েকটি স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়।

১৯৯৮ সালের মে মাসে অর্থাৎ ৭ম সংসদ অধিবেশন শুরুর প্রায় দু’বছর পর বিএনপির সদস্যদের নিয়ে সব স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়।

২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলে একই দৃশ্যের অবতারণা হয়। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর অষ্টম সংসদের অধিবেশন শুরুর পর প্রায় তিন বছর লাগে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সদস্যদের নিয়ে সব স্থায়ী কমিটি গঠনে।

ফলে এ দুই সংসদের মেয়াদকালে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে খুব কম সময় পায়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সহযোগী দলগুলো দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।

সংসদে আওয়ামী লীগ সদস্যদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও দশম সংসদে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকর হতে পারেনি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক দশম জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের ওপর প্রণীত ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিধি অনুযায়ী ৫০টি সংসদীয় কমিটির প্রতি মাসে একটি করে মোট ৩ হাজার বৈঠক করার কথা থাকলেও বৈঠক হয়েছে ১ হাজার ৫৬৬টি। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি ও বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত কমিটির কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।

তিন. আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সপ্তম সংসদের পঞ্চম অধিবেশনে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সংশোধনী এনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে মন্ত্রীর স্থলে সদস্যকে সভাপতি করার বিধান করা হয়। মন্ত্রী কমিটির একজন সদস্য হিসেবে থাকেন। এটা ছিল নিঃসন্দেহে একটি ভালো পদক্ষেপ।

তবে এর ফলে শুরু হয় মন্ত্রী ও সভাপতির মধ্যে মনকষাকষি। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতিরা চান কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা সংসদীয় কমিটিগুলোকে সুপারিশকারী সত্তার অতিরিক্ত কিছু হিসেবে দেখতে চান না।

মন্ত্রী ও কমিটির সভাপতির মনকষাকষিতে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যকারিতা আগেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এখনও হচ্ছে। তাছাড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে বিরত থাকে।

টিআইবির এক সমীক্ষায় দেখা যায়, নবম সংসদে ১১টি কমিটি মোট ১ হাজার ৮৯১টি সুপারিশ প্রদান করে। এগুলোর ৪১ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব সুপারিশ হারিয়ে যায়।

চার. যথাযথ কার্যপদ্ধতির অভাবে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো অনেক সময় কার্যকর হতে পারেনি। মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর কার‌্যাবলী সম্পর্কে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে (২০০০) বলা হয়েছে, সংসদে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো বাজেট ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন গভীরভাবে অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা না করে মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর কতিপয় গতানুগতিক বিষয়ের ওপর তাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখে।

পাঁচ. মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর গঠন অনেক সময় এগুলোর কার্যকর হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একাদশ সংসদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটিতে এমন কয়েকজন সদস্যকে সভাপতি করা হয়েছে যারা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন অব্যবহিত আগের সরকারে ওইসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন।

উদাহরণস্বরূপ, অব্যবহিত আগের সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে একই মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

অনুরূপভাবে অব্যবহিত আগের সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।

বিজ্ঞজনরা মনে করছেন, এসব স্থায়ী কমিটির সভাপতিরা তাদের সময়ে ওইসব মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ও অনিয়ম ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত থাকবেন। ফলে তাদের নেতৃত্বাধীন কমিটিগুলোর কাজ, বিশেষ করে তাদের সময়ে ওইসব মন্ত্রণালয়ের কাজের পর্যালোচনায় স্বচ্ছতা আসবে না।

টিআইবির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন ও এর কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়। সদস্যরা কমিটিকে নিজেদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে অকার্যকর হয়ে পড়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

ছয়. সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা বাড়াতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনীহা। সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা বাড়াতে আইন প্রণয়নের ব্যাপারে একমত হয় নবম সংসদের সব সংসদীয় কমিটি। সে সময় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির অনুরোধে সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাবসংবলিত একটি আইনের খসড়া মন্ত্রণালয় ওই কমিটির নিকট প্রেরণ করে।

ওই খসড়ার উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো ছিল- (ক) সাক্ষীদের হাজির হতে এবং দলিল ও তথ্যপ্রমাণ দাখিলে তাদের বাধ্য করতে কমিটিকে ক্ষমতা প্রদান; (খ) সংসদীয় কমিটি কর্তৃক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থা সম্পর্কিত কোনো অনিয়ম তদন্তকরণ এবং তদন্ত শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশসংবলিত তদন্ত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পেশ; (গ) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থা কর্তৃক ৬০ দিনের মধ্যে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং কমিটিকে অবহিতকরণ; এবং (ঘ) নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মন্ত্রণালয় বা সংস্থা সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে কমিটিকে কারণ অবহিতকরণ। সরকারের অনুমোদন না পাওয়ায় প্রস্তাবগুলো বিল আকারে সংসদে উত্থাপিত হয়নি।

সাত. জাতীয় সংসদসহ সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকর করতে সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সহযোগী দলগুলো দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় ওই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি।

সরকারি দলের তুলনায় খুব স্বল্পসংখ্যক সদস্য নিয়ে জাতীয় পার্টি সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে থাকে।

এজন্য এবং একইসঙ্গে বিরোধী দল ও সরকারে থাকার কারণে দলটি সংসদে এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে কার্যকর ভূমিকা পালনে সমর্থ হয়নি। নজিরবিহীন অনিয়মের মধ্য দিয়ে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মাত্র ৬টি আসনে জয়লাভ করে।

দশম সংসদের চেয়ে কমসংখ্যক সদস্য নিয়ে একাদশ সংসদেও প্রধান বিরোধী দলের আসনে অধিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি সংসদ ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক।

জাতীয় সংসদকে অধিকতর কার্যকর করতে সংসদীয় কমিটিগুলোর, বিশেষ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কমিটিকে সংসদের চোখ-কান বললে বোধহয় অত্যুক্তি করা হবে না।

রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ হল নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ। নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব হল সরকারের নীতিনির্ধারণ, নীতিনির্ধারণমূলক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন পর্যালোচনা এবং আইন প্রয়োগ।

নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো, বিশেষ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এসব কমিটির কার্যকর ভূমিকা পালনে প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ এবং তা সৃষ্টি করার দায়িত্ব সরকারের।

যতদূর জানা যায়, সংসদীয় সরকার পদ্ধতি চালু রয়েছে এমন দেশগুলোতে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করে কোনো আইন প্রণীত হয়নি, যদিও সাধারণভাবে সরকারের মন্ত্রণালয় বা সংস্থাগুলো সংসদীয় কমিটির অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়ন করে থাকে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ভারতে সাধারণত সংসদীয় কমিটির তিন-চতুর্থাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়। যেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় না, সেগুলোর বাস্তবায়ন না করার কারণ মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়ে দেয়। যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন বা বাস্তবায়ন না করার ক্ষেত্রে কারণ জানানোর জন্য সময়সীমা নির্ধারিত আছে।

সবশেষে বলতে চাই, সংসদকে অধিকতর কার্যকর করতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে, বিশেষ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। তবে একইসঙ্গে সরকার ও সংসদের মধ্যে একটি সমঝোতা থাকতে হবে, যাতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো এমন কোনো সুপারিশ না করে যা সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় এবং সরকার কমিটিগুলোর সুপারিশ যতদূর সম্ভব বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]