মুগাবে নেই কিন্তু তার অনেক অনুসারী আছে

  লিওনিদ বারশিদেস্কি ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুগাবে

৯৫ বছর বয়সে মারা যাওয়া জিম্বাবুয়ের নেতা রবার্ট মুগাবে ছিলেন একজন খাঁটি বীর; কিন্তু তিনি নিজের জনগণের জন্য যে ন্যায়ের ডাক দিয়েছিলেন সেটি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

সর্বদিক থেকে তাকে একনায়ক বোঝায় ও যেসব দেশ একনায়কদের সহ্য করতে ইচ্ছুক, সেসব দেশের জন্য মুগাবের জীবনের গল্প একটি সতর্কবার্তা- এমন একটি সতর্কবার্তা যা অগোচরে থেকে যায় বলে মনে হয়।

একইসঙ্গে ওইসব বিশ্ব নেতার প্রতি এটি একটি সতর্কবার্তা, যারা মনে করেন, তারা উন্নয়নশীল বা অগণতান্ত্রিক দেশগুলোকে কূটনীতি দিয়ে এবং বিধিনিষেধ আরোপ করে সোজা পথে আনতে পারবেন। এর নেতিবাচক প্রক্রিয়া হতে পারে ভয়ংকর।

মুগাবে বেড়ে উঠেছেন বই আসক্ত হিসেবে এবং তার বেড়ে ওঠা ছিল এমন একটি গ্রামে, যেখানে বিদ্যুৎ ছিল না। তার উচ্চকাঙ্ক্ষী মা ও একজন খ্রিস্টান পুরোহিত পড়াশোনার প্রতি তাকে উৎসাহ দিয়েছেন ও প্রচেষ্টা নিয়েছেন। উপ

নিবেশবিরোধী কার্যক্রমের জন্য জেলে থাকার ১১ বছর সময়কালেও তিনি পড়াশোনা বন্ধ করেননি। একজন শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিনি নেতৃত্বের জন্য লালায়িত ছিলেন না; বিপরীতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় পদের প্রতি তার তীব্র আকাক্সক্ষা ছিল, যে আন্দোলনের চাওয়া ছিল তৎকালীন বর্ণবাদী রোডেশিয়ায় অস্বীকৃত থাকা কালোদের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

এমনকি প্রতিরোধের সামরিক অংশের সময়ও তিনি উর্দি পরিধান করতেন না, বিপরীতে স্যুটকে প্রাধান্য দিতেন ও নিজের নীলনকশা এবং পরিকল্পনায় অন্যদের প্রতি সহিংস অ্যাকশনও ছেড়ে দিতেন।

১৯৭৯ সালের ল্যানচেস্টার হাউস চুক্তি রোডেশিয়ার স্বঘোষিত স্বাধীনতার ইতি টেনেছিল এবং সরকার ও দুটি বিদ্রোহী গ্রুপের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেগুলোর একটি পরিচালিত হতো মুগাবের নেতৃত্বে।

চুক্তির দিকে চালিত করা আলোচনার সময় আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া ও সভাপতিত্ব করা ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড ক্যারিংটন মুগাবেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি ত্যক্ত-বিরক্ত কিনা।

সর্বোপরি, তাকে বেআইনিভাবে কারাবন্দি করে রাখা হয় এবং স্মিথের সরকার এমনকি তার তিন বছর বয়সী ছেলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য তাকে সাময়িকভাবেও মুক্তি দেয়নি। এমন অবস্থায়ও মুগাবের জবাব ছিল ‘আমি মানুষের সঙ্গে নয়, চলমান পদ্ধতির সঙ্গে ত্যক্ত-বিরক্ত।’

এমনটিই শুনতে চাচ্ছিলেন পশ্চিমা নেতারা- এমন একটি নিশ্চয়তা যেখানে তার অনিবার্য বিজয়ের পর তিনি দেশের শ্বেতাঙ্গ এলিট শ্রেণির বিরুদ্ধে যেতে না পারেন। এই শ্বেতাঙ্গ এলিট শ্রেণি ছিল দেশটির জনসংখ্যার এক শতাংশ; কিন্তু তারা ৭০ শতাংশ কৃষি জমির মালিক ছিল।

ক্যারিংটন মুগাবের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন ভূমি সংস্কার ১০ বছরের জন্য স্থগিত করার জন্য, যাতে ইউকে ও ইউএস এইডকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল শ্বেতাঙ্গদের জমি স্বেচ্ছায় বিক্রি করলে তারা কিনতে পারবে।

মুগাবে প্রথম দিকে এতে অনিচ্ছুক ছিলেন; কিন্তু পরে সংঘাত শেষ করার জন্য তিনি নমনীয় হন। ১৯৮০ সালে ব্রিটেনের তত্ত্বাবধানে একটি নির্বাচনে তিনি জয়ী হন এবং জিম্বাবুয়ের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। প্রাথমিকভাবে তিনি অংশগ্রহণমূলক করার নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন এবং সম্পত্তির অধিকারকে সম্মান দেখান।

তখন পর্যন্ত তাকে যারা ক্ষমতায় এনেছিলেন তারা ছিল একটি বিপ্লবী বাহিনী; যেসব মানুষ অনুভব করেছিল যে তারা যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, তারা কিছুটা প্রশ্রয়ের কারণে ছিলেন অধৈর্য এবং অন্যায্যতার বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ।

একজন দক্ষ ও নিপুণ পরিচালনাকারী হিসেবে অস্থির মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সুকৌশলে আনুগত্যে আনতে তিনি সক্ষম হন এমন একটি সময়ে যখন উপজাতি এলাকায় অবারিত সহিংসতা তাদের সমর্থন করেছিল।

অনুগতদের পুরস্কৃত করতে হয়েছিল তাকে, বিপরীতে তিনি তাদের সমর্থন পেয়েছিলেন। কৃষি জমি কেনার জন্য আসা বিদেশি ফান্ড অন্যদিকে ঘুরে যায় এবং সেটি ভূমি বণ্টনের মৌলিক অন্যায্যতার প্রশ্নে কখনও যথেষ্ট ছিল না।

যুদ্ধে অংশ নেয়া বিখ্যাত যোদ্ধারা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন এবং মুগাবের ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়ছিল। ২০০০ সালে মুগাবে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ছাড়াই তাদের অনুমতি দেন শ্বেতাঙ্গ কৃষকের জমি অধিগ্রহণ করার জন্য। এতে করে সহিংসতা ও ধ্বংসাত্বকতা আসন্ন হয়ে পড়ে

বাণিজ্যিক চাষাবাদের ওপর নির্ভরশীল জিম্বাবুয়ের অর্থনীতি যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুবরণ করে। এর পেছনে কৃষকের উচ্ছেদের জবাবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেছিল। ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির ঘটনা ঘটে জিম্বাবুয়েতে।

তবে অর্থনীতি ধ্বংসের পেছনে আরও একটি কারণ ছিল ১৯৭৯ সালের একটি প্রতিশ্রুতি, যাতে মূল জিম্বাবুইয়ানদের ক্ষমতার দাবি করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল; কিন্তু উপনিবেশ স্থাপনকারীদের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি দাবি করার কোনো সুযোগ ছিল না।

এসবের মধ্য দিয়ে মুগাবে নিয়মিতভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক কঠোর কাজটি করে গেছেন, এমনকি তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহচররা দেশের সম্পদ চুরি করে গেছেন। ২০০০ সালের মাঝামাঝি এটি স্পষ্ট হয়ে যায়, জিম্বাবুয়ের নেতা স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বপ্নগুলোকে কবর দিয়ে ফেলেছেন দুর্নীতিগ্রস্ত একদলীয় প্রশাসন তৈরির মধ্য দিয়ে।

এ প্রশাসন টিকে ছিল সহিংসতা ও কূটকৌশলের মধ্য দিয়ে এবং অর্থনীতির নিয়মগুলো ভেঙে যাচ্ছিল ক্ষুদ্র এলিট একটি শ্রেণির প্রয়োজন মোতাবেক দীর্ঘসময় তাদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে। কিছুটা ভিন্নতাসহ এই থিম স্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল আফ্রিকায়; কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দিকেও এটি এক ধরনের নীতিতে পরিণত হয়েছে।

মুগাবে বৃদ্ধ হয়ে গেছেন এবং সরকারি কর্মকাণ্ডে তিনি ক্রমবর্ধমানভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছিলেন। তার প্রিয় অনুগত এবং যে কোনো বিচারে উত্তরাধিকারী এমারসন নানগাওয়া সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ২০১৭ সালে মুগাবেকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে। তার প্রশাসনও প্রতিটি পদক্ষেপে মুগাবের ঝিমিয়ে পড়া বছরগুলোর মতো মূলনীতি ও উদ্দীপনাহীন থাকে।

অসাধারণ প্রতিভাধারী ও নাছোড়বান্দা ব্যক্তি হিসেবে মার্কসীয় আদর্শবাদী মুগাবে ন্যায় পুনঃস্থাপনে নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার কারণে অসমাপ্ত ছিলেন। তিনি পরাজিত হয়েছিলেন নিজেরই মিত্র ও প্রভাবক কর্তৃক- যারা নিজেদের জন্য সবকিছুই চাচ্ছিলেন।

ঔপনিবেশিক শাসনামলের ভুলত্রুটি সমাধানের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের উদাসীনতাও তার ব্যর্থতার জন্য দায়ী। একজন রুশ নাগরিক হিসেবে মুগাবের ঘটনার অনেক প্রতিধ্বনি আমি দেখতে পাই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে রাশিয়ায় যা ঘটে চলেছে তার মধ্যে।

বিপ্লবী বীরের পরিবর্তে অনেক মানুষ তাকে স্মরণ করবে বার্ধক্যগ্রস্ত, অনিপুণ ও খুনি একনায়ক হিসেবে; কিন্তু বর্তমানে এক সেন্সে রাশিয়ান, তুর্কি, ব্রাজিলিয়ান, এমনকি কিছু দৃষ্টিভঙ্গিতে আমেরিকান ও ব্রিটিশরা তাদের নিজস্ব জিম্বাবুয়ে ভার্সনে রয়েছে।

তারা শাসিত হচ্ছে অনুপযোগী একনায়কদের মাধ্যমে, যাদের কূটকৌশলগুলো অনেক আগে থেকেই জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যে কোনো ধরনের সংযোগ হারিয়ে ফেলেছে। মুগাবে মারা গেছেন; কিন্তু কঠিন বাস্তব হল তার অবিদিত অনুগামীরা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

ব্লুমবার্গ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

লিওনিদ বারশিদেস্কি : ব্লুমবার্গের ইউরোপীয় মতামত লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×