বিশাল সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগাতে হবে

  মুঈদ রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমুদ্র

৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি হোটেলে ভারত মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ) আয়োজিত ব্লু-ইকোনমি মিনিস্টিরিয়াল কনফারেন্সের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সমুদ্র অর্থনীতি সামনে রেখে সমুদ্রে অব্যবহৃত ও অ-উন্মোচিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে যার যার টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার সুযোগ রয়েছে। সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করে আমরা দারিদ্র্যবিমোচন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিপুল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন- ‘খেয়াল রাখতে হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে যেন সমুদ্রের সুস্থ পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়।’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে দক্ষতা দেখাতে পারি না। সীমিত সম্পদের অপচয় রোধ করাটা তাই প্রথম কাজ।

ভাষাবিদরা সচেতনভাবেই ব্লু-ইকোনমির বাংলা করেছেন সমুদ্র অর্থনীতি, বোঝার ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট। যতই দিন গড়াচ্ছে অর্থনীতি ততই বিশেষায়িত হচ্ছে, অর্থনীতির অনেক দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ব্লু-ইকোনমি স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নিয়েই বিশেষ স্থান করে নিতে পারে।

১৮ শতকের মাঝামাঝিতে সংঘটিত শিল্পবিপ্লব আমাদের অনেক কিছুই দিয়েছে; জীবনের মানকে করেছে সহজ ও উন্নত। কিন্তু পরিবেশের ওপর অবিশ্বাস্য রকমের আঘাত হেনেছে। এর বিপরীতে গেল শতাব্দীর মাঝামাঝিতে ‘গ্রিন ইকোনমি’ বা ‘সবুজ অর্থনীতি’র দিকে মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে, যা কিনা পরিবেশবান্ধব। এ সবুজ অর্থনীতি মডেল হল, পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে কিংবা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা বা সমাধা করা।

এ অর্থনীতি উন্নয়ন ঘটাবে; কিন্তু পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকি কমাবে এবং মানুষের অভাব দূর করতে না পারলেও কমিয়ে আনতে সমর্থ হবে। অর্থনীতিবিদরা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই উন্নয়ন বলতে নারাজ। তারা মনে করেন, প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ এ ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য শর্ত। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে আমাদের বাংলাদেশ অন্যতম। তাই আমাদের সরকারগুলোও এদিকে নজর দিয়ে আসছে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে সবুজ অর্থনীতির অধিকতর সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বেলজিয়ান অর্থনীতিবিদ গুন্টার পিউলিকে ১৯৯৪ সালে এ বিষয়ে মতামত দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সে সময় থেকেই সবুজ অর্থনীতির পরিবর্ধিত রূপ হিসেবে জায়গা করে নেয় ‘ব্লু-ইকোনমি’, যাকে আমরা ‘সমুদ্র অর্থনীতি’ হিসেবে জানি। তবে ব্লু-ইকোনমির পরিপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায় ২০১০ সালে, যে সময়ে গুন্টার পিউলির ‘ঞযব ইষঁব ঊপড়হড়সু’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। এ সমুদ্র অর্থনীতির ধারণা বর্তমানে সারা বিশ্বে একটি গ্রহণযোগ্য ও আলোচিত বিষয়। হবেই বা না কেন?

বর্তমানে সারা বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের ৩২-৩৪ শতাংশ আসে গভীর সমুদ্রে স্থাপিত তেল-গ্যাস ক্ষেত্র থেকে। তাবৎ বিশ্বের মোট উত্তোলনযোগ্য তেলের ৫০ শতাংশই সমুদ্র ভাণ্ডারে আছে। এ তেলের আবার ২৫ শতাংশ রয়েছে গহিন জলের ভেতর। মৎস্য আহরণের কথায় যদি আসি, তাহলে বলতে হবে বিশ্বের প্রায় ৩৪ কোটি লোক সমুদ্রে মৎস্য আহরণের সঙ্গে জড়িত, এটিকে তারা জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এদের ৯০ শতাংশেরই বাস উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।

পৃথিবীর মোট মৎস্য উৎপাদনের ১৬ শতাংশ উৎপাদিত হয় আমাদের বঙ্গোপসাগরে, পরিমাণের দিক থেকে তা বছরে ৬০ লাখ টনেরও বেশি। বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ২০ শতাংশ আসে সমুদ্র থেকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা যদি বলি, অর্থের পরিমাণ বিবেচনায় ৭০ শতাংশ এবং আয়তন বিবেচনায় ৮০ শতাংশ বিশ্ব বাণিজ্য সম্পাদিত হয় সমুদ্রপথ ও বন্দর ব্যবহার করে এবং তা বছরে গড়ে ৩ শতাংশ করে বাড়ছে।

বাংলাদেশেও সমুদ্র অর্থনীতি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা নির্ধারিত হওয়ার পর তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে- উন্নয়ন আর টেকসই উন্নয়ন সমার্থক নয়। টেকসই উন্নয়ন হল সেই উন্নয়ন যা মানুষের জীবনমান বাড়াবে অথচ সম্পদ ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোনো ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে না, সম্পদের অযাচিত ক্ষয় হবে না। সমুদ্র অর্থনীতির উন্নয়নের বেলায়ও আমাদের ‘টেকসই’ ধারণাটি মাথায় রাখতে হবে।

তেল-গ্যাস, মৎস্যসম্পদ ও বাণিজ্য পথ ব্যবহারের পাশাপাশি বাংলাদেশের রয়েছে আরেকটি সম্ভাবনা। আমাদের রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকত কক্সবাজার। ১২০ কিলোমিটারের এ বিশাল সৈকতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী পর্যটন শিল্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা যদি কক্সবাজার সৈকতকে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারি, তাহলে ২০২০ সাল নাগাদ ১৬০ কোটি পর্যটককে আকৃষ্ট করা যাবে। তাছাড়া আগামী ১০ বছরে বিশ্ব পর্যটন খাতে যে ১০ কোটি লোকের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের বরাতে জুটবে।

মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রবিরোধ আন্তর্জাতিকভাবেই নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে আমাদের রয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র (টেরিটোরিয়াল সি), ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সব তলদেশের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের মালিকানা। আইনগত নিষ্পত্তি শেষে বঙ্গোপসাগরে ভারতের হাতে থাকা ১০টি গ্যাস ব্লকের মধ্যে ৮টি এবং মিয়ানমারের হাতে থাকা ১৮টি ব্লকের মধ্যে ১৩টির মালিকানাই আমরা ফিরে পেয়েছি। এতসব সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করার উপায় আছে কি?

অবশ্যই উপায় নেই আর তা হওয়াও উচিত হবে না। কিন্তু সমস্যা হল, যেখানে সমৃদ্ধির অপার সম্ভাবনা থাকে সেখানে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জও থাকে; তা মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজের অধ্যাপক ড. মো. ম. ফারুক হোসেন এমন ১৩টি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন : ১. সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলে সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা; ২. অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখা; ৩. সমুদ্র পর্যটনের লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব সামুদ্রিক অবকাঠামো নির্মাণ; ৪. আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি, মাদক, মানব ও অস্ত্র পাচারকারী, মৎস্য দস্যুতা এবং মাদক-সন্ত্রাসীর উৎপাত থেকে গভীর সমুদ্র এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের সুরক্ষা প্রদান;

৫. অর্জিত এলাকায় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা; ৬. প্রাণবৈচিত্র্যের টেকসই ব্যবস্থাপনা; ৭. সমুদ্র ও উপকূল পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা; ৮. ম্যানগ্রোভ ও সামুদ্রিক ঘাসের সুরক্ষা; ৯. জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা; ১০. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বজায় রাখা এবং জ্বলেপুড়ে যাওয়ার কারণে পরিবেশে তাপমাত্রার তারতম্য ব্যবস্থাপনা; ১১. সমুদ্রের অম্লায়ন এবং কার্বন ইস্যু; ১২. সমুদ্রকে দূষণমুক্ত ও বর্জ্যমুক্ত রাখা এবং ১৩. জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধি ও কৃষির ঘনায়নই হল আমাদের চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে আমাদের প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও স্বচ্ছ সমুদ্রনীতি তৈরি করা।

এ জায়গাতেই আমরা নির্বাক হয়ে যাই। যেখানে যত বেশি সমৃদ্ধির সম্ভাবনা, সেখানে তত বেশি অস্বচ্ছতার আশঙ্কা আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। আমাদের সব আনন্দের পেছনে পেছনে চলে নিরানন্দের ছায়া। বাংলাদেশের সব সম্পদের ভালো-মন্দের দেখভাল করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আজকাল কমিশনভোগী রেন্ট সিকাররা সরকারকে ঘিরে ফেলেছে। রেন্ট সিকাররা সরাসরি উৎপাদন বা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত না থেকে কোনো কিছু কাগজে-কলমে পাইয়ে দেয়ার পরিবর্তে কোটি কোটি টাকার কমিশন ভোগ করে এবং এ গোষ্ঠীটি বাংলাদেশে এখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

আমাদের এ বিশাল সমুদ্র অর্থনীতিতে এর কালোছায়া ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ২০১৯ সালে আবারও সম্পাদিত হয়েছে পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট)। এ চুক্তি অনুযায়ী বিদেশি কোম্পানি সমুদ্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস সরাসরি রফতানি করতে পারবে। যেখানে আমরা শিল্প রক্ষার স্বার্থে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করছি, সেখানে বিদেশি কোম্পানিকে রফতানির সুযোগ দেয়াটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২০০৮ সালে এ ধরনের চুক্তির বিরোধিতা করে সারা দেশে হরতাল পালিত হলে তা স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সরকার তা বাস্তবায়নে আবারও উদ্যোগী হয়। এর কারণ একটাই- রেন্ট সিকারদের স্বার্থ রক্ষা করা।

আমাদের সম্পদ খুবই সীমিত। কোনো অশুভ চক্রান্তের হাতে পড়ে এ সম্পদের ক্ষতি করতে দেয়া যাবে না। সমুদ্র অর্থনীতি কোনো একদিনের বিষয় নয়। আমাদের নিজস্ব দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে দেশীয়ভাবেই এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই, সময় নিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে সমুদ্র অর্থনীতিকে এ দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। সমুদ্র অর্থনীতিকে রাখতে হবে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×