নারীর প্রতি অপরাধ কঠোর হাতে দমনের বিকল্প নেই

  মীর আবদুল আলীম ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের এ সমাজের পুরুষ ঘরের বাইরে নিপাট ভদ্রলোক! অনেকে প্রায়ই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে হুংকার ছুড়েন। মঞ্চ-সেমিনারে বলেন, ‘নারী মায়ের জাতি, নারী নির্যাতন করবেন না’। মাইকে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা করেন- ‘বউ পেটানো লোক আমি দু’চোখে দেখতে পারি না।’ এ জাতীয় ভদ্রলোকরা বিচার-সালিশে নারী নির্যাতনকারী পুরুষ পেলে বেশ শায়েস্তাও করেন।
ছবি: সংগৃহীত

আমাদের এ সমাজের পুরুষ ঘরের বাইরে নিপাট ভদ্রলোক! অনেকে প্রায়ই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে হুংকার ছুড়েন। মঞ্চ-সেমিনারে বলেন, ‘নারী মায়ের জাতি, নারী নির্যাতন করবেন না’। মাইকে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা করেন- ‘বউ পেটানো লোক আমি দু’চোখে দেখতে পারি না।’ এ জাতীয় ভদ্রলোকরা বিচার-সালিশে নারী নির্যাতনকারী পুরুষ পেলে বেশ শায়েস্তাও করেন।

এ বিষয়ে নসিহত করেন, পরামর্শ দেন- ‘বউ ঘরের লক্ষ্মী; কখনও বউ পেটাবেন না। আল্লাহ নারাজ হবেন।’

কিন্তু নিজ ঘরে ঢুকলেই এদের অনেকেই এক অন্য মানুষ। বউয়ের কাছে এলেই মুখোশ খুলে যায় এদের। আমাদের সমাজে নেতৃত্বদানকারী এমন পুরুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভূরি ভূরি। কী রাজনীতিক, কী ডাক্তার, উকিল, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক- কেউ বাদ নেই এ তালিকা থেকে। তারা বিবেকসম্পন্ন উঁচুতলার মানুষ, তবুও এ কর্মটি করেন নির্লজ্জভাবে।

যারা জনগণকে সচেতন করবেন, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হবেন, তারাই যদি নির্যাতন করেন, তাহলে নারী নির্যাতন বন্ধ হবে কী করে?

এসব কারণেই পুরুষশাসিত এ সমাজে নির্যাতনের পরিসংখ্যান এত লম্বা যে, তা নির্ণয় করা দুরূহ ব্যাপার। বছরে যত না নারী নির্যাতন হয়, তার দুই শতাংশও আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। যেগুলো আদালতে বিচারাধীন থাকে তারও সাজা হয় ক’জনের? এসব অপরাধের ঘটনায় আদালতে মামলা হয় সবচেয়ে কম; মামলা হলে বিচার প্রক্রিয়া শেষে অপরাধীর দণ্ড কার্যকর হওয়ার দৃষ্টান্ত আরও কম।

অনেক ধর্ষণের শিকার নারী ও তার পরিবার সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কায় তা প্রকাশ করে না। এ কারণেই দেশে নারী নির্যাতন বাড়ছেই।

যেদিন এ লেখাটি লিখছি, সেদিনের সংবাদ শিরোনাম- নিজ শ্রেণিকক্ষ থেকে হাত-পা বাঁধা ছাত্রীকে উদ্ধার, সিঁদ কেটে যৌন হয়রানি, প্রেমপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ছাত্রীকে লাঠি দিয়ে পেটাল বখাটে। এর ঠিক দু’দিন আগে পত্রিকায় পড়েছি- কলেজছাত্রীর গাল কেটে দিল বখাটে, স্কুলছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্কের ছবি ফেসবুকে, বখাটের আগুনে কলেজছাত্রী দগ্ধ, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে কিশোরীকে হত্যার চেষ্টা।

কিছুতেই নারী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না; বরং বাড়ছে। অবলা নারী প্রতিদিনই ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অপহরণ, খুন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারী বাইরের চেয়ে ঘরেই বেশি নির্যাতনের শিকার হন।

নির্যাতিত নারী যেখানে আইনি আশ্রয় খোঁজেন, সেখানেও সমস্যা। এ ব্যাপারে একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রসঙ্গ না আনলেই নয়। এই ওসির স্ত্রীর দিন কাটত উপরওয়ালাকে স্মরণ করে, যেন ওইদিন নির্যাতনের মাত্রা একটু কম হয় এ আশায়। দোষে দুষ্ট বললে ভুল হবে, বলতে হবে তিনি গুণে গুণান্বিত ওসি ছিলেন! অতি নীরবে বউ পেটাতে পেটাতে তথাকথিত নারী নির্যাতনবিরোধী এ ওসির একদিন থলের বিড়াল বের হয়ে গেল। এক রাতে থানার নিজ কক্ষে ওসি বউ পেটানো আসামিকে নিজের হাতে ডাণ্ডা মেরে বাসায় ফেরেন। সেদিন একটু বেশিই রাগেন তিনি।

নিজের পশু চরিত্র সামাল দিতে পারেননি। সে রাতে ওই ওসি তার প্রথম স্ত্রীকে শুধু পেটাননি, সন্তানসহ ঘর থেকেই বের করে দেন। তার অধীনস্থদের সামনেই থানা কম্পাউন্ডে ঘটে এসব। পরদিন নারীবাদী এ ওসির বউ পেটানো মুখোশ থানার বাউন্ডারি পেরিয়ে জনসমক্ষে ফাঁস হয়ে যায়। এ হচ্ছে আমাদের সমাজে নারী নির্যাতনের নমুনা।

নারী নির্যাতনের সব ঘটনার খবরই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। ইদানীং লক্ষ করা যায়, নারী নির্যাতনের নতুন হাতিয়ার হিসেবে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের অনৈতিক সম্পর্ক ক্যামেরায় ধারণ করে ফেসবুক, টুইটার কিংবা অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে দেশ-বিদেশ ছড়িয়ে দেয়া হয়। ব্যাপারটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গর্হিত।

এতে স্নায়ু আবেদন থাকায় এর দর্শকেরও যেন কমতি নেই। ফলে মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগে তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায় দেশ-দেশান্তরে। কিন্তু এ মেয়ে তার পরিবার এবং আত্মীয়দের অবস্থা কি আমরা ভেবে দেখেছি? এ বিষয়ে কথা বলার যেন কেউ নেই। গত পাঁচ বছরে ‘গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে যৌন হয়রানির বিষয়টি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, বিষয়টি সচেতন মহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সাধারণত স্কুল-কলেজের মেয়েরাই এর শিকার বেশি। উঠতি বয়সের মেয়েরা হয় কোনো প্রতিশোধের শিকার নতুবা প্রেমিকের প্রতারণার মূল্যগুণে। পরকীয়ায় ফাঁসা নারীও এর শিকার হন।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না পাওয়াই নারী নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। নারীদের এ সমস্যা বহুদিন ধরেই চলমান; কিন্তু সমাধানের উদ্যোগ রাষ্ট্র কিংবা সমাজ কোনো পক্ষ থেকেই জোরালো নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব, সেক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে পুলিশ।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুলিশের এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা খুঁজে পাওয়া কঠিন। পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। অভিযোগ আছে অজ্ঞাত কারণে ধর্ষিতাকে সহযোগিতার বদলে তাদের কেউ কেউ নানাভাবে ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে থাকে। কেবল পুলিশ নয়, সমাজপতি ও গ্রাম্য মোড়লরা এসব নির্যাতনের ঘটনার পর তা মীমাংসা করে দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেন। এ অবস্থায় সমাজে এ ধরনের অপরাধ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকবে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আমরা চাই, নারীর ওপর এ নির্যাতন বন্ধ হোক।

নারীরা মায়ের-স্ত্রীর-বোনের-কন্যার মর্যাদা ফিরে পাক। আমি নারীকে ধোয়া তুলসী পাতা হিসেবে দেখছি না। নারীও অনেক দোষ করেন। তাই বলে পেটাতে হবে কেন? একজন স্বামী হিসেবে আপনিও তো স্ত্রীর কাছে দোষ করতে পারেন- তাই বলে কি তিনি (স্ত্রী) আপনাকে পেটাতে আসছেন? সংসার করছেন- পরস্পরকে ভালো করে বুঝে সংসার করেন। স্বামী-স্ত্রীতে মতের মিল না হলে আলোচনা করেন, প্রয়োজন হলে দু’পক্ষের মুরুব্বিদের নিয়ে বসে এর সুরাহা করুন। তারপরও সমাধান না হলে- কী আর করা, সমঝোতার মাধ্যমে দু’জন আলাদা হয়ে যান।

নারীর ক্ষমতায়ন বাড়লেও নারী উন্নয়ন আজও পদে পদে বাধার সম্মুখীন। নারীর প্রতি নির্যাতনের প্রতিবাদ হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। অধুনা সভ্যযুগেও আমরা মোটামুটি একই দাবি জানাতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হই। নারী এখনও সমান শ্রমে সমান মজুরি পান না, পারিবারিক জীবনে আইনি বৈষম্যের শিকার হন, পারিবারিক নির্যাতনের জন্য পান না আইনি সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির হাত থেকে নিস্তার পাওয়া এখনও দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। যদিও নারীর সম-অধিকার আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে একটি স্বীকৃত নীতি, বাস্তবে তার চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।

এ অবস্থা থেকে আমাদের নারী সমাজকে উঠিয়ে আনতে হবে। নারীকে পরিচিত করে তুলতে হবে নিজ পরিচয়ে। পরিতাপের বিষয়, এ দেশের শতবর্ষী নারীও স্বামীর সংসারে পরাধীনতার শৃঙ্খল কিছুতেই ভেদ করতে পারেন না; পারেন না নিজের স্বাধীনতাটুকু আদায় করে নিতে। জীবনের এতটা বছর পার করলেও তার মতামত সংসারে খুব কমই গুরুত্ব পায়। আর এটাই যুগ যুগ চলছে আমাদের সমাজ-সংসারে। আমাদের অবহেলিত-বঞ্চিত নারীদের আলো দেখাতে হবে, তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

এদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অপরাধগুলোকে বিশেষভাবে তদন্ত এবং বিচারের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে। এ আইনে যৌতুকের জন্য সাধারণ বা গুরুতর জখমসহ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি, হত্যা, অপহরণ, দাহ্য পদার্থ দিয়ে আহত করা ইত্যাদি প্রায় ১২ ধরনের অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন, ভিকটিমের জবানবন্দি ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিপিবদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এ আইনে অপরাধকে জামিনের অযোগ্যও ঘোষণা করা হয়। আইন আছে, আছে আদালত; তবু নারী নির্যাতন থেমে নেই। জেলা-উপজেলায়, গ্রামে-গঞ্জে নারী নির্যাতন চলছে তো চলছেই। নারী নির্যাতন আগে ছিল অশিক্ষিতের কাজ, এখন তা ভদ্র সমাজে ঢুকে গেছে। নারীর প্রতি এসব অপরাধ কঠোর হাতে দমনের বিকল্প নেই; সেই সঙ্গে নারীর প্রতি প্রয়োজন বিশেষ মনোযোগ।

মীর আবদুল আলীম : সাংবাদিক ও গবেষক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×