ছাত্রনেতারা গান শিখুক, বই পড়ুক!

  ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাব্বানী-শোভন

কয়েকদিন ধরেই বেশ একটা জমকালো মিডিয়া কভারেজ আমরা দেখছি ছাত্রলীগের দুই প্রধান নেতার চাঁদাবাজির খবর ও তাদের সরিয়ে দেয়া নিয়ে। যাহোক, নিশ্চয়ই আজ থেকে তার কিছুটা ভাটা পড়বে আর নতুন কোনো আলোচনায় আমরা চলে যাব। তার আগে আমার সামান্য কয়েকটি কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই।

ছাত্র রাজনীতির প্রধান সংকট এখন আর চাঁদাবাজিতে সীমাবদ্ধ নেই, এর আপাদমস্তক একটা বড় সংকট তৈরি হয়েছে দেশব্যাপী। একটা গল্প দিয়েই গল্পটা শুরু করি, ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, মাঝেমধ্যে মিছিল-মিটিং করে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা।

হঠাৎ করেই সে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা হয়ে যায়। তার পরিবার, আত্মীয়-পরিজন, গ্রামবাসী, এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। ছেলে বিশাল নেতা বনে গেছে। এরপর তার কাছে আসতে থাকে নানা ফোন, আমার ছেলেটারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো যায় কি না, একটু হলে রাখার ব্যবস্থা করা যায় কি না, একটু চাকরির ব্যবস্থা করা যায় কি না ইত্যাদি।

এ চিত্রটা খুবই পরিচিত। আমার গ্রামের একজন বলতেন, বাঙালি জেতার পক্ষে জয় দেয়। এমনকি আমাদের মতো ছোট সংগঠনের নেতাদের কাছেও কখনো-সখনো ফোন আসত ছেলেকে অমুক জায়গায় ভর্তি করানো যায় কি না ইত্যাদি।

এখন নেতাদের বাস্তবিক অবস্থাটা কী? নেতাদের নেতা হতে প্রথমেই ধরনা দিতে হয় পার্টির পাতি নেতা, মাঝারি নেতা, বড় নেতাদের সঙ্গে। সেই নেতাদের সন্তুষ্ট করতে তাদের বাড়ির বাজার, ফুটফরমাশ থেকে শুরু করে এমন কোনো কাজ নেই, যা না করতে হয়।

অন্যদিকে তাদের অবৈধ কাজের পাহারাদার ও লাঠিয়াল হিসেবে তো থাকতেই হয়। মাদক আর অস্ত্র হোক, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এগুলো কি ছাত্রনেতারাই করে? নাকি তাদের দিয়ে করানো হয়।

কারা করায়, কেন করায় তা খতিয়ে দেখা জরুরি। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সিন্ডিকেট কথাটা বেশ জনপ্রিয়। এ কথার শানেনজুলটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।

আমি একটা সংগঠনের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন করেছি দীর্ঘসময়। আমি দেখেছি ছাত্রদল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতিটি উৎসবে নেতাকর্মীদের সেলামি দিতে এবং তাদের মুখেই শুনেছি এটা না করলে তারা টিকতেই পারবে না।

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা হলেই গাড়ি, বাড়ি কোথা থেকে আসে? আমাদের সময় দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলের একজন কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নেতার মোটরসাইকেল চালাত। হঠাৎ করেই সে কেন্দ্রীয় নেতা বনে গেল। রাতারাতি তার গাড়ি আর বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। এখন প্রশ্ন হল, এগুলো এত দ্রুত কীভাবে আসে? কারা দেয়? কেন দেয়?

আমি কারও কারও কাছ থেকে জেনেছি, ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ তাদের হাতে রাখার জন্য এই গাড়ি, বাড়ি ও তাদের বিলাসবহুল জীবনের ব্যবস্থা করেন। কারণ এর দ্বারা তারা আরও বড় স্বার্থসিদ্ধির কাজ বাগিয়ে নিতে পারেন।

শোভন-রাব্বানীর ঘটনাই প্রথম নয়। এটা দেখে তাজ্জব বনে যাওয়ার দরকার নেই। যদি অনুসন্ধান করা হয়, দেখা যাবে, সর্বত্রই একই চিত্র।

সংকট আসলে কোথায়? সংকটটা হল- ছাত্র রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন তার প্রকৃত রূপ পাল্টে ফেলছে। একসময় ছাত্রদের অধিকার ও শিক্ষানীতির আন্দোলনে, স্বাধিকারের প্রশ্নে, গণতন্ত্রের লড়াইয়ে যে ছাত্র সংগঠনগুলো প্রাণপণ লড়াই করেছে; আজ তাদেরই কাউকে কাউকে এ নষ্টস্রোতে গা ভাসাতে দেখছি আমরা।

যদিও এ চর্চা আজ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন সংগঠনগুলো এ ক্ষমতাবাজিতেই লিপ্ত রয়েছে। তারা ছাত্রদের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে আর নেই। তারা যুক্ত ক্ষমতাকেন্দ্রিক ভাগ-বাটোয়ারায়। তাদের প্রটোকল লাগে, লাগে অস্ত্র, লাগে অর্থ, লাগে বিলাসবহুল জীবন। তারাও এগুলো শিখে তাদের বড় নেতাদের জীবন থেকে।

তাই আমি তাদের দোষ দেই না। সংকটটা তাই রাজনীতির সংকট আর তা হল ক্ষমতাসীনদের ভোগবাদী, স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের। যেখানে কোনো সৃজনশীলন ও নান্দনিকতার জায়গা নেই। ছাত্রনেতাদের গান না জানলেও চলবে; কিন্তু চোখ রাঙানি জানতে হবে। বই না পড়লেও চলবে, শুধু বুলি আওড়ালেই চলবে।

যাহোক, আমি যে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন করতাম সেটা ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠন করতে গিয়ে আমাদের ন্যূনতম কিছু পড়াশোনা করতে হতো। ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজটাকে বুঝতে হতো। আমরা সবাই জ্ঞানের ভাণ্ডার এমন ভাবার কারণ নেই। কিন্তু আমাদের প্রতিটি কাজের জন্য সংগঠনের নিয়নকানুন মেনে চলতে হতো।

যে কোনো কাজের জন্যই নেতাকর্মীদের কাছে জবাবদিহিতা করতে হতো। আমরা সংগঠন চালাতাম গণচাঁদা আর ডোনার চাঁদা থেকে। ১০ টাকা তুললে তা কুপনে লিখে তুলতে হতো। প্রতিটি সম্পাদকমণ্ডলী, কেন্দ্রীয় ও জাতীয় পরিষদ সভায় অর্থের সব ধরনের হিসাব পাস করতে হতো।

সংগঠনের যে কোনো পর্যায়ের নেতার বিরুদ্ধে যে কোনো অভিযোগ উঠলে সেটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। আমি শুধু ছাত্র ইউনিয়নের ক্ষেত্রেই বলব না, প্রগতিশীল অনেক সংগঠনের মধ্যেই এ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন, সংগ্রাম ও সংগঠনের চর্চা রয়েছে।

একটা ছাত্র সংগঠনের প্রধান কাজ হল ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলা। অথচ আমরা দেখি ক্ষমতাসীন সংগঠনগুলো ছাত্রদের সর্বদাই তাদের পালের গরুই বানিয়েছে।

হলে থাকতে হলে মিছিল করতে হবে, নেতাদের উঠতে-বসতে সালাম ঠুকতে হবে, যে কোনো অপকর্মে তাদের সঙ্গ দিতে হবে। ছাত্রদের স্বার্থের কোনো আন্দোলনে তাদের খুঁজেও পাওয়া যাবে না; কিন্তু আন্দোলন দমনে তারা ওস্তাদ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ তার উদ্যোগের জন্য। আর একটা কথা হল, নেতা পাল্টিয়ে কোনো লাভ নেই, এদের এ খাইখাই নীতি পাল্টিয়ে ছাত্রদের অধিকারের সংগ্রামে নামতে বলেন দয়া করে।

ছাত্রনেতাদের গান গাইতে শিখতে বলেন। কবিতা পড়তে বলেন। আর না হলে এ সংগঠন হবে পলায়নপর। যেমনটা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর হয়েছিল। দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের আদর্শিক ধারায় যারা লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবনত সালাম।

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×