‘জাতীয়’ শব্দের জাতীয়করণ

  আশাফা সেলিম ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘জাতীয়’ শব্দের জাতীয়করণ
ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী আশাফা সেলিম

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ ও ক্যারিশম্যাটিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ দেশে কিছুই তেমন একটা হয় না। আলোচ্য বিষয়টি যদিও সাধারণ, আবার গভীরভাবে ভাবলে কূল-কিনারা পাওয়া যায় না।

মনে হতে পারে, এ বিষয়ে গোটা জাতিই একটা ধোঁয়াশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু এ নিয়ে ভাবার সময় কারও নেই। তবে, সংশ্লিষ্ট যারা এর গুরুত্ব দিতে চান, তাদের কাছে গুরুত্ব আছে। সবার কাছে নয়। অনেকটা সেই প্রবাদটির মতো- ‘ধরলে তাল গাছ, না ধরলে...(মানে কিছুই না)’।

বিষয়টি হল ‘জাতীয়’ শব্দটির ব্যবহার বিধি। গত বছর ‘জাতীয় পত্রিকা’ শব্দবন্ধ নিয়ে পর্যবেক্ষণ-গবেষণাধর্মী অনেক লেখালেখি হয়েছে। সংবাদপত্র জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সিনিয়র সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনেকেই মূল্যবান বক্তব্য দিয়েছেন।

সবার বক্তব্যে এটা পরিষ্কার, ‘জাতীয় পত্রিকা’ ধারণাটির কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি-ভিত্তি নেই, উৎপত্তির ইতিহাসও নেই। আছে শুধু জনপরিচিতি ও মুখে মুখে বহুল ব্যবহার। ফেসবুকে এমন উদ্ভট বক্তব্যও পেয়েছি : ‘জাতীয় পত্রিকা ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তেমন বলা হয় না। মফস্বলের লোকেরা বলে!’ এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের (পিআইবি) সম্প্রতি প্রয়াত মহাপরিচালক বলেছেন, (হুবহু) ‘জাতীয় পত্রিকা বলে আসলে কিছু নেই। ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোকেই আসলে জাতীয় পত্রিকা বলা হয়ে থাকে।

তবে, কোনো পত্রিকার পক্ষ থেকে বলা হয় না যে, তারা জাতীয় পত্রিকা। এটি একটি প্রচলিত ধারণা (তার অনুমতিক্রমে মোবাইল ফোনে ধারণকৃত সাক্ষাৎকারটি এ লেখকের কাছে সংরক্ষিত আছে)।’

সম্প্রতি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা নিজেদের ‘জাতীয় দৈনিক’ বলছে। পত্রিকাটির মাস্টহেডে স্লোগান হিসেবে লিখছে, ‘দেশের সর্বাধিক প্রচারিত জাতীয় দৈনিক’। পত্রিকাটির ‘জাতীয় পত্রিকা’ হওয়ার যোগ্যতা অবশ্যই রয়েছে। শীর্ষস্থানীয় অন্য পত্রিকাগুলোও (এমনকি যাদের সেই অর্থে যোগ্যতা নেই, তারাও) যদি একইভাবে লিখতে শুরু করে বাধা দেয়া যাবে না। কারণ, ‘জাতীয়’ লিখতে যেহেতু কোনো বিধি নেই, তাই নিষেধও নেই। কিন্তু সে ক্ষেত্রে ‘জাতীয়’ শব্দটির যে মর্মার্থ, আমাদের জাতীয় জীবনে এর যে ব্যবহার বা গুরুত্ব, তার কতখানি ঠিকঠাকভাবে রক্ষা হবে- সেটাই প্রশ্ন।

এ প্রসঙ্গে ডিএফপির পরিচালক (বিজ্ঞাপন ও নিরীক্ষা) আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দিনের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা হল আইনগত প্রসঙ্গ, আরেকটা হল ব্যবহারিক বিষয়। আইন না থাকায় ‘জাতীয়’ শব্দটি লিখতে বা ব্যবহার করতে বর্তমানে কোনো অনুমতি লাগে না। পত্র-পত্রিকা ও প্রকাশনা সংক্রান্ত কোনো আইনে ‘জাতীয় দৈনিক’ শব্দের উল্লেখ নেই।

তাই ‘জাতীয় দৈনিক’ শব্দের আইনগত কোনো সংজ্ঞা বা স্বীকৃতি নেই। তাই আইনগত দিক থেকে শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো বাড়তি সুবিধা লাভের সুযোগও নেই। ...ব্যবহারিক দিক বা প্রায়োগিক বিষয় বিবেচনা করলে ‘জাতীয় দৈনিক’ শব্দ দিয়ে সারা দেশের জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন-গ্রাম পর্যায়সহ সর্বত্রই সহজলভ্য ও সব শ্রেণির পাঠকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় পত্রিকা বোঝানো হয়।

সেভাবে বিবেচনা করলে উল্লিখিত পত্রিকাটিসহ গুটিকয়েক দৈনিক পত্রিকার ক্ষেত্রে হয়তো ‘জাতীয় দৈনিক’ কথাটি মানায়; কিন্তু অন্য অনেক পত্রিকার ক্ষেত্রেই এটি বেমানান। ‘জাতীয়’ বিশেষণটি অনেকে ব্যবহার করেন পত্রিকাটির পাঠকপ্রিয়তার ব্যাপকতা বা সম্প্রসারণ বোঝাতে। তবে অন্য শব্দ দিয়েও এ কাজটি সম্পন্ন করা যেতে পারে, যেমন- ‘দেশব্যাপী’ বা ‘সর্বদেশীয়’ বলতে পারি।

কিন্তু এ শব্দের মাধ্যমে ‘জাতীয়’ শব্দের সঠিক প্রকাশ ঘটে না বা মানুষ এসব শব্দকে ‘জাতীয়’ শব্দের বিকল্প মনে করে না। তবে আইনগত ভিত্তি না থাকায় এ ‘জাতীয় পত্রিকা’ শব্দ সমষ্টি ব্যবহার না করাই উত্তম।’

‘জাতীয়’ শব্দের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন- ১৯৭২ সালের ১৩০নং অধ্যাদেশ (The Bangladesh National Anthem, Flag and Emblem Order, 1972 ) এবং ২০১০ সালের ৪৪নং আইন (The Bangladesh National Anthem, Flag and Emblem (Amendment) Act, 2010) দ্বারা জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় প্রতীক সুনির্দিষ্ট করা হয়েছিল এবং ১৯৭২ সালের ৪৫নং অধ্যাদেশ (The Bangladesh Names and Emblems (Prevention of Unauthorised Use) Order, 1972) দ্বারা বাংলাদেশের নাম ও প্রতীক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তবে এসব আইনের সংজ্ঞায় ‘জাতীয়’ শব্দটি সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। জাতীয় দৈনিক ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। এর দ্বারা অর্থের সম্প্রসারণ করা হয় ও গুরুত্ব বোঝানো হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এক কথায় ভাষার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কারণ ভাষা বহতা নদীর মতো, ভাষাকে বাঁধতে নেই। চলতে চলতে একটা সময় ভাষাই তার গতিপথ ঠিক করে নেবে। তাই, ‘জাতীয়’ শব্দের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন করার প্রয়োজন নেই। এটি ভাষা ব্যবহারকারী জনগণ ও সময়ের হাতেই ছেড়ে দেয়া ভালো।’

তবে আমার মতে, একটি মাত্র পত্রিকা নিজেদের ‘জাতীয়’ বললে কিছুটা সমস্যাও আছে। কারণ, অন্য শীর্ষ পত্রিকাগুলো তাহলে কী? বা এ দেশে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা কি একটিই! সম্প্রতি একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি (জনৈক অ্যাডভোকেট) আমাকে বললেন, ভাই, এ বিজ্ঞাপনটি (বড়সড়ো টেন্ডার নোটিশ) জাতীয় পত্রিকায় ছাপতে হবে। কোন পত্রিকায় দেয়া যায়? বললাম, আক্ষরিক অর্থে দৃশ্যমান ‘জাতীয় পত্রিকা’ তো আপাতত একটি (পত্রিকাটির নাম বললাম)। আর, অন্য শীর্ষ পত্রিকাগুলো তো নিজেদের দৃশ্যত ‘জাতীয় পত্রিকা’ বলা-লেখা শুরু করেনি। সে ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, কোনো একটি বহুল প্রচারিত শীর্ষ দৈনিকে দিয়ে দিন। উকিল সাহেব বললেন, ‘অন্য শীর্ষ পত্রিকাগুলোতে দিলে, জাতীয় পত্রিকা হিসেবে সেগুলোর তো আইনগত ভিত্তি নেই।’

ঠিক একইভাবে আমি বলি, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল তাদের কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে বলে থাকে ‘জাতীয় সম্মেলন’ বা ‘জাতীয় কাউন্সিল’! আমার মতে, বলা উচিত কেন্দ্রীয় সম্মেলন-কাউন্সিল। জাতীয় পাখি বলা হচ্ছে দোয়েলকে! আমার কাছে তো টিয়া পাখিকেই সবদিক থেকে বেশি ভালো লাগে।’ বললাম, দোয়েল দেশের সবখানে পাওয়া যায়। তিনি বললেন, তাহলে তো কাক আরও বেশি পাওয়া যায়।

কিন্তু সেটাকে জাতীয় করা হয়নি; কারণ ওটা ‘কাউয়া’। কিন্তু যে কোনো একটি মাছ বা পাখিকে ‘জাতীয়’ বলা হলে, অন্যগুলোকে অবজ্ঞা করা হয়। তাহলে বাকিগুলো কি বিজাতীয়? পত্রিকার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।

আসলে ‘জাতীয়’ কথাটির প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল সেই যুগে, যখন আমাদের বিজাতীয়রা শাসন করত। তখন জাতীয়তাবোধের একটা সংকট এবং ‘জাতীয়’ বলে কোনো কিছুকে পরিচয় করানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখন তো আর বিজাতীয়রা শাসন করে না। ফলে, সব ক্ষেত্রেই আমি আসলে ‘জাতীয়’ শব্দটিরই আর ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।’

আমার মতে, ‘জাতীয়’ শব্দটিরই জাতীয়করণ প্রয়োজন। কারণ, ‘জাতীয়’ শব্দটি আমাদের জীবনে শুধুই তিনটি বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত একটি শব্দ নয়। এ শব্দের অর্থের সঙ্গে জড়িত আমাদের ব্যক্তি তথা জাতীয় আবেগ। এ শব্দ আমাদের জাতিসত্তাকে বিশ্বদরবারে পরিচিত, প্রতিনিধিত্ব ও স্বতন্ত্র করে। কখনও কখনও আবেগকে গভীরভাবে নাড়া দেয় (যেমন: অতীতে দেখা গেছে রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা)। শব্দটির প্রয়োগও সাধারণত মর্যাদাপূর্ণ ক্ষেত্রে ও রাষ্ট্রস্বীকৃতভাবেই হয়ে থাকে। যেমন: জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংসদ, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় শোক দিবস, জাতীয় মাছ, ফল, ফুল, ক্রিকেট দল ইত্যাদি।

তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় অধ্যাপক’, ‘জাতীয় কবি’ ইত্যাদি বলা হলেও ‘জাতীয় চিকিৎসক’, ‘জাতীয় আইনজীবী’, ‘জাতীয় সাংবাদিক’ ইত্যাদি বলা হয় না। আবার, কোথাও কোথাও এ শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। প্রসঙ্গত শ্রদ্ধেয় প্রয়াত মো. শাহ আলমগীর উল্লিখিত সাক্ষাৎকারে আরও বলেছেন, ‘কখনও কখনও বিভিন্ন অর্গানাইজেশনের নামের সঙ্গে ‘জাতীয়’ শব্দটি বসিয়ে দেয়া হয়। এটা ঠিক নয়। তাই, ‘জাতীয়’ শব্দটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য একটি অথরিটি থাকা দরকার।’

আমি মো. শাহ আলমগীরের শেষ বাক্যের সঙ্গে যুক্ত করে বলতে চাই- ‘জাতীয়’ শব্দটির জাতীয়করণ তথা যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ দরকার। সে জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক একটি কমিটি বা কমিশন গঠন করা অথবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুবর্ণ শাসনামলের প্রায় ১১ বছর অতিক্রান্ত। এ সময়ে দেশে অনেক যুগান্তকারী অর্জন হয়েছে।

অর্থনৈতিক তথা সার্বিক উন্নয়ন ছাড়াও তারই নেতৃত্বে মহাকাশে ‘বঙ্গবন্ধু-১’ স্যাটেলাইট পাঠিয়ে বাংলাদেশ আজ এলিট ক্লাবের সদস্য। এ মহা উৎকর্ষের যুগে এসে ‘ভেগ’ আখ্যা বা অস্পষ্ট অভিধায় গা ভাসিয়ে জাতি চলবে, এমন হতে পারে না।

ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণমাধ্যমবান্ধব বর্তমান সরকারই পারে ‘জাতীয়’ শব্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে জাতিকে ধোঁয়াশামুক্ত করতে। তাই, এ ব্যাপারে আমি বিনীতভাবে মাননীয় তথ্যমন্ত্রী তথা সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ ও যথাযথ আশু পদক্ষেপ কামনা করছি।

আশাফা সেলিম : ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×