বিশ্ব নদী দিবস: নদী দূষণের উৎস নির্মূল জরুরি

  ড. আইনুন নিশাত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নদী দূষণ

নদীবাহিত পলি দ্বারাই বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। এই নদীর মাধ্যমে যে পানি আসে এটাই প্রকৃতিকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের উপকূল অত্যন্ত সমতল ও নিচু।

উজান থেকে যদি প্রচুর পানি না আসত, তাহলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি অনেক ভেতরে প্রবেশ করত। এ লবণাক্ততাকে ঠেকিয়ে রাখছে নদীর প্রবাহ। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা, ফসল উৎপাদন- এ রকম অনেক কর্মকাণ্ড সরাসরি নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত।

নদীর পানির সঙ্গে যে পলি আসে তা জমির উর্বরতা বাড়ায়। নদীর পাড়ে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হয়। এতে কারখানায় নদীর পানি ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুৎ স্টেশন এখনও নদীর পাড়ে গড়ে তোলা হয়। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের গরম হয়ে যাওয়াকে রক্ষার জন্য নদীর পানি ব্যবহার করা হয়।

রাজধানীর আশপাশের নদীগুলো দখলে-দূষণে মরে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় অনেক নদীর বুকে শীতকালে চাষাবাদ হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলায় পানি মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার পানিতে প্রাণীদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সংবিধানে যে নতুন ধারা সংযোজিত হয়েছে- সেখানে জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নদীসহ জলাভূমি রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব বেড়েছে।

সংবিধানের এ ধারা বাস্তবায়িত হলে এ বিষয়ক অনেক সমস্যার সমাধান হবে। অনেক অর্থ ব্যয় করে যমুনা বা পদ্মার পানি এনে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর প্রাণপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার প্রকল্পকে আমার মোটেই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ মনে হয় না। কে বা কারা নদী দূষণ করে যাবে আর সেই দূষণ থেকে নদী বাঁচানোর জন্য বা দূষণের মাত্রা কমানোর জন্য অনেক দূর থেকে পানি নিয়ে আসা হবে- এটা বাস্তবসম্মত নয়।

যেসব কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে তা বন্ধ করতে হবে। দূষিত তরল নদীতে ফেলা রোধ করতে হবে। এর জন্য ১৯৯৫ সালের আইন আছে, ১৯৯৭ সালের রেগুলেশন আছে, ২০০০ সালের আইন আছে, ২০১০ সালের আইনের সংশোধনী আছে এবং ২০১১ সালের রাজনৈতিক অঙ্গীকার আছে।

রাজধানীর আশপাশের নদীগুলোর প্রাণপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য, নদীগুলোর রাসায়নিক ও জীববৈচিত্র্যগত মান বজায় রাখার জন্য বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসাতে হবে। ট্যানারি এলাকা এবং তেজগাঁও শিল্প এলাকা, গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকা, একই সঙ্গে ইপিজেড এলাকায় যত কারখানা আছে- সব কারখানায় ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) বসানোর কাজটি জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অবস্থান থাকবে, এটাই আমার প্রত্যাশা।

একসময় নদী খননে সামাজিকভাবে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হতো। ফলে নদীর নাব্য বজায় থাকত। সেসব পদ্ধতি ফিরিয়ে আনতে হবে। ১৯৪৭ সালের পর নদীগুলোর যত্নে তেমন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। ফলে একের পর এক নদী মরে যাচ্ছে। প্রায় ৫০০ বছর আগে গঙ্গার সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্ক ছিল। ক্রমে গঙ্গার সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে এখন যমুনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে গেছে।

এক-দেড়শ’ বছর আগেও নদী খনন ও রক্ষণাবেক্ষণে সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হতো। বিভিন্ন সামাজিক পদক্ষেপ মৃতপ্রায় নদীগুলো সচল হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

যেসব উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়- সেসব উৎসকে বাইরের দূষণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশে উপযুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। কিছু উৎসে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু দূষণ রয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে আর্সেনিকের কথা উল্লেখ করা যায়। দেশের সর্বত্র একই গভীরতায় আর্সেনিক থাকে না। তাই কোন এলাকায় কোন গভীরতায় আর্সেনিক রয়েছে- এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা করে সঠিক তথ্য জনগণকে জানাতে হবে।

কাজটি ব্যবহুল ও জটিল। তাই আর্সেনিকের দূষণ থেকে সুরক্ষা পেতে যতটা সম্ভব পুকুর বা কুয়ার পানি পান করা যেতে পারে। পুকুর বা কুয়ার পানিতে একটি পরিবার বা সীমিতসংখ্যক মানুষের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব। কিন্তু একটি শহরের বা দেশের পানির চাহিদা মেটানোর বিষয়টিকে আলাদাভাবে বিবেচনায় নিয়ে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

ড. আইনুন নিশাত : পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×