নদীকে নদীর জায়গা ফেরত দিন

  ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নদী

নদীকে ঘিরে বাংলাদেশ নামক একটি দেশের সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। নদীর বুকে জন্ম নিয়েছিল যারা, সেই বাঙালিই আজকে নদীকে ভুলে যাচ্ছে। নদীর কষ্ট আজ আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে না।

আমাদের এই বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ; কিন্তু বর্তমানে নদীর সংখ্যার সঙ্গে এ কথার কোনোভাবেই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের প্রকৃতির চিরচেনা রূপ এখন অনেকটাই অতীত। নদীর এ কূল ভাঙে তো ও কূল গড়ে- নদী দখল-দূষণের ফলে নদীর এ স্বভাবগুলো এখন আর দেখা যায় না।

ভাটিয়ালি গানের যে অর্থ আর জনপ্রিয়তা তখন ছিল, তার কিছুই এখন নেই। এই পঙ্ক্তি একসময় মানুষের মনকে যেভাবে তাড়িত করত, এখন তা আর করে না। মানুষের মনকে এখন আর আগের মতো সেভাবে দোলা দেয় না নদী নিয়ে গান, কবিতা, ছড়া কিংবা উক্তি। মানুষের স্বার্থলোভী কর্মকাণ্ডের কাছে নদী আজ অসহায়। অসংখ্য নদী বিলীন হয়ে যাচ্ছে, অনেকে হারিয়ে ফেলছে তাদের সৌন্দর্য। মরণাপন্ন অবস্থায় রয়েছে অসংখ্য নদী, এর মধ্যে তুরাগ একটি।

উত্তাল খরস্রোতা তুরাগ তার যৌবন হারিয়ে আজ নিঃশেষের পথে। গাজীপুর ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের প্রধানতম নদী তুরাগের উৎপত্তিস্থল যমুনা। কালের বিবর্তনে যমুনার এ শাখা নদীটি প্রথমে ধলেশ্বরী, এলাংজানি, লৌহজং, বংশী নদী হয়ে সর্বশেষে তুরাগ নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে; যা মির্জাপুর, কালিয়াকৈর, কড্ডা, কাশিমপুর, আশুলিয়া, টঙ্গী ও মিরপুর হয়ে তুরাগ নামে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকাশিত, ‘বাংলাদেশের নদনদী’ থেকে জানা যায়, তুরাগের প্রবাহিত গতিপথের দৈর্ঘ্য ৭১ কিলোমিটার। এ সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যই ধারাবাহিকভাবে দখল ও দূষণ উভয়ের ফলে ‘মরা নদী’ নামে উপনীত হয়েছে।

এক সময় তুরাগ নদীই মায়ের মতো বুকে জড়িয়ে রাখত এ অঞ্চলের মানুষকে। এ নদীর পানি ব্যবহার করে লাখ লাখ কৃষক পরিবার তাদের কৃষিজমিতে সেচ দিয়ে শস্য উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করত। ভ্রমণবিলাসী নদীপ্রেমিক হাজারও মানুষ রংবেরঙের পানসি নিয়ে ঘুরে বেড়াত এ নদী দিয়ে। ইতিহাস রচনায়ও ভূমিকা রয়েছে এ নদীর। নাবিক আর পি সাহা একসময় জাহাজের ব্যবসায় নিয়োজিত থাকায় তিনি তার অনেক জাহাজ এ নদী দিয়ে চালনা করতেন। বড় বড় জাহাজ ও নৌকা সকাল-বিকাল চলাচল করত।

আজ তুরাগের পাড়ে গিয়ে এসব ভাবলে অনেকটা রূপকথার গল্প ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। বর্তমান প্রজন্ম এ ইতিহাস পড়লে আর তুরাগ নদীর বর্তমান চিত্র দেখে কখনোই বিশ্বাস করবে না; তুরাগ নদী কতটা যৌবনদীপ্ত ছিল, কতটা প্রাণবন্ত ছিল! ঢাকাবাসী তাদের কর্মব্যস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে এসে একটু নির্মল বাতাস, নদীর শীতল হাওয়া, বহমান নদীর গতি ইত্যাদি দেখে নিজেদের মন শান্ত করার ওই জায়গাটুকু হারিয়ে ফেলছে। আজ আর চাইলেও নিজের কষ্টটুকু নদীর পাড়ে বসে নদীর সঙ্গে বিনিময়ের পরিস্থিতি নেই। তুরাগ যেন স্বার্থলোভী মানুষের নিজের প্রশান্তির জায়গাটুকু নিজের হাতে গলাটিপে হত্যা করার কাহিনী চিত্র।

এখনকার তুরাগের পানি এতটাই গন্ধযুক্ত ও কালো বর্ণ ধারণ করেছে, এ নদীর পানি মানুষ তার প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারছে না। নদীতে থাকা প্রচুর মাছ এখন আর নেই; আছে শুধু ময়লা-আবর্জনা, পলিথিনের স্তূপ। এ পানির সঙ্গে মিশে আছে বিভিন্ন কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য এবং স্যুয়ারেজের বর্জ্য। নদীর উত্তাল ঢেউ কেড়ে নিয়েছে নদীর তলদেশে জমে থাকা নানা ধরনের আবর্জনা, পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক ইত্যাদি। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে ঢাকার আশপাশের ৫টি নদী (তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা ও বালু) পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং ১৯টি স্থানের নমুনা পানি সংগ্রহ করে Temperature, pH, DO, TDS, EC I Salinity পরীক্ষা করা হয়।

যদিও বর্ষাকালে এ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, তথাপি ১৯টি স্থানের নমুনা পানির কয়েকটিতে আদর্শ মানমাত্রার সঙ্গে অসামঞ্জস্য ছিল। কারণ হিসেবে যেসব বিষয় বেরিয়ে এসেছে, তার প্রধানটি হল শিল্পদূষণ। এ ছাড়াও রয়েছে পৌর বর্জ্যরে উপস্থিতি; কৃষি কার্যক্রমের ফলে আগত রাসায়নিক এবং নদীর পাশে গড়ে ওঠা জনমানুষের অপরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও গৃহস্থালি বর্জ্য, নদীদখল করে গবাদি পশুর বাসস্থান নির্মাণ, নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য ইটভাটা থেকে চুইয়ে আসা পানি, নৌযান থেকে নির্গত ইঞ্জিনের তেল ইত্যাদি।

সত্য হল, এখন মানুষ অনেকটা প্রয়োজনের তাগিদে নৌকায় নদীর এ পাড় থেকে অন্য পাড়ে যায়, মাঝে মাঝে পানির অসহ্য দুর্গন্ধের কারণে তা-ও মুশকিল হয়ে পড়ে। নদীর ধারে গড়ে ওঠা ছোট-বড় সব কলকারখানার মালিকরা নদীতে বর্জ্য ফেলছে এমনভাবে- যেন তারাই এ নদীর মালিক! নদী তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে, নদীর যে নিজের কোনো সত্তা আছে; তা তাদের আচরণে বোঝা খুবই কঠিন। নদী যে জীবন্ত প্রাণবন্ত একটি সত্তা, তা তুরাগের সঙ্গে মানুষের এ অমানবিক আচরণ দেখে মিথ্যা মনে হবে।

তুরাগের দুই ধারে বসতির নামে দখলদারদের ভিড় আছেই, যা ক্রমেই সরু করে দিচ্ছে এর প্রশস্ততাকে। নদীকে ঘিরে নদীর দু’পাশে অসংখ্য শিল্প-কলকারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা তুরাগ নদীকে মৃতপ্রায় করে তুলেছে। মিরপুর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটারের মধ্যে তুরাগের পানির দেখা মিললেও বেশিরভাগ অংশে বালু জমে নদীর পিঠ বেরিয়ে রয়েছে। বেড়িবাঁধ ধরে উত্তর দিকে চটবাড়ি এলাকায় পৌঁছালেই দেখা যায়, নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে নেদারল্যান্ড পার্ক; যার পুরো অংশটাই নদীর বালু দিয়ে ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। এর পাশে একইভাবে গড়ে উঠেছে ‘তামান্না ফ্যামিলি ওয়ার্ল্ড’ নামের আরেকটি পার্ক। এসব পার্কে গিয়ে মানুষ যতটা না আনন্দ পায়, নদীকে নদীর মতো থাকতে দিলে হয়তো আরও বেশি প্রশান্তি পেত।

দখল-দূষণে এ নদী আজ এতটাই বিপন্ন, হয়তো কয়েক বছর পর আর কোনো চিহ্ন থাকবে না তুরাগ নদীর। তুরাগ নদী রক্ষায় মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’-এর এক রিটের চূড়ান্ত শুনানিতে ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ের নির্দেশনায় বলা হয়, নদী রক্ষা কমিশনকে তুরাগ নদীসহ দেশের সব নদ-নদী দূষণ-দখলমুক্ত করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নিমিত্তে আইনগতভাবে অভিভাবক ঘোষণা করা হল। সব নদ-নদী দূষণমুক্ত করে স্বাভাবিক নৌ-চলাচলের উপযোগী করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কাজ করবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সূত্রে জানা গেছে, নদীর সীমানা নির্ধারণের জন্য প্রায় দুই হাজার পিলার বসানো হয়েছে তুরাগ নদীতে। এর মধ্যে আদালতের রায় মেনে বসানো হয়েছে মাত্র ২৯টি। ৯৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ পিলার বসানো হয়েছে নদীর ঢালে।

সঠিকভাবে রায় না মানার ফলে আমিনবাজার সেতু থেকে উত্তরা টঙ্গী সেতু পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ তুরাগের দুই পাড়ের মোট ৫ কোটি ২৩ লাখ বর্গফুট অতি মূল্যবান জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। নদী সুরক্ষায় খুবই নগণ্য মাত্রায় আইনের ভূমিকা কার্যকর হয়েছে। দেশের নদ-নদীগুলো দখলমুক্ত করার জন্য সম্প্রতি নদী কমিশন ৪২ হাজার দখলদারের তালিকা করেছে, এ ক্ষেত্রে পরিবেশবাদীরা একে অসম্পূর্ণ তালিকা বলে আখ্যায়িত করেছে। প্রয়োজন এ বিষয়ে সরকার ও সামাজিক পর্যায়ে কার্যক্রম।

আজ বিশ্ব নদী দিবসে আসুন, আমরা সবাই নদী রক্ষায় সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করি। নদীকে নদীর মতো বাঁচতে দেই, তবেই আমরাও আমাদের প্রাণবন্ত জীবন ফিরে পাব। ‘নদী একটি জীবন্ত সত্তা, এর আইনি অধিকার নিশ্চিত করি’ এ লক্ষ্যে সবাই এক হয়ে কাজ করি। নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দিয়ে, নদীর বৃহৎ স্বার্থের কথা চিন্তা করি। আজ নদী দিবসে সব না হোক, অন্তত ঢাকার সঙ্গে যুক্ত নদীগুলোকে পুরোপুরি দখলমুক্ত করার কাজে সবাই এগিয়ে আসুন। নদীকে নদীর জায়গা ফিরিয়ে দিতে হবে- আসুন, এ অঙ্গীকারে নদী রক্ষায় কাজ করি; দেশের সব নদীকে বাঁচিয়ে রেখে নদীমাতৃক নামকরণকে সার্থক করে তুলি।

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার : বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×