মেধা-দক্ষতার সঙ্গে আত্মসম্মানবোধও থাকা চাই

  বিমল সরকার ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মেধা-দক্ষতার সঙ্গে আত্মসম্মানবোধও থাকা চাই
প্রতীকী ছবি

ছাত্রজীবনে আমার প্রিয় একজন লেখক বিমল মিত্রের ‘অঙ্কে মেলে না’ নামে একটি উপন্যাস পড়েছিলাম। দীর্ঘদিন, আনুমানিক চল্লিশ বছর আগে পড়া ছোট্ট বইটির কাহিনী এবং বর্ণিত চরিত্রগুলোর কথা এখন আর মনে নেই।

তবে এটা বেশ মনে আছে যে, কাহিনীটি বিয়োগান্তক। বহুদিন পর আজ বারবার বইয়ের নামটির কথা আমার খুব মনে পড়ছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্থাপিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়। বঙ্গবন্ধু ও তার দুহিতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজ জেলা সদরে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান। বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়টি ধাপে ধাপে গড়ে উঠে।

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিবেচিত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারই বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত।

গোটা জাতির গর্ব করার মতো এমন একটি উঁচুমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ভিসিকে নানাবিধ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বিক্ষোভ ও তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ এবং রাতের আঁধারে পুলিশ প্রহরায় ক্যাম্পাস ছাড়তে হল।

বোধ করি কয়েক হাজার শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে ভিসির উপদেষ্টা-শুভাকাঙ্ক্ষীর সংখ্যাটিও হয়তো ছোট নয়।

কিন্তু অসন্তোষ-ক্ষোভ-আন্দোলনের ফলে পরিণতিটি শেষ পর্যন্ত এমনই হল, পুলিশ বাহিনীর সদস্য ছাড়া সংগঠন ও দল-মত নির্বিশেষে দু-দশ-বিশজন লোকও তার পাশে দাঁড়ানোর মতো ছিলেন না! অথচ তার কাছ থেকে কিংবা তার মাধ্যমে স্বার্থ উদ্ধারকারী ব্যক্তির সংখ্যাও তো একেবারে কম নয়, কম ছিল না। এই ‘দুর্বোধ্য অঙ্ক’ আমার মতো একজন সাধারণ ব্যক্তি মেলাব কীভাবে, কী করে?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন ক্ষেত্র, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার স্তরটি একদম স্বাভাবিক নেই। রয়েছে নানা অনিয়ম-অব্যবস্থা-অসঙ্গতি। একটি নয়, দুটিও নয়, দশ-বারোটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে বেশকিছু দিন ধরে। অভিযোগের পর অভিযোগ।

ভিসি, প্রোভিসি, ডিন, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর-রেক্টর বলতে গেলে কেউই বাইরে নেই অভিযোগের তালিকার। সাধারণ বা সামান্য কোনো অনিয়ম-অব্যবস্থা নয়, ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাপক দুর্নীতি ও চরম স্বেচ্ছাচারিতা। কোথাও কোথাও শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।

এ নিয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের মাঝে বিরাজ করছে চরম অসন্তোষ-ক্ষোভ-হতাশা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিটি হলেন ভিসি। এটি অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্তাব্যক্তির কাজকর্ম ও মনোবৃত্তি খেয়াল করলে মনে হয়, আর কিছু যেমনই হোক; লজ্জা-শরমের মাথাটিও আমরা দিনে দিনে খেয়ে ফেলতে বসেছি!

শিক্ষকতা আর পাঁচ-দশটির মতো সাধারণ কোনো পেশা নয়। এটি একটি মহান ব্রত। শিক্ষকতার সঙ্গে অন্য কোনো পেশার তুলনাই চলে না। জ্ঞানদান-চক্ষুদান, জ্ঞানচর্চা-গবেষণা-সাধনা; কী আশ্চর্য এক অনুভূতি! ভাবলেও যে কারও মনে বিমল আনন্দ ও পরম স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করার কথা।

অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নানা কারণে ও নানাভাবে আজ বিতর্কিত এবং আলোচিত-সমালোচিত হয়ে উঠেছে এ মহান পেশাটি। এখন আর এ পেশার সোনালি অতীত ও গৌরবোজ্জ্বল পরম্পরার কথাও আমাদের মনে খুব একটা রেখাপাত করে না।

স্থান-কাল-পাত্র এসবকিছুর ঊর্ধ্বে মহামতি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, সত্যেন বোস, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবদুর রাজ্জাক, মুজাফফর আহমদ চৌধুরী কিংবা বর্তমানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- এই তো মহান পেশা শিক্ষকতায় আমাদের অতীত-বর্তমান ও অনুপ্রেরণা; এভাবেই তো আমাদের পরম্পরা, মহাকালের পথ ধরে এগিয়ে চলা।

সাধারণ মানের পড়াশোনা করে জীবনে এক-দুটি সনদ লাভের পর প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত কতিপয় ব্যক্তি নয়, দেশের সেরা সেরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সম্পর্কে আমাদের একজন শিক্ষামন্ত্রী (২০০৯-২০১৮) আজ থেকে বছর চারেক আগে রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতায় যে মন্তব্যটি করেছেন তাতে জাতি হিসেবে আমাদের অন্তঃসারশূন্যতার চিত্রটিই আবারও নতুন করে ফুটে উঠেছে।

মন্ত্রী শ্রদ্ধাভাজন নুরুল ইসলাম নাহিদ হয়তো জানতেন, এর কোনো প্রতিবাদ হবে না। এ নিয়ে কেউ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করবে না। বাস্তবে হয়েছেও তা-ই। সবাই কেবল শুনে গেলেন। অধ্যক্ষরা শুনলেন। শুনলেন ভিসিরা। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে দেশবাসী জানল। জানল বিশ্ববাসী।

কিন্তু না; বাইরের অন্য কেউ তো দূরের কথা, যাদের উদ্দেশে মন্ত্রী মহোদয়ের মুখ থেকে হঠাৎ খেদ মেশানো এরূপ কথামালার বর্ষণ; সেসব পদ-পদবিধারী পর্যন্ত নিরুত্তর, মুখের রা-টি করেননি। মন্ত্রী মহোদয় তবে কি একযুগে দেশের সব অধ্যক্ষ এবং ভিসির কণ্ঠরোধ করে (?) তবেই এমন একটি মন্তব্য করলেন? আসলে আমরা কোনটিকে বিশ্বাস করব।

কোনো এক মহাজন বলেছেন, স্মৃতি মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রতারণা করে। তারিখ, এমনকি সালটিও এখন আর আমার সঠিক মনে নেই। তবে এটা বেশ মনে পড়ে, এনআই খান (নজরুল ইসলাম খান) সচিব হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগদান করার পরের ঘটনা এটি।

সেদিনের অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতার একপর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, ‘... বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার জন্য অনেক শিক্ষক নানাভাবে অনুরোধ, এমনকি আমার পায়ে পর্যন্ত ধরেন, ধরে থাকেন।’

অন্যসব পেশা যেমন-তেমন, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকজন অধ্যাপককে নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশটি কোথায়?

যিনি বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ-দক্ষ-অভিজ্ঞ-বিশ্বস্ত এবং যার জানার পরিধি সুবিস্তৃত, জ্ঞান অন্বেষায় সর্বদা ব্যাকুল, জীবন ও জগতের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে যার ভাবনার কোনো অন্তসীমা-পরিসীমা নেই, জ্ঞানের মশাল হাতে নিয়ে জীবন-জগৎ-সংসার আলোকিত করার সুমহান ব্রত নিয়ে শত রকমের বাধা-বিপত্তি-প্রতিকূলতাকে ডিঙিয়ে নিরন্তর সামনের দিকে হেঁটে চলেন; জাতিকে-সভ্যতাকে আরও সুন্দর-সুগম পথ দেখান- সাধারণ বিবেচনায় তিনিই তো অধ্যাপক।

দেশে এখন পাবলিক ও প্রাইভেট মিলে দেড়শ’ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি বাদে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্নের কোনো অন্ত নেই। কেবল ৪৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, আমাদের দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এখনও রোল মডেল হিসেবে গণ্য করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে।

অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, অনিয়ম-অব্যবস্থা-অসঙ্গতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নামের তালিকায় বেশ আগেভাগেই রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটিও। একেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধর্মীয় উপাসনালয়ের মতোই পবিত্র।

এসবের কর্ণধার হিসেবে যারা রয়েছেন তারা যোগ্যতা, মেধা, পাণ্ডিত্য, ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্ব- সবদিক থেকেই হবেন আদর্শস্থানীয়; এমনটাই সাধারণ ধারণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকজন শিক্ষক থাকবেন সব ধরনের কূপমণ্ডূকতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। জ্ঞান অর্জন, জ্ঞান লাভ ও জ্ঞান দানসহ জীবন-জগতের কল্যাণ সাধনায় মগ্ন। আত্মসম্মানবোধ তো তার থাকতেই হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কারা, কিভাবে আজকাল পদ-পদবি-পদোন্নতি বাগিয়ে নিচ্ছেন তা এখন আর গোপন নেই। তবে একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করবেন, তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা-দক্ষতার পাশাপাশি আত্মসম্মানবোধ থাকাটাও একান্ত জরুরি।

কারণ লক্ষ করলে বোঝা যায়, ওই বিষয়টিই যতসব বিপত্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লেখাটিতে শ্রদ্ধেয় নুরুল ইসলাম নাহিদকে উদ্ধৃত করে যে কথাগুলো বলেছি- নানাভাবে চেষ্টা করেও দিন-তারিখটি জানতে পারিনি (অনেক আগের ঘটনা, অবশ্যই স্মৃতি-বিস্মৃতির ব্যাপার)।

ঘটনাটি ব্যক্তিগতভাবে ছেলেবেলা থেকেই আমার লালিত ভাবনার পরিপন্থী বলে মনে বেশ দাগ কেটেছিল। যদি অবাস্তব-অসত্য হয় তবে আমি খুবই আনন্দিত ও খুশি হব। এজন্য সবার কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

বিমল সরকার : কলেজ শিক্ষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×