স্বদেশ ভাবনা

খাদ্য নিরাপত্তায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে

  আবদুল লতিফ মন্ডল ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খাদ্য নিরাপত্তায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে

আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠার স্মরণে প্রতি বছর দিনটি বিশ্ব খাদ্য দিবস হিসেবে পালিত হয়। প্রতি বছর দিবসটি পালনের জন্য একটি থিম বা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হল ‘Healthy diets for a yero hunger world’, যার অর্থ হল- ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ায় পুষ্টিকর খাদ্য। অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হবে।

বিশ্ব খাদ্য দিবস পালনের উদ্দেশ্যাবলির মধ্যে রয়েছে- ১. কৃষিজাত খাদ্য উৎপাদনে মনোযোগী হতে উৎসাহিত করা এবং জাতীয়, দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক এবং বেসরকারি প্রচেষ্টাকে উদ্দীপিত করা; ২. উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধিতে উৎসাহ দেয়া; ৩. গ্রামীণ জনগণের জীবনযাপন পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে এরূপ কার‌্যাবলি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের, বিশেষ করে নারী ও সুবিধাবঞ্চিতদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা; ৪. ক্ষুধা সমস্যা সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা; ৫. উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রযুক্তি সরবরাহ বৃদ্ধি করা; ৬. ক্ষুধা, পুষ্টিহীনতা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংহতিকে শক্তিশালী করা এবং খাদ্য ও কৃষি উন্নয়নে অর্জিত সাফল্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) যৌথ উদ্যোগে ১৫ জুলাই প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

বিশ্বে প্রতি নয় জনের একজন ক্ষুধায় ভুগছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা ২০১৭ সালে ছিল ৮১ কোটি ১০ লাখ। সে সংখ্যাটি এখন ৮২ কোটি ১০ লাখে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যাটি ছিল ৮০ কোটি। অর্থাৎ গত দু’বছরে (২০১৭, ২০১৮) ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ২ কোটিরও বেশি।

প্রতিবেদন মোতাবেক, বিশ্বজুড়েই বাড়ছে অপুষ্টিতে ও ক্ষুধায় ভোগা মানুষের সংখ্যা। তবে শতকরা হারে এ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে আফ্রিকান অঞ্চলগুলোতে। সেখানকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই অপুষ্টিতে ভুগছে। সংখ্যার হিসাবে তা ২৫ কোটি ৬১ লাখ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এ হার ৭ শতাংশের কাছাকাছি।

এদিকে শতকরা হিসাবে আফ্রিকায় অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলেও সংখ্যায় এশিয়ায় বেশি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। এশিয়ায় প্রায় ৫১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ পুষ্টিহীনতার শিকার।

এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া গত পাঁচ বছরে ক্ষুধা ও অপুষ্টি নিবারণে উন্নতি করলেও এখনও অঞ্চলটির ১৫ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। অঞ্চলটিতে গত বছর গুরুতর খাদ্য ঝুঁকিতে ছিল ২৭ কোটি ১৭ লাখ মানুষ।

বিভিন্ন গবেষণায় পুষ্টিকর খাবারের ভূমিকা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল- ক. পুষ্টিসমৃদ্ধ মায়েরা সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন; খ. শিশুদের অপুষ্টি দূরীকরণ একটি উন্নয়নশীল দেশের জিডিপি ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে; গ. শৈশবে পুষ্টিসমৃদ্ধ একজন মানুষ জীবনে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত আয় বাড়াতে পারে; ঘ. মানুষের আয়রন ঘাটতি দূরীকরণের মধ্য দিয়ে কর্মস্থলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে; অপুষ্টিজনিত শিশুমৃত্যু দূরীকরণ ৯ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমশক্তি বৃদ্ধি ঘটাতে পারে।

এখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসা যাক। খাদ্য নিরাপত্তার সংজ্ঞানুযায়ী তখনই খাদ্য নিরাপত্তা বিরাজমান, যখন সবার কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টি মানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে।

খাদ্য নিরাপত্তা নির্ধারণে তিনটি নিয়ামকের একটি হল খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা (quality & safety)। খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তার নির্দেশকগুলো হল খাদ্যের বহুমুখীকরণ, পুষ্টিমান ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের উপস্থিতি, প্রোটিনের মান এবং নিরাপদ খাদ্য।

আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) আর্থিক সহায়তায় এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) যৌথ উদ্যোগে তৈরি ও প্রকাশিত বাংলাদেশ আন্ডারনিউট্রিশন ম্যাপ বা অপুষ্টি মানচিত্র ২০১৪-এর ফাইন্ডিংসের মধ্যে রয়েছে- ক. গত দু’দশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় উন্নতি সাধন হলেও, দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে এলেও, প্রধান খাদ্য চালে স্বনির্ভরতা অর্জনে প্রায় সক্ষম হলেও, জন্মহার ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেলেও, শিক্ষার হার বেড়ে গেলেও পুষ্টির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। আর ‘দ্য স্টেট অব ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ছয়জনের একজন অপুষ্টিতে ভুগছেন।

বিভিন্ন গবেষণায় দেশে সার্বিকভাবে পুষ্টি স্বল্পতার জন্য একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হল- ক. তাৎক্ষণিক কারণ, খ. খানা বা পরিবার পর্যায়ে অন্তর্নিহিত কারণ, গ. সামাজিক পর্যায়ে মৌলিক কারণ।

অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ ও ব্যাধি তাৎক্ষণিক কারণের অন্তর্ভুক্ত। দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং এদের একটি অংশ অতিদরিদ্র। এরা অসহায় ও দুস্থ। অতিদরিদ্রদের একটি অংশ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল, যদিও এ কর্মসূচি থেকে প্রাপ্ত সাহায্য তাদের জীবনধারণের খুব কম চাহিদাই মেটাতে পারে।

বিশেষ করে এ কর্মসূচির আওতাবহির্ভূত অতিদরিদ্রদের বৃহত্তর অংশটি ক্ষুধা ও চরম পুষ্টিতে ভোগে। অপুষ্টিতে ভোগার কারণে এরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। অর্থাভাবে এরা চিকিৎসা নিতে পারে না। ফলে সক্ষম শ্রমশক্তিতে এদের অন্তর্ভুক্তি নেই।

খানা বা পরিবার পর্যায়ে অন্তর্নিহিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. অর্থাভাবে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহ করতে না পারায় তারা অপুষ্টিতে ভোগে। খ. দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবারগুলোয় অভ্যন্তরীণ খাদ্য বিতরণে অসমতা। এসব পরিবারে কর্মক্ষম পুরুষরা খাবারে অগ্রাধিকার পায়। পরিবারের শিশু ও মহিলারা বেশিরভাগ সময় পেটপুরে খেতে পায় না। তাছাড়া মা ও শিশুদের যত্নে রয়েছে চরম অবহেলা। অসুখে তাদের সুচিকিৎসা হয় না।

দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে এসব পরিবারে নানা ধরনের সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ফলে এসব পরিবারে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টি সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে।

সামাজিক পর্যায়ে মৌলিক কারণের মধ্যে রয়েছে গুণগত মানসম্পন্ন মানব, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের পরিমাণ। শিশুকে মায়ের দুধ না খাওয়ানো, অসচেতনতা, দুর্গম এলাকা ও অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবার কারণে আর্থিক দিক দিয়ে ভালো অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সের নিচে খর্বাকৃতি শিশুর সর্বোচ্চ হার চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান জেলায়, এ হার ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে একই বিভাগের কক্সবাজার জেলা। এখানে এ হার ৪৭ শতাংশ। পাঁচ বছরের নিচে কম ওজনের শিশুর সর্বোচ্চ হার সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায়।

এ হার ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৯টি জেলায় খর্বাকৃতি শিশুর এবং ৫৫টি জেলায় কম ওজনের শিশুর হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি।

প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলেও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা তলানিতে। বিশ্বখাদ্য নিরাপত্তা সূচক ২০১৭ অনুযায়ী বিশ্বের ১০৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৯তম। এর আগে ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যথাক্রমে ৮১, ৮১, ৮৮ ও ৮৯তম। এর অর্থ দাঁড়ায়, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে আমরা ক্রমাগতভাবে পিছিয়ে পড়ছি।

পুষ্টির সমস্যা সমাধানে সরকারকে সুনির্দিষ্টভাবে যে ব্যবস্থা নিতে হবে তার মধ্যে রয়েছে- যেসব অঞ্চল বা এলাকা সর্বাধিক বা তুলনামূলকভাবে অধিক পরিমাণে অপুষ্টিতে ভুগছে, সেসব অঞ্চল বা এলাকায় এরূপ পুষ্টির অভাবের কারণ নির্ণয়ে বিস্তারিত জরিপের ব্যবস্থা করা। অতঃপর জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিয়ে ওইসব অঞ্চল বা এলাকায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ অন্যান্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুষ্টির অভাব হ্রাস করা।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×