ভিসি নিয়োগের নীতিমালা দরকার

  ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভিসি

সততা ও নৈতিকতা দিয়ে কাজ করতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। কথাটি যথার্থ ও মূল্যবান। কিন্তু আমাদের বর্তমান ভিসিরা এর ধারে-কাছেও নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে যোগ্য ও মেধাবী মানুষদের সম্মানিত করা যায়। বঙ্গবন্ধুর দর্শন বলছে, মহাঅর্জনের জন্য মহত্যাগ দরকার। সবকিছুই ঠিক আছে; কিন্তু ভেতর আর বাইরে মানুষের ভাবনার মধ্যে এক ধরনের ব্যবধান লক্ষ করা যাচ্ছে। এতে করে সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষ আমরা বসাতে পারছি না; বরং অনেকটা জোর খাঁটিয়ে অন্যায্যতার ভিত্তিতে যোগ্যহীন লোকরা দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। এর ফলাফল মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে নেতিবাচকভাবে ভোগ করতে হচ্ছে।

অনেক মেধাবী, দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক গ্রুপিং, লবিং ও তোষামোদি করতে অসম্মান বোধ করেন বলে তারা নীরবে-নিভৃতে পাদপ্রদীপের নিচেই থেকে যাচ্ছেন। তাদের আমরা খোঁজ করে এ যোগ্য স্থানে বসিয়ে সম্মানিত করতে পারছি না; বরং ডাকসাইটে শিক্ষকদের ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আত্মসম্মানবোধ থেকে তারা এ ধরনের জায়গা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি গভীর আনুগত্য রেখে শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রেখে চলেছেন; কিন্তু সে ক্ষেত্রেও তারা যোগ্য মর্যাদা পাচ্ছেন না। এ ধরনের কালজয়ী শিক্ষকদের মৃত্যুর পর আমরা তাদের কৃতিত্বের কথা জানছি, যা আধুনিক রাষ্ট্রের মানবিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণার তীর্থভূমি। এ তীর্থভূমির দায়িত্ব যখন শিক্ষা ও গবেষণাবান্ধব না হয়ে আত্মবান্ধব হচ্ছে তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেস্ব স্বকীয়তা হারাচ্ছে।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ পদে পদায়ন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পদে পদায়ন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এখানে প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে একাডেমিক ও গবেষণার জ্ঞানকে প্রাধান্য দেয়া দরকার। মনোবিজ্ঞান বলছে, একজন মানুষের যদি জ্ঞানের গভীরতা ও বোঝার ক্ষমতা থাকে তবে তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও ভালো করবেন। আমরা যাদের ভিসি বানাচ্ছি তাদের অনেকেরই তেমন কোনো গবেষণা নেই। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও তাদের অবদান নেই। এর ফলে এ ধরনের মানুষ যখন ভিসি হচ্ছেন তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজের স্বার্থ কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। আবার যাদের তদবিরের মাধ্যমে আসছেন তাদেরও বিভিন্নভাবে সন্তুষ্ট রাখতে হচ্ছে। এছাড়া ভিসি বানানোর একটা অসাধু চক্রও তৈরি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের মানুষদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে এ ভিসি পদটি অনেকেই হাতিয়ে নিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে এ কারণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নানাবিধ জটিল সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এখন যে প্রক্রিয়ায় ভিসি নিয়োগ হচ্ছে তাতে শিক্ষার্থীরাও সরাসরি দেখছে ও বুঝতে পারছে, কীভাবে তাদের শিক্ষকরা নিজেদের মান-সম্মান খুইয়ে এ পদটির জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন; নিজেদের সম্মান ও ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিচ্ছেন। এর ফলে নিয়োগকৃত ভিসিরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছে লোক দেখানো সম্মান পেলেও প্রকৃত মর্যাদা পাচ্ছেন না। একইসঙ্গে যে মর্যাদা অর্জিত নয়; বরং লুণ্ঠিত, সে মর্যাদা যে প্রকৃত মর্যাদা নয়, সেটিও নিয়োগকৃত ভিসিদের মনস্তত্বে কাজ করছে। ফলে তাদের যে জ্ঞানসমৃদ্ধ আলোকবর্তিকার সমতুল্য নেতৃত্ব নিয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বজনীন করার কথা ছিল তা তারা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

বিভিন্ন পত্রিকায় খবর এসেছে, দেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান ভিসিদের কর্মকাণ্ডে সরকার রীতিমতো বিব্রত। নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন তারা। শিক্ষক হয়ে অশিক্ষকসুলভ আচরণ করায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরাও। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে এসেছে। এ প্রসঙ্গে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী এম শহীদুল্লাহ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সরকার সেই আলোকে সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া উচিত নয়। দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগের পরামর্শ এ শিক্ষাবিদের। কিন্তু কীভাবে ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতা পরিমাপ করা হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা এখনও পর্যন্ত কেউ দিতে পারেননি।

আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে এসেও আমরা ভিসি নিয়োগের সুসংগঠিত নীতিমালা করতে পারিনি বলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখন এটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে তদবির, লবিং, গ্রুপিং ও তোষামোদিকে অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করে সার্চ কমিটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ করা উচিত। এ সার্চ কমিটিতে তিনজন সম্মানিত জাতীয় অধ্যাপক, দু’জন প্রথিতযশা সাবেক অধ্যাপক (ইমেরিটাস প্রফেসর) ও দু’জন ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন।

ভিসি পদে আবেদনের জন্য একটি নীতিমালা থাকতে হবে; যে নীতিমালায় শিক্ষা ও গবেষণার বিভিন্ন উপাদানগুলো বিবেচনায় আনা যেতে পারে। এর সঙ্গে সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আচার-আচরণগত বিষয়সহ নীতি-নৈতিকতা যাচাই করার বিজ্ঞানসমত পদ্ধতি থাকতে হবে। ভিসি নিয়োগ কমিটি প্রয়োজন মনে করলে এ পদের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ভবিষ্যৎ মিশন ও ভিশন সংক্রান্ত ধারণা নিতে পারেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট যথাযথভাবে যাচাইয়ের পদ্ধতিও অনুসরণ করতে হবে। যারা ভিসি হতে আগ্রহী, তারা নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন করবেন। এ সার্চ কমিটি যাচাই-বাছাই করে একটি প্যানেল বা যোগ্য প্রার্থীর নাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এর পর যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ করা হবে। এছাড়া সরকার বাইরের দেশে ভিসি নিয়োগের বিভিন্ন বিকল্প পদ্ধতির বিষয়টি বিবেচনায় আনতে পারে।

ভিসি নিয়োগের জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার সাধারণত একটি সার্চ কমিটি গঠন করে থাকে। এ সার্চ কমিটিতে আচার্যের মনোনীত সদস্য, ইউজিসির সভাপতি বা প্রতিনিধি ও সিনেটে মনোনীত প্রতিনিধি থাকেন। এ কমিটি তিনজনের নামের একটি তালিকা তৈরি করে তা আচার্যের কাছে পাঠান। আচার্য সেখান থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করে একজনকে নিয়োগ দেন। আইন অনুযায়ী, সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য ভিসি পদে যোগ্য হবেন না। ভিসি নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এ কমিটি তিনজন শিক্ষকের একটি প্যানেল তৈরি করে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়ায় সেসময় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ প্রক্রিয়া আর কার্যকর থাকেনি; যদিও এ প্রক্রিয়া বন্ধের আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণাও আসেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্য সব ধরনের নিয়োগ একটি স্বাধীন নিয়োগ কমিশনের মাধ্যমে করা যেতে পারে, যেখানে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ধরনের যোগসূত্র থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব ধরনের টেন্ডার একটি স্বতন্ত্র কমিশনের মাধ্যমে হতে পারে, যেখানে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ধরনের যোগসূত্র থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের মূল কাজ হবে শিক্ষা ও গবেষণা সংক্রান্ত প্রজেক্ট আনা, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ও শিল্প-কারখানার সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা চুক্তি, কনফারেন্স আয়োজন, জব ফেয়ার, শিক্ষাকার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা, ইউনিভার্সিটির কোয়ালিটি মেইনটেইন করে এশিয়ান ও ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে আনা, শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের রিসার্চ করতে, পেটেন্ট করতে ও রিসার্চ পেপার লিখতে অনুপ্রাণিত করাসহ অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা।

একটু ভিন্নভাবে ভাবি, দেশকে এগিয়ে নেই; শিক্ষা ও গবেষণাকে অনুপ্রাণিত করি। আগামী প্রজন্মের দায়িত্ব আমাদের সবাইকে নিতে হবে। কারণ এখন যেভাবে ভিসি নিয়োগ হচ্ছে তাতে শিক্ষকদের মধ্যে রেষারেষি বাড়ছে, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গ্রুপের জন্য অবৈধ সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে; ভিসি প্রার্থীদের প্রতিযোগিতায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অস্থিরতায় ভুগছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। শিক্ষকদের মধ্যে সম্প্রীতির পরিবর্তে দলাদলি বাড়ছে; যা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এখন রাষ্ট্রের স্বার্থেই ভিসি নিয়োগের নতুন প্রক্রিয়া চালু করা দরকার।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×