শ্রীলংকান গণতন্ত্রের সমাপ্তি?

  ব্রহ্ম চেলানি ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রীলংকান পতাকা

এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো গণতন্ত্রগুলোর একটি সম্ভবত ঝুঁকিতে। আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন রাজাপাকসে পরিবারের আরেক সদস্যকে ক্ষমতায় আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদ, সহিংসতা এবং দুর্নীতির প্রতি যার আসক্তি খুবই পরিচিত।

যদিও সর্বশেষ পরীক্ষায় শ্রীলংকার গণতন্ত্র টিকে গেছে- এক বছর আগে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মাহিথ্রিপালা সিরিসেনার মাধ্যমে একটি সাংবিধানিক অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টার সময়, এটি সম্ভবত গোটাবায়া রাজাপাকসের শাসনামলে আর টিকে থাকবে না।

গোটাবায়া নামে পরিচিত এ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিরিসেনার উত্তরসূরি মাহিন্দা রাজাপাকসের ছোটভাই। বর্তমানে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ভাইয়ের শাসনামলে প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১৫ সালে শেষ হওয়া মাহিন্দা রাজাপাকসের এক দশকের দীর্ঘ শাসনামল নির্লজ্জ স্বজনপ্রীতির বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল, যেখানে তার চার ভাই সরকারের বেশির ভাগ মন্ত্রণালয় ও সরকারি অর্থের প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতেন।

এছাড়া ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে মাহিন্দা একটি মাত্রার একনায়কতন্ত্র তৈরি করেছিলেন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। যা হোক, মাহিন্দার চীনপন্থী পররাষ্ট্রনীতি শ্রীলংকায় চীনা প্রভাব এবং চীনের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার পথ ত্বরান্বিত করে দেয়।

মাহিন্দা রাজাপাকসের শেষ প্রেসিডেন্ট মেয়াদে হওয়া ঋণগ্রস্ততার কারণে ২০১৬ সালে সিরিসেনা বাধ্য হয়েছিলেন ভারত মহাসাগরের সবচেয়ে কৌশলগত বন্দর হাম্বানটোটা ও তৎসংলগ্ন ১৫ হাজার একর জমি ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেয়ার চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে। হংকং পদ্ধতির এ চুক্তিটির মডেল নেয়া হয়েছিল চীনের ওপর ব্রিটেনের ১৯ শতকের উপনিবেশ আরোপ থেকে।

গোটাবায়া কার ভাইয়ের ক্ষয়িষ্ণু উত্তরাধিকার ধরে রাখতে বা আবারও বাঁচিয়ে তুলতে চাইবেন এমন সন্দেহের কিছুটা হলেও কারণ আছে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই তিনি দায়মুক্তি পেতে পারেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন শ্রীলংকায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে চলমান দুটি মামলা থেকে।

আরেক মেয়াদ প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি এক ব্যক্তি কতবার প্রার্থী হতে পারবে তা পার্লামেন্টের আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার মাধ্যমে রাজাপাকসের প্রার্থিতা নিষিদ্ধ হওয়ার পর গোটাবায়া নিজের মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিলের ঘোষণা করেন, যাতে করে তার প্রার্থী হওয়ার পথে কোনো বাধা না থাকে।

২০০৯ সালে শ্রীলংকার ২৫ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসানের তত্ত্বাবধান করেছেন মাহিন্দা; কিন্তু তিনি শান্তির কোনো পক্ষ ছিলেন না। গৃহযুদ্ধের শেষ বছরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ- অধিকারকর্মী থেকে তামিল বেসামরিক নাগরিক যারা রাজাপাকসে পরিবারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, গুম হয়ে গেছে বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এমনকি জাতিসংঘের মতে, তামিল টাইগার গেরিলা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর চূড়ান্ত অভিযান ছিল ‘আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক ও পুরোপুরি একটি লঙ্ঘন’, যাতে অন্তত ৪০ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধকালীন সামরিক কমান্ডার সারাথ ফনসেকার মতে, বিদ্রোহী নেতারা আত্মসমর্পণ করার পর দ্রুত তাদের হত্যা করতে গোটাবায়া আদেশ দেন।

শ্রীলংকার প্রধানত হিন্দু তামিল সংখ্যালঘুদের ওপর বিভীষিকা চালানো সত্ত্বেও রাজাপাকসের ভাইয়েরা দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সিংহলি জনগণের বেশির ভাগের কাছে নায়কের মর্যাদা পান। এটি মাহিন্দাকে সাহসী করে তোলে বহুজাতিক একটি দেশকে একজাতিক পরিচয়ে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করার জন্য।

এ পদক্ষেপ পুনর্বায়ন (গোটাবায়া নিশ্চিতভাবে তা করবেন) গৃহযুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জাতিগত বিভক্তি কমিয়ে আনবে না কোনোভাবেই। সাম্প্রতিক সিংহলি ও মুসলমানদের মধ্যে শুরু হওয়া তিক্ততার কথা না হয় বাদই দিলাম। এ উত্তেজনা তীব্রভাবে বেড়ে যায় এপ্রিল মাসে, যখন ইসলামপন্থী জঙ্গিরা ইস্টার সানডে’তে সিরিজ বোমা হামলা করে ২৫৩ জনকে হত্যা ও আরও অনেককে আহত করে।

এটি কেবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাই ছিল না, এটি ছিল শ্রীলংকায় ইসলামপন্থী জঙ্গিদের প্রথম সবচেয়ে বড় হামলা, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যার ১০ শতাংশ। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, এটি ছিল অভাবনীয়। বস্তুত, সিরিসেনা স্বীকার করে নিয়েছেন, প্রতিরক্ষা ও পুলিশ কর্মকর্তারা ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছ থেকে আসন্ন হামলার একটি আগাম সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন এবং ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিতও করা হচ্ছিল; কিন্তু তিনি সে রিপোর্ট দেখেননি।

গত অক্টোবরে সিরিসেনার অভ্যুত্থানের টার্গেট প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেও সতর্কবার্তাটিকে আমলে নেননি। সিরিসেনা আকস্মিকভাবে বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করেন এবং পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার আগে চ্যালেঞ্জ দূর করতে অন্য কারও পরিবর্তে খোদ মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে শপথ পাঠ করান; কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট বিষয়টিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে তার চেষ্টা রুদ্ধ হয়।

রাজাপাকসে ভাইয়েরা এরই মধ্যে ইসলামপন্থীদের বোমা হামলাকে ব্যবহার শুরু করেছেন সিংহলি জাতীয়তাবাদী স্ফুলিঙ্গ উসকে দেয়ার জন্য। গোটাবায়া তার সমর্থকদের কাছে শপথ করেছেন, নির্বাচিত হলে গোয়েন্দা নজরদারি শক্তিশালী করবেন এবং নাগরিকদের ওপর নজরদারির বিষয়টি আবারও শুরু করবেন ইসলামপন্থী উগ্রতা চুরমার করে দেয়ার জন্য।

প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন এমন অভিযুক্ত একজন যুদ্ধাপরাধীর দৃষ্টিপথ এখনও বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির দিকে নিবদ্ধ; যা বাস্তবিক অর্থেই সংখ্যালঘু গ্রুপগুলো, মিডিয়া ও বেসামরিক-স্বাধীনতাপন্থী অধিকারকর্মীদের আতঙ্কিত করছে। এমনকি আরও কষ্টকর খবর আছে। গোটাবায়ার পক্ষ আরও নিশ্চিত করেছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি চীনের সঙ্গে ‘সম্পর্ক পুনরুদ্ধার’ করবেন। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্রপথের কাছের শ্রীলংকার কৌশলগত স্থান দেয়ার মধ্য দিয়ে এ প্রতিশ্রুতির বিস্তৃতি দ্বীপরাষ্ট্রটিকে ছাড়িয়ে যাবে এবং অনেক কিছু জড়াবে।

অবশ্য, সমুদ্রপথের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে শ্রীলংকা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে চীন ও ইন্দো-প্যাসিফিক ডেমোক্রেটিক শক্তিগুলোর (ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) মধ্যে। সমুদ্রপথ সংক্রান্ত চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’

কৌশল ভারতকে বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলছে ভারত মহাসাগরের মূল পথে চীনের কৌশলগত সামরিক ও বাণিজ্যিক সুবিধাদি বৃদ্ধির কারণে। চীনা প্রেসিডেন্ট ঝি জিনপিন তার সমুদ্র সিল্ক রোড প্রকল্পের কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হাম্বানটোটা বন্দর প্রকৃতপক্ষেই একটি মূলবান মুক্তা।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের সংশয় বাড়ছে, তখন রাজাপাকসে পরিবারের সম্ভাব্য ক্ষমতায় ফেরার খবর চীনের জন্য একটি সুখবর; কারণ চীন দেশটিকে সম্ভাব্য একটি সামরিক উপনিবেশে পরিণত করার আশা করে।

কিন্তু এটি অন্য সবার জন্য খারাপ খবর। গোটাবায়ার প্রেসিডেন্সি এরই মধ্যে বিলম্বিত হয়ে পড়া তার ভাইয়ের প্রশাসনের ভিকটিমদের ন্যায়বিচার আটকে দিতে পারে, ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সহায়তা করতে পারে। শ্রীলংকার গণতন্ত্র আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

ব্রহ্ম চেলানি : দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক ও বার্লিনের রবার্ট বোচ একাডেমির ফেলো

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×