মিঠে কড়া সংলাপ

গোড়া রেখে আগা ছেঁটে লাভ হবে না

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ০২ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গোড়া রেখে আগা ছাঁটা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ হল এ দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল। এ দলটির ইতিহাস এবং উত্থান-পতনের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

যে দলটি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেই দলের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে দেশের মানুষ যে চিন্তাভাবনা করবেন, আলোচনা-সমালোচনা করবেন, দলটির জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়লে চিন্তা করে আকুল হবেন সেটাই স্বাভাবিক। আর সেসব দৃষ্টিকোণ থেকে এ মুহূর্তে দলটির জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার কোথায়, তা নিয়ে দলের শুভানুধ্যায়ীদের ভাবনাচিন্তার অন্ত নেই।

বিশেষ করে দলটিকে যারা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, বঙ্গবন্ধুর জন্য আজও যাদের প্রাণ কাঁদে, বঙ্গবন্ধুকন্যার জন্য চিন্তা করে যারা ব্যাকুল হয়ে ওঠেন, তাদের জন্য বর্তমান কালটা একটি ক্রান্তিকালই বটে। কারণ চাটার দল চেটেপুটে যখন সবকিছু নষ্ট করে দিচ্ছিল, লুটেরার দল লুটেপুটে যখন সবকিছু সাবাড় করে দিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। আর সে অবস্থায় তার চারপাশে অবস্থিত চাটার দল, লুটেরার দলের হোতাদের কপালেও ভাঁজ পড়েছে।

কারণ, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, যেসব ব্যক্তি ব্যাংক লুট করেছে, পুঁজিবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তারা বা তাদের গডফাদারদের অবস্থান-অবস্থিতি বঙ্গবন্ধুকন্যার আশপাশেই! অন্যথায় ব্যাংক ও পুঁজিবাজার এভাবে লুটপাটের শিকার হতো না।

ব্যাংক ও পুঁজিবাজার থেকে যারা এভাবে বারবার অর্থ লুটে নিচ্ছে তাদের অবস্থান-অবস্থিতি চিহ্নিত করতে গেলে দেখা যাবে, অবশ্যই তারা দূরের কেউ নন। বঙ্গবন্ধুকন্যার আশপাশে অবস্থান করেই কলকাঠি নাড়ানোর মাধ্যমে তারা তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। আর ওইসব অপকর্মকারী ব্যক্তির আশীর্বাদপুষ্টরাই আবার টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মদ-জুয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

অতি সম্প্রতি ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি উন্মোচনের মাধ্যমে যার একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ দেশ ও জাতির সামনে উপস্থাপিত হল। কিন্তু এই ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি যে প্রকৃত ঘটনার একটি সামান্যতম অংশমাত্র, তা বোধকরি অনেকের পক্ষেই ধারণা করা সম্ভব নয়। কারণ প্রায় দশ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ডাক্তার পুত্রের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে জানতে পেরেছিলাম, এ দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় কীভাবে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। চলে আসার আগের দিন আমার পুত্রের এক বন্ধুর বাড়িতে নিমন্ত্রণে গিয়ে আমি অনেক কথাই জানতে, শুনতে ও বুঝতে পেরেছিলাম।

ওই নিমন্ত্রণ অনুষ্ঠানে আগত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্র যিনি নিজেও একসময় ছাত্রলীগ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তিনি বললেন, ‘আঙ্কেল বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা অস্ট্রেলিয়ায় এসে জুয়ার আড্ডায় দেদার টাকা ওড়ায়।’ যে ছেলেটি আমাকে এ তথ্যটি দিয়েছিলেন, তিনি সিডনিতে মানি ট্রানজেকশন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

দশ বছর আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকরা হাজার হাজার কোটি টাকা অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করেছেন এবং প্রতিদিন হুন্ডির মাধ্যমে তা অব্যাহত আছে। আর বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ সব সরকারের আমলেই তা হয়ে আসছে!

ছেলেটি আফসোস করে আরও বলেছিলেন, ‘জুয়ার আড্ডায় এসে বাংলাদেশের নেতারা যেভাবে টাকা নষ্ট করে তা দেখলে খুবই কষ্ট লাগে।’ সেদিনে তার কথা এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দিলেও আজকের ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটিত হওয়ার পর ক্যাসিনোর সম্রাটদের সিঙ্গাপুরে গিয়ে জুয়া খেলার একবিন্দু প্রমাণ জনসমক্ষে চলে এলে, তা দেখেশুনে দশ বছর আগে সিডনির মানি ট্রানজেকশন ব্যবসায়ী ছেলেটির কথাই মনে পড়ে গেল।

আর এসব দেখে, শুনে, বুঝে এ দেশের সেসব মানুষের কাথাও মনে পড়েছে যিনি বা যারা অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, কিংবা দিন-রাত নিদারুণ পরিশ্রমের মাধ্যমে কোথাও মোটা অঙ্কের বেতনে চাকরি করে পাই পাই হিসাব কষে প্রতিবছর সরকারি কোষাগারে আয়কর জমা করছেন।

এ শ্রেণির আয়করদাতার কথা মনে হচ্ছে, কারণ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে সরকারকে আয়কর প্রদানের পর সেসব অর্থ যেভাবে অপচয় হচ্ছে তা দেখেশুনে ওইসব আয়কর প্রদানকারীর মনের অবস্থা বুঝতে পারি। আর উপরোক্ত বিষয়গুলো আমলে নিলে বারবার যে কথাটি সামনে চলে আসবে তা হল, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

কারণ ইতিমধ্যে ক্যাসিনো সম্রাট চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের রাজনীতির একটি দৈন্যদশাও দেখিয়ে দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘ঢাকার এক একটি জনসভায় লোক জোগাড় করতে কত টাকা লাগে সে খবর আপনারা জানেন?’ আর এসব টাকার জোগান দিতেই নাকি তাকে এসব করতে হয়!

এভাবে জবানবন্দি প্রদানের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় সচিত্রভাবে এসব সম্রাটের যাদের সঙ্গে সখ্য দেখা গেছে এবং যাচ্ছে তা দেখলে অবশ্যই বলা চলে, এসব সম্রাট বিচ্ছিন্ন কেউ নন। তারা তাদের রাজনৈতিক গুরুদের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্তমান অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকন্যা এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করায় যদিও তাদের রাজনৈতিক গুরুদেবগণ, ‘আমি না, আমি না’ ধ্বনি তুলে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু ওইসব অন্যায় অপকর্মের টাকার স্বাদ ওইসব সম্রাট ছাড়াও উঁচু স্তরের অনেক নেতাও যে ভোগ করতেন সে কথাটিও ঠিক! অন্যথায়, সম্রাটের মতো একজন মানুষ কীভাবে যুবলীগের উচ্চাসনে বসতে পারেন এবং সেখানে অবস্থান করে বছরের পর বছর ধরে তিনি নিরাপদে তার অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, টর্চার শেল গঠন করে সেখানে নিজদলীয় নেতাকর্মীকে পর্যন্ত নির্যাতন করে চলেছিলেন?

আবার সম্রাটীয় নীতি গ্রহণ করেই জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সারা দেশে এক একজন সম্রাটকেই বেছে বেছে মনোনয়ন প্রদান করা হয়। দলীয় কোনো ভালো ব্যক্তি, যিনি সৎ, ভদ্রলোক, নিরহংকারী ও পরোপকারী নিঃস্বার্থ ব্যক্তি, তিনি বা তারা মনোনয়নপ্রত্যাশী হলে সম্রাটদের কাছে তারা যে পাত্তাই পান না সে কথাটিও তো দিবালোকের মতোই সত্য।

সে সময় তো রাজনৈতিক গুরুদেবগণ তথা দলীয় হাইকমান্ড দলীয় প্রধানের কাছে সম্রাটদের আমলনামা তুলে ধরে তাদের পক্ষেই ওকালতি করেন, নাকি? সে সময় যদি দলীয় হাইকমান্ড দলীয় প্রধানের কাছে শিক্ষিত, সৎ, নিঃস্বার্থ ভদ্রলোকের আমলনামাকে প্রাধান্য দিতেন তাহলে তো রাজধানীসহ সারা দেশ সম্রাটে ভরে যেত না।

আজ রাজধানী শহরে যে সম্রাটকে ধরা হয়েছে শুধু তিনি একাই কি সম্রাট, নাকি সারা দেশের ৬৪টি জেলায়ই খোঁজ করলে এমন শত শত সম্রাট পাওয়া যাবে। একটি জেলা শহরে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়, একশ ভাগ ক্ষেত্রেই যে সেসব অর্থ একেকজন সম্রাটের মাধ্যমে ব্যয় করতে হয়, অর্থাৎ ওইসব জেলা শহর, থানা শহর ইত্যাদি এলাকার যেসব সম্রাট রয়েছেন তাদের নির্দেশে তাদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় এ কথাও তো সর্বজনবিদিত! আর সেসব ক্ষেত্রে কাজের কাজ যে কী হয় তাও তো সবারই জানা!

এমনও তো দেখা গেছে, একশ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মাত্র পঁচিশ-ত্রিশ কোটি টাকা ব্যয় করে বাকি সবটাই ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়া হয়! তাহলে সে ক্ষেত্রে ওইসব সম্রাটের কী হবে? ওইসব অর্থও তো দেশের অর্থ, দশের অর্থ, নাকি? আর ওইসব অর্থও কি মফস্বলের সম্রাটরা একাই ভোগ করেন, নাকি ভাগ-বাটোয়ারা কেন্দ্রেও আসে? নইলে একজন নেতাকে এমন কথা বলতে শোনা যাবে কেন যে, ২০১৪-এর নির্বাচনেও মনোনয়নের জন্য তাকে কেন্দ্রের নেতা-উপদেষ্টাদের পেছনে পাঁচ কোটি টাকা খরচ করত হয়েছে।

আর কেন্দ্রের ওইসব নেতা-উপদেষ্টাও বিদেশ ভ্রমণসহ বিদেশে স্ত্রী-পরিজন বা নিজের চিকিৎসা খরচের অজুহাতে মনোনয়ন বাণিজ্যসহ বিভিন্ন সময়ে সারা দেশের সম্রাটদের কাছ থেকেই বখরা আদায় করেন! আর এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জননেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যাই বা কার ওপর এবং কাদের ওপর ভরসা করবেন?

তিনি যদি দলীয় হাইকমান্ডের অন্য সবার প্রতি ভরসা করতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে তাকে নিজ হাতেই যে সবকিছু করতে হবে সে কথা বলাইবাহুল্য। আর বর্তমানে তিনি সে কাজটি শুরু করেছেন কি না ভবিষ্যৎই তা বলে দেবে। তবে সে ক্ষেত্রে গোড়া রেখে শুধু আগা ছেঁটে কোনো লাভ হবে না! আগে ডাল ছেঁটে গোড়ায়ও হাত দিতে হবে!

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×